Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮, ৩০ কার্তিক ১৪২৫, ০৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
শিরোনাম

স্থবির ২১ নদীবন্দর

ডিসি অফিসে ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতা

পঞ্চায়েত হাবিব : | প্রকাশের সময় : ৫ আগস্ট, ২০১৮, ১২:০২ এএম

ভূমি অধিগ্রহণের জটিলতায় কারণ দেখিয়ে বিআইডব্লিউটিএকে ২১টি নদীবন্দরের জমি হস্তান্তর করছেন না জেলা প্রশাসকরা (ডিসি)। বর্তমান সরকারের আমলে এসব বন্দরের কাজ ও জমি হস্তান্তর হচ্ছে না এমন আশঙ্কা করছেন বিআইডব্লিউটিএ কর্মকর্তারা।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আবদুস সামাদ ইনকিলাবকে বলেন, বিআইডব্লিউটিএ’র ২১টি নদীবন্দরের জমি হস্তান্তর হচ্ছে না এটা জেনে আমি অবাক। জানার পরই এগুলোর সমস্য নিয়ে বৈঠক করেছি। দেখা যাচ্ছে, বিআইডব্লিউটিএ’র পক্ষ থেকে বারবার তাগাদা দেয়ার পরও ডিসি অফিস থেকে সাড়া পাচ্ছেন না। এ কারণে এবার ডিসি সম্মেলনে জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) জানিয়ে দেয়া হয়েছে। আশা করি তারা দ্রুত শেষ করবেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিআইডব্লিউটিএ’র এক কর্মকর্তা ইনকিলাবকে বলেন, ঘুষ না দেয়ার কারণে নানা জটিলতায় এসব বন্দরের ফাইল আটকে রাখা হচ্ছে। ডিসি আসে ডিসি যায়, কিন্তু সরকারি বন্দরের জমি অধিগ্রহণের ফাইল আর নড়ে না।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, উপকূলীয় এলাকায় জনসাধারণ মানুষ, বড় বড় জাহাজ আসা-যাওয়া এবং দেশি-বেদিশি পর্যটকদের যাতায়াত সুবিধা বৃদ্ধিসহ নৌযান চলাচলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের থেকে বিআইডব্লিউটিএ’র মাধ্যমে ২১ নদীবন্দরে নামে দেশের বিভিন্ন জেলায় সরকারিভাবে জমি অধিগ্রহণ কাজ শুরু করে। ১৯৭৫ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ২১টি বন্দরের ফাইল নিয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরছে বিআইডব্লিউটিএ’র কর্মকর্তারা। সরকারি কাজ, তবুও সাড়া দিচ্ছেন না ডিসিরা। যেসব বন্দরে সাড়া দিচ্ছেন না সে গুলো হচ্ছে- পটুয়াখালী নদীবন্দরের অগ্রগতি প্রতিবেদনে বলা হয়, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আমলে ১৯৭৫ সালে ৩৮৮ এল/৭৫ এর মাধ্যমে সরকার পটুয়াখালী নদীবন্দরের প্রজ্ঞাপন জারি করে। প্রজ্ঞাপনের পর থেকে নানা জটিলতা দেখিয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ফাইলটি আটকে রেখেছে। পটুয়াখালী ডিসি অফিস থেকে কয়েকবার জরিপ কাজ করে। তারপর ডিসি অফিস থেকে এ বন্দরের কাগজ দেয়া হচ্ছে না। দৌলতদিয়া নদীবন্দর ১৯৮৩ সালে এসআরও নং-২৪৭ এল কেসই মাধ্যমে সরকার দৌলতদিয়া নদীবন্দরের নামে প্রজ্ঞাপন জারি করেন রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক। সরকারিভাবে প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ার পরে কয়েকবার রাজবাড়ী জেলা প্রশাসক ও বিআইডব্লিউটিএ যৌথভাবে জরিপ করার কথা থাকলে তা ৩৫ বছরে শেষ করতে পারেননি। নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, জেলা প্রশাসকের অসহযোগিতার কারণে এটি এখন পর্যন্ত করা যায়নি।
রাজবাড়ী জেলা প্রশাসক মো. শওকত আলী ইনকিলাবকে বলেন, বিষয়টি অনেক পুরানো। এ বিষয়টি নিয়ে আমাকে বলেনি। আমি এখনো বিষয়টি জানি না। তবে জমি অধিগ্রহণে সমস্যা থাকে। আমি একটি মিটিংকে আছি, পরে কথা বলব।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরে চাঁদপুর জেলায় নদীবন্দর করা হবে ঘোষণা দেয়া হয়। সেই আলোকে ২০১৮ সালের ৮৫ দশমিক ২৬৫৪ একর তীর ভূমির বিআইডব্লিউটিএ’র কাছে হস্তান্তরের লক্ষ্যে চাঁদপুর জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে আহ্বায়ক করে ছয় সদস্য বিশিষ্ট একটি সার্ভে টিম গঠন করা হয়। কমিটি একটি স্কের্চ ম্যাপসহ রিপোর্ট /প্রতিবেদন পেশ করবে। তৎপ্রেক্ষিত চাঁদপুর জেলা বন্দরের ফোরশোর হস্তান্তরের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। কক্সবাজার জেলা কস্তরাঘাট নদী বন্দরে তীরভ‚মি বিআইডব্লিউটিএ অনুক‚লে হস্তান্তর। সরকারি অগ্রগতি প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯০৮ সালে এসআরও-৩০ আইন ২০১০ দ্বারা সরকার কর্তৃক গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে কক্সবাজার কস্তরাঘাট নামে একটি নতুন নদীবন্দর ঘোষণা করে। কক্সবাজার কস্তরাঘাট নদীবন্দরের ফোরশোর ভূমি যৌথ জরিপের মাধ্যমে হস্তান্তরের লক্ষ্যে সহকারী কমিশনার ভূমি সদর কক্সবাজার ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মহেশখালী ও বিআইডব্লিউটিএ’র সমন্বয় দুইটি উপ-কমিটি গঠন করা হয়। কক্সবাজার নদীবন্দরের তীর ভূমি বিআইডব্লিউটিএ’র অনুক‚লে হস্তান্তরের নিমিত্তে পুনঃ যৌথ জরিপের অংশ হিসেবে মাঠজরিপ সম্পন্ন করা হয়েছে এবং টেবিলওয়ার্ক এবং অন্যান্য কার্যক্রম রয়েছে। এ ছাড়া অগ্রগতি প্রতিবেদনে প্রকল্পের কাজ ৯০ শতাংশ শেষ হয়েছে। তারপর জেলা প্রশাসক জমি দিতে চাইছেন না। টেকনাফ নদীবন্দরে অগ্রগতি প্রতিবেদনে বলা হয়, উপক‚লীয় এলাকার জনসাধারণ ও দেশি-বিদেশি পর্যটকদের যাতায়াত সুবিধা বৃদ্ধিসহ টেকনাফ সেন্টমার্টিন নৌপথ নৌযান চলাচলে নিরাপদ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২০১৬ সালে সরকার টেকনাফ নদীবন্দরের নামে প্রজ্ঞাপন জারি করে এবং নদীবন্দরের সংরক্ষক নিয়ুক্ত করা হয় বিআইডব্লিউটিএকে। কিন্তু এখনো কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে থেকে জমি অধিগ্রহণের কাগজপত্র বুঝিয়ে দেয়া হয়নি। উল্টো জমি অধিগ্রহণের নামে হয়রানি করা হচ্ছে।
নগরবাড়ী কাজীরহাট-নরাদহ নদীবন্দর একইভাবে সরকার দৌলতদিয়া নদীবন্দরের নামে প্রজ্ঞাপন জারি করে। পরবর্তীতে ২০১১ সালে আবার বর্তমান সরকার নগরবাড়ী নদীবন্দরের নাম পরিবর্তনসহ সীমনা পুনঃনিধারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে। ২০১১ সালের পর থেকে আজ পর্যন্ত পাবনা জেলা প্রশাসক ও বিআইডব্লিউটিএ যৌথভাবে জরিপ কাজ সম্পন্ন করতে পারেনি। এ কারণে নগরবাড়ী কাজীরহাট-নরাদহ নদীবন্দর জমি হস্তান্তর করা হয়নি।
নরসিংদী নদীবন্দর ১৯৮৯ সালে এসআরও নং-২৭৩ আইনের মাধ্যমে সরকার নরসিংদী নদীবন্দরের নামে জমি অধিগ্রহণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে। প্রজ্ঞাপন জারির পর থেকে আজ পর্যন্ত নরসিংদীর জেলা প্রশাসক ও বিআইডব্লিউটিএ যৌথভাবে জরিপ কাজ সম্পন্ন করেনি এবং জমি হস্তান্তর করেনি।
২০০৪ সালে বিএনপি সরকারের আমলে ভোলা নদীবন্দরে জমি অধিগ্রহণের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। ভোলা জেলা প্রশাসক ও বিআইডব্লিউটিএ যৌথভাবে জরিপ কাজ শেষ করতে পারেনি। বিআইডব্লিউটিএ কর্মকর্তারা জানান, জমি অধিগ্রহণ করেছে সরকার। আর ডিসি অফিসে অধিগ্রহণের নামে হয়রানি করে আসছে। তাদের কারণে যৌথভাবে জরিপ কাজ হয়নি।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চিলমারী উপজেলায় জনসভায় চিলমারী বন্দরে উন্নয়ন কাজের ঘোষণা দেন। পরে চিলমারী বন্দর নামে ২০১৬ সালে এসআরও নং-৩৬৮ আইনের মাধ্যমে সরকার চিলমারী নদীবন্দরের নামে জমি অধিগ্রহণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে। কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক ও বিআইডব্লিউটিএ যৌথভাবে জরিপ কাজ শেষ করতে পারেনি।
মুন্সিগঞ্জের মীরকাদিম বন্দর, আশুগঞ্জ-ভৈরব নদীবন্দর, বি-বাড়ীয়া ও কিশোরগঞ্জ, চরজানাজাত নদীবন্দর মুন্সিগঞ্জ, সনামগঞ্জ জেলার ছাতক নদীবন্দর, নারায়ণগঞ্জের মেঘনা নদীবন্দর, ফরিদপুর জেলার ফরিদপুর নদীবন্দর, সুনামগঞ্জ জেলার ঘোড়াশাল নদীবন্দর ও টেকেরহাট নদীবন্দর, লক্ষীপুর জেলার মজু চৌধুরীরহাট নদীবন্দর, সুনামগঞ্জ নদীবন্দর, দাউদকান্দি-বাউশিয়া নদীবন্দর এবং মাদারীপুর আড়িয়াল খা নদীর লঞ্চঘাট সংলগ্ন তীর বরাবর প্রায় চার কিলোমিটার নির্মিত ওয়ার্কওয়েতে বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদান করতে ডিসিকে অনুরোধ করা হয়েছে। কিন্তু কি কারণে ডিসি অফিসে ফাইল পড়ে আছে কেউ বলতে পারেন না।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ