Inqilab Logo

ঢাকা, শনিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৮, ০৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ০৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী

রাসূল (সা:) এর দরবারের আদব-০৩

| প্রকাশের সময় : ২৬ জুলাই, ২০১৮, ১২:০২ এএম

উদাহরণ-০১ হুদায়বিয়ার সন্ধিকালীন ঘটনার সময় মহানবী (স) হযরত উসমান (রা)-কে স্বীয় প্রতিনিধি নিযুক্ত করে সন্ধি স্থাপনের জন্য মক্কা পাঠালেন । নিজে ব্যক্তিগতভাবে সকল সাহাবাদের সঙ্গে হুদায়বিয়া নামক স্থানে অব¯থান করছিলেন। হযরত উসমান গনী (রা) মক্কার কোরায়শদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করলেন। কিন্তু তারা ওই বৎসর মুসলমানদের উমরার অনুমতিদানের বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করলো। কয়েকদিনের অনবরত প্রচেষ্টা সত্তে¦ও আশানুরূপ কোন ফল পাওয়া গেল না। মক্কার কাফির নেতৃবৃন্দ তাদের নিজ হঠধর্মী সিদ্ধান্তে অটল থাকলো। কয়েকজনে হযরত উসমান গনী (রা)-কে প্রসÍাব দিল যে, ব্যক্তিভাবে আপনি নিজে যদি উমরা করতে চান তার অনুমতি আমাদের পক্ষ থেকে রয়েছে। হযরত উসমান গনী (রা) জবাবে বললেন, এটা কিভাবে সম্ভব যে, আমার মনিবকে(নবীজী স.) তাওয়াফ করতে বাধা দেওয়া হবে আর সেখানে আমি নিজে একা তাওয়াফ করে নেব ? মক্কার কোরায়শদের অন্তরে এ বিষয়টি বজ্রাঘাতের মতো আঘাত হানলো। তারা এমনটি ধারণাই করতে পারেনি যে, রাসূল (স) এর অনুসারী লোকদের আদব ও প্রেমাবেগ এমন উচ্চ পর্যায়ে উপনীত হয়ে গেছে! হযরত উসমান গনী (রা) যখন ফিরে আসলেন তখন কোন কোন সাহাবী জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কি তাওয়াফ করে এসেছেন ? তিনি জবাব দিলেন, “আল্লাহর শপথ! যাঁর কুদরতী হাতে আমার প্রাণ রয়েছে । আমি যদি সেখানে এক বছরও অবস্থান করতাম অথচ আমার মনিব প্রিয় নবী (স) হুদায়বিয়ায় অবস্থান করছেন ; তাহলে আমি প্রিয়নবীকে ছাড়া কক্ষণো তাওয়াফ করতাম না।” হযরত বুসিরী (র) ‘হামযা’বিশিষ্ট কাসিদায় কত উত্তমরূপে বলেছেনÑ “হযরত উসমান (রা) বায়তুল্লাহ্র তাওয়াফ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার কারণ, কোন দিক থেকেই তা নবী করীম (স) এর কাছে ছিল না। তাই তার ( উমরা-তাওয়াফের) পরিবর্তে প্রিয়নবীর নূরানী হস্তে বায়‘আতে রেদওয়ানের মাধ্যমে তাঁরা পেয়ে গেলেন দ্বিগূণ আমলের প্রতিদান। এটা কেবল আদবেরই ফল ছিল। কতই না উত্তম আদবের অনুশীলন ছিল মহানবীর সঙ্গী-সাথীদের।” হযরত উসমান গনী (রা) লজ্জা-শালীনতা ও আদবের গুণে অপরাপর সাহাবাদের থেকে অনেক অগ্রগামী ছিলেন। তিনি বলতেন, “যখন আমি মহানবী (স) এর কাছে বায়‘আত নিলাম তখন থেকে আজ পর্যন্ত আমি কখনও ডানহাত নিজ লজ্জাস্থানে স্পর্শ করিনি”।
উদাহরণÑ২ হুদায়বিয়ার সন্ধিকালীন মক্কার কোরায়শগণ উরওয়া ইবন মাসউদ সাকাফীকে প্রতিনিধি বানিয়ে পাঠালো যেন সন্ধির শর্তসমূহ নির্ধারণ করা যায়। উরওয়া উচ্চ-পর্যায়ের বিচক্ষণ ও দূরদর্শী ছিল। সে মুসলমানদের সৈন্যের মাঝে পৌঁছেই প্রতিটি বস্তুরই সমীক্ষা চালাতে শুরু করলো। এমনকি সে মহানবী (স) এর দরবারে বসাবস্থায়ই বাক্যালাপ কালীন কানিচোখে সাহাবাদের আচার-আচরণ, নড়াচড়া পর্যবেক্ষণ করতে লাগলো। তারপর যখন সে মক্কার কোরায়শদের কাছে ফিরে গেল তখন নবীভক্ত পতঙ্গদের ব্যাপারে তার নি¤েœাক্ত অভিব্যক্তি বর্ণনা করলোÑ “দরবারে প্রতিনিধি হিসাবে গিয়েছি। আমি কোথাও এমন বাদশাহ্ কখনও দেখিনি , যাকে তার সঙ্গী-সাথীরা এমন নযীরবিহীন ইয্যত-সম্মান প্রদর্শন করে যা কিনা মুহাম্মদ (স)-কে তাঁর সাহাবীরা করে থাকে। তিনি যখন তাদের কোন বিষয়ের নির্দেশ দেন তারা তাতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। তিনি যখন উযূ করেন , তারা তাঁর উযূর অবশিষ্ট পানি নিয়ে অনেকটা যুদ্ধের অনুরূপ কাড়াকাড়ি,ভাগাভাগি শুরু করেন। তিনি যখন কথা বলেন, তারা একেবারে চুপচাপ হয়ে তাঁর কথা শুনতে থাকেন। আর তাঁর প্রতি অধিক শ্রদ্ধাবশত তাঁরা তাঁর দিকে এক নাগাড়ে তাকিয়েও থাকে না।”- (মুসলিম) সাহাবাকিরাম (রা) এর মহানবী (স) এর প্রতি আদব প্রদর্শনের সাক্ষ্য এর চেয়ে উত্তম বাক্যে পেশ করা অবশ্যই সুকঠিন। কারো প্রশংসা যদি শত্রæর মুখে উচ্চারিত হয় তখন তার গুরুত্ব অনেক বেড়ে যায়। সেসব পবিত্র মনীষীই প্রকৃত প্রশংসার যোগ্য যারা নিজেদের আদব-শিষ্টাচার ও উত্তম চরিত্রের স্বীকারোক্তি প্রদানে শত্রæদেরও বাধ্য করেছিলেন।“আদব এমন এক রাজমুকুট যা আল্লাহ তা‘আলার দয়া ও অনুগ্রহে ভাগ্যে জুটে থাকে। তা নিজ মাথায় পরিধান করো এবং যেথায় ইচ্ছা গমন করো, ইয্যত পাবে।”
উদাহরণÑ৩ হযরত আব্বাস (রা) মহানবী (স) এর চাচা ছিলেন। তবে বয়সের দিক থেকে তেমন পার্থক্য ছিল না। একদা মহানবী (স) তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেনÑ “আপনি কি আমার চেয়ে বেশী বড়?” বাক্যটি শুনেই হযরত আব্বাস (রা) কেঁপে উঠলেন এবং বললেনÑ “হে আল্লাহর রাসূল! আপনি অবশ্যই বড়,মর্যাদায় শ্রেষ্ঠ; তবে আমি বয়সে একটু বেশী”। উক্তরূপ আরেকটি ঘটনাও বর্ণিত আছে যে, হযরত উসমান (রা) বয়সের প্রসঙ্গ আলোচনা করতে গিয়ে কোন সাহাবীকে জিজ্ঞাসা করলেন,“ তুমি বড় না কি মহানবী (স) বড় ?” ওই সাহাবী উত্তরে বললেন, “মহানবী (স) আমার চেয়ে অনেক বড় , তবে জন্মের দিক থেকে আমার জন্ম পূর্বে হয়েছে”। (কাশফুল-গুম্মাহ:আল্লামা শা‘রানী) এসব থেকে সহজেই অনুমেয় যে, সাহাবাগণ নিজেদের মাঝে সাধারণ বাক্যালাপ এর ক্ষেত্রেও এমন কোন শব্দ ব্যবহার করা পসন্দ করতেন না যা দ্বারা বে-আদবীর আভাষ পাওয়া যেতে পারে। মহানবী (স) এর প্রতি সম্মান ও মর্যাদাবোধের আবেগ-অনুভূতি তাঁদের জীবনের পরতে পরতে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল যে, দ্রæত বাক্যালাপ কালীনও আদব-পরিপন্থী কোন শব্দ তাঁদের মুখ থেকে বের হতো না।
উদাহরণÑ৪ ‘শামায়েলে তিরমিযি’ গ্রন্থে হযরত আনাস ইবন মালেক (রা) হতে বর্ণিত যে, বিশেষ কোন প্রয়োজনের চাহিদা মোতাবেক যদি সাহাবাকিরাম (রা) এর কারও মহানবী (স) এর গৃহের দরজায় কড়া নাড়া দেওয়ার প্রয়োজন হতো তাহলে সেক্ষেত্রে তাঁরা আদব রক্ষার্থে নিজ নখের দ্বারা কড়া নাড়তেন। উদ্দেশ্য হয়ে থাকতো, যেন অবগতিও হয়ে যায় এবং উচ্চ আওয়াজের দরুন যেন মনে কষ্টও না লাগে।
উদাহরণÑ৫ মক্কার কোরায়শদের সর্দার আবূ সুফিয়ানের কন্যা উম্মে হাবীবা (রা) মুসলমান হয়ে গেলে মহানবী (স) তাঁকে নিজ স্ত্রী হিসাবে গ্রহণ করে ধন্য করেছেন। আবূ সুফিয়ান তখনও মুসলমান হননি। যখন হুদায়বিয়ার সন্ধি চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে আসছিল তখন মক্কার কোরায়শরা ওই চুক্তির মেয়াদ পুনঃ বৃদ্ধির লক্ষ্যে আবূ সুফিয়ানকে নির্বাচিত করে পাঠালেন। আবূ সুফিয়ান কোরায়শদের দূত হিসাবে পবিত্র মদীনা নগরীতে পৌঁছলেন এবং নিজ কন্যা উম্মে হাবীবা (রা) এর গৃহে উপস্থিত হলেন। একটি চৌকির ওপর মহানবী (স) এর বরকতপূর্ণ বিছানা বিছানো ছিল। আবূ সুফিয়ান যখনই তার ওপর বসতে চাইলেন তখনই হযরত উম্মে হাবীবা (রা) বিছানাটি সরিয়ে ফেলে নিজ পিতাকে খালি চৌকির দিকে ঈঙ্গিত করে বললেন, আব্বাজান বসুন! আবূ সুফিয়ান পরিস্থিতি সঠিকভাবে বুঝে উঠতে পারেননি, তাই মেয়েকে জিজ্ঞাসা করলেন, এ বিছানা কি আমার বসার যোগ্য নয়, না কি আমি তার ওপর বসার যোগ্য নই ? উম্মে হাবীবা (রা) বললেন, আব্বাজান ! এটা হচ্ছে রাসূলুল্লাহ (স) এর বিছানা! আবূ সুফিয়ান বললেন, তাতে কি হয়েছে, সে তোমার স্বামী আর আমি তো তোমার পিতা। মুমিন জননী উত্তর দিলেন, তাতো ঠিক বটে ; কিন্তু আপনি তো এখনও মুশরিক অবস্থায় আছেন অথচ প্রিয়নবী (স) এর বিছানাটি পবিত্র। যে-কারণে আমার মনে সায় দিচ্ছে না যে, আপনার অপবিত্র দেহ আমার মনিব (স) এর বিচানায় লাগুক। এ ঘটনা থেকে অনুমান করা যায় যে, নবীপ্রেম ও নবীর ভালোবাসা কাকে বলে ?
উদাহরণÑ৬ মসজিদে নববীতে খোৎবাদানের জন্য কাঠের একটি মিম্বর বানানো হয়েছিল ; যার তিনটি সিঁড়ি ছিল। মহানবী (স) যখন খোৎবা দিতে দাঁড়াতেন তখন সবচেয়ে ওপরের সিঁড়িতে বসে মধ্যের সিঁড়িতে পা মুবারক রাখতেন । চলবে



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর