Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৮, ০১ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ০৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
শিরোনাম

তালবিয়া পাঠ করা সাইয়্যেদেনা ইব্রাহীম আ:-এর স্মৃতিচিহ্ন

এ. কে. এম. ফজলুর রহমান মুন্শী : | প্রকাশের সময় : ২৭ জুলাই, ২০১৮, ১২:৫২ এএম

হজ এবং ওমরা আদায়কারীগণ যখন ইহরাম বাঁধেন তখন অত্যন্ত বিনয়, নম্রতা ও আন্তরিকতার সাথে তাদের মুখ থেকে এই শব্দাবলি উচ্চারিত হতে থাকে : ‘আমি হাজির হে আল্লাহ, আমি হাজির, আমি হাজির, তোমার কোনোই অংশী নেই, আমি হাজির, নিশ্চয়ই সকল প্রশংসা, যাবতীয় নেয়ামত এবং সাম্রাজ্য বা অধিকার তোমারই জন্য, তোমার কোনোই অংশী নেই।’-সহীহ বুখারী কিতাবুল হজ, বাবুত তালবিয়া, খন্ড ২, পৃ. ৫৬১, বর্ণনা সংখ্যা ১৪৭৪; সহীহ বুখারী: কিতাবুল লিবাস, বাবুত তালবীদ, খন্ড ৫, পৃ. ২২১৩, বর্ণনা সংখ্যা ৫৫৭১; সহীহ মুসলিম : কিতাবুল হজ, বাবুত তালবিয়া ওয়া ছিফাতুহা ওয়া ওয়াকতুহা, খন্ড ২, পৃ. ৮৪২, বর্ণনা সংখ্যা ১১৮২।
এই তালবিয়া হজ এবং ওমরার আহকামসমূহ পালন করার প্রাক্কালে হেরেমে কাবায় পাঠ করা হয়। কিন্তু অনেক কম লোকই জানেন, এই তালবিয়া কি? এবং এর শুরু কোথা হতে হয়েছে। মূলত ইহা সাইয়্যেদেনা ইব্রাহীম আ:-এর সেই আহ্বানের জবাব, যা তিনি আনুমানিক ৫ হাজার বছর পূর্বে কাবাগৃহ নির্মাণ সমাপ্ত করে আল্লাহপাকের নির্দেশে ঘোষণা করেছিলেন। সেই নির্দেশকে উল্লেখ করে আল কোরআনুল হাকীমে এরশাদ হয়েছে : ‘তুমি বুলন্দ আওয়াজে মানুষের মধ্যে হজের ঘোষণা করে দাও, মানুষ পদব্রজে এবং সকল দুর্বল উটে আরোহণ করে তোমার নিকট হাজির হবে, যারা দূর দারাজ রাস্তা অতিক্রম করে আসবে’। -সূরা হজ : আয়াত ২৭। হাদিস শরীফে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত ইব্রাহীম আ: জাবালে আবু কুবায়েসের ওপর আরোহণ করে সেখান হতে পৃথিবীর সকল প্রান্তের মানুষকে বাইতুল্লাহয় উপস্থিতির জন্য ঘোষণা দিলেন, ‘হে লোক সকল, আল্লাহর ঘরের দিকে আস, তাওয়াফ এবং হজের জন্য আস’। ইবনে আমি হাতেম রাজী, তাফসীরুল কোরআসিল আজীম, খন্ড ৮, পৃ. ২৪৮৭-২৪৮৮, বর্ণনা সংখ্যা ১৩,৮৮৪; ইবনে জাওজী, যাদুল মাছির ফী এলমিত তাফসীর, খন্ড ৪, পৃ. ৪২২।
ইব্রাহীম আ:-এর এই আহ্বানকে রূহানীভাবে এতখানি দূর-দূরান্তে পৌঁছে দেয়া হলো যে, কাল ও স্থানের দূরত্বের বাইরে প্রত্যেক স্থানে ইহা পৌঁছে গেল যেখানে যেখানে তৎকালে মানুষ বসবাস করত। বরং যে সকল লোক তখন আলমে আরওয়াহতে অবস্থান করছিল এবং যারা কিয়ামত পর্যন্ত মর্তলোকে আগমনের অপেক্ষায় ছিল তাদের কাছেও সেই আহ্বানের ধ্বনি পৌঁছেছিল এবং যারা এই আহ্বান শুনে লাব্বাইকা বলেছিল, তাদের হজ করার তাওফিক এবং বাইতুল্লাহতে হাজিরীর অনুমতি প্রদান করা হলো। এ সম্পর্কিত কয়েকটি রেওয়ায়েত নিম্নে পেশ করা হলো।
ক. হযরত ইব্রাহীম আ. যখন বাইতুল্লাহ নির্মাণের কাজ সমাপ্ত করলেন, তখন আল্লাহপাক তার নিকট ওহী প্রেরণ করলেন, মানুষের মধ্যে বুলন্দ আওয়াজে হজের ঘোষণা করো। বর্ণনাকারী কলেন, তখন হযরত ইব্রাহীম আ: বললেন, (হে লোক সকল), খবরদার, নিশ্চয়ই তোমাদের পরওয়ারদিগার একটি গৃহ নির্মাণ করেছেন এবং তোমাদেরকে এর হজ করার নির্দেশ দিয়েছেন। সুতরাং তার এই আহ্বান ধ্বনি পাথর, বৃক্ষ, পাহাড়-পর্বত এবং মাটি, মোটকথা কোনো বস্তু এমন ছিল না যারা এই উত্তর দেয়নি, লাব্বাইকা, আমি হাজির। হে আল্লাহ, আমরা তোমার দরবারে হাজির। -হাকেম : আল মুস্তাদরেক আলাস সহীহাইন, খন্ড ২, পৃ. ৬০১, বর্ণনা সংখ্যা ৪০২৬; বায়হাকী : আস সুনানুল কুবরা, খন্ড ৫, পৃ. ১৬৭, বর্ণনা সংখ্যা ৯৬১৩। খ. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা: হতে বর্ণিত, হযরত ইব্রাহীম আ: যখন বাইতুল্লাহ নির্মাণ সমাপ্ত করলেন, তখন তাকে নির্দেশ করা হলো বুলন্দ আওয়াজে মানুষের মধ্যে হজের ঘোষণা জারি করো। তিনি আরজ করলেন, হে আমার পরওয়ারদিগার, আমার আওয়াজ তাদের পর্যন্ত পৌঁছবে না। ইরশাদ হলো, তুমি ঘোষণা দাও। তোমার আওয়াজ (মাখলুক পর্যন্ত পৌঁছানোর দায়িত্ব আমার। বর্ণনাকারী বলেন, তারপর হযরত ইব্রাহীম আ. ঘোষণা দিলেন, হে লোক সকল, তোমাদের ওপর আল্লাহপাকের প্রাচীন ঘর (খানায়ে কাবা) এর হজ ফরজ করা হয়েছে। বর্ণনাকারী বলেন, সুতরাং আকাশ হতে জমিন পর্যন্ত সমস্ত মাখলুক এ ঘোষণা শুনতে পেল। তবে কি তোমরা দেখ না যে, সারা পৃথিবীর আনাচে-কানাচে হতে (তার আওয়াজের ওপর লাব্বাইক বলার) লোকজন তালবিয়া পাঠ সহকারে মক্কায় আগমন করছে? -ইবনে শায়রা : আল মুছান্নাফ, খন্ড ৬, পৃ. ৩২৯, বর্ণনা সংখ্যা ৩১৮১১৮; হাকেম : আল মুস্তাদরেক আলাস সহীহাইন, খন্ড ২, পৃ. ৪২১, বর্ণনা সংখ্যা ৩৪৬৪। গ. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. আল্লাহতায়ালার বাণী ‘ওয়া আজ্জিন ফিন্নাসি’ এর ব্যাখ্যায় বলেছেন, হযরত ইব্রাহীম আ: একটি পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে ঘোষণা দিলেন যে, হে লোক সকল, তোমাদের ওপর হজ ফরজ করা হয়েছে।’ সুতরাং যারা পুরুষদের পৃষ্ঠদেশে এবং মহিলাদের উদরে ছিল, তারাও এই আহ্বান শুনতে পেল। আর মুমিনদের মধ্যে যারা আল্লাহর জানা মোতাবেক কেয়ামত পর্যন্ত হজ করার ছিল, তারা তার ঘোষণার জবাব দিতে গিয়ে বলল, হে আল্লাহ, আমরা তোমার বারগাহে হাজির হয়েছি। -তাবারী: জামেইউল বয়ান ফী তাফসিরীল কোরআন, খন্ড ১৭ পৃ. ১৪৪।
লাব্বাইকা এই ধ্বনি ৫ হাজার বছর পূর্বে এক মুহূর্তের জন্য বুলন্দ হয়েছিল। কিন্তু আজও এর প্রতিধ্বনি স্থায়ীভাবে চতুর্দিকেই শোনা যায়। হুজ্জাজে কেরাম এই ধ্বনিকে নিজের মন-মগজে স্থান দান করে এর জবাব প্রদান করেন এবং আল্লাহপাকের খলীল ইব্রাহীম আ:-এর সাথে সম্পর্কিত একটি ঘটনার কথা স্মরণ করেন।



 

Show all comments
  • নাবিল আহমেদ ২৭ জুলাই, ২০১৮, ৪:২০ এএম says : 0
    আল্লাহ আমাদেরকে সকল নেক কাজ করার তৌফিক দান করুক।
    Total Reply(0) Reply
  • আজমল ২৭ জুলাই, ২০১৮, ৪:২০ এএম says : 0
    এই সুন্দর লেখাটির জন্য এ. কে. এম. ফজলুর রহমান মুন্শী হুজুরকে ধন্যবাদ।
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর