Inqilab Logo

ঢাকা বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২০, ১২ কার্তিক ১৪২৭, ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৪২ হিজরী

খুলনাঞ্চলে চিংড়ি শিল্পে ধস

প্রকাশের সময় : ২১ এপ্রিল, ২০১৬, ১২:০০ এএম | আপডেট : ১১:১৫ পিএম, ২০ এপ্রিল, ২০১৬

এ.টি.এম. রফিক ও আশরাফুল ইসলাম নূর, খুলনা থেকে : খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের (বাগদা) ঘেরগুলোতে ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। মৌসুমের শুরুতেই দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের তৃণমূল মৎস্য চাষীরা পড়েছেন দুর্ভাবনায়। গেল মৌসুমের মাঝামাঝি থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্যাকেজিংয়ের তিনটি শর্তের বেড়াজালে হিমায়িত মৎস্য রপ্তানী বন্ধ হয়ে যায়। ফলে ‘সাদা সোনা’ খ্যাত চিংড়ি রপ্তানী খাতে ব্যাপক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ব্যাহত হয়। জাতীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। নানামুখী প্রতিবন্ধকতা উত্তরণে করণীয় নির্ধারণে আগামী ২৩ এপ্রিল বেলা ১১টায় খুলনার অভিজাত একটি হোটেলে এনবিআর’র চেয়ারম্যান মোঃ নজিবুর রহমান আলোচনায় বসবেন খুলনা চেম্বার, বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস্ এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশন (বিএফএফইএ) ও হিমায়িত খাদ্য রপ্তানীকারক শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে।
উল্লেখ্য, সর্বশেষ গত ৯ এপ্রিল খুলনায় অনুষ্ঠিত বিএফএফইএ’র ৩১তম বার্ষিক সাধারণ সভায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট, খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট ও পটুয়াখালীসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আগত সদস্যরা সমস্যা সমাধানে প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেন। দেশের শতভাগ কৃষিভিত্তিক হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানীখাতের আওতাবহির্ভূত সমস্যার কারণে সৃষ্ট তারল্য সংকট মোকাবেলায় সরকারি সিদ্ধান্তগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি রপ্তানীকারকদের। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ ও বাণিজ্য মন্ত্রীর তিনটি ডিও দিলেও ৪০ শতাংশ বক একাউন্ট সুবিধা না দেয়ায় চিংড়ি শিল্প মারাত্মক ধসে পড়ে বলে অভিযোগ তাদের।
বিএফএফইএ’র সূত্রে জানা গেছে, আওতা বহির্ভূত কারণে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে আন্তর্জাতিক বাজারে হিমায়িত চিংড়ির মারাত্মক দরপতন, ডলারের বিপরীতে রুবল ও ইউরোর দরপতন এবং কমদামী ভেন্নামী চিংড়ির ব্যাপক বাজারজাতকরণের ফলে চিংড়ি রপ্তানীকারী প্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিকভাবে সংকটে পড়ে। এছাড়া চিংড়ি উৎপাদন বৃদ্ধি না পাওয়ায় প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানাগুলো নামেমাত্র উৎপাদন ক্ষমতা ব্যবহার করায় ব্যাংক ঋণের বোঝায় দায়গ্রস্ত হয়ে পড়ে। বর্তমানে অর্ধেক চিংড়ি রপ্তানীকারী প্রতিষ্ঠান নানাবিধ আওতা বহির্ভূত কারণে রুগ্ন হয়ে পড়েছে। চিংড়ি উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা না হলে অচিরেই শিল্পখাতে মারাত্মক বিপর্যয়ের সৃষ্টি হবে বলে আশঙ্কা হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানীকারকদের শীর্ষ সংগঠন বিএফএফইএ’র।
সংশিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, খুলনাঞ্চলের ৬০টি হিমায়িত চিংড়ি প্রক্রিয়াজাতকারী কারখানার মধ্যে ৪০টি প্রতিষ্ঠান রপ্তানীতে সচল ছিল। জাতীয় হিমায়িত চিংড়ির মধ্যে ৭০ শতাংশ খুলনাঞ্চল থেকেই রপ্তানী হয়। গত ২০১৪-১৫ অর্থ বছরে হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানী হয়েছিল ৫০৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। চলতি অর্থ বছরে এর লক্ষ্যমাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
এনবিআর’র আওতাধীন খুলনা শুল্ক বিভাগ হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানীতে ব্যবহৃত প্যাকেজিং সামগ্রী (কার্টন ও একসেসরিজ) সংগ্রহে স্থানীয় মুদ্রা (টাকার) পরিবর্তে বৈদেশিক মুদ্রায় (ডলারে) আইএলসি (ইনল্যান্ড লেটার অব ক্রেডিট) খোলা এবং ব্যাক টু ব্যাক এলসি’র শর্তারোপ করেছে। ফলে গত বছরের অক্টোবর মাসের শেষদিক থেকে খুলনাঞ্চল থেকে হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানী বন্ধ হয়। এতে অন্তত একশ’ কোটি টাকার অধিক চিংড়ি রপ্তানীর আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেন বিএফএফইএ’র সিনিয়র ভাইস-প্রেসিডেন্ট মোঃ গোলাম মোস্তফা।
তিনি জানান, খুলনা কাস্টমস কমিশনার পোশাক শিল্পের ‘ব্যাক টু ব্যাক এলসি’র শর্তগুলো হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানীর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা শর্ত দিয়েছে। অথচ হিমায়িত মৎস্য রপ্তানীর ক্ষেত্রে আমদানীতে কাঁচামাল না থাকায় এই শর্তটি প্রযোজ্য নয় বলে দাবি করেন তিনি। গত বছরের ১৫ নভেম্বর থেকে শুধু গলদা ক্রয় বন্ধ রাখা হয়। পরে হিমায়িত সকল প্রকার চিংড়ি রপ্তানী বন্ধ হয়। এতে জাতীয় অর্থনৈতিক বিরাট প্রভাব পড়ছে। সর্বশেষ গত ১০ ডিসেম্বরও এনবিআর’র শুল্ক ঃ রপ্তানী ও বন্ড বিভাগে রপ্তানীমুখী হিমায়িত মৎস্য রপ্তানীকারী প্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত কার্টুন ও একসেসরিজ সরবরাহের জটিলতা নিরসনের কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার আবেদন জানিয়েছিলাম। কিন্তু এখনো কোন সুরাহা করা হয়নি।
বিএফএফইএ’র ভাইস-প্রেসিডেন্ট সেখ মোঃ আব্দুল বাকি বলেন, আগামী ২৩ এপ্রিল শনিবার বেলা ১১টায় খুলনার সিটি ইন হোটেলে এনবিআর’র চেয়ারম্যান, খুলনার চেম্বার, বিএফএফইএসহ সংশিষ্টদের সাথে হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানী প্রক্রিয়ায় সৃষ্ট সমস্যা সমাধানে আলোচনা হবে।
এনবিআর’র সূত্রমতে, গত বছর এনবিআর’র এক আদেশে বন্ডেড ওয়্যার হাউজ লাইসেন্সধারী প্যাকেজিং শিল্প কারখানা থেকে বন্ড লাইসেন্সবিহীন রপ্তানীকারক প্রতিষ্ঠানে (হিমায়িত মৎস্য রপ্তানীকারকসহ) কার্টুন ও একসেসরিজ সরবরাহের ক্ষেত্রে তিনটি শর্তারোপ করে। শর্তগুলো হল-পণ্য সরবরাহ মাস্টার এলসি’র বিপরীতে ব্যাক টু ব্যাক এলসি’র মাধ্যমে করতে হবে, ইউপি জারির আগেই ব্যাক টু ব্যাক এলসি এবং মাস্টার এলসি’র সঠিকতা যাচাই করে নিতে হবে এবং সংশিষ্ট বন্ড প্রতিষ্ঠান পণ্য রপ্তানীর সমর্থনে পিআরসিসহ অন্যান্য রপ্তানি দলিলাদি পরবর্তীতে বন্ড লাইসেন্স নবায়নের সময় বন্ড কমিশনারেট/সংশিষ্ট শুল্ক ভবনে দাখিল করতে হবে।
সূত্রমতে, খুলনায় উৎপাদনশীল অন্তত ৭টি প্রিন্টিং ও প্যাকেজিং প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কাষ্টমসের শর্তের কারণে মাছ কোম্পানীগুলো কার্টুন কিনতে এলসি খুলতে না পেরে মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যায়।
তৃণমূল চিংড়ি চাষীদের সূত্রে জানা গেছে, খুলনার কয়রা উপজেলার চিংড়ি ঘেরগুলোতে ব্যাপকহারে বিক্রি উপযোগী চিংড়ি মরে যাচ্ছে। চিংড়ির মড়ক ঠেকাতে সবরকমের চেষ্টাই ব্যর্থ হচ্ছে বলে জানিয়েছেন চিংড়ি চাষিরা। মৌসুমের শুরুতে এমন বিপর্যয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কয়েক হাজার প্রান্তিক চিংড়ি চাষী। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের উপকূলবর্তী এলাকার চিংড়ি ঘেরগুলোতেও ভাইসের প্রাদুর্ভাব দেখা দিচ্ছে।
কয়রা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোঃ আলাউদ্দিন হোসেন জানান, হঠাৎ করে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় ঘেরের মাটি ও পানির উপর এর প্রভাব পড়ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে লবণাক্ততাও বেড়েছে। এতে চিংড়ির স্বাভাবিক পরিবেশে বিরূপ প্রভাব পড়ায় অধিকহারে চিংড়ি মারা যাচ্ছে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: খুলনাঞ্চলে চিংড়ি শিল্পে ধস
আরও পড়ুন