Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৬ মার্চ ২০১৯, ১২ চৈত্র ১৪২৫, ১৮ রজব ১৪৪০ হিজরী।

যানজট ও দুর্ঘটনা- অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় ক্ষতি

বিশেষ সংবাদদাতা | প্রকাশের সময় : ৩ আগস্ট, ২০১৮, ১২:০১ এএম

দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে যানজট আর সড়ক দুর্ঘটনায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডবিøউএইচও) হিসাব বলছে, শুধু সড়ক দুর্ঘটনার কারণে ক্ষতি হচ্ছে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ দশমিক ৬ শতাংশ। সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনা আগের চেয়ে বেড়েছে। যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে, ২০১৭ সালেই প্রায় ৫ হাজার সড়ক দুর্ঘটনায় সারা দেশে নিহত হয়েছে ৭ হাজার ৩৯৭ জন। আর চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ২ হাজার ৪৭১ জন। এছাড়া গত তিন বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় পঙ্গু হয়েছে ৪ হাজার মানুষ।
সড়কে দুর্ঘটনার মতোই অর্থনীতির ক্ষতি বাড়াচ্ছে যানজট। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ঢাকায় যানজটে প্রতিদিন নষ্ট হচ্ছে ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা। গত ১০ বছরে গাড়ির গড় গতি ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার থেকে কমে ৭ কিলোমিটারে নেমে এসেছে। যেখানে পায়ে হেঁটে চলার গড় গতি প্রতি ঘণ্টায় ৫ কিলোমিটার। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের হিসাব অনুযায়ী, শুধু যানজটের কারণে প্রতি বছর ক্ষতি হচ্ছে দেশের মোট জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ। সব মিলিয়ে সড়ক দুর্ঘটনা ও যানজটে প্রতি বছর ক্ষতি হচ্ছে জিডিপির সাড়ে ৩ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আইন প্রয়োগের দুর্বলতার কারণেই সড়ক দুর্ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলেছে। ডবিøউএইচওর পর্যবেক্ষণও বলছে, যানবাহনের গতিসীমা, চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স, মোটরসাইকেল আরোহীর হেলমেট ব্যবহারসহ সবগুলো আইন বাস্তবায়নই খুব দুর্বল। পূর্ণ স্কোর ১০-এর মধ্যে কোনোটিতেই বাংলাদেশের অর্জন ৪-এর বেশি নয়।
বেসরকারি হিসাবে, গত ১০ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে প্রায় ৪৭ হাজার। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাণ হারানো বা পঙ্গুত্ববরণের মধ্যেই সড়ক দুর্ঘটনার ট্রাজেডি সীমাবদ্ধ নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের ৫২ শতাংশই পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন। একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে পরিবার নেমে গেছে ছিন্নমূল বা দারিদ্রের কাতারে। বেঁচে থাকার জন্য পরিবারের সদস্যদের আর কোনো অবলম্বন নেই।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ছোট-বড় ৪ হাজার ৯৭৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে সর্বমোট ৭ হাজার ৩৯৭ জন। আহত হয়েছে ১৬ হাজার ১৯৩ জন। এর মধ্যে হাত, পা বা অন্য কোনো অঙ্গ হারিয়ে চিরতরে পঙ্গু হয়েছে ১ হাজার ৭২২ জন। এসব দুর্ঘটনায় ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে জিডিপির প্রায় দেড় থেকে দুই শতাংশ। এ সময় ১ হাজার ২৪৯টি বাস, ১ হাজার ৬৩৫টি ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান, ২৭৬টি হিউম্যান হলার, ২৬২টি কার, জিপ, মাইক্রোবাস, ১ হাজার ৭৪টি অটোরিকশা, ১ হাজার ৪৭৫টি মোটরসাইকেল, ৩২২টি ব্যাটারিচালিত রিকশা, ৮২৪টি নছিমন-করিমন দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। যাতে বহু টাকার ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণে সড়ক দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে- বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, বিপদজনক অভারটেকিং, রাস্তা-ঘাটের নির্মাণ ত্রæটি, ফিটনেসবিহীন যানবাহন এবং যাত্রী ও পথচারীদের অসতর্কতা। বিআরটিএ-এর হিসাবেই রাস্তায় চলাচলরত ফিটনেসবিহীন যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার। এসব যানবাহনের ফিটনেস সনদ নবায়ন করা হয়নি গত ১০ বছর যাবত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চালকদের বিরামহীন গাড়ি চালানোও দুর্ঘটনা বাড়িয়ে দিচ্ছে। ইউরোপের দেশগুলোয় টানা সাড়ে ৪ ঘণ্টা গাড়ি চালানোর পর চালককে ন্যূনতম ৪৫ মিনিট বিশ্রাম নিতে হয়। দিনে ৯ ঘণ্টার বেশি গাড়ি চালানো পুরোপুরি নিষিদ্ধ। তবে সপ্তাহে একদিন ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত গাড়ি চালানো যায়। পাশাপাশি চালকদের প্রতিদিন ১১ ঘণ্টা বিশ্রাম নেয়ার কথা বলা হয়েছে। যদিও বাংলাদেশে টানা ১২ ঘণ্টা, এমনকি ১৬ ঘণ্টাও গাড়ি চালাচ্ছেন চালকরা। ঈদ যাত্রায় টানা কয়েকদিনও গাড়ি চালানোর নজির আছে এ দেশে।
অপরদিকে, যানজটের কারণে দেশের অর্থনীতিতে বিশাল অঙ্কের ক্ষতি হচ্ছে। স¤প্রতি যানজটের আর্থিক ক্ষতির একটি হিসাব করেছে বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট। তাদের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি বছর দেশে যানজটের কারণে যে আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে, তা জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাস্তা কম- গাড়ি বেশি-এটাই ঢাকার যানজটের প্রধান কারণ। রাস্তার উপর গাড়ি পার্কিং করে রাখার কারণেও সৃষ্টি হচ্ছে যানজটের। পার্কিংয়ের কারণে কোথাও রাস্তার সিংহভাগ বেদখল হয়ে যায়। এ ছাড়া রাস্তা দখল করে দোকান ও স্থাপনা গড়ার কারণেও যানজটের সৃষ্টি হয়। আর মহাসড়কে যানজট হচ্ছে আইন না মেনে চলার কারণে। একই সাথে পুলিশের চাঁদাবাজি ও অব্যবস্থাপনাও যানজটের জন্য দায়ী।
যানজট নিরসনে ঢাকায় ৯টি ফ্লাইওভার, ৬৬টি ফুটওভার ব্রিজ, ৩টি আন্ডারপাস নির্মাণ, দুটি ইউলুপ, ২০ জোড়া ডেমু ট্রেন, ৯টি ওয়াটার বাস, বিআরটিসির ৪২টি আর্টিকুলেটেড এবং ৩০৩টি ডাবল ডেকার বাস কেনা হয়েছিল। চালু করা হয়েছিল অটোমেটিক সিগনালিং ব্যবস্থা ও লেন পদ্ধতি। এতে বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। কিন্তু যানজট পরিস্থিতির তেমন কোনো উন্নতি হয়নি।
বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, এক দশকে রাজধানীতে যানবাহনের গড় গতিবেগ ২১ কিলোমিটার থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৭ কিলোমিটারেরও নিচে। অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত ফ্লাইওভারের পাশাপাশি অপ্রতুল রাস্তাঘাট, দুর্বল ব্যবস্থাপনা দিন দিন যানজটের তীব্রতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। ঢাকায় যানজটের তীব্রতা এতটাই বেড়েছে যে, তা সহনীয় মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। এ কারণে ঢাকায় দৈনিক ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে।
এদিকে, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের হিসাবে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যানজটের কারণে ব্যবসায়ীদের ক্ষতি হচ্ছে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। আর যাতায়াতে সময় অপচয়ের কারণে যাত্রীদের ক্ষতি ১ হাজার কোটি টাকা। দুর্ঘটনা ও ভাঙাচোরা সড়কের কারণে যানবাহনের ক্ষতি ৫৭০ কোটি টাকা। এছাড়া যানজটে জ্বালানী অপচয় হয় ২ হাজার কোটি টাকার, পরিবেশগত ক্ষতি ১ হাজার কোটি, স্বাস্থ্যগত ক্ষতি ৩০০ কোটি ও অন্যান্য ক্ষতি ১০০ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে বছরে মোট ক্ষতি ৯ হাজার ৯৭০ কোটি টাকা। যা দেশের অর্থনীতির জন্য বড় অঙ্কের ক্ষতি।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: যানজট


আরও
আরও পড়ুন