Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১০ আশ্বিন ১৪২৫, ১৪ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

ঢাকার বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনতে হবে

| প্রকাশের সময় : ১৬ আগস্ট, ২০১৮, ১২:০২ এএম

যুক্তরাজ্যের ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের জরিপে আবারো নিকৃষ্টতম শহরের তালিকায় স্থান পেয়েছে রাজধানী শহর ঢাকা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধারাবাহিকভাবে ঢাকার এই অবস্থান অব্যাহত আছে। পাঁচ বছর আগে ২০১৩ সালে প্রকাশিত ইআইইউ জরিপে বিশ্বের ১৪০ শহরের মধ্যে ঢাকা ১৩৯তম স্থান লাভ করেছিল। মাঝখানে তিন বছর তৃতীয়, চতুর্থ স্থান ঘুরে এবার আবারো বসবাসের অযোগ্য শহরের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে। গত ৫ বছরে বিশ্বের অনেক পরিবর্তন ঘটেছে, বাংলাদেশেও কথাকথিত উন্নয়নের জিগির আরো জোরালোভাবে উচ্চারিত হলেও রাজধানী শহর ঢাকাকে বাসযোগ্য করার কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি অথবা এ ক্ষেত্রে সরকারের কোনো উদ্যোগই কাজে লাগেনি। ইকোনমিক ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের জরিপে বাসযোগ্যতার ক্ষেত্রে ১৪০ািট শহরের জন্য যে মানদন্ড নির্ধারণ করা হয়েছে তার মধ্যে নাগরিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে ধরা হয়েছে। সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরুর পর থেকেই রাজধানী দামেস্ক বিশ্বের সবচেয়ে অযোগ্য শহরের তালিকায় স্থান পাচ্ছে। যুদ্ধের ঝুঁকির কারণে কখনো কখনো বাগদাদ বা কাবুলের নামও অযোগ্য শহরের তালিকায় স্থান পেয়েছে। বাংলাদেশে কোন যুদ্ধ বা গৃহযুদ্ধ পরিস্থিতি না থাকলেও যুদ্ধবিদ্ধস্ত শহরগুলোর তালিকার সাথেই অযোগ্য বা ঝুঁকিপূর্ণ শহরের তালিকায় ধারাবাহিকভাবে ঢাকার নাম উঠে আসা জাতির জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক ।
গত বছর ইআইইউ লিভেবেলিটি রিপোর্টে ঢাকার অবস্থান ছিল বিশ্বের ১৪০ শহরের মধ্যে ১৩৭তম। গত মঙ্গলবার প্রকাশিত গ্লোবাল লিভেবেলিটি ইনডেক্সে আবারো দুই ধাপ অবনতি ঘটিয়ে ঢাকা ১৩৯ নম্বরে চলে আসে। অর্থাৎ প্রতিদিন অসংখ্য বিমান হামলা, বন্দুক-কামানের গর্জন, গেরিলা হামলায় লাখ লাখ বাস্তুহারা মানুষের শহর দামেস্কের পরের স্থানটি পেয়েছে ঢাকা। এর মানে হচ্ছে দামেস্কের পর বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার নাগরিকরা সবচেয়ে বাজে অবস্থায় বসবাস করছে। ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের জরিপে শহরের বাসযোগ্যতার মানদন্ড হিসেবে স্থিতিশীলতা, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবেশ ও সংস্কৃতি, পরিবহনব্যবস্থা, অবকাঠামোসহ ৩০টি বিষয় আমলে নেয়া হয়েছে। প্রতিটি সূচকে মোট ১০০ নম্বরের গড় হিসাবে এই তালিকা করা হয়েছে। বাসযোগ্যতার ক্ষেত্রে বিশ্বের শীর্ষ শহরগুলোর মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন এবং অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা পাল্লা দিয়ে উন্নতি করছে। গতবছর মেলবোর্ন ৯৭.৫ স্কোর করে শীর্ষ স্থানে থাকলেও এবার ৯৮.৪ পেয়েও ভিয়েনার কাছে হেরে গেছে। ভিয়েনা এবার ৯৯.১ স্কোর নিয়ে শীর্ষে উঠে এসেছে। আমাদের সরকার, মেয়র ও রাজনৈতিক নেতারা বছরের পর বছর ধরে নগরবাসিকে উন্নয়নের গল্প শোনাচ্ছেন। যুদ্ধবিদ্ধস্ত দামেস্কও যেখানে অবকাঠামোখাতে ইআইইউ’র কাছ থেকে ৩২.১ নম্বর পেয়েছে সেখানে ঢাকা পেয়েছে ২৬.৮। এক দশক ধরে ক্ষমতাসীন বর্তমান সরকার ঢাকার অবকাঠামো ও নাগরিক নিরাপত্তার উন্নয়নে তেমন কিছুই করতে পারেনি। এ সময়ে অনেক ক্ষেত্রেই অবনমন ঘটেছে।
ঢাকার যানজট, জনদুর্ভোগ, সর্বোপরি বাসযোগ্যতা হারানোর পেছনে সবচেয়ে বড় ভ‚মিকা পালন করছে জনসংখ্যার আধিক্য। দুই কোটির বেশী জনসংখ্যা অধ্যুসিত একটি মেগাসিটির যে ধরনের রাস্তা, গণপরিবহনব্যবস্থা, স্যুয়ারেজ, পানি, বিদ্যুত,গ্যাস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, খেলার মাঠ, উদ্যান, বিনোদন কেন্দ্র, আবাসন ও নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন ঢাকায় তার কিছুই নেই। উপরন্তু রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা,অস্থিতিশীলতা, নাগরিকদের গণতান্ত্রিক ও মানবিক অধিকারের প্রশ্নে সরকারের রাজনৈতিক সংগঠন ও বাহিনীগুলোর অসহিষ্ণুতা, বিচার বহিভর্‚ত হত্যাকান্ড, গুম-খুনের মত ঘটনা বেড়ে যাওয়া ও বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে ঢাকা কার্যত আতঙ্কের নগরীতে পরিনত হয়েছে। ইআইইউ’র সর্বশেষ রিপোর্ট প্রকাশিত হওয়ার আগে ঢাকায় কিশোর শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক দাবীর আন্দোলন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ফলাও প্রচার পেয়েছে। এই আন্দোলনের শেষ ধাপে শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকদের উপর রক্তাক্ত হামলার ঘটনা বিশ্ব সম্প্রদায়ের দৃষ্টি এড়ায়নি। এসব ঘটনা শুধু ঢাকার বাসযোগ্যতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেনা, সেই সাথে বাংলাদেশের গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও জননিরাপত্তাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। একদিকে সরকার উন্নয়নের কথা বলছে, মধ্য আয়ের দেশে পরিনত করার কথা বলছে, অন্যদিকে দেশ বিনিয়োগ পরিবেশ হারাচ্ছে, দেশের রাজধানী শহর বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে। ঢাকা শহরকে বাসযোগ্য করতে নতুন নতুন আবাসিক প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন নতুন ফ্লাইওভার নির্মিত হচ্ছে। এতে যানজট বা জনদুর্ভোগ কমেনি। ঢাকার চারপাশের নদীগুলোর দখল ও দূষণরোধসহ শহর থেকে শ্রমঘন ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর কলকারখানা সরিয়ে নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন নগরবিদরা। গত ৫দশকে গড়ে ওঠা শত শত বস্তিতে মানবেতরভাবে বাস করছে লাখ লাখ মানুষ। শুধুমাত্র বস্তি উচ্ছেদের মাধ্যমে নগরীর অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ কমানোর উদ্যোগ সফল হবেনা। ঢাকায় গড়ে ওঠা কলকারখানা, অফিস আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিকেন্দ্রীকরণ ও ঢাকার চারপাশে অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমেই কেবল ঢাকা শহরকে অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপমুক্ত করা যেতে পারে। এ লক্ষ্যে প্রথমেই যত দ্রæত সম্ভব ঢাকা থেকে গার্মেন্টস কারখানাসহ সব ধরনের কলকারখানা সরিয়ে দেয়ার উদ্যোগ নিতে হবে। ঢাকার শিল্পকারখানা ও সরকারী প্রতিষ্ঠানসমুহের বিকেন্দ্রীকরণের পাশাপাশি গাজীপুর, সাভার, ধামরাই, নারায়নগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, পূর্বাচলের আবাসন, শিল্পায়ন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নের কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। সর্বোপরি জননিরাপত্তা, গণতান্ত্রিক অধিকার ও সুশাসন নিশ্চিত করার মাধ্যমে ঢাকাকে বিনিয়োগবান্ধব ও বাসযোগ্য করে তোলা সম্ভব।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।