Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৮, ২৯ কার্তিক ১৪২৫, ০৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী

অসম্ভাব্য অভিযোগ

মহিউদ্দিন খান মোহন | প্রকাশের সময় : ২৬ আগস্ট, ২০১৮, ১২:০২ এএম

বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া রাজনীতিতে আসেন ১৯৮৩ সালে। মূলত. দলটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আকস্মিকভাবে শাহাদাৎ বরণের পর দলের ঐক্য ধরে রাখতেই বেগম জিয়াকে রাজনীতির খাতায় নাম লেখাতে হয়। বিএনপিরই শীর্ষ নেতাদের একটি অংশ তাকে রাজনীতিতে আসার জন্য অনুরোধ করেন, উদ্বুদ্ধ করেন। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের সঙ্গে এ নিবন্ধ লেখকের এ বিষয়ে কথা হয়েছে। তারা বলেছেন, প্রথমদিকে বেগম জিয়া রাজনীতিতে আসতে আগ্রহী ছিলেন না। তখন নেত্রীবৃন্দ তাকে এই বলে রাজী করান যে, তার স্বামীর সৃষ্টি বিএনপিকে টিকিয়ে রাখার জন্য হলেও তার রাজনীতিতে আসা দরকার। শেষ পর্যন্ত তিনি রাজনীতিতে আসেন এবং বিএনপির চেয়ারপার্সন হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
বেগম জিয়ার সাধারণ গৃহবধু থেকে রাজনীতিক হয়ে ওঠার পথ কুসুমাস্তীর্ণ বা মসৃন ছিলনা। অনেক ঘাত-প্রতিঘাত এবং চড়াই -উৎরাই পার হয়ে তাকে আজকের অবস্থানে আসতে হয়েছে। রাজনীতিতে এসেই তাকে স্বৈারাচারবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে হয় এবং সফল নেতৃত্বের মাধ্যমে দেশবাসীর মনে জায়গা করে নিতে সক্ষম হন তিনি। নীতির প্রশ্নে তার আপোসহীনতা তাকে নিয়ে যায় ভিন্নতর এক উচ্চতায়। তিনি অভিষিক্ত হন আপোসহীন নেত্রীর অভিধায়। জনগণের হৃদয় তিনি কতটা জয় করতে পারেন, তার প্রমাণ মেলে স্বৈরাচারের পতনের পর দেশে অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় নির্বাচনে। পক্ষপাতহীন, অবাধ ও সুষ্ঠু সে নির্বাচনে বেগম জিয়ার নেতৃত্বে তার দল বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করে। তিনি হন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী।
দীর্ঘ পঁয়ত্রিশ বছরের রাজনৈতিক পথচলায় বেগম খালেদা জিয়ার অনেক ত্রুটি-বিচ্যুতি বা ভুল-ভ্রান্তি হয়তো আছে। তার অনেক সিদ্ধান্তের সঙ্গে তারই কোনো কোনো সহকর্মী ভিন্নমত পোষণও করেছেন। তার অনেক কথা বা কাজের সমালোচনাও আছে। এটাই স্বাভাবিক। একজন মানুষের সব কাজ, সব কথা সঠিক বা নির্ভুল হবে এমন কোনো কথা নেই। তাছাড়া তিনি যেহেতু রক্ত-মাংসেরই মানুষ, ভুল হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। রাজনীতি করতে গিয়ে দলের প্রয়োজনে নানা কৌশলও তাকে নিতে হয়েছে, যার সঙ্গে কারো কারো মতের মিল হয়তো হয়নি। তবে, এটা এক রকম জোরের সঙ্গেই বলা যায় যে, বেগম জিয়া তার রাজনৈতিক ক্যারিয়রের এই তিন যুগে ষড়যন্ত্র-চক্রান্তের পথে হাঁটেন নি। কিছুটা একগুয়ে স্বভাবের খালেদা জিয়া চলছেন সোজাপথে, বলেছেনও সোজাসাপ্টা কথা। একথা তার চরম দুশমনও বলতে পারবে না যে, রাজনৈতিক বৈরিতার কারণে তিনি কাউকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করে কথা বলেছেন, কারো চরিত্র হননের চেষ্টা করেছেন বা কারো বিরুদ্ধে অশালীন ভাষায় বক্তব্য দিয়েছেন। এটা মিতভাষী বেগম জিয়ার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। যারা তাকে কাছ থেকে দেখেছেন বা দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করেছেন তারা বিষয়টি ভালোভাবেই জানেন। তবে, দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাকসংযমী খালেদা জিয়াকে অসত্য, ভিত্তিহীন এবং অশালীন আক্রমনের শিকার বহুবার হতে হয়েছে।
১৯৮৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে আসার আগে সংসার ছাড়া বেগম খালেদা জিয়ার অন্য কোনো বিষয়ে সংশ্লিষ্টতা ছিল-এমন কোনো প্রমাণ নেই। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান জীবিত থাকাবস্থায় তার নামটিও অনেকে জানতেন না। সে সময় প্রেসিডেন্ট জিয়ার স্ত্রী ‘বেগম জিয়া’ হিসেবেই মানুষ তাকে চিনত। তার নাম কেউ জানতও না। প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কোনো অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকেলে বা বিদেশ সফরে গেলে (তাও অত্যন্ত স্বল্প সংখ্যক) সংবাদ মাধ্যমে তাকে ‘রাষ্ট্রপতির স্ত্রী’ অথবা ‘বেগম জিয়া’ সাথে ছিলেন বা উপস্থিত ছিলেন বলে উল্লেখ করা হতো। এর পেছনে প্রেসিডেন্ট জিয়ার কোনো নির্দেশনা ছিল কীনা তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। অনেকে মনে করেন, পরিবারের সদস্যদের রাষ্ট্র বা সরকারের কর্মকান্ড ও আনুষ্ঠানিকতা থেকে দূরে রাখার যে নীতি প্রেসিডেন্ট জিয়া গ্রহণ করেছিলেন, এটাও হয়তো তার একটি দিক।
পাঠক হয়তো একটু অবাকই হচ্ছেন হঠাৎ করে বেগম খালেদা জিয়ার এ প্রশস্তি গাওয়া দেখে। উপরের কথাগুলো বলা হলো এজন্য যে, স্বামী জিয়াউর রহমান দেশের রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় দেশের ‘ফার্স্ট লেডি’ হওয়া সত্তে¡ও বেগম খালেদা জিয়া রাষ্ট্রীয় কোনো কাজকর্মে নিজেকে সম্পৃক্ত করেননি বা করার সুযোগ পাননি। বলা যায়, সে ক্ষেত্রে তার কোনো ভূমিকাই ছিল না। অবশ্য পরবর্তীতে আমরা দেখেছি এবং বুঝেছি ‘ফার্স্ট লেডি’ কাকে বলে এবং তার দাপট কতটা প্রবল হয়।
যা হোক আসল প্রসঙ্গে ফিরে যাই। যে বেগম জিয়া স্বামী রাষ্ট্রপতি হওয়ার পরেও রাষ্ট্রের কোনো কাজকর্মে সম্পৃক্ত ছিলেন না, তার বিরুদ্ধে যদি অভিযোগ আনা হয়, তারও আগে, যখন তার স্বামী দেশের সোবাহিনীর উপ-প্রধান, সে সময় সংঘটিত একটি ঘটনার পেছনের ষড়যন্ত্রের সঙ্গে তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন, তাহলে কি তা বিশ্বাসযোগ্য হবে? তেমনি একটি অভিযোগ বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে অতিসম্প্রতি উত্থাপিত হয়েছে। বলা হয়েছে, বঙ্গবন্ধু হত্যার ষড়যন্ত্রের সাথে শুধু জিয়া নন, তার স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াও জড়িত। গত ১৬ আগষ্ট বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট নিহতদের স্মরণে আওয়ামী লীগ আয়োজিত স্মরণসভায় বক্তৃতা করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘এমন কোনো মাস নেই, জিয়া সস্ত্রীক আমাদের বাসায় আসতেন না। বঙ্গবন্ধুর হত্যার পেছনে এই ঘন ঘন আসার মধ্যেও ষড়যন্ত্র ছিল। তিনি বলেছেন,‘আর জাতির পিতার আত্মস্বীকৃত খুনিকে সংসদে পাঠিয়েছিলেন খালেদা জিয়া। এর অর্থ কী দাঁড়ায়? জিয়া একা নন, তার স্ত্রীও এ হত্যাকান্ডের ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।’
আমরা জানি, ১৯৭৫ সালের ওই সময়ে বেগম জিয়া সেনাবাহিনীর উপ-প্রধানের স্ত্রী হিসেবে ঘর-কন্যা নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন। সে অবস্থানে থেকে অমন একটি ভয়ঙ্কর কাজের সাথে তার যুক্ত হওয়া কী সম্ভব? অভিযোগের যুক্তি হিসেবে স্বামী জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বেগম জিয়ার বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে যাওয়া আসার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু একজন মানুষ কারো বাসায় যাতায়াত করলেই কী মনে করতে হবে যে, তিনি সেই ব্যক্তির হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িত? যুক্তি হিসেবে এটা কতটা গ্রহণযোগ্য তা অবশ্যই পর্যালোচনার দাবি রাখে। তা ছাড়া এও বলা হয়েছে, যেহেতু বেগম জিয়া বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিকে সংসদে পাঠিয়েছিলেন তাই তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত। যদি তাই হয়, তাহলে প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে কী হিসেবে আখ্যায়িত করা যাবে? এটা সবাই অবগত আছেন যে, ’৭৫-এর ১৫ আগষ্টের নিষ্ঠুর হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িতরা এরশাদের শাসনামলে রাজনৈতিক দল গঠন করেছিল। কর্নেল ফারুক গঠন করেছিলেন ফ্রিডম পার্টি, আর লে. কর্নেল শাহরিয়ার রশিদ খান গঠন করেছিলন প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক পার্টি-সংক্ষেপে প্রগশ। আর ১৯৮৬ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে যখন বিএনপি-আওয়ামী লীগ বর্জন করেছিল, তখন ফ্রিডম পার্টির চেয়ারম্যান কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমান (অব.) তার দলের প্রার্থী হিসেবে কুড়াল মার্কা নিয়ে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করে এরশাদের সাজানো সে নির্বাচনকে বৈধতার সীল দিয়েছিলেন। সে হিসেবে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে এরশাদের নাম বাদ দেয়া যায়না।
বঙ্গবন্ধুর হত্যার ষড়যন্ত্রে জিয়াউর রহমান সম্পৃক্ত ছিলেন-এমন কথাবার্তা আওয়ামী লীগের বিভিন্ন স্তরের নেতাদের মুখে প্রায়ই শোনা যায়। জনগণ সেসব কথা খুব একটা ধর্তব্যের মধে নেয় না। ওইসব কথাকে প্রচলিত রাজনৈতিক ব্লেম গেইম হিসেবেই ধরে নেয়। এ অভিযোগের প্রমাণ হিসেবে তারা রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমদ কর্তৃক সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল কে, এম শফিউল্লাহকে সরিয়ে জিয়াউর রহমানকে সেনাপ্রধান নিয়োগের উল্লেখ করে থাকেন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ঘটনায় সেনাপ্রধান কে এম শফিউল্লাহর ভ‚মিকা এখনও প্রশ্নবোধক হয়ে আছে। শোনা যায়, আক্রান্ত হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু বার বার শফিউল্লাহকে ফোন করেছিলেন ফোর্স পাঠানোর জন্য। কিন্তু শফিউল্লাহ কোনো পদক্ষেপ নেননি। বরং তিনি বঙ্গবন্ধুকে বাড়ির পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে যাবার পরামর্শ দিয়েছিলেন। যেখানে সেনাপ্রধান চুপ করেছিলেন, সেখানে উপ-প্রধান হিসেবে জিয়াউর রহমানের কিই-বা করার ছিল। আর খন্দকার মোশতাক যেহেতু সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন শফিউল্লাহকে সেনাপ্রধান রাখবেন না, সেহেতু তদস্থলে একজনকে তো নিয়োগ দিতেই হতো। আর সে সময় সেনাবাহিনীর উপ-প্রধান জিয়াউর রহমানই ছিলেন সিনিয়র। সে হিসেবে তিনি নিয়োগ পেয়েছিলেন। এ নিয়োগকে যদি বঙ্গবন্ধু হত্যার ষড়যন্ত্রে জিয়াউর রহমানের সম্পৃক্ত থাকার প্রমাণ ধরা হয়, তাহলে এ অভিযোগ থেকে অনেকেই রেহাই পাবেন না। সবাই জানেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরে যারা মোশতাক সরকারের মন্ত্রী হয়েছিলেন, তারা সবাই আওয়ামী লীগের নেতা ছিলেন। আর বিনাবেতনে মোশতাকের প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা হয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল এম এ জি ওসমানী। সেই জেনারেল ওসমানীকে আওয়ামী লীগ ১৯৭৮ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তারই নেতৃত্বাধীন গণতান্ত্রিক ঐক্য জোটের প্রার্থী করেছিল। খন্দকার মোশতাকের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত এবং তার কেবিনেটের প্রতিমন্ত্রী দেওয়ান ফরিদ গাজী এবং মন্ত্রী আবদুল মান্নান পরবর্তীতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেছেন এবং এমপিও হয়েছেন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরে যারা মোশতাক সরকারের মন্ত্রী হয়েছিলেন, সে সরকারের আনুক‚ল্য পেয়ে ধন্য হয়েছেন, নানা রকম সুবিধা নিয়েছেন এবং পরবর্তীতে আবার বঙ্গবন্ধু কন্যার সান্নিধ্য পেয়েছেন, সেসব উল্লেখ করতে গেলে একটি নিবন্ধ নয়, গ্রন্থ রচনা করা যাবে। সুতরাং সেদিকে না যাওয়াই ভালো। এখানে যেটুকু উল্লেখ করা হলো, তা শুধু এটুকু বোঝার জন্য যে, কেবল জিয়াউর রহমানই নন, মোশতাক সরকারের সুবিধাভোগী অরো অনেকেই আছেন, যারা আওয়ামী লীগ নেতাদের নজরে পড়েন না।
লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।



 

Show all comments
  • Nahid Hassan ২৬ আগস্ট, ২০১৮, ১:৩৬ এএম says : 0
    valo laglo lekha gula
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর