Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৮, ০১ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ০৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
শিরোনাম

শ্রমবাজারে অশনি সঙ্কেত

শামসুল ইসলাম | প্রকাশের সময় : ২৮ আগস্ট, ২০১৮, ১২:০১ এএম

জনশক্তি রফতানিতে অশনি সঙ্কেত দেখা দিচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের বৃহৎ শ্রমবাজার সউদী আরবে কর্মী নিয়োগের চাহিদা হ্র্রাস পাচ্ছে। মালয়েশিয়ায় জি টু জি প্লাসে দশ সিন্ডিকেট চক্রের কর্মী নিয়োগের চলমান প্রক্রিয়া (এসপিপিএ) সম্প্রতি স্থগিত ঘোষণা করেছে দেশটির নতুন সরকার।
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ড. মাহথির মোহাম্মদ দেশটিতে কর্মী নিয়োগে দশ সিন্ডিকেটের মনোপলি ব্যবসা ভেঙ্গে দিয়ে সকল সোর্স কান্ট্রির একক নিয়মে প্রত্যেক বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সিকে কর্মী প্রেরণের সুযোগ দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। আগামী শনিবার থেকে দশ সিন্ডিকেটের কর্মী প্রেরণ প্রক্রিয়া বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। তবে প্রক্রিয়াধীন প্রায় ২০ হাজার কলিং ভিসার কর্মীরা দেশটিতে যাওয়ার সুযোগ পাবে। একাধিক জনশক্তি রফতানিকারক এ তথ্য জানিয়েছেন।
গত বছরের ৮ মার্চ থেকে চলতি বছরের ১৯ আগষ্ট পর্যন্ত চিহ্নিত দশ সিন্ডিকেট বর্হিগমন ছাড়পত্র নিয়ে এসপিপিএ-এর মাধ্যমে চড়া অভিবাসন ব্যয়ের বিনিময়ে ২ লাখ ১ হাজার ৮৬৬ জন কর্মীকে মালয়েশিয়ায় পাঠিয়েছে। সম্ভাবনাময় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার চলমান না থাকলে জনশক্তি রফতানিতে বড় ধরনের আঘাত আসতে পারে। সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সির স্বত্বাধিকারীরা এ অভিমত ব্যক্ত করেছেন।
গত ফেব্রুয়ারি থেকে কুয়েতে পুরুষ-মহিলা গৃহকর্মী নিয়োগ বন্ধ রয়েছে। কুয়েতের কোম্পানিগুলোতে অল্প সংখ্যায় কর্মী যাচ্ছে। দীর্ঘদিন সংযুক্ত আরব আমিরাতের শ্রমবাজারও চালু হচ্ছে না। দেশটিতে হাতে গোনা কিছু কর্মী যাচ্ছে। বিএমইটির সূত্র জানায়, গত জানুয়ারি থেকে গত ২৬ আগষ্ট পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে ৪ লাখ ৮৯ হাজার ৯৪ জন কর্মী চাকরি লাভ করেছে। গত বছর বিভিন্ন দেশে ১০ লাখ ৮ হাজার ৫২৫ জন কর্মী চাকরি লাভ করেছিল।
গত বছরের জুলাই মাসে ৭৬ হাজার ২১৫ বিদেশে গিয়েছিল। আর গত জুলাই মাসে ৫৮ হাজার ৬২৭ জন কর্মী বিদেশে গিয়েছে। গত বছরের আগষ্ট মাসে ৯৩ হাজার ৩৪১ জন বিদেশে গিয়েছিল। আর চলতি আগষ্ট মাসে ৩৮ হাজার ৪৬৫ জন কর্মী বিদেশে গিয়েছে। গত বছর সউদী আরবে চাকরি লাভ করেছে ৫ লাখ ৫১ হাজার ৩০৮ জন নারী-পুরুষ। আর চলতি বছরের সাত মাসে সউদী আরবে চাকরি লাভ করেছে ১ লাখ ৫৯ হাজার ৫৭৭ জন নারী-পুরুষ। গত বছর সউদী আরবে ৮৩ হাজার ৩৫৪ জন নারী কর্মী চাকরি লাভ করেছিল। আর চলতি বছরের সাত মাসে সউদীতে ৪৫ হাজার ৫৩৯ জন নারী কর্মী চাকরি লাভ করেছে।
এদিকে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত হালনাগাদ তথ্যে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে বিভিন্ন দেশে অবস্থানকারী প্রবাসী কর্মীরা ১৩১ কোটি ৭০ লাখ ডলার পাঠিয়েছেন। গত অর্থবছরের জুলাই মাসে এসেছিল ১১৫ কোটি ৫৫ লাখ ডলার। ২০১৬-১৭ অর্থবছরের প্রথম মাসে এসেছিল ১০০ কোটি ৫৫ লাখ ডলার। গত অর্থবছরের শেষ মাস জুনে ১৩৮ কোটি ১৫ লাখ ডলার পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, স্থানীয় বাজারে ডলারের তেজিভাব এবং হুন্ডি ঠেকাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নানা পদক্ষেপের কারনে রেমিটেন্স বেড়েছে।
বিএমইটির মহাপরিচালক মো. সেলিম রেজা গতকাল ইনকিলাবকে বলেন, মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রফতানি বন্ধ হয়নি। শুধু দশ সিন্ডিকেটের কর্মী নিয়োগের চলমান প্রক্রিয়া (এসপিপিএ) বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। সোর্স কান্ট্রি হিসেবে বাংলাদেশ এখন থেকে দেশটিতে সকল বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সি কর্মী প্রেরণের সুযোগ পাবে।
তিনি আরও জানান, মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগে কোনো হতাশার কিছুই নেই। ভ্রাতৃ-প্রতীম মালয়েশিয়ার সাথে বাংলাদেশের অত্যান্ত ভালো সর্ম্পক রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যাপক কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ মালয়েশিয়ার সোর্স কান্ট্রি হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। মালয়েশিয়ায় কর্মরত লাখ লাখ বাংলাদেশী কর্মী কঠোর পরিশ্রম করে দেশটির অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। দেশটিতে বিপুল সংখ্যায় বাংলাদেশী কর্মীর চাহিদা রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বায়রার মালয়েশিয়া সংক্রান্ত স্ট্যান্ডিং কমিটি’র সাবেক সভাপতি ও ইর্স্টান বে-বাংলাদেশ-এর স্বত্বাধিকারী মো: গিয়াস উদ্দিন বাবুল গতকাল ইনকিলাবকে বলেন, বাংলাদেশ থেকে দশটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে জনশক্তি নেয়ার এসপিপিএ প্রক্রিয়া বন্ধ করার পর এখন নতুন একটি পদ্ধতি চালু করতে যাচ্ছে মালয়েশিয়া সরকার। যে নিয়ম বাংলাদেশসহ সব দেশের জন্যই প্রযোজ্য হবে এবং সব লাইসেন্সধারী এজেন্টই শ্রমিক প্রেরণের সুযোগ পাবে। তিনি বলেন, বর্তমানের প্রক্রিয়াধীন কলিং ভিসার অপেক্ষমান কর্মীরা মালয়েশিয়ায় যাওয়ার সুযোগ পাবেন। তার এজেন্সি’র ৫০ জন কলিং ভিসার কর্মী আগামী ৩ সেপ্টেম্বর এয়ার এশিয়া এয়ারলাইন্সের মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় যাবে। তিনি বলেন, আগামীকাল ও পরশু কলিং ভিসার শতাধিক কর্মীকে মালয়েশিয়ায় প্রেরণের জন্য টিকিট সংগ্রহের চেষ্টা চলছে।
মালয়েশিয়ার সেলাঙ্গুরস্থ জেএল হোম গ্যালারী এন্টারপ্রাইজ এসডিএন বিএইচডি’র ডিরেক্টর মোহাম্মদ আবু হানিফ ইনকিলাবকে বলেন, দশ সিন্ডিকেট চক্র দুই লক্ষাধিক কর্মী পাঠিয়ে প্রায় ৪ হাজার ২শ’ ১৮ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। তিনি বলেন, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ড. মাহথির মোহাম্মদ দশ সিন্ডিকেটের অনৈতিক কর্মকান্ড চিরতরে নস্যাৎ করতে এসপিপিএ সিষ্টেম বন্ধ করে দিয়েছেন। দেশটি’র প্রধানমন্ত্রী সকল সোর্স কান্ট্রির ন্যায় বাংলাদেশের প্রত্যেক রিক্রুটিং এজেন্সিকে কর্মী প্রেরণের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে বিদেশী কর্মী নিয়োগ সংক্রান্ত উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন কমিটি গঠন করছেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মালয়েশিয়ায় প্রচুর বাংলাদেশী কর্মীর চাহিদা রয়েছে। শিগগিরই মালয়েশিয়া সরকারের মন্ত্রী পর্যায়ের প্রতিনিধি দল কর্মী নিতে বাংলাদেশে সফরে আসবেন বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
মালয়েশিয়ায় অবৈধ অভিবাসী বাংলাদেশীরা চরম হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন। মালয়েশিয়া ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ অবৈধ অভিবাসী কর্মীদের আগামী ৩১ আগষ্টের মধ্যে দেশ ত্যাগের নির্দেশ দিয়েছে। অবৈধ বাংলাদেশীরা প্রতিদিন ইমিগ্রেশনে ধরর্ণা দিচ্ছে পাস নিয়ে দেশে ফিরতে। গতকাল মালয়েশিয়ার পুত্রাজায়া থেকে ভেস্ট-মার্কেটিং এসডিএন বিএইচডি’র ম্যানেজিং পার্টনার মো: রুহুল আমিন এতথ্য জানিয়েছেন। তিনি দেড় লক্ষাধিক অবৈধ বাংলাদেশীদের বৈধতা লাভের সময় বৃদ্ধির জন্য কার্যকরী উদ্যোগ নেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর আশু হস্তক্ষেপ কামান করেন।
বায়রার সাবেক যুগ্ম-মহাসচিব-১ আলহাজ আবুল বাশার বলেন, সউদী আরবে অর্থনীতিক মন্দার কারণে এবং অভিবাসী কর্মীদের ইকামা নবায়নের ফি-দ্বিগুণ বৃদ্ধি করায় কর্মী গমনের হার কমে গেছে। তিনি বলেন, সউদী আরবের অর্থনীতিবিদরা গত বছর ঘোষণা দিয়েছেন, দেশটিতে বেকারত্বের হার ১২.৮ শতাংশে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে দেশটিতে বিদেশি বেকারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৬ হাজারেরও বেশি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আগে সউদী যেতে একজন কর্মীর ৮/৯ লাখ টাকা ব্যয় হতো । বর্তমানে একজন কর্মী সউদী যেতে ব্যয় হয় মাত্র দুই লাখ টাকা। তিনি বলেন, দুইজন মহিলা কর্মীকে সউদী পাঠালে একজন পুরুষ কর্মী প্রেরণের কোটা পাওয়া যায়। এ ধরনের শর্তাবলির কারণেও সউদীতে কর্মী গমনের হার হ্রাস পাচ্ছে। তিনি সউদীর শ্রমবাজার ধরে রাখতে সরকারকে বাংলাদেশী কর্মীদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ের প্রতি নজর দিয়ে নতুন দ্বি-পাক্ষিক চুক্তি করার জোর দাবী জানান।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে পুরোপুরি জনশক্তি রফতানির সম্ভাবনাও চোখে পড়ছে না। গত ১ আগষ্ট থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকার দেশটিতে অবৈধ প্রবাসীদের বৈধ হওয়ার সুযোগ দিয়ে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছে। আগামী ৩১ আগষ্ট পর্যন্ত এই সাধারণ ক্ষমার মেয়াদ কার্যকর থাকবে। এই সময়ের মধ্যে আমিরাতে অবস্থানরত অবৈধ প্রবাসীরা অন্য কোম্পানিতে নতুন করে কাজ নিতে পারবেন। এক্ষেত্রে কোনো ধরনের জরিমানা ও কারাদন্ডের বিধান থাকবে না। এমনকি আউটপাস সংগ্রহের পর নিজ দেশেও যেতে পারবেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে নিযুক্ত বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেলের কার্যালয়ের এক বিবৃতিতে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
এছাড়া গত ১৮ এপ্রিল বাংলাদেশ থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১৯টি ক্যাটাগরির কর্মী নিয়োগের বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। বিগত কয়েক মাসের আলাপ আলোচনার চূড়ান্ত পর্যায়ে দুবাইস্থ সংযুক্ত আরব আমিরাতের মিনিস্ট্রি অব হিউম্যান রিসোর্সেস এন্ড এমিরেটাইজেশন-এর দপ্তরে দেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারকটি উভয় দেশের আগ্রহ ও সম্মতির ভিত্তিতে উহা স্বাক্ষরিত হয়। বাংলাদেশের পক্ষে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. নমিতা হালদার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মিনিস্ট্রি অব হিউম্যান রিসোর্সেস এন্ড এমিরেটাইজেশন-এর আন্ডার সেক্রেটারী সাইফ আহমেদ আল সুআইদি স্ব স্ব দেশের পক্ষে সমঝোতা স্মারকটি স্বাক্ষর করেন।
উল্লেখ্য, দীর্ঘ সাড়ে চার বছর যাবত সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশী পুরুষ কর্মী নিয়োগ বন্ধ রয়েছে। অতি সম্প্রতি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে নিযুক্ত মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি ইউরোপের কয়েকটি দেশে শ্রমবাজার সম্প্রসারণের লক্ষ্যে একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল নিয়ে সপ্তাহব্যাপী সফর করেন। কিন্ত উল্লেখিত দেশগুলোতে জনশক্তি রফতানি বৃদ্ধির তেমন কোনো আলামত পাওয়া যাচ্ছে না।



 

Show all comments
  • Mohammed Kowaj Ali khan ২৮ আগস্ট, ২০১৮, ১১:৪৪ এএম says : 0
    এত দিনে আমাদের সোনার বাংলাদেশ সোনায় পরিণত হইয়া যাইতো। যদি চাপাবাজ আর ধুকাবাজিরা ক্ষমতায় যাইতে না পারিতো। লজ্জা করে যে সোনার দেশের সম্মানিত নাগরীক বিদেশ যাইতেছেন গৃহকর্ম কাজ করিতে। একদিন আসিবে চাপাবাজ ধুকাবাজ ধংস হইবে আর দেশে আসিবে স্বাধীনতা। বাংলাদেশের মানূষ মাথা উঁচু করিয়া দাঁড়াইবেন। ইনশাআল্লাহ। *************
    Total Reply(0) Reply
  • তারেক মাহমুদ ২৮ আগস্ট, ২০১৮, ১০:০৮ এএম says : 0
    শ্রমবাজার সম্পর্কে সরকারকে আরো বেশি সচেতন হতে হবে।
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর