Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৫ আশ্বিন ১৪২৫, ৯ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

সাফা মারওয়ার ‘সাঈ’ সাইয়্যেদা হাজেরা আ. এর সুন্নাত

এ. কে. এম. ফজলুর রহমান মুন্শী | প্রকাশের সময় : ২১ আগস্ট, ২০১৮, ১২:০২ এএম

আল্লাহ তায়ালার মকবুল বান্দাহদের থেকে প্রতিপন্ন এমনসব কর্মকান্ড যা তারা এবাদতের নিয়তে আদায় করে থাকেন, যেগুলো সরাসরি নির্ধারিত এবাদত নয়। কিন্তু পরম দয়াময় আল্লাহর দরবারে এগুলো এতই পছন্দনীয় ও মুস্তাহাব হয়ে থাকে যে, সেগুলোকে সম্মানিত এবাদতের অংশ বানিয়ে দেয়া হয়। এর উদাহরণ হযরত হাজেরা আ. এর সাইয়্যেদেনা ইসমাঈল আ. এর জন্য পানির তালাশে সাফা ও মারওয়া দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে পাগলের মতো দৌড়ানো। আল্লাহপাকের নিকট এই প্রিয় সেবিকার এই কাজ এতই পছন্দনীয় হলো যে, তিনি একে মানাসেকে হজের অংশ বানিয়ে দিলেন, ব্যবহারিক ভাষায় একে ‘সাঈ’ বলে এবং তা হজ ও ওমরার ওয়াজিবসমূহের অন্তর্ভূক্ত। একথা সুস্পষ্টভাবে জানা থাকা দরকার যে, সাঈ এর সাত চক্করের মধ্যে নির্দিষ্ট কোনো জিকির, দোয়া কালাম, ওয়াজিফা অথবা কোরআনের আয়াত তিলাওয়াত করা হয় না। তবে আপনি যদি ইচ্ছা করেন তবে কোরআনুল কারীমের বিভিন্ন সূরা তেলাওয়াত করতে পারেন, বিভিন্ন দোয়া, তাসবিহাত ও মোনাজাত করতে পারেন। দরুদ শরীফ বারবার পাঠ করতে পারেন। আর যদি স্মরণে কিছুই না আসে, তাহলে শুধু আল্লাহর নাম জিকির করতে পারেন। অথবা যে কোনো উত্তম কালেমা আপনার মনে আসে পাঠ করতে পারেন। এসবই জায়েজ। যদি কোনো কিছু মনে না আসে তবে চুপচাপ সাঈ এর সাত চক্কর সাফা এবং মারওয়ার মধ্যে পূর্ণ করুন। সাফা এবং মারওয়ার সাঈ সংক্রান্ত ঐতিহাসিক পটভ‚মিকাকে তুলে ধরে ইমাম বুখারী (১৯৪-২৫৬ হি.) এবং অন্যান্য হাদীস শাস্ত্রের ইমামগণ এবং তাফসীর শাস্ত্রের ইমামগণ বহুসংখ্যক হাদীস ও রেওয়ায়েতে বর্ণনা করেছেন। তন্মধ্যে একটি রেওয়ায়েত হলো এই: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বর্ণনা করেন, হযরত ইব্রাহীম আ., হযরত হাজেরা আ. এবং দুগ্ধপোষ্য ছেলে হযরত ইসমাঈল আ. কে (শাম থেকে) মক্কায় নিয়ে আসলেন। তৎকালে মক্কায় মানুষ আবাদ ছিল না এবং পানির নাম নিশানাও ছিল না। সুতরাং তিনি এ দু’জনকে বাইতুল্লাহর কাছে ছেড়ে দিলেন এবং একটি পোটলায় কিছু খেজুর এবং মশকের মধ্যে কিছু পানিও তাদেরকে দিলেন।
তারপর হযরত ইব্রাহীম আ. শাম দেশে প্রত্যাবর্তন করতে লাগলেন। হযরত হাজেরা আ. তার পিছে পিছে অগ্রসর হয়ে উঁচু স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, হে ইব্রাহীম, আপনি কোথায় যাচ্ছেন? আপনি আমাদেরকে এমন এক উপত্যকায় রেখে যাচ্ছেন, যেখানে না কোনো মানুষ আছে, না অন্য প্রাণী। তিনি কয়েকবার এই প্রশ্ন করতে লাগলেন। কিন্তু হযরত ইব্রাহীম আ. তার দিকে ফিরেও তাকালেন না। তারপর হযরত হাজেরা আ. তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তবে কি আপনাকে আল্লাহপাক এমন হুকুম দিয়েছেন? হযরত ইব্রাহীম আ. বললেন, হ্যাঁ। একথা শুনে হাজেরা আ. বললেন, এমন কথাই যদি হয়ে থাকে তাহলে আমরা এটাকে বিনষ্ট হতে দেব না। তারপর তিনি পূর্বস্থানে ফিরে আসলেন। তারপর হযরত ইব্রাহীম আ.ও সামনের দিকে অগ্রসর হতে লাগলেন। এক সময় দৃষ্টি সীমার বাইরে চলে গেলেন। তারপর যখন ‘ছানিয়া’ নামক স্থানে পৌঁছলেন, তখন দুই হাত উত্তলন করে আল্লাহর দরবারে এই ভাষায় দোয়া করলেন, হে আমার পরওয়ারদিগার। নিশ্চয় আমি আমার সন্তান (ইসমাঈল) কে (মক্কার) দানাপানিহীন উপত্যকায় তোমার মর্যাদাবান গৃহের নিকট আবাদ করেছি, হে আমার পরওয়ারদিগার, যেন সে নামায কায়েম রাখে। সুতরাং তুমি মানুষের অন্তরকে এমন করে দাও, যেন তারা আগ্রহ ও ভালোবাসার সাথে তাদের দিকে অনুরক্ত থাকে এবং তাদেরকে (সকল প্রকার) ফলের রিজিক দান কর, যেন তারা শোকর আদায় করতে থাকে। -সূরা ইব্রাহীম: আয়াত ৩৭।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. আরও বর্ণনা করেছেন: হযরত ইসমাঈল আ. এর মাতা হাজেরা আ. ইসমাঈল আ. কে দুগ্ধপান করাতে লাগলেন এবং সেই পানি হতে পান করতে লাগলেন। এক সময় তার মশকের পানি শেষ হয়ে গেল। যার ফলে তিনি এবং তার ছেলে পিপাসার্ত হয়ে পড়লেন। তিনি দেখতে পেলেন যে, তার দু’বছরের বয়স্ক ছেলে পিপাসা কাতর হয়ে উভয় পা মাটিতে মারছেন। এই দৃশ্য সহ্য করতে না পেরে তিনি পানির তালাশে বের হলেন। সেই স্থানের কাছেই ছিল ‘সাফা’ পাহাড়, ইহাতে আরোহণ করে করে উপত্যকার এদিকে-সেদিকে তাকাতে লাগলেন। যদি কিছু নজরে আসে। কিন্তু তিনি কাউকে দেখতে পেলেন না। সুতরাং সাফা হতে অবতরণ করে উপত্যাকায় চলে আসলেন এবং পরিধেয় বসন আঁটসাঁট করে বিপদগ্রস্ত মানুষের মতো দ্রুত দৌড়ে তিনি তা পার হলেন এবং ‘মারওয়া’ পাহাড়ে আরোহণ করে এদিকে-সেদিকে কোথাও মানুষকে তালাশ করতে লাগলেন। কিন্তু তিনি কাউকে দেখতে পেলেন না। এভাবে তিনি (সাফা এবং মারওয়ার মধ্যবর্তী স্থানে) সাতবার চক্কর দিলেন। বর্ণনাকারী আরও বলেন, হুজুর আকরাম সা. ইরশাদ করেছেন, এ কারণেই মানুষ সাফা এবং মারওয়ার মধ্যে (হযরত হাজেরা আ. এর সুন্নাতের ওপর আমল করতে গিয়ে) সাঈ করেন। [বুখারী: আস সহীহ, কিতাবুল আম্বিয়া, বাবু কাউলিল্লাহি ওয়াত্তা খাজাল্লাহু ইব্রাহীমা খলীলা, খন্ড ২, পৃ. ১২২৮-১২২৯, বর্ণনা সংখ্যা ৩১৮৪; নাসাই: আস সুনানুল কুবরা: খন্ড ৫, পৃ. ১০০, বর্ণনা সংখ্যা ৮৩৭৯; ইবনে কাছির: তাফসীরুল কোরআনিল আজীম, খন্ড ১, পৃ. ১৭৭।
এই ঘটনার প্রায় ৫ হাজার বছর অতিবাহিত হয়েছে। এখন সেই উপত্যকা নেই, এমন কি সেই পাহাড়ি অবস্থাও নেই। এমনকি আল্লাহর প্রিয় সেই সেবিকা হাজেরা আ. এর ওপর যে অবস্থার অবতারণা ঘটেছিল, তাও অবশিষ্ট নেই। তারপরও হাজী সাহেবান আল্লাহর নির্দেশ পালনস্বরূপ সাঈ করেন। যখন হাজী সাহেবান ও ওমরাকারীগণ সাফা এবং মারওয়ার সেই অংশে উপস্থিত হন, তখন তারাও দৌড়ে সেই স্থান অতিক্রম করেন। হযরত হাজেরা আ. স্বীয় কলিজার টুকরা হযরত ইসমাঈল আ. এর জন্য পানির তালাশে এক পাহাড় হতে অন্য পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে নিচু এই উপত্যকাকে পাড়ি দেওয়ার জন্য দৌড়ে ছিলেন। আল্লাহপাকের নিকট প্রিয় সেবিকা হাজেরা আ. এর এই আমল খুবই পছন্দীয় হলো। আর আজও আমরা সেই পেরেশানী ও হৃদকম্পনের খেয়ালে ও চিন্তায় ধারণ করে আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ পালনার্থে সাঈ করি।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ