Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮, ৩০ কার্তিক ১৪২৫, ০৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী

বিষাক্ত পানির মাছ বিষের সমান

আফতাব চৌধুরী | প্রকাশের সময় : ১০ আগস্ট, ২০১৮, ১২:০৪ এএম

মাছ নানা স্থানে বাস করে। আমাদের দেশে পুকুর, খাল, বিল, নদী নালা, জলাধার, এমনকি ধানের ক্ষেতসহ প্রাকৃতিক পানি সম্পদগুলোতে মাছের চাষ হয়। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের মাছ সমুদ্র এবং মোহনা অঞ্চলেও বাস করে। মাছের এসব আবাসস্থল নানাভাবে দূষিত হচ্ছে। প্রাকৃতিক স¤পদগুলোর দূষণ বৃদ্ধির প্রধান কারণ হলো,
(১) অধিক শস্য উৎপাদনের জন্য শস্যক্ষেতে বিভিন্ন প্রকার কীটনাশকের ব্যবহার। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কীট নাশক ঔষধ প্রয়োগের ফলে হার প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশী দেয়া হয় যা শস্যের জন্য উপকারী হলেও মাছের পক্ষে ক্ষতিকারক। (২) নদীর পারে কিংবা মোহনায় নিকট নানা প্রকার কল কারখানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেখান থেকে দুষিত পদার্থ দিবারাত্রি পানিতে ফেলে দেয়া হয়। এসব দুষিত পদার্থে নানা প্রকার ধাতু ও ধাতব পদার্থ থাকে তার মধ্যে বিভিন্ন প্রকার টেট্রোলিয়াম জাত হাইড্র্রোকার্বন এবং ডিটারজেন্টও আছে। (৩) বিভিন্ন শহর ও আধাশহর থেকে নলের সাহায্যে শহরের যাবতীয় মল-মূত্রাদি নদীর বা বিলের পানিতে নিক্ষেপ করা হয়। এতে নদী বা বিলের পানি বিষাক্ত হয় । (৪) নদী, খাল-বিল বা হাওরে পশুপাখী এমনকি মানুষের মৃতদেহ ফেলে দেয়া হয়। যেগুলোর পচনক্রিয়ায় যেসব পদার্থ নির্গত হয় তা পানিকে বিষাক্ত করে। এভাবে মাছের প্রায় সবকটি আবাসস্থলই কোনও না কোনভাবে প্রতিদিনই দূষিত হচ্ছে।
নদী খালবিল পুকুর, মোহনা ও সমুদ্রে সর্বদা নানা দূষিত পদার্থ পড়তে থাকে। শস্যক্ষেত্রে অন্য পানিতে মিশেযাক। এছাড়া শহর, নগর ও বন্দরের পয়ঃপ্রণালী, দূষিত পদার্থ প্রতি নিয়ত পানিতে বিষাক্ত করে চলেছে। সে পানিতে নানা প্রকার মাছ জীবন ধারন করে এবং ছোট থেকে বড় হয় তাছাড়া বিভিন্ন প্রকার অনুউদি¢দ কণা, অনুপ্রাণী কণা, পানির তলদেশে বসবাসকারী নানা প্রকার জীব প্রকৃতিও দূষিত পানিতে বসবাস করে। মাছ ও এক প্রকার জলজ প্রাণী ক্রমাগত দূষিত পানিতে বসবাস করে দূষণ সহ্য করার ক্ষমতা অর্জন করে থাকে। অর্থাৎ যে মাছের দূষিত পানিতে মরে যাওয়ার কথা সে মাছ স্বচ্ছন্দে সে পানিতে বেঁচে থাকে, খাবার খায়, ঘুরে বেড়ায় এবং প্রজনন ক্রিয়া ও স¤পন্ন করে। এ মাছগুলো মানুষের জন্য যথেষ্ট বিপদের কারণ হতে পারে। কয়েকটি দূষিত পদার্থ, কীটনাশক ঔষধ, কয়েক প্রকার ধাতু, যেমন: পারদ, ক্যাডমিয়াম ও ক্রোমিয়াম এবং কয়েক প্রকার ডিটারজেন্ট মাছের শরীরে চামড়ার ও ফুলকার ভিতর দিয়ে এবং মুখের ঝিল্লির ভিতর দিয়ে মাছের শরীরে প্রবেশ করে তারপর মাছের সর্ব অংশে ছড়িয়ে পড়ে। এ দুষিত পদার্থ মাছের দেহের নানা অঙ্গে ক্রমাগত জমা হতে থাকে। কিছু জমা হয় ফুলকায়, কিছু জমা হয় মাথায় এবং কিছু জমা হয় মাংসপেশীতে। কীটনাশক ঔষধগুলোর মধ্যে ডিটিটি, এলড্রিন বিএইচসি প্রভৃতি সবচেয়ে মারাত্মক। মাছের শরীরের যে অংশে তেলের ভাগ বেশী সেখানে বিষাক্ত পদার্থটি অপেক্ষাকৃত বেশী পরিমাণে সঞ্চিত হয়। অথচ আমাদের মাছ খাওয়ার অভ্যাসগুলো লক্ষ্য করলে দেখা যায় আমরা মাছের মাথা ও পেটি খেতে বেশী ভালবাসি। কিন্তু যাবতীয় বিষাক্ত পদার্থগুলোর বেশীর ভাগই মাথা ও পেটিতে অধিক সঞ্চিত হতে থাকে। ফলে যকৃত, কিডনি ও চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। চ্যাং, কুচো চিংড়ি, পুটি রাস্তার ধারের ডোবা ধানের ক্ষেত, খালবিল কিংবা অনেক দিনের পড়ে থাকা পুকুর থেকে ধরে বাজারজাত করা হয় সেগুলো থেকেও ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে বেশী। কারণ এ পরিত্যক্ত পুকুর, জলাশয়ের পানিতে নানা প্রকার কীটনাশক ঔষধ ও অন্যান্য দূষিত পদার্থের খাবার মাত্র। এসব স্থল যেমন মাছ বসবাস করে তারা ক্রমশঃ নিজেদের সহ্য শক্তি বৃদ্ধি করে এবং তাদের শরীরের বিভিন্ন অংশে সেসব মারাত্মক দূষিত পদার্থ ক্রমাগত সঞ্চিত হতে থাকে। সেসব জলাশয়গুলো প্রধানতঃ নীচু এলাকায় অবস্থিত। সেখানে বর্ষার পানি বিভিন্ন শস্যক্ষেত্র হতে সহজে এসে জমা হয়।
বাজারের সস্তা ছোট মাছগুলো ক্রমশঃ বিষাক্ত মাছে পরিণত হয়। এ মাছগুলো বাজারে জীবিত অবস্থায় দেখা গেলেও তাদের মাংসপেশীতে, ফুলকায়, মাথায় যথেষ্ট পরিমাণে কীটনাশক ঔষধ সঞ্চিত থাকে। সুতরাং যারা আর্থিক কারণে বড় আকারের মাছ খেতে পারে না এবং প্রতিনিয়ত প্রোটিনের যোগানের জন্য ছোট মাছের উপর নির্ভরশীল তারাত কীটনাশক ঔষধ ও অন্যান্য বিষ থেকে রেহাই পাচ্ছেন না।
প্রতিকারের উপায় ঃ (১) মাছের শরীরে দূষিত পদার্থ যাতে সঞ্চিত না হয় তার একমাত্র পন্থা হলো দূষণরোধের ব্যবস্থা গ্রহণ করা। দূষিত পদার্থ পানিতে ফেলার আগে তা দূষণমুক্ত করে তবেই পানিতে ফেলতে হবে। (২) ঠিক যতটুকু কীটনাশক ঔষধ দিলে ক্ষেত খামারের কীটপতঙ্গ বিনষ্ট হতে পারে। তার বেশী প্রয়োগ করা উচিত নয়। অন্যথায় তাকে শাস্তি যোগ্য অপরাধ বলে গণ্যকরা প্রয়োজন। (৩) কতগুলো ঔষধ বা আমেরিকা, জাপান বা অন্যান্য দেশে নিষিদ্ধ করা হয়েছে সেখান থেকে আমাদের দেশে চলে আসছে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে। সে ঔষধগুলো এদেশেও বাতিল করতে হবে। (৪) যদি মাছ জীবন্ত অবস্থায় বাজার থেকে কেনা হয় এবং সেগুলোকে ৫/৭ দিন চৌবাচ্চার পানিতে কিংবা নদীর পানিতে ধরে রাখা হয় তাহলে তাদের শরীর থেকে দূষিত পদার্থ নিজে থেকে বেরিয়ে যায় এবং মাছ বিশুদ্ধ হয়। (৫) বাজার থেকে মাছ কিনার সময় মাছের কানকা এবং শরীর একটু শুকে দেখতে হবে তাতে কেরোসিন বা পুরানো কাদার গন্ধ আছে কি না। যদি থাকে তবে বুঝতে হবে মাছের দেহে কীটনাশক ঔষধ বা দূষিত পদার্থ সঞ্চিত আছে। এ ধরনের মাছ কেনা ঠিক নয়। (৬) মাছের শরীরের মাঝ খানের, কাটার উপরের অংশে সবচেয়ে কম বিষ সঞ্চিত হয়। কিন্তু সে অংশে কাটার পরিমাণ বেশী। শিশুকে কাটা বেছে এ অংশ খেতে দিতে হবে। এতে শিশু বিষাক্ত দ্রব্য খাওয়া থেকে রেহাই পাবে। (৭) কোনও মাছের ফুলকা খাওয়া ঠিক না, মাছের চোখেও অতিমাত্রায় কীটনাশক ঔষধ সঞ্চিত থাকে। (৮) শিশুকে মাছের মাথা খেতে দেয়া ঠিক নয়। (৯) বাঙ্গালীর মাছ খাওয়ার পদ্ধতিতে অত্যাধিক পরিমাণে সঞ্চিত কীটনাশক ঔষধ ভক্ষণ করার সম্ভাবনা একটু কমে যায়। কারণ, আমরা মাছ তেলে ভাজি, তারপর সেগুলো রান্না করি। রান্নার সময়, সেগুলো কয়েক মিনিট সিদ্ধ করি। আমরা প্রায় ১ কড়াই পানিতে ভাজা মাছ রান্না করি, এতে বেশী মাত্রায় বিষ খাওয়ার সম্ভাবনাও কমে যায়। অর্থাৎ বিষকে আমরা পাতলা করে দেই। তারপর ভক্ষণ করি। (১০) মাছের টুকরোগুলোকে অনেক খানি সরষের তেলে ডুবিয়ে ভাজি করলে মাছের টুকুরোগুলোর ভিতর সঞ্চিত কীটনাশক ঔষধ সরষের তেলে বেরিয়ে আসে এবং মাছের টুকরো গুলো কীটনাশক ঔষধ মুক্ত হয়। (১১) এখন এ টুকরোগুলো অন্য তেলে রান্না করে খেতে হবে। তবেই তা দূরষণমুক্ত থাকবে। কিন্তু কার্যত তা অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব হবে না। কারণ তেলের দাম তো আর কম নয়।
এসব ঘটনা থেকে বুঝা যায় যে বিষাক্ত পানির মাছ খাওয়া বিষ খাওয়ারই সমান। স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য স্মৃতি শক্তি বৃদ্ধির জন্য, সুস্থ সবল নাগরিক হওয়ার জন্য মৎস্যজাত প্রোটিন বা উদ্ভিদ প্রোটিনের তুলনা চলে না। মাছের প্রোটিন সর্বশ্রেষ্ঠ। কিন্তু এ প্রোটিন আজ নানাভাবে বিষাক্ত হয়ে পড়েছে। এ প্রোটিনকে নষ্টের হাত থেকে রক্ষার দায়িত্ব আমাদের সকলের। এ দায়িত্ব সরকারের একার নয়। যারা পানিকে প্রতিনিয়ত দূষণ করে চলেছেন, নানাভাবে কীটনাশক ঔষধ ছড়িয়ে বা কল কারখানা থেকে দূষিত পদার্থ ফেলে, তাদের বিরুদ্ধে আমাদের সকলকেই সোচ্চার হতে হবে।

সাংবাদিক-কলামিস্ট



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর