Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৫ আশ্বিন ১৪২৫, ৯ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

টিআইবি’র জরিপে দুর্নীতির শীর্ষে আইনশৃঙ্খলা সংস্থা

| প্রকাশের সময় : ১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮, ১২:০৩ এএম

আইনশঙ্খলা সংস্থার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ নতুন কিছু নয়। যুগের পর যুগ ধরে এ অভিযোগ চলে আসছে। আইনশৃঙ্খলা সংস্থা সম্পর্কে একজন সাধারণ মানুষেরও ধারণা, এ সংস্থার বেশিরভাগ সদস্যই দুর্নীতিতে জড়ায়। এ ধারণা যে অমূলক নয়, তার প্রমাণ রয়েছে টিআইবি’র ‘সেবা খাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০১৭’-এ। জরিপে দেশের সেবা খাতে ২০১৭ সালে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি হয়েছে আইনশৃঙ্খলা সংস্থায়। এখানে সেবা নিতে গিয়ে ৭২.৫ শতাংশ খানা তথা পরিবার বা ছোট গোষ্ঠী বিশেষ দুর্নীতির শিকার হয়েছে। দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে এরপরই রয়েছে পাসপোর্ট অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। আর দেশের ৮৯ শতাংশ মানুষের মতে, ঘুষ না দিলে কোনো খাতেই সেবা মেলে না। জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে, ৬৬.৫ শতাংশ মানুষ দুর্নীতির শিকার। বছরে ঘুষ প্রায় ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা। দুর্নীতির সংজ্ঞা হিসেবে ব্যক্তিস্বার্থে ক্ষমতার অপব্যবহারের উল্লেখ করা হয়েছে। ঘুষ, সম্পদ আত্মসাৎ, প্রতারণা, দায়িত্বে অবহেলা, স্বজনপ্রীতি ও প্রভাব বিস্তারের কথা বলা হয়েছে। টিআইবি’র এ জরিপ থেকে বোঝা যায়, গুরুত্বপূর্ণ তিনটি সেবা খাতে দুর্নীতি কীভাবে আগ্রাসী রূপ নিয়েছে। এর কোনো প্রতিকার বা পরিবর্তনের কোনো উদ্যোগ ও লক্ষণ নেই।
টিআইবি সেবা খাতের দুর্নীতি নিয়ে বছরওয়ারি জরিপ বরাবরই প্রকাশ করে আসছে। তার এ জরিপ হেলাফেলা করার সুযোগ নেই। কারণ সংস্থাটি নির্দিষ্ট নিয়ম ও প্রক্রিয়া মেনেই জরিপ করে থাকে। সাধারণ মানুষের সাথে সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের মাধ্যমে তাদের মতামত গ্রহণ করে। সংস্থাটি শুধু বাংলাদেশ কেন্দ্রিক এই জরিপ করে না, বিশ্বব্যাপী করে থাকে। তার জরিপের গুরুত্ব রয়েছে। বলা বাহুল্য, জরিপে যেসব সংস্থার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ বেশি উঠে আসে, সেসব সংস্থার কাছে তা কখনোই গ্রহণযোগ্য হয় না। এবারের জরিপে আইনশৃঙ্খলা সংস্থার দুর্নীতি শীর্ষে উঠেছে। স্বাভাবিকভাবেই তার ভাল লাগার কথা নয়। কর্তৃপক্ষীয় তরফে বলা হয়েছে, টিআইবি’র কাছে এর ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। ব্যাখ্যা সে চাইতেই পারে, তবে এ কথা সর্বজনস্বীকৃত দেশের আইনশৃঙ্খলা সংস্থার এক শ্রেণীর সদস্যর দুর্নীতি ওপেন সিক্রেট এবং তা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। বিগত কয়েক বছরে এ সংস্থার দোর্দন্ড প্রতাপ সম্পর্কে জনগণ অবহিত। আইনশৃঙ্খলা সংস্থার অনেক সদস্যর মধ্যে এ মনোভাব কাজ করে যে, সাধারণ মানুষের সাথে তারা যেমন খুশি তেমন আচরণ করতে পারে। তাদের কাজ যে মানুষের সেবা করা, দুর্নীতি ও অন্যায় প্রতিরোধ করা এবং জনগণের বন্ধু হিসেবে পাশে দাঁড়ানো-এ কথাটি ভুলে যায়। এ সংস্থার বিরুদ্ধে শুধু দুর্নীতির অভিযোগই নয়, গুম, হেফাজতে মৃত্যু, বিচারবর্হিভূত হত্যাকান্ডের মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের আতংক সবসময় বিদ্যমান। তুলে নিয়ে অস্বীকার করার প্রবণতাও বিভিন্ন ঘটনায় লক্ষ্য করা গেছে। সবচেয়ে বড় কথা, যারা গুম ও অপহরণের শিকার হয়, তাদের উদ্ধারেও এ সংস্থাকে তৎপর হতে দেখা যায় না। তদন্ত চলছে বলে বক্তব্য দিয়ে দায়িত্ব শেষ করা হয়। গত ৩০ আগস্ট ছিল আন্তর্জাতিক গুম দিবস। এ দিবসে ‘মায়ের ডাক’ নামে একটি মঞ্চ থেকে গুম হয়ে যাওয়া ৪০ পরিবারের স্বজনরা তাদের স্বজনদের ফিরে পাওয়ার জন্য আকুতি জানিয়েছে। তারা গুম নিয়ে সরকারের মৌনতা, অসত্য ভাষণ ও পাত্তা না দেয়ায় ক্ষুদ্ধতা প্রকাশ করেছে। আমরা এ কথা বরাবরই বলে আসছি, যে ব্যক্তি গুম হয়েছে, সে ব্যক্তিকে যদি আইনশৃঙ্খলা সংস্থা গুম করে না থাকে, তবে তার দায়িত্ব হচ্ছে গুম হওয়া ব্যক্তিকে খুঁজে বের করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেয়া। দুঃখের বিষয়, এ কাজটি আইনশৃঙ্খলা সংস্থার তরফে তেমন একটা করতে দেখা যায় না। আইনশৃঙ্খলা সংস্থার এ ধরনের আচরণ এবং তার একশ্রেণীর সদস্যর দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়া নিয়ে দেশের মানুষ যে ক্ষুদ্ধ সেটা টিআইবি’র জরিপে উঠে এসেছে। আইনশৃঙ্খলা সংস্থার মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি বিগত কয়েক বছর ধরে দেশ-বিদেশে সমালোচিত হয়ে আসছে। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা তাদের প্রতিবেদনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরে আসছে। দুঃখের বিষয়, এতে সংস্থাটির কোনো টনক নড়েছে বলে প্রতীয়মাণ হচ্ছে না। এসব প্রতিবেদন তারা পাত্তা দিচ্ছে না। সরকারও সংস্থাটির দুর্নীতি প্রতিরোধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। দুর্নীতিতে জড়িতদের নামমাত্র সাজা, ক্লোজড বা বদলি করা হয়। এতে এক ধরনের দায়মুক্তি দেয়া হয়। এতে দুর্নীতিবাজ অন্য সদস্যরা প্রশ্রয় পেয়ে দুর্নীতি ও অপরাধে জড়িয়ে পড়তে উৎসাহী হয়ে ওঠে।
আইনশৃঙ্খলা সংস্থা ও অন্য সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি নিয়ে প্রকাশিত টিআইবি’র জরিপ বিশ্বব্যাপী দেশের ভাবমর্যাদার জন্য কোনোভাবেই মঙ্গলজনক নয়। মানুষের সেবক যদি দুর্নীতিগ্রস্ত ও আতঙ্কের কারণ হয়ে ওঠে, তবে দেশে আইনের শাসন বলতে কিছু থাকে না। মানুষ কার কাছে যাবে, কার কাছে প্রতিকার চাইবে? অথচ সরকার আইনশৃঙ্খলা সংস্থাসহ প্রশাসনের সর্বস্তরে বহুগুণে বেতন বৃদ্ধি করেছে। তখন সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, এতে প্রশাসনে দুর্নীতি কমে আসবে। দেখা যাচ্ছে, দুর্নীতি তো কমেইনি, উল্টো বেড়ে চলেছে। যদিও তখন পর্যবেক্ষকরা মন্তব্য করেছিলেন, সরকার প্রশাসনকে খুশি রেখে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য তাদের সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধা দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা সংস্থাও সরকারের এ দুর্বলতা বুঝতে পেরে এ সুযোগকে কাজে লাগাচ্ছে। জনগণের সেবার পরিবর্তে সাধারণ মানুষের সাথে তাদের পূর্বের আচরণ বজায় রেখেছে এবং তা বৃদ্ধি করে চলেছে। এভাবে চলতে থাকলে দেশে কীভাবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে? সেবকই যদি দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ে তবে জনগণের নিরুপায় হয়ে পড়া ছাড়া গতি থাকে না। এ অবস্থা চলতে দেয়া যায় না। আমরা মনে করি, আইনশৃঙ্খলা সংস্থাকে টিআইবি’র জরিপ উপেক্ষা না করে, তা আমলে নিয়ে দুর্নীতির ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া। এর সদস্যদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে নিয়মিত তদারকি করা। তারা সাধারণ মানুষের বন্ধু এবং অপরাধীদের শত্রু এ মনোভাব জাগিয়ে তোলা।

 

 

 



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ