Inqilab Logo

ঢাকা, শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৬ আশ্বিন ১৪২৫, ১০ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

রাজনীতির শিকার মানবিক আন্দোলন

মহিউদ্দিন খান মোহন | প্রকাশের সময় : ১৩ আগস্ট, ২০১৮, ১২:০১ এএম

প্রতিবাদ কীভাবে আন্দোলনে রূপ নিতে পারে তার দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে। দুই বাসের রেষারেষির কারণে চাকায় পিষ্ট হয়ে সহপাঠীদের মৃত্যুর প্রতিবাদে শহীদ রমিজউদ্দিন স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীরা প্রথমে সড়ক অবরোধ করে, পরে বিমানবন্দর সড়কে অবস্থান ধর্মঘট করে। ২৯ জুলাইয়ের পরে তাদের সে প্রতিবাদের ঢেউ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। এক সপ্তাহের মধ্যে তা বিস্তৃতি লাভ করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। রাজধানীতে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ সমাবেশ রূপ নেয় গণআন্দোলনে। এমন কোনো স্কুল-কলেজে নেই যার শিক্ষার্থীরা এ আন্দোলনে শরিক হয়নি। মূলত ৩০ জুলাই থেকে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠে। এ আন্দোলন নতুন রূপে আবির্ভূত হয়। সহপাঠিদের হত্যার বিচারের পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করার দাবিতে সোচ্চার হয়ে ওঠে। সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো, সড়ককে নিরাপদ করতে হলে যে বিষয় বা আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি, শিক্ষার্থীরা স্ব-উদ্যোগে তা বাস্তবায়নে মাঠে নামে। ফলে তা শান্তিপূর্ণ এবং অহিংস আন্দোলনে রূপ নেয়।
একটি সপ্তাহ রাজধানী পরিগ্রহ করে এব অভিনব রূপ। স্কুল-কলেজের ইউনিফর্ম পরা হাজার হাজার শিশু-কিশোরের পদভারে রাজধানীর রাজপথ কেঁপে উঠে। মুখরিত হয়ে উঠে তাদের নানা শ্লোগানের শব্দে। আমরা নানা ধরণের প্রতিবাদ-বিক্ষোভ দেখে অভ্যস্ত। কিছু একটা উছিলা পেলেই দেখি একদল লোক রাস্তায় নেমে নির্বিচারে গাড়ি ভাংচুর, অগ্নি সংযোগে মেতে ওঠে। তাদের হাতে নিগৃহিত হয় মানুষ। কিন্তু সপ্তাহব্যাপী চলা শিশুদের আন্দোলনে সেরকম কোনো ঘটনা ঘটেনি। আন্দোলনরত শিশুরা একটি গাড়ির কাঁচে হাত দেয় নি, এক টুকরো ইট ছুড়ে মারেনি কারো দিকে। একটি দিয়শলাইয়ের কাঠিও জ¦ালায়নি কোনো কিছু পুড়িয়ে ভস্ব করে দিতে। শিশুদের এ শান্তিপূর্ণ অহিংস আন্দোলন থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে।
অভ‚তপূর্ব জনসমর্থন পেয়েছে শিশুদের এ আন্দোলন। সব শ্রেণি-পেশার মানুষ তাদের উত্থাপিত নয় দফা দাবির প্রতি জানিয়েছে কুণ্ঠাহীন সমর্থন, দিয়েছে উৎসাহ। আমাদের দেশের বাবা-মা’রা তাদের সন্তানদেরকে রাজনীতি, মিছিল, মিটিং থেকে সব সময় দূরে রাখতে চান। কিন্তু এবারই আমরা ব্যতিক্রম দেখলাম। মা তার সন্তানকে মিছিলে যেতে উৎসাহিত করেছেন। খাবার নিয়ে গেছেন আন্দোলনরত আদরের সন্তানের জন্য। শুধু নিজের সন্তান নয়, রাজপথে থাকা অন্য শিশুর মুখেও তুলে দিয়েছেন এক মুঠো খাবার পরম মমতায়। কিন্তু কেন? রাজনীতি আন্দোলন ইত্যাদির প্রতি বিতৃষ্ণ অভিভাবকরা কেন সন্তানদের আন্দোলনে যেতে উৎসাহিত করেছেন?
এর কারণ অত্যন্ত পরিষ্কার। শিশুরা যেসব দাবি নিয়ে রাজপথে সোচ্চার হয়েছে, সেগুলো এদেশের প্রতিটি মানুষের প্রাণের দাবি। জীবনের নিরাপত্তা কে না চায়? কিন্তু আমাদের দেশে এখন তা নেই। কেউ সন্ত্রাসীদের গুলিতে, কেউ বাস-ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে বেঘোরে প্রাণ হারাচ্ছে প্রতিনিয়ত। প্রখ্যাত সাংবাদিক নির্মল সেন (বর্তমানে পরলোকগত) আজ থেকে ছেচল্লিশ বছর আগে স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চেয়েছিলেন তার কলামে। দুর্ভাগ্য আমাদের, সে গ্যারান্টি আজো মেলেনি। বরং দিন কে দিন জীবন হয়ে উঠেছে আরো বেশি অনিশ্চিত, আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে অস্বাভাবিক মৃত্যুর প্রকোপ। এই অস্বাভাবিক মৃত্যুর একটি বড় অংশ ঘটে সড়ক মহাসড়কে বাস-ট্রাক দুর্ঘটনায়। আমাদের শিশুরা সেই অস্বাভাবিক মৃত্যুর মহামারী বন্ধের দাবিতেই মাঠে নেমেছিল। আর সেজন্যই এ আন্দোলন দল-মত নির্বিশেষে দেশবাসী সবার সমর্থন সহানুভ‚তি অর্জন করতে পেরেছিল।
শিশুদের এ আন্দোলনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল না। ছিলনা তা কোনো দল, সম্প্রদায়, গোষ্ঠী কিংবা ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধে। আন্দোলন ছিল মূলত সড়ক পরিবহন সেক্টরে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার দাবিতে। তাদের উত্থাপিত নয় দফা দাবির প্রতি দৃকপাত করলেই সে সত্যটি সহজেই ধরা পড়বে। প্রধান দাবি সড়ককে নিরাপদ করা। আর সে নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে হলে যেসব পদক্ষেপ নেয়া জরুরি, তাতে দেশের একটি মহলের গাত্রদাহ সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক। যুগের পর যুগ আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে যারা পরিবহন সেক্টরের মালিক-মোক্তার সেজে বসে আছেন, স্বার্থহানির আশঙ্কায় তারা যদি ক্রুদ্ধ হয়ে উঠেন তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। আর সেজন্যই শিশুদের আন্দোলনের সময় ‘নিরাপত্তা’র অজুহাতে কোনো প্রকার ঘোষণা না দিয়ে গণপরিবহন বন্ধ করে দেয়ার ঘটনা অনেককেই বিস্মিত করেনি। কারণ কায়েমী স্বার্থবাদী গোষ্ঠী এ ধরণের ঘটনাই ঘটিয়ে থাকে। এই আন্দোলনের প্রতি পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের ক্ষোভকে আমরা স্বাভাবিক হিসেবেই ধরে নিতে পারি। কারণ এতদিন তারা যে স্বেচ্ছাচারিতা চালিয়ে এসেছে, তার বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ প্রতিবাদ হয়নি। দেখা গেছে, কোথাও কোনো সড়ক দুর্ঘটনা ঘটলে স্থানীয়ভাবে প্রতিবাদ হয়েছে, গাড়ি ভাংচুর-পুড়িয়ে দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু একটি দুর্ঘটনা ও তার প্রতিক্রিয়ায় দেশব্যাপী আন্দোলন গড়ে ওঠা এবারই প্রথম। আর সে আন্দোলন জনগণের দ্ব্যর্থহীন সমর্থন পাওয়ায় ওই মহলটির কপালে ভাঁজ পড়েছে। গোষ্ঠীস্বার্থ ক্ষুন্ন হওয়ার আশঙ্কায় মহলটি আন্দোলনের প্রতি সাধারণ মানুষকে ক্ষেপিয়ে তোলার জন্য অঘোষিত পরিবহন ধর্মঘটে চলে যায়। অবশ্য চারদিন বন্ধ রাখার পর ৬ আগস্ট সীমিত সংখ্যক গণপরিবহন রাস্তায় নামে। পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের এ আচরণে এটা স্পষ্ট যে, তারা আইন-কানুন মানতে নারাজ। যে যেমন ইচ্ছা গাড়ি চালাবে, তাতে কে মরল, কে বাঁচল সেটা তাদের দেখার বিষয় নয়। সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো, পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের এই বেপরোয়া আচরণের প্রতি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কিছু রাজনৈতিক নেতার মদত ছিল।
শিশুদের সূচিত শান্তিপূর্ণ মানবিক আন্দোলনটি শেষ পর্যন্ত আর অহিংস থাকেনি। আমাদের নষ্ট রাজনীতির কবলে পড়ে হয়ে উঠে সহিংস। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনরত শিশুরা সরকারি দলের কর্মী-ক্যাডারদের আক্রমণের শিকার হয়। তাদের ওপর প্রথম হামলাটি হয় ৪ আগস্ট রাজধানীর ঝিগাতলায়। ওই হামলায় শতাধিক ছাত্র আহত হওয়ার খবর দেয় সংবাদমাধ্যমগুলো। একই দিনে ধানমন্ডিস্থ আওয়ামী লীগ কার্যালযে দুর্বৃত্তরা হামলা করেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে দলটির পক্ষ থেকে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে পত্রিকার খবরে বলা হয়েছে, মাথায় হেলমেট পরা একদল যুবক ঝিগাতলায় অবস্থানরত শিশুদের ওপর সশস্ত্র হামলা চালায়। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেছে, ক্ষমতাসীন দলের লোকেরাই ওই হামলা চালায়। আর আওয়ামী লীগ অফিসে হামলার ঘটনাটি ঝিগাতলায় শিক্ষার্থদের ওপর হামলার অজুহাত সৃষ্টির উদ্দেশ্যে তৈরি করা কীনা এ প্রশ্নও অনেকের মনেই ওঠে। দ্বিতীয় দিন অর্থাৎ ৫ আগস্ট সংর্ঘষ ছড়িয়ে পড়ে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে। এদিন ঝিগাতলা-ধানমÐিসহ এলিফ্যান্ট রোড, উত্তরা, ফার্মগেট, মিরপুর ও রামপুরায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। পুলিশকে ভীষণ মারমুখী দেখা যায়। তারা রাবার বুলেট ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে। এদিনও শতাধিক আহত হওয়ার খবর দেয় সংবাদমাধ্যমগুলো। ৬ আগস্ট রাজধানীর কয়েকটি বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্রদের সঙ্গে পুলিশ ও দুর্বৃত্তদের সংঘর্ষ হয়। পুলিশ ও বহিরাগত দুর্র্বৃত্তরা সম্মিলিতভাবে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
যে বিষয়টি লক্ষণীয় তাহলো, এসব হামলায় পুলিশের পাশে একদল যুবককে দেখা গেছে সশস্ত্র অবস্থায়। তাদের কেউ কেউ পুলিশের সামনেই আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে ধরেছে। কিন্তু পুলিশ কিছুই বলেনি। সশস্ত্র ওই দুর্বৃত্তদের পুলিশ কেন এতটা ছাড় দিল সে প্রশ্ন এখন সবার মুখে মুখে। অনেকে ওই হামলা সমূহকে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে পুলিশ-দুর্বৃত্ত যৌথ অভিযান বলেও অভিহিত করছেন।
এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে ‘তৃতীয়’ পক্ষ অনুপ্রবেশ করে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে চেয়েছিল। এই তৃতীয় পক্ষ কে বা কারা তা সরকার পক্ষ পরিষ্কার করেনি। তবে পরবর্তীতে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ থেকে বুঝতে কারো বাকি থাকেনি তৃতীয় পক্ষ বলতে কাদেরকে বোঝানো হয়েছে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সহিংসতার উস্কানি দেয়ার অভিযোগে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রিজভীর বিরুদ্ধে মামলা করেছেন ক্ষমতাসীন দলের এক নেতা। আমীর খসরুর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে, তিনি বিএনপির এক কর্মীকে আন্দোলনে মাঠে নামার জন্য টেলিফোনে নির্দেশ দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ওই টেলি কথোপকথনের অংশ বিশেষ ভাইরাল হয়েছে।
সচেতন ব্যক্তিরা বলছেন যে, শিশুদের একটি সামাজিক-মানবিক আন্দোলন শেষ পর্যন্ত দেশের অপরাজনীতির শিকার হয়ে অনেকটাই মহিমা হারিয়েছে। সরকার শুরু থেকেই চেষ্টা করেছে, এ আন্দোলনের পেছনে বিএনপির মদতের বিষয়টি জনসমক্ষে তুলে ধরতে। এজন্যই আন্দোলন শুরুর তিন দিনের মাথায় সরকারের মন্ত্রী ও নেতাদের মুখে শোনা গেছে সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে ব্যর্থ হয়ে বিএনপির শিশুদের কাঁধে সওয়ার হওয়ার অভিযোগ। এ অভিযোগ কতটা সঠিক বা সত্য সে বিচারে যাওয়ার দরকার নেই। দুঃখ শুধু এই, একটি মহৎ আন্দোলন ভিন্ন রূপে চিত্রিত হয়েছে ক্ষমতাসীন দলের লোক ও পুলিশের যৌথ হামলার কারণে। এর জন্য রাজনীতিক বেøম গেইম বিশেষভাবে দায়ী।
একটি মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে শিক্ষার্থীরা এই অহিংস আন্দোলনটি শুরু করেছিল। শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলনের পরিসমাপ্তি ঘটুক এটাই সবাই চেয়েছিলেন। শিশুদের সব দাবি যৌক্তিক স্বীকার করে নীতিগতভাবে সেগুলো মেনে নেয়ার কথা বলে সরকার শুভ বুদ্ধিরই পরিচয় প্রথম দিকে দিয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক সংকীর্ণতা এখানেও সবকিছু মিসমার করে দিয়েছে। তার ফলে সর্বজন সমর্থিত নিষ্কলুষ একটি অন্দোলন সহিংসতার কালিমালিপ্ত হলো। সড়কে প্রাণহানি-রক্তপাত বন্ধের দাবিতে যারা সোচ্চার হলো, তাদেরই রক্ত ঝরল সেই সড়কেই। এর চেয়ে দুর্ভাগ্যজনক আর কী হতে পারে!
লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।



 

Show all comments
  • Nazmul Ayub ১৩ আগস্ট, ২০১৮, ৫:৫৩ পিএম says : 0
    সত্য প্রচারের জন্য ধন্যবাদ।
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ