Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৮, ০১ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ০৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী

কোরবানীর আহকাম সমূহ

এসএম আরিফুল কাদের | প্রকাশের সময় : ১৫ আগস্ট, ২০১৮, ১২:০৫ এএম

কোরবানী একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। যা যুগে যুগে সব শরিয়তেই বিদ্যমান ছিল। মানব সভ্যতার সুদীর্ঘ ইতিহাসে প্রমাণিত যে, পৃথিবীর সব জাতি ও স¤প্রদায় কোনো না কোনোভাবে আল­াহর দরবারে তার প্রিয় বস্তু উৎসর্গ করতেন। উদ্দেশ্য একটাই- আল­াহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জন। এ প্রসঙ্গে আল­াহ তা’আলা বলেন, ‘আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্যে কোরবানির এক বিশেষ রীতি পদ্ধতি নির্ধারণ করে দিয়েছি, যেন তারা ওই সব পশুর ওপর আল­াহর নাম নিতে পারে, যা আল­াহ তাদেরকে দান করেছেন।’ (সুরা হজ : ৩৪) 

কোরবানির হুকুম নিয়ে মতভেদ রয়েছে। ইমাম আওযায়ি, ইমাম লাইস, ইমাম আজম আবু হানিফা (রহ.) মত হলো কোরবানি ওয়াজিব। আর ইমাম মালেক ও ইমাম আহমদ (রহ.) থেকে একটি মত বর্ণিত আছে যে, তারাও ওয়াজিব বলেছেন। তাঁদের দলিল: আল­াহ তা’আলা নির্দেশ দিয়েছেন- ‘তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় কর ও পশু কোরবানি কর।’ (সূরা কাউসার : ২) আর আল­াহ রাব্বুল আলামিনের নির্দেশ পালন ওয়াজিব হয়ে থাকে। তাঁদের মতে কোরবানি ওয়াজিব হওয়ায় হাদিসেও ঘোষণা রয়েছে। রাসূলে কারিম (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্তে¡ও কোরবানি করে না। সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে।’ ( মুসনাদ আহমদ, ইবনে মাজাহ) যারা কোরবানি পরিত্যাগ করে তাদের প্রতি এ হাদিস একটি সতর্কবাণী। তাই কোরবানি ওয়াজিব। কোরবানি ওয়াজিব না হলে উপযুক্ত ব্যক্তির উপর মহানবি (সা.)-এর এত বড় হুমকি আসার কথা নয়।
অপর পক্ষে ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) এর বর্ণনানুসারেও ইমাম শাফেয়ী (রহ.) এর মতে কোরবানি সুন্নাতে মুয়াক্কাদা। তাঁদের দলিল: রাসূলুল­াহ (সা.) বলেছেন- ‘তোমাদের মাঝে যে কোরবানি করতে চায়, জিলহজ মাসের চাঁদ দেখার পর সে যেন কোরবানি সম্পন্ন করার পূর্বে তার কোনো চুল ও নখ না কাটে।’ (সহিহ মুসলিম) এ হাদিসে রাসূলুল­াহ (সা) এর বানী ‘যে কোরবানি করতে চায়’ কথা দ্বারা বুঝে আসে এটা ওয়াজিব নয়। (বঙ্গানুবাদ শরহে বেকায়া)
শাইখ ইবনে উসাইমীন (রহ) উভয় পক্ষের দলিল-প্রমাণ উলে­খ করার পর বলেন, এ সকল দলিল-প্রমাণ পরস্পর বিরোধী নয়। বরং একটা অন্যটার সম্পূরক। সারকথা হলো- যারা কোরবানিকে ওয়াজিব বলেছেন তাদের প্রমাণাদি অধিকতর শক্তিশালী। আর ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.)-এর মত এটাই।
উপরে উল্লে­খিত দলিলাদির মাধ্যমে কোরবানি দাতা অবশ্যই প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থমস্তিস্ক সম্পন্ন ও নেসাব পরিমান সম্পদের মালিক হতে হবে। আর কোরবানির নেসাব পুরো এক বছর থাকা জরুরি নয়। বরং জিলহজ্জ মাসের ১০তারিখ সুবেহ সাদিক থেকে ১২তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত এ তিনদিনের কোনো দিন মওজুদ থাকলে কোরবানি করতে হবে। (রদ্দুল মুহতার, বাদায়েউস সানায়ে)
কোরবানির কিছু শর্ত রয়েছে। যা মেনে চলা কোরবানি দাতার অবশ্য কর্তব্য:
(১) এমন পশু দ্বারা কোরবানি দিতে হবে যা শরিয়ত নির্ধারণ করে দিয়েছে। সেগুলো হলো- উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, ও দুম্বা। এ গুলোকে কোরআনের ভাষায় বলা হয় ‘বাহিমাতুল আনআম।’ যেমন এরশাদ হয়েছে:- ‘আমি প্রত্যেক স¤প্রদায়ের জন্য কোরবানির নিয়ম করে দিয়েছি। তিনি তাদেরকে জীবনোপকরণ স্বরূপ যে সকল চতুষ্পদ জন্তু দিয়েছেন, সেগুলোর ওপর যেন তারা আল­াহর নাম উচ্চারণ করে।’ (সূরা হজ্ব : ৩৪) আল­াহর রাসূল (সা.) উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, দুম্বা ছাড়া অন্য কোন জন্তু কোরবানি করেননি ও কোরবানি করতে বলেননি। তাই কোরবানি এগুলো দিয়েই করতে হবে।
(২) শরিয়তের দৃষ্টিতে কোরবানির পশুর বয়সের দিকটা খেয়াল রাখা জরুরি। উট কমপক্ষে ৫ বছরের হতে হবে। গরু ও মহিষ কমপক্ষে ২বছরের হতে হবে। আর ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা কমপক্ষে ১বছরের হতে হবে। তবে ভেড়া ও দুম্বা যদি ১বছরের কিছু কমও হয়, কিন্তু এমন হৃষ্টপুষ্ট হয় যে, দেখতে ১ বছরের মতো মনে হয় তাহলে তা দ্বারাও কোরবানি করা জায়েজ। অবশ্য এক্ষেত্রে কমপক্ষে ৬ মাস বয়সের হতে হবে। (কাযীখান ৩ : ৩৪৮, বাদেউস সানায়ে ৪ : ২০৫-২০৬)
(৩) কোরবানির পশু যাবতীয় দোষ-ত্রæটি মুক্ত হতে হবে। যেমন হাদিসে এসেছে:- সাহাবি আল-বারা ইবনে আজেব (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল­াহ (সা.) আমাদের মাঝে দাঁড়ালেন। তারপর বললেন, চার ধরনের পশু আছে। যা দিয়ে কোরবানি জায়েজ হবে না। অন্য বর্ণনায় বলা হয়েছে পরিপূর্ণ হবে না। আর তা হলো- অন্ধ, রোগাক্রান্ত, পঙ্গু, এবং আহত । (তিরমিজি, নাসাঈ) নাসাঈর অন্য বর্ণনায় ‘আহত’ শব্দের স্থলে ‘পাগল’ উল্লেখ আছে। ইমাম মালেক (রহ.)-এর মতে কোরবানির জন্য সর্বোত্তম জন্তু হল শিংওয়ালা সাদা-কালো দুম্বা। কারণ রাসূলে (সা.) এ ধরনের দুম্বা কোরবানি করেছেন বলে বোখারি ও মুসলিমের হাদিসে এসেছে। গুণগত দিক দিয়ে উত্তম হল কোরবানির পশু হৃষ্টপুষ্ট, অধিক গোশত সম্পন্ন, নিখুঁত, দেখতে সুন্দর হওয়া ।
শরীকে কোরবানি দেওয়ার বিধান :
শরীকে কোরবানির বিধান সম্পর্কে হাদিসে পাওয়া যায়। হযরত জাবের রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মহানবি (সা.) বলেছেন, গরু বা গাভী সাত জনের পক্ষ থেকে এবং উট সাত জনের পক্ষ থেকে কোরবানির জন্য যথেষ্ট। (মুসলিম ও আবু দাউদ) কোরবানির অংশীদার নেওয়ার ক্ষেত্রে শরয়ী হু কোম হলো- উট, গরু, মহিষে এক থেকে সাতজন লোক কোরবানি করতে পারবে। আবার উট, গরু, মহিষের মধ্যে প্রত্যেকটিতে সাতভাগ দিতে হবে এমন কোন শর্ত নেই। বরং কোরবানি দাতা একাই একটি বা একাধিক গরু, উট, মহিষ নিজের ও তার পরিবারের সবার পক্ষ থেকে কোরবানি করতে পারবেন। দুম্বা, ছাগল ও ভেড়া একজনের পক্ষ থেকে একটাই কোরবানি করতে হবে। এসব পশুতে অন্য কোন পৃথক ওয়াজিব কোরবানি দাতা কোরবানির অংশীদার হতে পারবে না। শরীকদার কোরবানির মধ্যে যদি কারও শুধু গোশত খাওয়ার নিয়ত থাকে, হালাল টাকা না হয় এবং ঈমান না থাকে তাহলে সকলের কোরবানি নষ্ট হয়ে যাবে। (ফতোয়া বিভাগ, হয়বতনগর এ.ইউ. কামিল মাদ্রাসা, কিশোরগঞ্জ/ফতোয়ায়ে শামী ৫:২০১)
কোরবানির শরীকদারের জন্য দু’টি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। ১. সকলের নিয়ত এক হওয়া। ২. ভাগের প্রতিটি অংশ সমান হওয়া। তাই গোশত আন্দাজে ভাগ করলে হবে না। পাল্লা দ্বারা মেপে সমান সমান ভাগ করতে হবে। অন্যথায় যদি ভাগের মধ্যে কিছু কমবেশী হয় তবে সুদ হবে এবং গোনাহগার হতে হবে। (শামী ৫ : ২০২)
কোরবানির পশুর গোশত বণ্টনের পদ্ধতি:
কোরবানির গোশত নিজে খাবে, নিজের পরিবারবর্গকে খাওয়াবে, আত্মীয়-স্বজনকে হাদিয়া তোহফা দিবে এবং গরীব মিসকিনকে দান করবে। এ প্রসঙ্গে আল­াহ রাব্বুল আলামিন বলেন, ‘অতঃপর তোমরা উহা থেকে আহার কর এবং দুঃস্থ, অভাবগ্রস্থকে আহার করাও।’ (সূরা হজ্ব : ২৮) রাসূলুল­াহ (সা)ও কোরবানির গোশত সম্পর্কে বলেছেন, ‘তোমরা নিজেরা খাও ও অন্যকে আহার করাও এবং সংরক্ষণ কর।’ (সহিহ বোখারি) মুস্তাহাব তরিকা হলো কোরবানির গোশত তিন ভাগে ভাগ করা। ১. নিজ পরিবার পরিজনের জন্য এক ভাগ। ২. আত্মীয় স্বজনের জন্য এক ভাগ। ৩. ফকির মিসকিনদের জন্য একভাগ। আর যদি পরিবারের লোক সংখ্যা বেশি হয়, তবে কোরবানির সমস্ত গোশত খেলেও অসুবিধা নেই। তবে কেউ যদি ফকির মিসকিনকে সামান্যও দান করে তাতেও গুনাহ হবে না। (ফতোয়ায়ে শামী ৫ : ২০৮) কোরবানির জীব জবেহকারী ও গোশত প্রস্তুতকারীর পারিশ্রমিক পৃথকভাবে দিতে হবে। কোরবানির গোশত, কাল্লা বা পা দ্বারা দেওয়া যাবে না। কোরবানির গোশত শুকিয়ে বা ফ্রিজে জমা করে রাখা জায়েজ। (শামী ৫:২০৮)



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর