Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৮, ২৯ কার্তিক ১৪২৫, ০৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
শিরোনাম

ডাক্তারদের দায়িত্বহীনতা ও অনৈতিক বাণিজ্যের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে

| প্রকাশের সময় : ৩১ আগস্ট, ২০১৮, ১২:০৫ এএম

জনসেবার জন্য চিকিৎসক হওয়া আমাদের সমাজে এক মহান ব্রত বা লক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত। অথচ ডাক্তার হওয়ার পর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেই মহান ব্রত আর খুঁজে পাওয়া যায়না। দেশে সরকারী-বেসরকারী হাসপাতালে চিকিৎসা সেবায় যে অরাজকতা, বিশৃঙ্খলা ও অনৈতিক কর্মকান্ড দেখা যায় তার জন্য একশ্রেণীর ডাক্তার ও স্টাফরা দায়ী। বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত টিআইবি রিপোর্টেও দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতকে অন্যতম দুর্নীতিগ্রস্ত খাত হিসেবে দেখানো হয়েছে। হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবায় দীর্ঘদিন ধরে চলা দুর্নীতি, অনিয়ম, অস্বচ্ছতা ও লুটপাটের বিরুদ্ধে অনেক লেখালেখি হলেও সরকারের তরফ থেকে তেমন কোন প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। গত বুধবার রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেছেন, দেশের সরকারী স্বাস্থ্যসেবা খাতে ৩ হাজারের বেশী ডাক্তার তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন ছাড়াই নিয়মিত বেতন নিচ্ছেন। অনেক ডাক্তার মফস্বল এলাকায় পোষ্টিং পাওয়ার পরও সেখানে গিয়ে দায়িত্ব পালন করেননা। যোগদান করেও কেউ কেউ বেশীরভাগ কর্মদিবস অনুপস্থিত থাকেন। ইতিপূর্বে বিভিন্ন সময়ে প্রধানমন্ত্রীও তাদের লক্ষ্য করে কড়া কথাবার্তা বলেছেন। মফস্বলে দায়িত্ব পালন করতে না চাইলে তাদেরকে স্বেচ্ছায় চাকরি ছেড়ে দেয়ারও তাগিদ দিয়েছেন।
তিন হাজার ডাক্তার কোন কাজ না করেই বেতন নিচ্ছেন এমন তথ্যের পাশাপাশি স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরো জানিয়েছেন, এসব ডাক্তারের নামের তালিকা দেয়ার জন্য তিনি মন্ত্রনালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশও দিয়েছিলেন। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এ তালিকা করতে ব্যর্থ হয়েছেন বা অগ্রাহ্য করেছেন। সরকার স্বাস্থ্যখাতে বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করছে। এর বেশীরভাগই যাচ্ছে সরকারী হাসপাতালের মেশিনপত্র, ওষুধ ক্রয় এবং ডাক্তার ও স্টাফদের বেতনের পেছনে। কিন্তু দেশের মানুষ সেবাখাত থেকে বিনামূল্যে ন্যুনতম সেবাও পাচ্ছে না। সরকারী হাসপাতালের সিনিয়র ডাক্তারদের একটি বড় অংশ বেসরকারী হাসপাতাল ও ব্যক্তিগত চেম্বারেই বেশী সময় দেন। জনসেবার চাইতে টাকার পাহাড় গড়াই যেন তাদের লক্ষ্য। তবে সরকারের মন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রী শুধুমাত্র অভিযোগ ও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বসে থাকলে হবেনা। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় বেতন নিয়ে জনসেবা না করে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলে ব্যস্ত থাকা এক ধরনের ক্রাইম। এদের সম্পর্কে প্রয়োজনীয় বিহিত ব্যবস্থা করতে না পারলে তার দায় সরকার ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর উপরও বর্তায়। এমনকি মন্ত্রনালয়ের নির্দেশ অমান্য করে যে সব কর্মকর্তা এসব ডাক্তার ও স্টাফদের সম্পর্কে অনুসন্ধান ও তালিকা প্রণয়নে ব্যর্থ হয়েছে তাদেরকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, দুই বছর মফস্বল এলাকায় দায়িত্ব পালনের শর্তে তিনি ৬ হাজার ডাক্তার নিয়োগ দিয়েছিলেন। এসব ডাক্তারের অনেকেই দুই বছরের মেয়াদের আগে বিভিন্ন সময়ে অন্যত্র বদলি হয়ে গেছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, শর্ত পুরণ না করে এসব ডাক্তার বদলির অনুমোদন দিল কে? জনগনের স্বাস্থ্যসেবা যে কোন দেশে সরকারের অগ্রাধিকারভিত্তিক খাত। এ খাতে সেবার মানোন্নয়ন, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু অন্যান্য খাতের মত স্বাস্থ্যসেবা খাতও এখন সরকারের দলীয় লেজুড়বৃত্তির আখড়ায় পরিনত হয়েছে। হাসাপাতালের পরিচালক, ডাক্তারদের পদায়ণ এবং স্টাফ নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার চেয়ে সরকারের দলীয় পরিচয়ই মূখ্য হয়ে ওঠে। কিছু বিচ্ছিন্ন ব্যতিক্রম বাদ দিলে, এসব ডাক্তার ও স্টাফকে জনগনের স্বাস্থ্যসেবার চেয়ে দলীয় রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নেইে বেশী তৎপর দেখা যায়। এরা ঢাকায় বা বিভাগীয় শহরে বদলি হয়ে ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক স্বার্থ ও রাজনৈতিক কর্মকান্ডে জড়িত থাকতেই বেশী স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন। সিনিয়র ডাক্তাররা যখন সরকারী মূল দায়িত্বে অবহেলা করছেন তখন সরকারী হাসপাতালের চিকিৎসা সেবার বেশীরভাগ কর্মকান্ড পরিচালিত হচ্ছে শিক্ষানবিস ও অবৈতনিক স্টাফদের দিয়ে। হাসপাতালের স্টাফ, নার্স ও আয়াদের রোগীদের জিম্মি করে অনৈতিকভাবে টাকা আদায়ে ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়। সরকারী হাসপাতালের ডায়াগনোস্টিক মেশিন অকেজো রেখে তারা রোগীদের বেসরকারী ডায়াগনোস্টিক সেন্টারে পাঠিয়ে কমিশন বাণিজ্যে লিপ্ত থাকছেন। সরকারী ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম চোরাবাজারে বিক্রি করে দিয়ে রোগীদের সব খরচ বহনে বাধ্য করছে। এমনকি সরকারী-বেসরকারী হাসপাতালের ডাক্তারদের ভুল চিকিৎসার শিকার হয়ে রোগীর মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে অহরহ। মোদ্দা কথা হচ্ছে, দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাত ও হাসপাতালগুলো মন্ত্রনালয়ের একশ্রেনীর মতলববাজ কর্মকর্তা, ডাক্তার ও তাদের দালালদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে। অনতিবিলম্বে এদের চিহ্নিত করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। স্বাস্থ্যসেবায় স্বচ্ছতা ফিরিয়ে এনে জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে দুর্নীতিপরায়ণ ডাক্তার ও স্টাফদের বিদায় করে নতুন নিয়োগ দিতে হবে। প্রয়োজনে বিদেশ থেকে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার এনে চাহিদা পুরণের কথাও বিবেচনা করা যেতে পারে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর