Inqilab Logo

ঢাকা, শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৬ আশ্বিন ১৪২৫, ১০ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

নদীভাঙনের তাণ্ডব

| প্রকাশের সময় : ১৮ আগস্ট, ২০১৮, ১২:০৩ এএম

নদীভাঙন এবং নদীর গতি পরিবর্তন এদেশে নতুন কিছু নয়। যুগের পর যুগ ধরে এটা চলে আসছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় পানি উন্নয়ন বোর্ডকে পদক্ষেপ নিতেও দেখা যায়। তবে সেসব পদক্ষেপ যে পুরোপুরি কাজে আসছে না কিংবা নদীভাঙন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না তা বরাবরই লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এ নিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। দুর্নীতি অর্থ লুটপাট, সঠিক সময়ে পদক্ষেপ না নেয়া, দায়সারা কাজ করা, বাঁধ নির্মাণে ত্রুটিসহ নানা অভিযোগ সংস্থাটির বিরুদ্ধে নিয়মিতই উঠছে। এ নিয়ে অনেক লেখালেখিও হয়েছে এবং হচ্ছে। গত কয়েক দিনের টানা বর্ষণ ও উজানের ঢলে আকস্মিক মাঝারি ধরনের বন্যা ও মৌসুমী পানি নেমে আসার কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে ভয়াবহ নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। ইনকিলাবের এক প্রতিবেদনে ভাঙনের তীব্রতা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, বহু এলাকার সড়ক, দোকানপাট, ঘর-বাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও মসজিদ এমনকি কোথাও কোথাও উপজেলা সদর চিরতরে বিলীন হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ঘর-বাড়ি ও কৃষি জমি হারিয়ে মানুষ নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। কর্মসংস্থান ও বেঁচে থাকার তাকিদে তারা এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে খাদ্য সংকট ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। পারিবারিক সংকট ও বেকারত্ব তীব্র আকার ধারণ করেছে। অথচ এসব এলাকায় নদীভাঙন রোধ এবং নিঃস্ব মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সরকারি তেমন কোনো উদ্যোগ নেই।
একটি বেসরকারি গবেষণা সংস্থার হিসেবে দেখা গেছে, প্রতি বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ শিকার হচ্ছে প্রায় ১০ লাখ মানুষ। গড়ে ৮ হাজার হেক্টর জমি নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। শুধু পদ্মা ও যমুনার ভাঙনে এ পর্যন্ত দেড় লাখ হেক্টর এলাকা বিলীন হয়েছে। নদীর ভয়াবহ ভাঙনে দেশের আভ্যন্তরীন ভূমি ও এলাকার চিত্র বদলে যাচ্ছে। লাখ লাখ মানুষ সর্বস্ব হারিয়ে উদ্বাস্তুতে পরিণত হচ্ছে। অনেক ঐতিহাসিক স্থাপনা থেকে শুরু করে মানুষের জমি ও বসতবাড়ি হারিয়ে যাচ্ছে। এ এক অপূরণীয় ক্ষতি। নদীভাঙনের শিকার লাখ লাখ মানুষ বাধ্য হয়ে দেশের বিভিন্ন শহর ও এলাকায় আশ্রয় নিচ্ছে। সেখানে সৃষ্টি হচ্ছে, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্য। অধিকাংশ মানুষই কর্মসংস্থান ও বেঁচে থাকার আশায় রাজধানীমুখী হচ্ছে। এতে রাজধানীর উপরও প্রতিদিন ভয়াবহ চাপ বাড়ছে। এক হিসেবে দেখা গেছে, প্রতিদিন রাজধানীতে আড়াই হাজারেরও বেশি মানুষ প্রবেশ করছে। এদের বেশিরভাগই উদ্বাস্তু ও নদীভাঙনের শিকার। তারা আশ্রয় নিচ্ছে বস্তিুতে বা রাস্তার পাশে ফুটপাতে। নগরবিদরা রাজধানীকে জনসংখ্যার ভারমুক্ত করার জন্য বিকেন্দ্রীকরণের ওপর বহুবার গুরুত্ব দিয়েছেন। তাতে সরকার তেমন কোনো কান দেয়নি। বরং দিন দিন রাজধানী মানুষের ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়ছে। ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্যভিত্তিক ইকোনোমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের প্রতিবেদনে ঢাকা বিশ্বের দ্বিতীয় বসবাস অযোগ্য শহরের তালিকায় রয়েছে। অন্যদিকে সারাদেশে যেভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ও নদীভাঙনে মানুষ জমি ও বসতবাড়ি হারিয়ে উদ্বাস্তুতে পরিণত হচ্ছে, তাতে অদূর ভবিষ্যতে কী অবস্থা দাঁড়াবে, তা কল্পনাও করা যায় না। অথচ শুধু নদীভাঙন রোধ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণের কাজটি যদি পানি উন্নয়ন বোর্ড যথাযথভাবে করতে পারত, তাহলে বাস্তুচ্যুত মানুষের ঢল কিছুটা হলেও কমানো যেত। বলা বাহুল্য, কেউই নিজ বসতবাড়ি ছেড়ে কোথাও যেতে চায় না। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে লড়াই করে টিকতে না পেরে বাধ্য হয়ে তাদের এলাকা ছাড়তে হয়। আমরা দেখছি, নদীভাঙন রোধ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ এবং সংস্কারের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রতি বছরই শত শত কোটি টাকা বরাদ্দ করে। দুঃখের বিষয়, এতে শুধু বিপুল অর্থ বরাদ্দই করা হয়, নদী শাসন, ভাঙন প্রতিরোধ ও বন্যা নিয়ন্ত্রনের তেমন কিছু হয়না। বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ এতই ভঙ্গর যে, বন্যার ঢলে মুহূর্তেই তা ভেঙে যায়। তখন পানি উন্নয়ন বোর্ড তড়িঘড়ি করে ভাঙন এলাকায় বালির বস্তা, পাথর ফেলে জোড়াতালি দিতে চেষ্টা করে। স্থানীয় লোকজন নিজেদের বাস্তুভিটা ও ফসলী জমি রক্ষার্থে নিজ উদ্যোগে বাঁধ জোড়া দিতে নেমে পড়ে। সারাবছর বাঁধ সংস্কার ও নির্মাণ করার দায়িত্ব যে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সে যে তা যথাযথভাবে পালন করছে না, সেটা বন্যা ও নদীভাঙনের চিত্র থেকেই বোঝা যায়। যদি সংস্থাটি কড়া নজরদারির মাধ্যমে আন্তরিকতা নিয়ে সারাবছর নদীভাঙন রোধ ও বাঁধ নির্মাণ এবং সংস্কারের দায়িত্বটি যথাযথভাবে করত, তাহলে অনেক এলাকায়ই বন্যা ও ভাঙন থেকে রক্ষা পেত।
বলার অপেক্ষা রাখে না, যেসব এলাকায় নদী ভাঙনপ্রবণ এবং বন্যায় বেশি কবলিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে, সেসব এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ড যদি নিয়মিত মনিটরিং করে, তবে প্রাকৃতিক এ দুর্যোগ থেকে অনেকাংশে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। প্রয়োজন শুধু সতর্কতা অবলম্বন করা। আমারা দেখেছি, ভাঙন ও বন্যা প্রবণ এলাকায় সারাবছর সংস্কারমূলক কাজ খুব কমই হয়। যখন ভাঙন ও বন্যা প্রবল হয়ে উঠে, তখনই অনেকটা লোক দেখানো তৎপরতা চালানো হয়। শুষ্ক মৌসুমে যদি ভাঙন রোধ ও বন্যা ঠেকানোর জন্য সংশ্লিষ্ট এলাকায় নিয়মিত সংস্কার কাজ চালানো হতো, তবে এমনটি হতো না। বর্ষা মৌসুম এলেই যেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তৎপর হয়ে উঠে। এর কারণ অজানা নয়। এ সময় কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয় এবং তা থেকে দুর্নীতি ও অর্থ লুটপাটেরও একটা উসিলা পাওয়া যায়। এতে জনগণের বিপুল অর্থ একটি অসাধু শ্রেণীর পকেটে চলে গেলেও জনগণকে দুঃখ-দুর্দশার মধ্যেই বছরের পর বছর থাকতে হচ্ছে। নিঃস্ব হয়ে তারা দেশের বোঝায় পরিণত হচ্ছে। জনগণের অর্থ অপচয়ের অধিকার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নেই। সংস্থাটিকে এই অপসংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে। যথাসময়ে যথাযথ পদক্ষেপের মাধ্যমে নদীভাঙন রোধ ও বন্যা মোকাবিলায় কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে নিয়ে এ কাজ করতে হবে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ