Inqilab Logo

ঢাকা, সোমবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৮, ০৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী

এবারের ঈদ যেন হরিষে বিষাদ

মোবায়েদুর রহমান | প্রকাশের সময় : ২১ আগস্ট, ২০১৮, ১২:০৩ এএম

আগামীকাল বুধবার পবিত্র ঈদুল আযহা। কয়েক দশক ধরে ঢাকায় অবস্থান করায় আমার এই অভিজ্ঞতা হয়েছে যে, যাদের শেকড় ঢাকায় নয়, তারা প্রায় সকলেই দেশের বাড়িতে অন্তত কোরবানির ঈদটা করেন। অর্থাৎ তারা দেশের বাড়িতে কোরবানি দেন। এই হিসাবে ঢাকা শহরের দুই কোটি লোকের মধ্যে কম করে এক কোটি হলেও মানুষ দেশের বাড়িতে যাবেন। ইতোমধ্যেই হয়তো তারা অনেকের দেশের বাড়িতে পৌঁছেছেন। ঈদুল ফিতরের যেমন একটি আলাদা বৈশিষ্ট্য এবং আনন্দ আছে তেমনি ঈদুল আযহা বা কোরবানির ঈদেরও একটি আলাদা বৈশিষ্ট্য এবং আনন্দ আছে। ঈদুল ফিতরে নতুন জামা-কাপড়, জুতা পরা এবং সেমাই ও হালুয়া খাওয়ার আনন্দ। কিন্তু কোরবানির ঈদের মজাই আলাদা। বাড়ির সিনিয়র সদস্যরা কোরবানির গরু-খাসি কিনতে হাটে যান। তাদের সাথে সাথে ছোট ছোট বাচ্চা, কিশোর বা তরুণ যুবারাও হাটে যায়। নানান সাইজের নানান রঙের গরু বা খাসি দেখে তাদের সেকি আনন্দ ! এসব কথা বলতে গিয়ে আমার নিজের ছোট বেলার কথা মনে পড়ছে। গরু কিনে সেই গরুর দড়ি ধরে বাড়ি পর্যন্ত নিয়ে আসা, উঠোনে দুই তিন দিনের জন্য সেই গরু বেঁধে রাখা, সেই গরুকে খড়, ভূষি এবং খৈল খাওয়ানোতে কিশোর এবং তরুণদের সেকি মহা আনন্দ ! এর পর ঈদের নামাজ পড়ে এসে একটার পর একটা গরু বা খাসী জবাই। তারপর সেই গরু বা খাসির চামড়া ছিলে মাংস বানানো, মগজ আলাদা করা, ভূড়ি আলাদা করা, ইত্যাদির পেছনে রয়েছে আলাদা মজা। সেই মাংস তিন ভাগ করা এবং শরিয়ত মোতাবেক আত্মীয় স্বজন এবং গরীবদের মাঝে সেটি বিলিয়ে দেওয়া। কিশোর এবং তরুণদের সবচেয়ে বেশি মজা হয় তখন যখন তাদের আম্মা সেই মাংস কষাতে দেন। কষা মাংসের স্বাদই আলাদা। বিশাল ডেকচি থেকে মাংসের সুরা টগবগ করে ফুটছে। আর সেখান থেকে একটা দুটো বা তিনটা গরম কষা মাংস তুলে মুখে দেওয়া। এসব আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। এগুলো অনুভূতির ব্যাপার।
ঈদের মর্মই তো হলো সকলে মিলে আনন্দ ভাগ করা। নিজের পরিবারের সাথে আনন্দ ভাগ করা, আত্মীয়-স্বজনের সাথে আনন্দ ভাগ করা, পাড়া প্রতিবেশির সাথে ভাগ করা এবং দেশবাসীর সাথে আনন্দ ভাগ করা। কিন্তু এবার ২০১৮ সালে আমরা সেই আনন্দ কি সকলে মিলে ভাগ করতে পারছি? রবিবার যখন এই লেখাটি লিখছি তখন পর্যন্ত কোটা আন্দোলন এবং নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সাথে জড়িত অন্তত ১১৮জন কিশোর ও যুবককে আটক করা হয়েছে। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন মহিলাও রয়েছে। আগের দুইদিন পত্রিকায় দেখলাম, আদালত এদেরকে জামিন দিচ্ছে না। সর্বশেষ খবরে জানা গেছে, এই ১১৮ জনের মধ্যে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের দায়ে আটক ৪২ জনকে জামিনে মুক্তি দিয়েছেন আদালত। কোটা আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্তরা এখনো কারাগারে। বলা বাহুল্য, এদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ সেটা খুন ডাকাতি, রাহাজানি, ধর্ষণ বা রাষ্ট্রদ্রোহীতার পর্যায়ে পড়ে না। কিন্তু তার পরেও তারা একজন নাগরিকের নূন্যতম মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে কেন? তারা চেয়েছিলো, কোটা পদ্ধতির যুক্তিগ্রাহ্য সংস্কার। এর মধ্যে অন্যায় টা কোথায়? প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনার তরফ থেকে ছাত্রলীগ তাদের সাথে কথা বলেছে। এরপর জাতীয় সংসদের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী নিজেই ঘোষণা করেছেন যে, আজ থেকে (যেদিন প্রধানমন্ত্রী সংসদে ভাষণ দেন) সমস্ত কোটা বাতিল করা হলো। সর্বশ্রেণীর ছাত্র প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণাকে বিপুলভাবে অভিনন্দিত করেছিল। সরকার একটি কমিশনও করেছে। সে কমিটি সুপারিশ করেছে যে, দেশে কোনো কোটা পদ্ধতি থাকবে না। যেহেতু মুক্তিযোদ্ধা কোটা উচ্চ আদালতের এনডোর্সমেন্ট পেয়েছিলো তাই ঐ কোটার ব্যাপারে ফাইনাল সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য উচ্চ আদালতের মতামত গ্রহণ করা হবে।
সরকার যখন স্বীকার করলো যে, কোটা আন্দোলন ছিলো জাস্টিফাইড তখন ছাত্ররা আন্দোলন থেকে সরে যাওয়ার পরে কেন তাদেরকে বাড়িঘর থেকে উঠিয়ে নেওয়া হচ্ছে? কেন সরকারের এই দ্বৈত নীতি? এখন তো অনেকেই বলতে চাচ্ছেন যে, ভাল কথা বলে, সমর্থনের নাম দিয়ে সরকার পয়লা ছাত্রদেরকে যে কোনো ছুতোনাতায় ঘরে ফেরাতে চেয়েছে। একবার যখন তারা ঘরে ফিরবে তখন ঐ আন্দোলনের নাড়ি ধরে মারা হবে টান। এখন সেটাই করা হয়েছে এবং কোটা আন্দোলন অনেকের মতে ক্রাশড হয়ে গেছে।
দুই
একই অবলম্বন করা হয়েছে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে ক্ষেত্রে এসম্পর্কে পত্রপত্রিকা এবং ইলেক্ট্রনিক মাধ্যমে এত বেশি আলোচনা হয়েছে যে, সেগুলির পুনরাবৃত্তি করা নিষ্প্রয়োজন। আমি ভেতরের খবর জানি না। জানা সম্ভবও নয়। তবে যে কয়দিন শিশু-কিশোরদের আন্দোলন চলেছে সেই কয়দিন টেলিভিশন নিউজ নিয়মিত দেখেছি, একাধিক পত্রপত্রিকা নিয়মিত পড়েছি এবং অনলাইন নিউজ পোর্টাল নিয়মিত দেখেছি। যতটুকু বুঝতে পেরেছি, তাতে আমার মনে হয়েছে যে, ছাত্রদের এই নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে রাজনীতির বিন্দুবিসর্গও ছিলো না। স্কুলের বা কলেজের ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্র রাজনীতির কিই বা বোঝে? আমাদের দেশে স্কুল লেভেলে বা কলেজ লেভেলে কিছু কিছু ছাত্র বিশেষ বিশেষ ছাত্র সংগঠনে যোগ দেয়। কিন্তু সেই সব ছাত্র সংগঠনের আদর্শে মুগ্ধ হয়ে কি তারা যোগ দেয়? তখন কি তাদের সেই আদর্শ বোঝার বয়স হয়? এসব বিষয় বোঝার আগে মস্তিষ্কের পরিপক্কতা অর্জনের প্রয়োজন। মস্তিষ্কের পরিপক্কতা অর্জিত হয় প্রচুর পড়াশোনা করে এবং একই সাথে বয়স বাড়ার সাথে সাথে। এসব বিষয় বিবেচনায় আমার স্থির বিশ্বাস যে, নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে কোনো রাজনৈতিক দলের কোনো সংশ্রব ছিলো না। এখন বিরোধী দল যদি কামনা করে, যে সেই আন্দোলন থেকে কিছু ফসল তাদের গোলায় উঠুক, তাহলে তারা সেটা কল্পনা করতেই পারে। কিন্তু ইচ্ছা করলে আর কল্পনা করলেই তো সব হয় না। ঐ যে ইংরেজিতে একটি কথা আছে, If wishes were horses কিন্তু সেটি তো আর হবার নয়। আর ছাত্র সংগঠনগুলোর আদর্শে উজ্জীবিত হওয়া? দেশের প্রধান দুটি ছাত্র সংগঠন হলো, আওয়ামীপন্থী ছাত্রলীগ আর বিএনপিপন্থী ছাত্রদল। এদের নিজেদেরই কি কোনো আদর্শ আছে যে সেই আদর্শ তারা কোমলমতি শিশু-কিশোরদের মাথায় ঢুকিয়ে দেবে? এই উভয় সংগঠনই তো নিবেদিত রয়েছে তাদের প্যারেন্ট অর্গানাইজেশন অর্থাৎ আওয়ামী লীগ ও বিএনপির তাঁবেদার হয়ে তাদের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে। সুতরাং তারা আর কোমলমতি ছাত্রদের মস্তিষ্কে নীতি-আদর্শ, মূল্যবোধ কিভাবে এবং কখন ঢুকাবে?
অথচ, তাজ্জবের ব্যাপার হলো এই যে, এসব কোমলমতি ছাত্র এবং যেসব ছাত্র বিএ বা এম এ পড়ে তাদেরও কাউকে কাউকে জেলে নেওয়া হয়েছে। এদেরও এখন পর্যন্ত কোন জামিন হয়নি। কয়েক জায়গায় দেখা গেছে, এসব বাচ্চা-কাচ্চার মায়েরা এবং বোনেরা রাজপথে তাদের কচি-কিশোর সন্তানদেরকে দেখে সন্তানের প্রতি মায়া মমতাবশত নিজেদের আবেগকে আর দমন করতে পারেন নি। তাই অনেক মাকে আন্দোলনকারীদেরকে রুটি, বিস্কুট, স্যান্ডুইচ ইত্যাদি বিলাতে দেখা গেছে। অনেক পিতাকে দেখা গেছে আন্দোলনে আবেগের বশবর্তী হয়ে মিনারেল ওয়াটার অর্থাৎ বোতলের বিশুদ্ধ পানি ঐ শিশু-কিশোরদের খাওয়াচ্ছেন। এগুলো করে তারা কি অপরাধ করেছেন? কোটা আন্দোলনের মতই এই আন্দোলনেও আওয়ামী লীগ সরকার একই পলিসি অনুসরণ করে। প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগের সর্বস্তরের নেতাকর্মী বলতে থাকেন যে, সরকার তাদের দাবি দাওয়াকে যুক্তিযুক্ত মনে করে এবং সেগুলোকে সরকার মেনে নিয়েছে। এখন সরকার সে গুলো বাস্তবায়নের জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছে।
এসব আশ্বাস পাওয়ার পর ছাত্ররা এবং শিশু-কিশোররা ঘরে ফিরে যায়। আন্দোলন থেমে যায়। কিন্তু দিন শেষে দেখা যায় যে, যে লাউ সেই কদু। আবার সেই ট্রাফিক পরিচালনায় বিশৃঙ্খলা, লাইসেন্সবিহীন এবং ফিটনেসছাড়া গাড়ির অবাধ দৌরাত্মৎ। ট্রাফিক পুলিশের তৎপরতা নাই। সব কিছু মিলিয়ে যেটা ঘটলো সেটিকে ইংরেজি ভাষায় বলা হয়, Back to square one অর্থাৎ যেখান থেকে শুরু সেখানেই শেষ। মাঝখান থেকে মানুষের প্রত্যাশা গিয়েছিলো বেড়ে।
তিন
আমি এখানে আমার একান্তই ব্যক্তিগত অভিমত জানাচ্ছি। প্রায় ১০ দিন হলো শিশু-কিশোরদের আন্দোলনের অবসান হয়েছে। আন্দোলনের ফলাফল কি? ফলাফল হলো একটি বিগ জিরো। বাংলায় বলে, যথা পূর্বং তথা পরং। কোটি কোটি মানুষের হৃদয় নিঙড়ানো সমর্থনপুষ্ট এমন একটি সার্বজনীন আন্দোলন সম্পূর্ণ বৃথা গেল। ষাটের দশকে আওয়ামী লীগ যখন মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে তখন তারা বলতো, কোনো আন্দোলনই বৃথা যায় না। কোনো রক্তই বৃথা যায় না। আমি গভীর বেদনার সাথে জানাচ্ছি যে, মা-বোন এবং বাপ-চাচার সমর্থনপুষ্ট এসব মাসুম বাচ্চার আন্দোলন ব্যর্থ হলো। আন্দোলন তো শেষ হয়ে গেল। ঘরের ছেলেরা ঘরে ফিরে গেলো। কিন্তু তারপর কি ঘটলো? দেখা গেলো ঢাকা থেকে শুরু করে মফস্বল পর্যন্ত ব্যাপক ধরপাকড়। কোমলমতি ছাত্র বলে যাদের প্রতি মায়া দেখানো হয়েছে সেটি যে ছিলো কুম্ভিরাশ্রু, সেটি পরবর্তী ঘটনাবলীতে ভালোভাবে প্রমাণিত হয়েছে।
শিশু-কিশোররা গ্রেফতার হয়েছে, সেই সাথে তাদের মায়েরাও। এই রকম ঘটনা অতীতে কোনো দিন শোনা যায়নি। আমরা বিস্তারিত ঘটনায় যাচ্ছি না। কিন্তু এই আন্দোলনকে যে ভাবে দমন করা হলো, যে প্রবল শক্তি প্রয়োগ করা হলো, যে হেলমেট বাহিনীকে মাঠে নামানো হলো তাদের কি হচ্ছে? মালকোছা মেরে চাপাতি হাতে নিয়ে যারা বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্রদেরকে পেটালো এবং দাবড়ালো তাদের কি হলো? যারা বেদম মার খেয়েছে তারাই জেলে যাচ্ছে। যারা বেদম পেটালো তারা বুক ফুলিয়ে হাটছে। যারা মার খেলো, তারা জুলুমের শিকার হলো। এখানো যারা মুক্তি পায়নি তাদেরকে জেলের ভেতরে রেখে আমরা বাইরে ঈদের আনন্দ করছি। এটা আমাদের কেমনতর ঈদ?
journalist15@gmail.com



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ