Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৫ আশ্বিন ১৪২৫, ৯ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

এককালের আসামের দুই গুণীজনের কথা

মোহাম্মদ আবদুল গফুর | প্রকাশের সময় : ১১ আগস্ট, ২০১৮, ১২:০৪ এএম

এক কালের আসামের দুই সূর্য সন্তান স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে অকল্পনীয় ভূমিকা পালন করেন। এদের প্রথম জন ইতিহাসে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী নামে পরিচিতি লাভ করেছেন। দ্বিতীয় জন প্রিন্সিপ্যাল দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ নামে বিশেষভাবে পরিচিত। এদের প্রথম জনের যে কোনো অরাজনৈতিক ভূমিকা ছিলনা এবং দ্বিতীয় জনের যে কোন রাজনৈতিক জীবন ছিল না, এমনটা বলা যাবে না, তবে এখানে তাদের উভয়ের ক্ষেত্রে প্রধান পরিচয়টাই তুলে ধরা হয়েছে।’
মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী জন্ম গ্রহণ করেন ১৮৮০ সালের ১২ ডিসেম্বর সিরাজগঞ্জের ধানগড়া গ্রামের এক বনেদী খাঁ পরিবারে। পিতা হাজী শরাফত আলী খানের অন্যতম সন্তান আবদুল হামিদ খান শৈশবেই পিতা হারা হয়ে এতিম হয়ে পড়েন। মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে তাকে যেতে দেখা যায় পীরের দরবারে। তিনি চলে আসেন পীর সৈয়দ নাসিরুদ্দিন বোগদাদীর খানকায়। তবে তাঁর জীবন কখনো দীর্ঘ দিন একমুখী থাকেনি। ১৯০৩ সালে সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের সঙ্গে তিনি যুক্ত হন। ইসলামিক শিক্ষা গ্রহণের জন্য ১৯০৭ সালে তিনি দেওবন্দা যান। সেখানে দুই বছর অধ্যয়নের পর তিনি আসামে প্রত্যাবর্তন করেন। ১৯১৯ সালে কংগ্রেসে যোগদানের মধ্যদিয়ে তিনি খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনে অংশ গ্রহণ করেন। এবং দশ মাস কারাদণ্ড ভোগ করেন। ১৯২৬ সালে তিনি আসামে প্রথম কৃষক প্রজাআন্দোলনের সূত্রপাত ঘটান। ১৯২৯ সালে আসামের ধুবড়ী জেলার ব্রহ্মপুত্র. নদের ভাসানচর গ্রামে কৃষক সম্মেলন করেন। এ সময় তার নামের সঙ্গে ভাসানী শব্দ যুক্ত হয়। ১৯৩১ সালে তিনি কাগমারীতে, ১৯৩২ সালে সিরাজগঞ্জের কাওড়া খোলায় এবং ১৯৩৩ সালে গাইবান্ধায় বিশাল কৃষক সম্মেলন অনুষ্ঠান করেন। ১৯৩৭ সালে তিনি কংগ্রেস ত্যাগ করে মুসলিম লীগে যোগদান করেন। একই বছর আসামে বাঙালী নিপীড়নের লক্ষ্য লাইন প্রথা চালু হলে তিনি তার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। ১৯৪০ সালে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের সঙ্গে বাইশ তেইশ মার্স ১৯৪০ ঐতিহাসিক লাহোর সম্মেলনে যোগদান করেন। ১৯৪৪ সালে তিনি আসাম প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। এ সময় পাকিস্তান আন্দোলনে অংশগ্রহণের দায়ে তিনি কারাদণ্ড দণ্ডিত হন। ১৯৪৮ সালে তিনি মুক্তিলাভ করায় পূর্ব বাংলায় চলে আসেন। ১৯৪৯ সালে তার নেতৃত্বে ঢাকার রোজগার্ডেনে তার নেতৃত্বে পাকিস্তানের প্রথম বিরোধী রাজনৈতিক দল পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম হয়। এসময় ভূঘ মিছিলে নেতৃত্ব দেয়ার দায়ে তিন গ্রেপ্তার হন। ১৯৫০ সালের শেষের দিকে সরকারি নির্যাতনের প্রতিবাদে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে অনশন ধর্মঘট পালন করে তিনি মুক্তিলাভ করেন।
বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবীতে তমদ্দুন মজলিসের উদ্যোগে যেআন্দোলন শুরু হয়েছিল তাকে জোরদার করে তোলার ১৯৫২ সালের ৩০ শে জানুয়ারি ঢাকা জেলা বার লাইব্রেরী হলে তাঁর নেতৃত্বে যে সভা অনুষ্ঠিত হয় তাতে গঠিত সর্ব দলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি।
এখানে উল্লেখযোগ্য যে, অনেকের ধারণা ভাষা আন্দোলনের সুত্রপাত হয় ১৯৫২ সালে। এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল ভাষা আন্দোলনের সুত্রপাত হয় ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই। ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপর ঐ সালের ১ সেপ্টেম্বর তমদ্দুন মজলিস নামের যে সাংস্কৃতিক সংস্থা জন্ম লাভ করে তার পক্ষ থেকে ১৯৪৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু’ শীর্ষক পুস্তিকা প্রকাশের মাধ্যমে রাষ্ট্র ভাষা আন্দোলনের সুত্রপাত হয়। এর কারণও ছিল। পৌনে ২০০ বছর বৃটিশ শাসনের পর উপমহাদেশ ভারত ও পাকিস্তান নামের দুটি স্বতন্ত্র সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে জন্ম লাভ করে। এর মধ্যে ভারতের রাষ্ট্র ভাষা যে হিন্দি হবে সে সিদ্ধান্ত পূর্বাহেৃ কংগ্রেস ঘোষণা করলেও পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কি হবে তা নিয়ে বিতর্ক চলার মধ্যেই পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা হয়ে যায়।
১৯৪৭ সালেই যে ভাষা আন্দোলন শুরু হয়ে যায় তা আমরা আগেই দেখছি। আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তমদ্দুন মজলিসের প্রতিষ্ঠাতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের তরুন শিক্ষা অধ্যাপক আব্দুল কাসেম। ভাষা আন্দোলনের প্রথম সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ণ বিভাগের লেকচারার অধ্যপক্ষ নূরুল হক ভূঞাকে আহ্বায়ক করে। ১৯৪৮ সালে ৪ঠা জানুয়ারী পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ নামে যে ছাত্র সংগঠন জন্ম লাভ করে তা জন্মলগ্ন থেকেই তমদ্দুন মজলিসের সূচিত ভাষা আন্দোলনের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করে। এই সময় পাকিস্তান গণপরিষদে কংগ্রেস দলীয় সদস্য বাবু ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত গণপরিষদের সদস্যদের ইংরেজী ও উর্দুর ন্যায় বাংলাতেও বক্তৃতা দানের সুযোগ দাবী করলে সে দাবী প্রত্যাখ্যাত হয়। তার প্রতিবাদে ১৯৪৮ সালের ১১ই মার্চ সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে হরতাল আহ্বান করা হয়। ১১ই মার্চের এই হরতাল ছিল পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর এই প্রথম হরতাল। এ হরতাল সর্বত্র সাফল্যে মন্ডিত হয়। যদি ইতিমধ্যে কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নার ঢাকা সফর এবং ভাষার দাবী সরাসরি বিরোধিতা করায় আপাতত আন্দোলন দুর্বল হয়ে পড়ে তবে ভাষা সৈনিকরা যে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবী ত্যাগ করেন নাই তা জানান দিতে ১৯৪৯-১৯৫০-১৯৫১ পর্যন্ত প্রতি বছর ১১ই মার্চ রাষ্ট্রভাষা দিবস পালন করতেন। পরবর্তীকালের ১৯৫২ সালে ২১ ফেব্রæয়ারী রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবীতে যে চূড়ান্ত বিষফোড়ন ঘটে, তারপর ভাষার দাবীতে বিরোধিতার করার সাহস আর কারো হয়নি।
এই ভাষা আন্দোলনের ফলে যে রাজনৈতিক আবহাওয়া সৃষ্টি হয় তার সুবাদে ১৯৫৩ সালের ৫ ডিসেম্বর শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বাধিন কৃষক শ্রমিক পার্টী এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী নেতৃত্বাধিন আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য দল মিলে যুক্তফ্রন্ট গঠন করেন। ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের এই যুক্তফ্রন্ট মুসলিম লীগকে ব্যাপকভাবে পরাজিত করে পূর্ব বঙ্গে সরকার গঠন করে। এই যুক্তফ্রন্ট আমাদের জাতীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এভাবে মওলানা ভাসানী যতদিন পর্যন্ত দেশের মধ্যে থাকেন, ততদিন জাতীয় রাজনীতিতে ব্যস্ত থাকতেন। তবে তার রাজনীতি কখনও শুধু দেশীয় গন্ডার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ছিলেন সা¤্রাজ্যবাদ-বিরোধী রাজনীতিতে বিশ্বাসী। কিন্তু তাঁর নিজের দলের অনেক প্রভাবশালী নেতার সঙ্গে এই প্রশ্নে বিরোধ ছিল। এই বিরোধের মূলে ছিল পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তির প্রতি তার বিরোধীদের সমর্থন। ফলে এই প্রশ্নে দুই বিরোধী উপদলের মধ্যে বিরোধ এক পর্যায়ে অনির্বায হয়ে উঠলে মওলানা ভাষানী ১৯৫৭ সালের ৫ জুলাই সদরঘাটের রূপমহল সিনেমা হলের ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টী নামে নতুন দল গঠন করেন।
এতো গেল এককালের আসামের দুই গুণীজনের প্রথমজন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর কথা। এবার এক কালের আসামের আরেক গুণীজন উপমহাদেশের বিশিষ্ট দার্শনিক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফের জন্ম ১৯০৬ সালের ২৫শে অক্টোবর। তার নানা হাসন রাজার বাড়ীতে বিখ্যাত মরমী কবি হাসন রাজার বাড়ীতে। তার পিতা ছিলেন দুহালিয়ার দেওয়ান আসফ।
১৯৩২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনশাস্ত্রে এম এ ডিগ্রী গ্রহণের মাধ্যমে তার শিক্ষা জীবনের সমাপ্তি হয়। তাঁর কর্ম জীবন শুরু হয় ১৯৩৭ সালে সিলেটের গোলাপগঞ্জের মুহাম্মদ চৌধুরীর একাডেমিতে তার প্রধান প্রধান শিক্ষক পদে যোগদানের মাধ্যমে। পরবর্তীতে সিলেট মুরারী চাঁদ কলেজে সহকারী অধ্যাপক পদে কাজ শুরু করেন। ১৯৫৭ থেকে ১৯৬৫ পর্যন্ত নরসিংদী কলেজের প্রিন্সিপ্যাল হিসাবে দায়িত্ব পালন করে। ১৯৬৭ সালে বিপ্লবী সাহাবী আবুজর গিফারি কলেজের প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপ্যাল হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে এবং পরে ইসলামিক স্টাস্টিজ বিভাগের খন্ডকালীন প্রফেসর হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।
দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফের আসল পরিচয় তিনি ছিলেন একজন সাহিত্যিক। তার বিখ্যাত গ্রন্থসমূহের মধ্যে রয়েছে জীবন সমস্যা সমাধানে ইসলাম, তমদ্দুনের বিকাশ, নতুন সূর্য (গল্প সংকুলন) দর্শনের নানা প্রসঙ্গ, সিলেটে ইসলাম, দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ ধর্ম ইসলাম, নয়া জিন্দেগী (উপন্যাস) জাগ্রত অতীত (আত্মজীবনী) ছন্দ পতন (গল্প গ্রন্থ) এছাড়া তার অন্যান্য গ্রন্থ হলো: ব্যক্তিত্বের বিকাশ, দর্শনের ইতিহাস, আমাদের জাতীয়তাবাদ, আমাদের আজাদী আন্দোলনের তিন অধ্যায়, মষার আলোকে ইসলাম, আসলামী আন্দোলন যুগে যুগে, মরমী কবি হাসন রাজা, হাসন রাজার জীবনী, দুহারিয়ার ধর্মপুরের পীর বংশের ইতিহাস, কলমির শাক (গল্প গ্রন্থ), এইতো জীবন (গল্প গ্রন্থ), ছিল মুকুল (গল্প গ্রন্থ), হাসন রাজা (নাটক), আগামী পশু (নাটক), এবং রাজার সেরা রাজ শিকারী।
এককালের আসামের দুই গুণীর অন্যতম দার্শনিক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফের বহু তথ্য তাড়াহুরার মধ্যে বাদপড়ে গেছে। তিনি সাতচল্লিশের পার্টিশনের প্রাক্কালে মুসলিম লীগের পক্ষ থেকে আসাম প্রাদেশিক কাউন্সিলের অন্যতম সদস্য ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি ভাষা আন্দোলনের স্থপতি সংগঠন তমদ্দুন মজলিসের যোগ দেন এবং এর সভাপতি হন। ১৯৪৯ সালে তমদ্দুন মজলিসের যে প্রথম বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, তাতে তাঁকে সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। আমৃত্যু তিনি এ পদে বহাল ছিলেন। এছাড়াও জীবিত থাকাকালে ভারতের আন্নামালাই নগরে অনুষ্ঠিত দর্শন কংগ্রেসের পাকিস্তান প্রতিনিধিত্ব করেন।এছাড়াও তিনি পৃথিবীর অসংখ্য দেশে পাকিস্তান আমলে পাকিস্তান দর্শন কংগ্রেসের প্রতিনিধিত্ব করেন।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ