Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৫ আশ্বিন ১৪২৫, ৯ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

নিরেট বিদ্রোহী বর্ণমালা

মু সা ফি র ন জ রু ল | প্রকাশের সময় : ৩১ আগস্ট, ২০১৮, ১২:০৩ এএম

কবি কাজী নজরুল ইসলামের (১৮৯৯-১৯৭৬) আবির্ভাবকালে বাংলাদেশ তথা ভারতীয় উপমহাদেশ ছিল পরাধীন, অনগ্রসর। সেই পশ্চাৎপদ পরিবেশে এক স্বাধীন চেতনা, স্বাধীন ব্যক্তিত্ব, স্বাধীন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তিনি এসেছিলেন ধুমকেতুর মত। এই স্বাধীন চেতনা ও স্বতন্ত্র চিন্তন শক্তিকে সম্বল করে ব্যক্তিত্ববোধের প্রবল বিশ্বাসে কবি ঘোষণা করেছিলেন রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মনৈতিক বিদ্রোহ। ব্রিটিশ শাসনের অত্যাচার ও অবিচার কবিকে বিক্ষুব্ধ করে তুলেছিল। তাই রাজনৈতিক পরিবর্তনের মানসে তিনি সা¤্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠেন। 

বস্তুত, সামাজিক মানুষের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের অসামঞ্জস্যবোধের পিছনে ক্রিয়াশীল অগণতান্ত্রিক চেতনা, অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সূত্র ধরে শোষক শ্রেণির দ্বারা সাধারণ মানুষের প্রতি যে শোষণ অত্যাচার-সেই অমানবিক নিষ্পেষণের বিরুদ্ধেও কবির বিদ্রোহ। প্রকৃতপক্ষে, উচ্চবিত্ত শ্রেণির নির্মোঘ ভোগবিলাস ও অনাচার; হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে ভ্রাতৃঘাতী সংগ্রাম, অবিশ্বাস তাকে গভীরভাবে মর্মাহত করেছিল। তাই শুধু রাজশক্তির শোষণ রূপ ও অবিচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ নয়, তাঁর বিদ্রোহ ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধেও।
সমাজ সচেতন নজরুল সাহিত্যে সর্বাত্মক বিদ্রোহের অগ্নিমন্ত্র জ্বালিয়ে গেছেন সব ধরনের নিপীড়ন, শোষণ, অন্যায়-অবিচার আর মানুষের বন্ধনহীন ক্ষুদ্রতার প্রতি। আসলে বিদ্রোহের প্রকৃতি নির্ভরশীল সামগ্রিক পরিস্থিতি ও সাহিত্যিকদের সমাজ মানসের সম্পর্কের উপর। সমকালীন জীবনের সামগ্রিক অস্থিতিশীল পরিবেশ মানুষের সার্বিক মুক্তির জন্য। মানুষের জীবনের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, সাধারণ মানুষের প্রতি মমত্ববোধই এ বিদ্রোহের মূল উৎস।
কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর এই সর্বমুখী বিদ্রোহী চেতনাকে সাহিত্য রূপায়ণে আশ্রয় নিয়েছেন পুরাণ ঐতিহ্য, সমকালিন ইতিহাসের অতীতকে স্মরণ করেছেন বর্তমান পুনঃনির্মাণের হাতিয়ার রূপে। অতীত ঐতিহ্য পুরাণকে নতুন রূপ দিয়ে বর্তমানের সঙ্গে তার সেতুবন্ধন ঘটিয়েছেন, অনাগত দিনের স্বপ্ন সম্ভাবনায় তাকে ঐশ্বর্যশালী করে তুলেছেন, এর মাধ্যমে তিনি শুধু চেয়েছেন-‘মানুষ জেগে উঠুক ভেঙে পড়–ক সমস্ত শৃঙ্খল।’
কাজী নজরুল ইসলামের সর্বাপেক্ষা উত্তম ও সর্বাধিক প্রচারিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘অগ্নিবীণা’ (১৯২২)। গ্রন্থটি ‘ভাঙা বাংলার রাঙা যুগের আদি পুরোহিত ও স্বাগ্নিক বীর’ শ্রী বারীন্দ্র কুমার ঘোষকে উৎসর্গীকৃত। এই গ্রন্থেরই শুধু নয়, নজরুলের সকল কবিতার মধ্যে ‘বিদ্রোহী’ অন্যতম উল্লেখযোগ্য কবিতা। এ কবিতায় কবির বিদ্রোহী চেতনার স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ লক্ষণীয়। কবির ব্যক্তিত্বের, ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যের, আত্মবিশ্বাসের, আত্মপ্রত্যয়ের, আত্মশক্তির উদ্বোধন ও প্রকাশ ঘটেছে এ কবিতায়। আত্মবিশ্বাসের প্রবল বিশ্বাসে বিশ্বাসী কবি কোন মহত্তর সত্ত¡ার কাছে আত্ম-সমর্পণে অনিচ্ছুক; পৃথিবীর সমস্ত অন্যায়, অত্যাচার, উৎপীড়ন দূরীকরণে সংকল্পবদ্ধ। আত্মচেতনা ও নিজের সৃষ্টিশীল প্রতিভার আবিষ্কারে আনন্দে উদ্ভাসিত কবি একদিকে নিজেকে তুলনা করেছেন হিন্দু-মুসলিম, পাশ্চাত্য পুরাণ ঐতিহ্যের শক্তিমান অজেয় বিষয় চরিত্রের সঙ্গে অন্যদিকে বিজ্ঞানের ধ্বংসাত্মক উপকরণের সঙ্গে :
“আমি ই¯্রাফিলের শিঙ্গার মহাহুংকার
আমি পিনাক পানির ডমরু ত্রিশুল ধর্মরাজের দÐ
আমি চক্র ও মহাশঙ্খ আমি প্রণব নাদ প্রচÐ।”
(বিদ্রোহী)
সাধারণভাবে নজরুলের মন যেমন চির বিদ্রোহী তেমনি প্রেমের ক্ষেত্রেও একান্তভাবে আবেগপ্রবণ প্রেমিক। তাঁর এই দ্বৈত সত্ত¡ার পরিচয় এ কবিতায়। অর্থাৎ ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় বিদ্রোহ ও প্রেম এই দুই সত্তা নিরবচ্ছিন্নভাবে সন্নিহিত হয়েছে :
“আমি ইন্দ্রানী সূত হাতে চাঁদ ভালে সূর্য্য
মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর হাতে রণতুর্য।”
(বিদ্রোহী)
এ প্রেম বিদ্রোহের অন্তর্লীন আর একটি সুর। বিদ্রোহের উচ্ছ¡াস ও প্রেমের উদ্বেলতা একই সজ্ঞাত। রোমান্টিক আত্মোপলব্ধির প্রেরণাই যার নিয়ামক সূত্র :
“আমি বিদ্রোহী রণক্লান্ত
সেইদিন হব শান্ত।”
(বিদ্রোহী)
অর্থাৎ কবির বিদ্রোহ চিরন্তন। কোন কালের সীমায় সীমাবদ্ধ নয়। যতদিন অন্যায়, অত্যাচার, নিপীড়ন থাকবে ততদিন এ বিদ্রোহ ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি, জন্ম থেকে জন্মান্তরে এ বিদ্রোহের প্রবাহমান থাকবে।

কবির বিদ্রোহের মূল স্বভাবগত। অকৃত্রিম মানব প্রেম এবং সে প্রেমের প্রকাশ তার অন্তরের নির্দেশনানুসারে। শুধু স্বদেশই নয়, বিশ্বের মানবগোষ্ঠির সঙ্গে তিনি একাত্মতা অনুভব করেন বলেই তাঁর রোমান্টিক কবিচিত্ত মানুষের লাঞ্ছনা, নির্যাতন, শোষণ প্রভৃতি উচ্ছেদ করতে বিদ্রোহীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। নজরুলের বিদ্রোহের উৎস তাঁর সুগভীর ও প্রত্যয়োজ্জ্বল মানব প্রেম। তাই মানুষের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, ধর্মনৈতিক সকল ক্ষেত্রেই বৈষম্য ও অসঙ্গতি তাকে প্রবলভাবে নাড়া দিয়েছে।
আপনার বিষজ্বালা ও অস্থিরতা কবির বিদ্রোহকে করেছে তীব্রতর ধুমকেতুর প্রথমোচ্চারিত বাক্য- “আমি যুগে যুগে আসি, আসিয়াছি পুনঃ মহাবিপ্লব হেতু’তে। এই জন্য যে, কবির বিদ্রোহ ও দুষ্টের দমন শেষে পৃথিবীতে নতুন সমাজ ব্যবস্থার প্রবর্তন : এক শোষণহীন ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। পুরাণের চিন্তাধারার সঙ্গে আজকের যুগের চিন্তাধারার ব্যবধান অনেক। কিন্তু যে সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণে সেদিন বৈপ্লবিক কর্মশক্তি দিয়ে ঈশ্বর প্রেরিত মহামানবের আবির্ভাব হয়েছিল-সেই একই কারণে ‘ধুমকেতু’ কবিতায় তাঁর বিদ্রোহী সত্ত¡ার আবির্ভাব :
“আমি জানি ঐ ¯্রষ্টার ফাঁকি, সৃষ্টির ঐ চাতুরি
তাই বিধি ও নিয়মে লাথি মেরে ঠুকি বিধাতার বুকে হাতুড়ি।”
(ধুমকেত)
কবি সৃষ্টিকর্তার উপর, নিয়তির উপর নির্ভর করছেন না, তিনি আত্মশক্তির উপর, পৌরুষের উপর নির্ভর করছেন। মানুষের কর্মশক্তিকে মানুষের আত্মস্বরূপকে তাঁর প্রত্যয়কে স্বীকৃতি দিয়েছেন। এতে তাঁর নাস্তিকসূচক উচ্চারণ শক্তিমান ও অনমনীয়ত্ব হৃদয়েরই বহিঃপ্রকাশ। নজরুলই বাংলা সাহিত্যের একমাত্র নীলকণ্ঠ শিল্পী যিনি সমস্ত জীবন ধরে শুধু সংগ্রামের মাধ্যমে দেশ-মাতৃকার পায়ে নিজের হৃদয়কে বেঁধে আপনাকে ভুলে এ বাংলা, বাঙালির জন্য নিজেকে উৎসর্গ করে অমর হয়ে আছেন। বলা চলে সে যুগে অমন খোলাখুলিভাবে স্পষ্ট অথচ দৃঢ় ভাষায় পূর্ণ স্বরাজের দাবি করা যে কোন বাঙালির জন্য ছিল দুঃসাহসিক। নজরুল এক সন্ধিলগ্নে ধুমকেতুর ঝাÐা নিয়ে নিয়ে আবির্ভূত হন বাংলা সাহিত্য গগনে। তাঁর এ অনুপ্রেরণা সমগ্র বাঙালি জাতিকে চরমভাবে উদ্বুদ্ধ করেছিল। এ কারণে তিনি তাঁর বারবার ব্রিটিশ সরকারের রোষাণলে পড়েছিলেন।
নজরুলের প্রবল অহমিকার তীব্রতর প্রকাশ ঘটেছে ‘বিদ্রোহী’ ও ধুমকেতু কবিতা দু’টিতে। ‘কামাল পাশা’, ‘আনোয়ার পাশা’, ‘রণভেরী’, ‘সোহরাব’, ‘খেয়াপারের তরণী’ ‘শাত্ ইল-আরব’, ‘কোরবানী’, ‘মোহরম’ প্রভৃতি কবিতায় মুসলমান সমাজ জীবনের বর্তমান দৈন্য, ভীরুতা, ব্যর্থতার প্রতি মুসলমানদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তাদের শঙ্কাহরণ অভয়মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হতে বলেছেন। তিনি তাদের ডাক দিয়েছেন দেশের মুক্তিরণে অংশগ্রহণ করতে :
“ঐ নতুনের কেতন ওড়ে কাল বৈশাখীর ঝড়
তোরা সব জয়ধ্বনি কর
তোরা সব জয়ধ্বনি কর।”
(প্রলয়োল্লাস)

আরবের সমকালীন দুরবস্থার কথা জেনে তিনি সে দেশের গৌরবময় অতীত ইতিহাসের ধ্যান করেছেন। এই সঙ্গে তাঁর শোর্যবীর্যকে স্মরণ করে শ্রদ্ধায় মাথা নত করেছেন। বস্তুত, স্বাধীকার আকাঙ্খার সঙ্গে ঐতিহ্য প্রীতি নজরুলের বিদ্রোহী কবি মানসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
নজরুল সমকালীন ইতিহাসের আশ্রয় নিয়েছেন তাঁর বিদ্রোহের প্রেরণা হিসেবে। প্যান ইসলাম ভাবাপন্ন আনোয়ার পাশা ও সাধারণতন্ত্রে বিশ্বাসী কামাল পাশার মধ্যে আদর্শের বিরোধ থাকলেও কবি এই দুই বীরের উদাহরণ টেনে তাদের শোর্যবীর্যের কথা স্মরণ করেছেন। কামালের মুক্তিসংগ্রামের বিজয়োল্লাসে তাই কবি আনন্দ ও উত্তেজনায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন :
“ঐ ক্ষেপেছে পাগলী মায়ের দামাল ছেলে কামাল ভাই,
অসুরপুরে শোর উঠেছে জোরসে সামাল সামাল ভাই।
কামাল ! তুনে কামাল কিয়া ভাই,
হো হো কামাল! তুনে কামাল কিয়া ভাই।”
(কামাল পাশা)
দেশের মুক্তিযুদ্ধের নিমিত্ত আত্মবলিদানকে কবি মহৎধর্ম বলে মনে করেন। মৃত্যুঞ্জয় শহীদের জন্য কবি অশ্রæপাতের বিরোধী, কেননা দেশ সেবার গৌরবে তারা ধন্য :
“মৃত্যু এরা জয় করেছে, কান্না কিসের ?
আব-জম্-জম্ আনলো এরা, আপনি পিয়ে কলসি বিষের।

দেশ বাঁচাতে আপনারি জান শেষ করেছে;
বেশ করেছে!!
শহীদ ওরাই শহীদ।”
(কামাল পাশা)
বস্তুত, সমকালীন দুনিয়ার মুসলমানদের দূর্বলতা, ভীরুতা, বিশ্বাসঘাতকতা, স্বাধীনতা হরণকারী বিদেশী শাসকদের প্রতি ক্ষোভ এবং এসব থেকে উদ্ধারের জন্য প্রেরণা প্রতীক হিসেবে কবি আনোয়ার পাশা, কামাল পাশার শোর্যবীর্য সাহস শক্তিকে তাঁর বিদ্রোহী চেতনার অনুসঙ্গী করেছেন।
নজরুলের বিদ্রোহের মধ্যে ‘প্রমিথিউস’ এর মহাবিদ্রোহের ছায়া দেখা যায়। তাঁর বিদ্রোহী চেতনা মূলত রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ধর্মনৈতিক চেতনাসম্পন্ন হলেও শুধু এতেই সীমাবদ্ধ নয়। আসলে তাঁর বিদ্রোহী চেতনা বহুমাত্রিকতার দাবীদার। তিনি তাঁর বিদ্রোহী চেতনার সংমিশ্রণে অসাম্প্রদায়িক একটি ভাবাদর্শ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ