Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৮, ০১ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ০৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
শিরোনাম

ওয়ান-ইলেভেনের মতো সরকারের পুনরাবৃত্তি কি ভালো হবে?

কামরুল হাসান দর্পণ | প্রকাশের সময় : ৩১ আগস্ট, ২০১৮, ১২:০৪ এএম

ঈদের আমেজ ধীরে ধীরে কেটে যাচ্ছে। শুরু হচ্ছে রাজনীতির উত্তাপ। রাজনীতির জন্য এ মাসটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। ঈদের দিন থেকেই রাজনীতিতে কথার উত্তাপ শুরু হয়েছে। মূল বিষয় ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জাতীয় নির্বাচন। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনীতিকদের মধ্যে বাকযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। বিশেষ করে দেশের বড় দুই দল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে। বিএনপির শীর্ষ নেতৃবৃন্দ একই সুরে আগামী নির্বাচন নির্দলীয় সরকারের অধীনে হতে হবে বলে দৃঢ়ভাবে বক্তব্য দিচ্ছে। তা নাহলে নির্বাচন প্রতিহত করা হবে। এর জবাবে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, বিএনপি যদি ৫ জানুয়ারির মতো নির্বাচন প্রতিহত বা বানচাল করার চেষ্টা করে, তবে দাঁতভাঙ্গা জবাব দেয়া হবে। বোঝা যাচ্ছে, এ মাসের দিন যত গড়াবে উভয় দলের মধ্যে কথারযুদ্ধও বাড়বে। তবে বিএনপি কি কেবলই কথারযুদ্ধে সীমাবদ্ধ থাকবে? তার দাবী আদায়ে মাঠে কি আন্দোলন করবে না? এটা একটা মিলিয়ন ডলার কোশ্চেন। কারণ ক্ষমতাসীন দল বহু আগে থেকেই দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে মাঠে বিএনপির আন্দোলন করার কোনো সক্ষমতা নেই। ওবায়দুল কাদের তো বলেই দিয়েছেন, বিগত দশ বছরে যে দলটি মাঠে আন্দোলন করতে পারেনি, এ নির্বাচনেও আন্দোলন করতে পারবে না। তার এ কথার নেপথ্যের বিষয়টি বোধ করি, একজন সাধারণ মানুষও জানেন। বিএনপি কেন বিগত দশ বছরে মাঠের আন্দোলনে সফল হতে পারেনি তার কারণ হচ্ছে, সরকার বিএনপির প্রতি এতটাই কঠোর যে দলটি মাঠে নামলেই তার সাজানো এবং অনুগত প্রশাসনের মাধ্যমে তা কঠোরভাবে দমন করেছে এবং করে চলেছে। দলটি যে তার গণতান্ত্রিক অধিকার একটি জনসভা করবে বিশেষ করে রাজধানীতে, এ অনুমতিই সরকার দেয় না। বছরে একবার-দুবার শর্তের বেড়াজালে আটকে অনুমতি দিয়ে গণতন্ত্রের নমুনা দেখায়। বলা যায়, বিরোধী দল বিএনপি, যে দলটি সরকারের বড় প্রতিপক্ষ এবং হুমকি, তাকে সরকার এক চুলও ছাড় দিতে নারাজ। এ পরিস্থিতিতে নির্বাচনের মাত্র মাস চারেক বাকি। এ সময়ে দলটি কী করবে, তা প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। তবে এটুকু বলা যায়, দলটি চেষ্টা করবে মাঠে নামার জন্য। আর সরকারও আরো কঠোর হয়ে তা দমন করার চেষ্টা করবে। এতে দেশের রাজনীতি যে উত্তপ্ত হয়ে উঠবে, তাতে সন্দেহ নেই। ইতোমধ্যে বাতাসে নানা গুজব ও গুঞ্জণ শোনা যাচ্ছে। অনেকের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, নির্বাচন হবে কিনা? ইতোমধ্যে ওবায়দুল কাদের বলেছেন, বিএনপি নাকি দেশে ওয়ান-ইলেভেনের মতো সরকার প্রতিষ্ঠা করার ষড়যন্ত্র করছে। এ নিয়ে দেশে-বিদেশে কোথায় কোথায় গোপন মিটিং তারা করছে, এ খবর তার কাছে আছে। এ ব্যাপারে তার দল সতর্ক রয়েছে বলেও ঘোষণা দিয়েছেন। এর জবাবে বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগই বিগত ওয়ান-ইলেভেন সরকারের বড় সমর্থক ছিল। তারা বলেছিল, এ সরকার তাদের আন্দোলনের ফসল। ফলে তারাই ওয়ান-ইলেভেনের মতো সরকারের গন্ধ পাচ্ছে। তবে একটা কথা ঠিক, যেসব গুজব-গুঞ্জন বিভিন্ন মহলে এমনকি সাধারণ ও সচেতন মানুষের মধ্যে রয়েছে, তার মর্মার্থ হচ্ছে, নির্বাচন কি হবে? নাকি ওয়ান-ইলেভেনের মতো কোনো সরকার আসবে? এখন রাখাল বালকের কথার মতো যদি বাঘ আসছে, বাঘ আসছে বলার মতো ওবায়দুল কাদেরের কথা সত্যি হয়ে যায়, তবে কি অবাক হওয়ার কিছু থাকবে? কারণ ওয়ান-ইলেভেন সরকারের কথা কেন হঠাৎ করে তিনি বলতে যাবেন? নিশ্চয়ই এর কোনো কারণ বা ভিত্তি তিনি জানেন।
দুই.
বাংলাদেশে রাজনৈতিক দ্ব›দ্ব ও সংঘাতের প্রেক্ষিতে সুযোগসন্ধানীদের দৃশ্যপটে আগমন নতুন ঘটনা নয়। যখনই রাজনৈতিক সমঝোতার অনুপস্থিতি ঘটেছে, তখনই রাজনীতির উপর দোষ চাপিয়ে তারা ক্ষমতা দখল করেছে। এরশাদের ক্ষমতা দখল এবং ওয়ান-ইলেভেনের সরকার ক্ষমতায় আসে মূলত রাজনৈতিক দলগুলোর অনৈক্য, সংঘাত ও মতবিরোধের সুযোগে। এ ধরনের সরকার ক্ষমতা দখল করেই রাজনৈতিক দলের কর্মকান্ডকে দোষারোপ করে। রাজনীতিকে পরিশুদ্ধ করার জন্য বিভিন্ন দলের নেতাদের গ্রেফতার দমন-পীড়ন ও মামলাসহ নানা প্রক্রিয়া অবলম্বন করে। ওয়ান-ইলেভেনের সময় মাইনাস টু ফর্মুলার মাধ্যমে দেশের প্রধান দুই নেত্রীকেই বাদ দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। বিকল্প হিসেবে দুই দলের কিছু শীর্ষ নেতাকে দিয়ে সৃষ্টি করা হয় সংস্কারপন্থী গ্রুপ এবং দল। সে সময় যদি তাদের ফর্মুলা কার্যকর হয়ে যেত, তবে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস এখন ভিন্নরূপ পরিগ্রহ করত। বলার অপেক্ষা রাখে না, রাজনীতিতে অপ্রত্যাশিত ঘটনার সৃষ্টি হয় তখনই যখন জনসমর্থনহীন সরকার ক্ষমতায় থাকে। এ ধরনের সরকারের ক্ষমতায় টিকে থাকার মূল মিশন হয়ে উঠে বিরোধীপক্ষকে দমন-পীড়ন করা। এই দমন প্রক্রিয়ায়ও সে নিশ্চিন্ত থাকতে পারে না। তার ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে এমন দলকে বিনাশ করার প্রক্রিয়া অবলম্বন করে। এর কারণ হচ্ছে, সে নিজেও জানে, ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত না হওয়ায় জনগণের সমর্থন রয়েছে এমন শক্তি তার জন্য বড় হুমকি। ফলে আপত দৃষ্টিতে ক্ষমতাবান মনে হলেও নৈতিক বল না থাকায় ভেতরে ভেতরে সে ভয়ে থাকে। স্বাভাবিকভাবে চেয়ারে বসতে পারে না। ভয় তাড়ানোর জন্য গলা চড়িয়ে কথা বলে। অনেকটা অন্ধকারে পথ চলা পথিকের যেমন ভয় তাড়ানোর জন্য জোরে কাশি দেয় কিংবা গান ধরে। তার পথ চলা হয় আতঙ্কের মধ্য দিয়ে। পায়ে দড়ি প্যাঁচালেও মনে করে সাপ প্যাঁচিয়ে ধরেছে। পর্যবেক্ষকদের অনেকে মনে করেন, বর্তমান সরকারের মধ্যে যে এ ধরনের ভয় কাজ করছে না, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। তা নাহলে ওয়ান-ইলেভেন সরকারের প্রসঙ্গ আসবে কেন? অন্যদিকে জনগণের ভোটে নির্বাচিত ব্যক্তি বা দলের কাছে ক্ষমতাটা দিনের আলোর মতোই। অন্ধকারের ভয় তাকে পেয়ে বসে না, ঝেড়ে কাশতে হয় না, অহেতুক গানও গাইতে হয় না। নৈতিক শক্তি বলে সে অন্ধকার দূর করে। বর্তমান সরকারের মধ্যে একটা ভয় দেখা গিয়েছিল, ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে। সে সময় সরকার বেশ বিচলিত অবস্থায় দেখা গেছে। এর কারণ হতে পারে, সরকারের মধ্যে এ বোধ জেগেছিল, সে জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়নি। তার নৈতিক ভিত্তি দুর্বল। যদি এমন হতো বিনাভোটে ১৫৩টি আসনে নির্বাচিত না হয়ে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হতো, তবে এ নিয়ে তার উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার কিছু থাকত না। কে ক্ষমতায় যেতে চায় বা ষড়যন্ত্র করছে, এ নিয়ে অনুমাননির্ভর ও অসার কথাবার্তার প্রয়োজন পড়ত না। এখন নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, তার ভেতর এক ধরনের নার্ভাসনেস কাজ করছে। এ নার্ভাসনেসের দুটি দিক হচ্ছে, এক. সুষ্ঠু নির্বাচন হলে হেরে যাওয়ার ভয়। দুই. নার্ভাসনেস কাটাতে সরকার বিরোধী আন্দোলনের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর হয়ে উঠা। তবে সরকারের আচরণ দেখে মনে হচ্ছে, সে খুবই শক্ত অবস্থান গ্রহণ করেছে। যে কোনো উপায়ে বিরোধী রাজনীতিকে দমন করে যেনতেনভাবে সিটি করপোরেশনের নির্বাচনগুলোর মতো আপাত দৃষ্টিতে শান্তিপূর্ণ ও সুনশান নীরবতার মধ্য দিয়ে নির্বাচনী বৈতরণী পার হয়ে যাওয়া। কারণ সরকার নিশ্চিত, সে যেভাবে প্রশাসন সাজিয়েছে তাতে তার কথার বাইরে তারা যাবে না এবং তারাই তাকে টিকিয়ে রাখবে। মুখে মুখে জনগণের কথা বললেও নেপথ্যে পুরোপুরি প্রশাসন নির্ভর হয়ে উঠেছে। এখানে জনগণের কথার বিষয়টি আই ওয়াশ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। তার দরকার ক্ষমতায় টিকে থাকা। আর টিকে যেতে পারলে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মতো আরও পাঁচ বছর নির্বিঘ্নে কাটিয়ে দেয়া যাবে। ক্ষমতাসীন নেতাদের কথাবার্তায় এমন নিশ্চিন্ত ভাব ইতোমধ্যে প্রকাশ পেতে শুরু করেছে। তারা খুবই আত্মবিশ্বাসী যে, আগামী নির্বাচনে তারা বিজয়ী হবেন। এক্ষেত্রে ওয়ান-ইলেভেন সরকারের কথা বলে রাজনীতিতে এক ধরনের ক্লাইমেক্স সৃষ্টি করা হচ্ছে।
তিন.
বিএনপির অনেক নেতা প্রায় নিত্যদিনই বলছেন, আগামী নির্বাচন ৫ জানুয়ারির মতো হতে দেয়া হবে না। তারা কেন এবং কিসের ভিত্তিতে বলছেন, তার কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই। একটি সরল হিসাব হতে পারে, বিএনপি ও তার জোট ৫ জানুয়ারীর মতো নির্বাচন প্রতিরোধে আন্দোলন-সংগ্রাম গড়ে তুলবে। এটা কিভাবে সম্ভব, তা এখনও পরিস্কার নয়। যদি সম্ভব না হয়, তবে বিএনপি কি করবে? ইতোমধ্যে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে বলে দেয়া হয়েছে, বিএনপির সাথে কোনো ধরনের সংলাপ বা সমঝোতা হবে না। আগামী অক্টোবরের প্রথম দিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ছোট পরিসরে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন হতে পারে। সেখানে সংসদে প্রতিনিধিত্বকারীদের নিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার গঠিত হবে। এ সরকারে বিএনপির থাকার সুযোগ নেই। গত সপ্তাহে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, বিএনপির সামনে দুটি পথ খোলা। এক. সংবিধান অনুযায়ী বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা। দুই. নির্বাচন থেকে সরে যাওয়া। আপাত দৃষ্টিতে এরপর আর কথা থাকে না। এর মধ্য দিয়ে এটাই প্রতীয়মাণ হচ্ছে, ক্ষমতাসীন দল বিএনপিকে বিন্দুমাত্র ছাড় দিতে নারাজ। প্রয়োজনে বিএনপিকে বাদ দিয়ে ৫ জানুয়ারির মতো আরেকটি নির্বাচন করবে। এখানেও প্রশ্ন আসে, সরকারের পক্ষে কি বিএনপিকে বাদ দিয়ে আরেকটি নির্বাচন করা সম্ভব? বিএনপি যদি আবারও একতরফা নির্বাচন ঠেকাতে মরিয়া হয়ে আন্দোলন শুরু করে, তবে সরকার টলুক না টলুক তার ধাক্কা কি দেশের পক্ষে সামলানো সহজ হবে? সরকার যতই বলুক, দেশ উন্নয়নের জোয়ারে ভাসছে। তবে দেশের মানুষ জানে, ৫ জানুয়ারির আগে-পরে সৃষ্ট আন্দোলনে সরকার টিকে গেলেও দেশের অর্থনীতি ও জানমালের যে ক্ষতি হয়েছে, তার রেশ আজও রয়ে গেছে। শুধু আন্দোলনের রেশ নয়, নির্বাচনটি বিশ্বের প্রভাবশালী দেশ ও সংস্থাগুলোর কাছে গ্রহণযোগ্য না হওয়ায় তাদের সহযোগিতা কমেছে। অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব কাটিয়ে ওঠা কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, একটি খারাপ নির্বাচনের নজির স্থাপিত হয়েছে। ক্ষমতাসীন দল কি এমন আরেকটি খারাপ নজির সৃষ্টি করতে চাইবে? যদি না চায়, তবে যতই অপছন্দ হোক এবং ইচ্ছার বিরুদ্ধে হলেও বিএনপির সাথে একটি সমঝোতায় আসা উচিত। কারণ সরকার বহু চেষ্টা করেও দলটিকে নিঃশেষ করতে পারেনি। অন্যদিকে ভোটের হিসাবেও দলটি ক্ষমতাসীন দলের প্রায় সমান সমান। এ বাস্তবতা অস্বীকার কারার উপায় নেই। কাজেই শত চেষ্টা করেও যাকে নিশ্চিহ্ন করা যায়নি এবং যার অবস্থান এখনও শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে, তাকে বাদ দিয়ে আরেকটি নির্বাচন করা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। সাধারণভাবে একটা কথা আছে, যদি তোমার শত্রু কে শেষ বা নিশ্চিহ্ন করতে না পারো, তবে তাকে কনভিন্স করে সাথে নিয়েই পথ চলো। বিএনপিকে যেহেতু শেষ করা যায়নি, তাই তাকে কনভিন্স করাই হবে বিচক্ষণতার পরিচয়। তা না করে যদি ৫ জানুয়ারিরর মতো আরেকটি নির্বাচনের দিকে যাওয়া হয়, তবে তা দেশ ও জাতির জন্য ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। তাছাড়া বিগত প্রায় ৫ বছরে বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটও পরিবর্তিত হয়েছে। সরকারের একমাত্র সমর্থক যে ভারত, তার অবস্থানও আগের মতো আছে, এমনটি মনে করার কারণ নেই। সেও চাচ্ছে, একটি অংশগ্রহণমূলক সুষ্ঠু নির্বাচন হোক। তার আচরণে মনে হচ্ছে, ৫ জানুয়ারির মতো সরাসরি হস্তক্ষেপ করে আরেকটি নির্বাচন করিয়ে দেয়ার মতো অপরিপক্ক কাজ দ্বিতীয়বার সে করতে যাবে না। গত বছরের অক্টোবরে বাংলাদেশ সফর করে যাওয়া ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির সাধারণ সম্পাদক রাম মাধব আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের সাথে এক বৈঠকে বলেছিলেন, বিজেপি প্রত্যাশা করে বাংলাদেশে আগামী নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক হবে। এর আগে ভারতের অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলিও বাংলাদেশ সফর করে অনুরূপ কথা বলেছিলেন। তাদের এ বক্তব্য থেকে প্রতীয়মাণ হয়, আগামী নির্বাচন নিয়ে দেশটির দৃষ্টিভঙ্গি ৫ জানুয়ারীর নির্বাচনের মতো নয়। এ প্রেক্ষিতে, দেশের রাজনীতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা পূর্বানুমান করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এই আনপ্রেডিক্টেবল পরিস্থিতিতে নানা ধরণের গুঞ্জণ ও গুজব ডালপালা ছড়াচ্ছে। সবচেয়ে বড় গুঞ্জনটি হচ্ছে, নির্বাচন না হওয়া নিয়ে।
চার.
আপাত দৃষ্টিতে দেশের সার্বিক রাজনীতি অত্যন্ত শান্ত ও স্থিতিশীল মনে হলেও, এ চিত্র যে নির্বাচন পর্যন্ত থাকবে, তা মনে করার কারণ নেই। এ পরিস্থিতি অনেকটা ঝড় আসার পূর্বে থমথমে পরিস্থিতির মতো। বাইরে থেকে বোঝা না গেলেও ভেতরে ভেতরে যে অনেক কিছু ঘটে যাচ্ছে, তা আঁচ করা যায়। নানা ইস্যুতে ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে যে এক ধরনের অস্বস্তি ও অস্থিরতা রয়েছে, তা বিভিন্ন ঘটনায় বিপাকে পড়া থেকে বোঝা যায়। এদিক থেকে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির মাঠ পর্যায়ে কোনো ধরনের কর্মসূচি না থাকলেও দলটি সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে। প্রেস কনফারেন্স করে বক্তব্য-বিবৃতির ঝড় তোলা ছাড়া তার আর তেমন কাজ নেই। তার এই বক্তব্য-বিবৃতিও ক্ষমতাসীন দলের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছে। এর পাল্টা জবাব দিতে হচ্ছে। এ থেকে বুঝতে অসুবিধা হয় না, বিএনপিকে যতই উপেক্ষা ও পাত্তা না দেয়া হোক না কেন, তার কথা ফেলে দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। কারণ একটাই, তার ব্যাপক জনসমর্থন রয়েছে। তার বক্তব্য দেশের মানুষের কাছে পৌঁছে। আবার বিএনপি আন্দোলনে ব্যর্থ, এ দল দিয়ে কিছু হবে না-এতসব অপবাদ সত্তে¡ও দলটি নীরবে গুছিয়ে উঠছে। বিএনপির এই ইতিবাচক পরিস্থিতি অনেকটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে গড়ে উঠছে। এক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলের সমস্যাও বিএনপির অনুকূলে যাচ্ছে। বিএনপিকে দিয়ে কিছু হবে না, হতাশ হওয়া সাধারণ মানুষের এ মনোভাবের বিপরীতে দলটির অবস্থান ধীরে ধীরে সুসংহত হওয়ার প্রচ্ছন্ন একটা দৃশ্য স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ভেতরে ভেতরে দলটি নিজেকে আন্দোলনের জন্য তৈরি করছে। এর বিপরীতে ক্ষমতাসীন দল দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে রাজনীতি করছে। ক্ষমতার বাইরে তার রাজনৈতিক শক্তি কতটা অটুট রয়েছে, তা বলা মুশকিল। নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে তার প্রকৃত শক্তি ও সক্ষমতা বোঝা যাবে। পর্যবেক্ষকদের অনেকে বলছেন, ক্ষমতা থেকে চলে গেলে দলটির রাজনৈতিক শক্তির দুর্বলতা প্রকাশ পাবে। এখন ক্ষমতায় থাকায় তা টের পাওয়া যাচ্ছে না। ক্ষমতায় মোহগ্রস্ত হয়েই প্রতিপক্ষের কাউকে আমলে নিচ্ছে না। তুচ্ছজ্ঞান করে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিচ্ছে। রাজনৈতিক বৈরিতা বৃদ্ধি করে চলেছে। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে এ বৈরিতা ও সংঘাত যে বৃদ্ধি পাবে, তাতে সন্দেহ নেই। এর প্রেক্ষাপটে যদি অনাকাক্সিক্ষত কোনো ঘটনা ঘটে যায়, তবে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
darpan.journalist@gmail.com



 

Show all comments
  • লাইজু ৩১ আগস্ট, ২০১৮, ৪:৫৮ এএম says : 0
    যেহেতু সমঝোতা হচ্ছে না, ওটাই হওয়া দরকার
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর