Inqilab Logo

ঢাকা, সোমবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৯ আশ্বিন ১৪২৫, ১৩ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

বাঘ রক্ষায় কঠোর হতে হবে

আফতাব চৌধুরী | প্রকাশের সময় : ২৯ জুলাই, ২০১৮, ১২:০২ এএম

সারা পৃথিবীতে সাকুল্যে তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার বাঘ অরণ্যে বেঁচে আছে যার বেশির ভাগই ভারতে। তবে সে সংখ্যাও মেরে কেটে দু’হাজারের আশপাশে হবে। কিন্তু এ তো গেল রয়াল বেঙ্গল টাইগারের কথা। জীবিত বাকি প্রজাতিগুলোর মধ্যে ইন্দো-চাইনিজ প্রজাতির বাঘের সংখ্যা নেমে দাঁড়িয়েছে তিনশোর মতো, মালায়ান টাইগার পাঁচশোর মতো, সাইবেরিয়ান টাইগারের সংখ্যা মাত্র শ’ তিনেক। সাউথ চায়না টাইগারের সংখ্যা একশ’রও কম, সুমাত্রান টাইগারও বড় জোর শ’চারেক হবে। গত শতাব্দীর তিনেক দশকে বালি টাইগার, সাতের দশকে ক্যাসপিয়ান টাইগার আর আটের দশকে জাভান টাইগার পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। সংখ্যাতত্ত¡ হতে অনুমান করা যাচ্ছে, বাকি প্রজাতিগুলোরও বিলুপ্তির বেশি দেরি নেই। পৃথিবী থেকে বাঘ বিলুপ্ত হলে হবেটা কী? আন্দাজ করা যেতে পারে?
গরু মারা জঙ্গলের দিকে চোখ ফেরাই। এই জঙ্গলের সর্বোচ্চ শ্বাপদ হল লেপার্ড-কিন্তু গাউর, হাতি বা গন্ডারকে মারার ক্ষমতা তার নেই। ফলে তৃণভোজী প্রাণীদের অনিয়ন্ত্রিত প্রজননের দরুন এতটাই তাদের সংখ্যাবৃদ্ধি ঘটেছে যে মনুষ্য বসতিতে তারা প্রায়শই হানা দিচ্ছে। অভয়ারণ্য সংলগ্ন অঞ্চলে তারা শস্যের ক্ষতি করে চলেছে। মানুষের সঙ্গে এদের সংঘাত ঘটছে অনিবার্যভাবেই। এখানে যদি বাঘ থাকত, তৃণভোজীদের সংখ্যাবৃদ্ধির ওপর একটা রাশ থাকত। সুন্দরবনের কথাই ধরা যাক। সুন্দরবনের যে দ্বীপগুলো ব্যাঘ্র অধ্যুষিত নয়-সেখানকার জঙ্গলে আর ব্যাঘ্র অধ্যুষিত দ্বীপগুলোর জঙ্গলের তুলনা করলে সহজেই প্রতিভাত হবে আসল অবস্থা। সে শুধু জঙ্গলের রাজাই নয়, পাহারাদারও বটে। আসলে আমাদের খাদ্যশৃঙ্খলের শীর্ষে আছে বাঘ। অবলুপ্ত হলে খাদ্যশৃঙ্খলটা আর থাকবে না। প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিঘিত হবে।
১৯০০ সালে ভারত উপমহাদেশে বাঘের সংখ্যা ছিল লক্ষের কাছাকাছি। সুন্দর বন অঞ্চলেই ছিল এর সংখ্যা বেশি। ১৯৭০-এ এই সংখ্যাটা নেমে এল চার হাজারে। অর্থাৎ সত্তর বছরে আমরা ছিয়ানব্বই হাজার বাঘ মারতে সক্ষম হয়েছি! স্বাধীনতার পরেও বাঘ মারাটা কোনো অপরাধ ছিল না। ছিল শৌর্যের পরিচয়। সুন্দর বন অঞ্চলে এক বাঘের রাজাই একশ’ আটটা বাঘ মেরেছিলেন। এই নিয়ম নাকি তারা বংশানুক্রমে পালন করে চলতেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হত্যা বিনা কারণে। ফলাফল ‘টাইগার ক্রাইসিস’। সেটা ছিল সত্তরের দশক। ইতোমধ্যে সংখ্যা বেড়েছে। শিল্প বিপ্লব এসে গেছে সর্বত্র। আরো বেশি জমি চাই। শহর বাড়াতে হবে, কৃষিজমি বাড়াতে হবে, আরও খাদ্য, চাই পানিবিদ্যুৎ, অতএব গাছ কাটো। পরিসংখ্যান বলছে, সুন্দর বন অঞ্চলে অরণ্যচ্ছেদনের হার বছরে তিন শতাংশেরও বেশি। আমাদের বাড়ি, আমাদের রাস্তা, আমাদের রেল, আমাদের কারখানা তৈরির ফলে উত্তরোত্তর বাঘেদের বাসস্থান কমতে থাকলো। এক অরণ্যের সাথে অন্য অরণ্যে যেতে হলে অনিবার্য হল মানুষের সঙ্গে বন্য প্রাণের সংস্পর্শ। ফল যা হবার তাই হল। বাঘেদের সংখ্যা কমতে থাকলো দ্রুত। তৈরি হল আর এক সংকট।
ভারতে শেষ দু’দশকে জনসংখ্যা বেড়েছে পঞ্চাশ শতাংশ, শেষ চার দশকে চীনের জনসংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। চীন অরণ্য ধ্বংস করছে। ভারতে ঘটনাটা একটু অন্য রকম। সেখানে লাগোয়া দুটো অরণ্যের মধ্যে জাঁকিয়ে বসেছে দরিদ্র জনগণ। এই দুই পক্ষের সংঘর্ষ হয়ে উঠেছে নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। বাঘ হয়তো গবাদি পশু মারছে। বাঘের খাবার হয়তো যাচ্ছে মানুষের পেটে। গ্রামবাসীরা তাই আক্রোশে মৃত পশুটির মাংসে মেশাচ্ছে বিষ। পেঞ্চ ন্যাশনাল পার্কে গেলে গ্রীষ্মেই বাঘিনালার বাঘিনী এই রকম এক ঘটনায় দুই বাচ্চাসহ প্রাণ হারিয়েছে। তাছাড়া, দালালদের কাছেও তো এসেছে তথ্য, যে বাঘেদের সর্বাঙ্গ প্রজাতির কাছে বিক্রি হয় চড়া দামে। দালালরা ধরল ফড়েদের হাত। তারা চলে এল পাহাড়িদের কাছে। পাহাড়িরা বড় হয়ছে অরণ্যের মাঝে। অরণ্যেকে তারা নিজেদের হাতের তালুর মতো চেনে, কিন্তু অনাহার যে তাদের নীতি নৈতিকতাকে ঢুকিয়ে দিয়েছে ক্ষুধাভর্তি পেটে। তাই খুব স্বল্প অর্থের বিনিময়ে তারা সংসার চাঁদদের বাঘের সর্বোঙ্গের জোগানদার হয়ে ওঠে। হঠাৎ একদিন দেখা যায় সারিস্কা থেকে বাঘ ভ্যানিশ। রঘু চান্দোয়াত আর্তনাদ করে ওঠেন পান্না ন্যাশনাল পার্কের বাঘেদের অবস্থা দেখে। প্রথম প্রথম তারা জঙ্গলে ঢুকত সাবেকি অস্ত্র, সাবেকি ফাঁদ নিয়ে। কিন্তু এক সময় তাদের হাতে এসে গেল আধুনিক মারণাস্ত্র। মারণক্ষমতা বাড়ল কয়েক গুণ। কিছু কিছু চোরাকারবারী ধরা পড়ল, শাস্তিও হল। কিন্তু চোরাশিকার থামানো গেল না।
বিপন্নতার আরও কারণ বাঘের স্বভাব। দুই থেকে তিন বছর বয়সের বাঘেরা মায়ের উপর নির্ভরশীল থাকার পর নিজেদের আলাদা জায়গা খুঁজতে থাকে। নিজ অস্তিত্ব বজায় রাখতে বাঘের ত্রিশ বর্গ কিলোমিটার এবং বাঘিনীর পাঁচ থেকে দশ বর্গ কিলোমিটার এলাকার প্রয়োজন। অরণ্যচ্ছেদনের ফলে অরণ্য বহর কমছে। ফলে এলাকা দখলের প্রয়োজনে বাঘকে ‘কোর’ এরিয়া ছেড়ে ‘ফ্রিঞ্চ’ এলাকায় চলে আসতে হচ্ছে অতঃপর মানুষের সঙ্গে সংঘাতের আশঙ্কাও বাড়ছে। খবরে প্রকাশ, চলতি বছরের ২৬ জুন পর্যন্ত ভারতে ৭৪টি বাঘ মারা পড়েছে। সরকারি ছবিই যদি এই রকম হয়, তা হলে আসল চিত্রটা আরও ভয়ঙ্কর হতেই পারে। ওয়াইল্ড লাইফ প্রোটেকশন সোসাইটি অব ইন্ডিয়া’র দেওয়া চিত্রটা দেখলে স্পষ্ট হবে, চৌদ্দটি বাঘ হয় তড়িদাহত, না-হলে বিষক্রিয়া বা চোরাশিকারিদের হাতে প্রাণ দিয়েছে। আর ষোলটা বাঘের থাবা বা নখ বা দেহের অন্য কোনো অঙ্গ পুলিশ বা বনবিভাগের দ্বারা উদ্ধার হয়েছে। সুতরাং, সংখ্যাটা দাঁড়াল ত্রিশ। আঠারোটা বাঘের মৃত্যু হয়েছে বার্ধক্যে, নিজেদের মধ্যে মারামারি বা ট্রেন বা সড়ক দুর্ঘটনায়। বাকি ছাব্বিশটাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছে।
বাঘেরা মোটেই ভালো নেই, ভালো না-থাকার কারণও একাধিক। বনভূমি নিধন, পোচিং, বনভূমিগুলোর মধ্যে যোগাযোগ নষ্ট হয়ে যাওয়া প্রভৃতি উল্লেখ্য। তা হলে উপায়? সোজা হিসাব, এক. চোরাশিকার বন্ধ করতে পাহারা আর কড়া আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ। দুই. অরণ্যচ্ছেদন বন্ধ করতে হবে। মঙ্গোলিয় উপজাতির কাছে বাঘের বিভিন্ন অঙ্গের চাহিদা মেটাতে তাদের সামনে বিকল্প উপস্থাপন করা যেতে পারে। যথা আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা। সহজলভ্য এই বিকল্প তাদের ব্যাঘ্রনিধনে অনুৎসাহিত করতে পারে। চীনদের আড়কাঠিরা নানা পদ্ধতিতে চোরাশিকার করে, যেমন বিষপ্রয়োগ। বাঘ সাধারণত একেবারে নিজের শিকারের পুরোটা খেয়ে ফেলে না। লুকিয়ে রাখা আধ-খাওয়া শিকারে বিষ প্রয়োগ চোরাশিকারিদের প্রিয় অস্ত্র। হাল আমলে আগ্নেয়াস্ত্র বা ২২০ ভোল্ট ১১ কেভি বৈদ্যুতিক তার বাঘের চলাচলের পথে ফেলে রেখে বাঘ মারার পদ্ধতি গ্রহণ করতে দেখা গিয়েছে মধ্য ভারতের কিছু জঙ্গলে।
ওয়াইল্ড লাইফ প্রোটেকশন সোসাইটি অব ইন্ডিয়ার হিসাব অনুযায়ী, ৯০০-র উপর বাঘ সম্পর্কিত কোর্ট কেসের অল্প কয়েকটির মাত্র ফয়সালা হয়েছে। এতে এটাই প্রমাণিত হয় যে, বাঘ সংরক্ষণে দরকার আরও কঠোর আইন এবং তার দ্রæত প্রয়োগ এবং প্রণয়ন। দ্বিতীয়ত, ‘বাঘবান’ চিহ্নিত অরণ্যগুলোকে রক্ষা করতে হবে। চাই জনমত গঠন। এখানেই ছোটখাটো সোসাইটিগুলোর ভূমিকা।
বলতে দ্বিধা নেই ‘সুন্দরবনকে বাঁচান বাঘ বাঁচান’ আজ কেবল বাংলাদেশের দাবী নয় এটি আন্তর্জাতিক শ্লোগানে পরিণত হয়েছে। পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট, বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বাক্ষী বাংলাদেশের সুন্দরবনের অস্তিত্ব আজ ধ্বংস ও বিলুপ্তির মুখে। সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় অজস্র সংবাদ যথা সুন্দরবনের গাছের রোগ, প্রাণী বৈচিত্রের বিলুপ্তি, বনজ সম্পদ ধ্বংস, বন্য প্রাণীর নির্বিচার নিধন ও চোরা শিকারে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা হ্রাস ইত্যাদি খুবই গুরুত্বের সাথে প্রচার করা হচ্ছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে আরেক ভয়াবহ তথ্য, সেটি হলো পৃথিবীব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন ও সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি; যার পরিণতিতে সুন্দরবনের এক বিরাট অংশ আগামী ৫০ বছরের মধ্যে সমুদ্র গর্ভে হারিয়ে যাবার আশংকা দেখা দিয়েছে। পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা এ অতুলনীয় বনভূমির অস্তিত্বের আশংকায় চিন্তিত। সুন্দরবনের পাশেই রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে ইতোমধ্যেই পরিবেশবাদীরা প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছেন। পরিবেশ নিয়েই প্রায় তিন যুগেরও বেশি সময় থেকে আমিও গবেষণা ও লেখালেখি করে আসছি, পেয়েছি জাতীয় পুরস্কারও। আমারও সরকার বরাবরে বিনীত আবেদন থাকলো দেশের পরিবেশ বিনষ্ট হয়, সুন্দরবন তথা সারা দেশের ক্ষতি হয় এমন কাজটি করতে সংশ্লিষ্ট মহল যেন বার বার চিন্তা-ভাবনা করেন। এ বিদ্যুৎ কেন্দ্র হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে স্থাপনের পর যদি দেখা যায় আমাদের উপকার না হয়ে অপকার হয় তাহলে তা তো আগেবাগেই বিবেচনা করা উচিত।
এক সময় বাংলাদেশের বিভিন্ন বনাঞ্চলে বাঘ দেখা যেত হরহামেশাই। ইদানীং সুন্দরবন ছাড়া কোথাও বাঘের আনাগোনা নেই। এদিকে জানা যায়, বন রক্ষকদের সাহায্যে সুন্দরবনেই বাঘের সংখ্যা দিনে দিনে হ্রাস পাচ্ছে। বাঘ শিকারীরা বাঘ নিধনে তৎপর কিন্তু যারা নিধন করছে তাদেরকে সামাল দেয়া যাদের কর্তব্য তারা নীরব। এ দিকে বনভূমি সংকুচিত হওয়ার ফলে পরিবেশগত কারণে এবং খাদ্যাভাবে দিনে দিনে দেশে বাঘের সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। আমরা পত্র-পত্রিকায় প্রায়ই দেখি আমাদের মন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা দেশে যতটা বাঘ আছে বলে জানান দিয়ে থাকেন বাস্তবের সাথে তার মোটেই মিল নেই। উল্লেখ্য দিনে দিনে সারা দেশেই বনভূমি সংকুচিত হচ্ছে আর এর সঙ্গে বাঘসহ সকল বনজ প্রাণীর সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। পাঁচ-দশ বছর আগেও আমাদের দেশের বনভূমিতে নানা প্রকার পশু, পাখি দেখা যেত আজ তার অস্তিত্বই নেই। সোজা ও সরল ভাষায় বলতে হয় আমাদেরকে অবশ্যই বাঘসহ সকল প্রকার বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে আন্তরিকতার সাথে দেশপ্রেমে উদ্ধুদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। আমাদের এমন ভাবে কথা বলতে হবে, কাজ করতে হবে যাতে কথা ও কাজে মিল থাকে। এখনই তৎপর না হলে, রক্ষককে সততার পরিচয় না দিলে আর সাধারণ মানুষকে সচেতন করা না হলে একদিন হয়ত বাঘ নামক হিংস্র হলেও অতি প্রয়োজনীয় এ জন্তুকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। সতর্ক হতে হবে এখনই, বিলম্ব করা ঠিক হবে না।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট এবং সদস্য, বন ও পরিবেশ সংরক্ষণ কমিটি, সিলেট।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর