Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১০ আশ্বিন ১৪২৫, ১৪ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

চট্টগ্রামে এখনও মাদকের ছড়াছড়ি

রফিকুল ইসলাম সেলিম | প্রকাশের সময় : ৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮, ১২:০২ এএম

ভারত থেকে ফেনী সীমান্ত হয়ে চট্টগ্রাম আসার পথে ধরা পড়লো ট্রাকবোঝাই ১শ’ কেজি গাঁজা। মিয়ানমার থেকে আসা ইয়াবার চালান পাচারকালে বন্দর নগরীর ফিরিঙ্গি বাজার ও মেরিনার্স রোডে ধরা পড়ে ১৫ হাজার পিস ইয়াবা ট্যাবলেট। রোববার মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে র‌্যাব ও পুলিশের অভিযানে এসব মাদক উদ্ধার হয়। এ সময় গ্রেফতার করা হয় ট্রাক ও মাইক্রোবাসসহ ছয়জনকে। এর আগে নগরীর লালখান বাজার থেকে ফার্নিচারে লুকিয়ে ঢাকায় পাচারকালে আটক করা হয় ২৯ হাজার ইয়াবার আরও একটি চালান। ওই চালানের মালিক পুলিশের এক এসআই।
র‌্যাব পুলিশ আর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনীর অভিযানে প্রতিদিনই এই অঞ্চলে একাধিক মাদকের চালান উদ্ধার হচ্ছে। কক্সবাজার সীমান্তেও ধরা পড়ছে ইয়াবার বড় বড় চালান। মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার পরও মাদকের বিস্তার কমছে না। এখনও এই অঞ্চলের সর্বত্রই মাদকের ছড়াছড়ি। সক্রিয় রয়েছে মাদকের কারবারি, তাদের গডফাদার ও মাদক আসক্তরা। মাদক পাচারে জড়িত পুলিশের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তারাও সক্রিয়। ১৫ মে শুরু হওয়া মাদক বিরোধী বিশেষ অভিযানে ধরা পড়েনি চট্টগ্রাম অঞ্চলে কোন গডফাদার।
অভিযানের মুখে কৌশল পাল্টেছে মাদকের কারবারিরা। তবে বন্ধ হয়নি মাদক পাচার। মিয়ানমার থেকে আসছে ইয়াবার চালান। ভারত থেকে ফেনসিডিল, গাঁজাসহ হরেক মাদকের চালান ঢুকছে দেশে। অভিযানের মুখে মাদক গডফাদাররা আড়ালে চলে গেলেও তাদের নেটওয়ার্ক অক্ষত রয়ে গেছে। মাদক পাচার ও ব্যবসার সাথে রাজনৈতিক দলের ক্যাডার-মাস্তান, জনপ্রতিনিধি, পুলিশের কতিপয় কর্মকর্তা সরাসরি জড়িত। এ কারণেই মাদক কারবারি চক্রের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক ভাঙ্গা যায় না বলে অভিমত সংশ্লিষ্টদের। পুলিশের অভিযানে সিন্ডিকেটের সদস্যরা গা ঢাকা দিলেও চলে মাদক পাচার।
আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, আগের মতোই মাদক ধরা পড়ছে। এতে বোঝা যায় মাদক পাচার বন্ধ হচ্ছে না। তবে কৌশল পাল্টেছে। আগে ইয়াবা ও ফেনসিডিলের বড় বড় চালান পাচার করা হতো। এখন ছোট আকারের চালান পাচার হচ্ছে। এ কারণে ছোট ছোট চালান ধরা পড়ছে। মিয়ানমার থেকে ইয়াবার বড় চালান আসছে। এসব চালান ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে পাচার করা হচ্ছে। আগে কয়েকটি ঘটনায় দেখা গেছে সরাসরি মিয়ানমার থেকে সমুদ্র পথে ইয়াবার বড় চালান এনে চট্টগ্রাম থেকে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ দেয়া হতো। অভিযান শুরু হওয়ার পর ওই ধরনের বড় কোন চালান ধরা পড়েনি।
ভারত থেকেও ফেনসিডিল, গাঁজাসহ বিভিন্ন রকমের মাদক আসা বন্ধ হয়নি। র‌্যাব-পুলিশের অভিযানে প্রায়ই ভারতীয় ফেনসিডিল ও গাঁজার চালান উদ্ধার হচ্ছে। গত রোববার ভোর রাতে ফেনী থেকে চট্টগ্রাম পাচারকালে ট্রাক বোঝাই একশ কেজি গাঁজার চালান উদ্ধার করে এলিট বাহিনী র‌্যাব। র‌্যাবের অভিযানে প্রায়ই উদ্ধার হচ্ছে ফেনসিডিলের ছোট ছোট চালান। ইয়াবার মতো ফেনসিডিল ও গাঁজার কারবারিরাও কৌশল পাল্টে ছোট ছোট চালান পাচার করছে।
মাদক বিরোধী অভিযানের মধ্যেও পুলিশের মাদক কারবারিরা সক্রিয় রয়েছে। শুক্রবার ভোরে চট্টগ্রামের লালখান বাজার থেকে ঢাকা নেওয়ার পথে ২৯ হাজার ২৮৫ পিস ইয়াবা আটক করে র‌্যাব। এ সময় মিনি ট্রাকের চালক মোঃ মোক্তার ও তার ভাই মোঃ সবুজ ওরফে বাবুকে গ্রেফতার করা হয়। র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানায়, ইয়াবার চালানের মালিক পুলিশের এসআই বদরুদ্দোজা মাহমুদ। পরে তাকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়। ঢাকা থেকে শাস্তিমূলক বদলি হয়ে আসা এ পুলিশ কর্মকর্তা চট্টগ্রামের দামপাড়ায় মেট্রোপলিটন পুলিশ লাইনে বসেই ইয়াবার ব্যবসা করে আসছিলেন। এর আগেও একইভাবে তিনি চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় ইয়াবার চালান পাচার করে বলে জানিয়েছেন ট্রাক চালক।
গত ৩১ জুলাই নগরীর বাকলিয়ায় হাফেজনগর এলাকার একটি বাসা থেকে ১৫ হাজার পিস ইয়াবাসহ নাজিম উদ্দিন মিল্লাত নামে এক যুবককে গ্রেফতার করে র‌্যাব। পরে জানা যায়, ওই বাসাটি বাকলিয়া থানার এসআই খন্দকার সাইফুদ্দিনের। বাসাটি ভাড়া নিয়ে পুলিশ কর্মকর্তা সাইফুদ্দিন দীর্ঘদিন থেকে ইয়াবা ব্যবসা করে আসছিলেন। পরে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তবে সে পালিয়ে গেছে এমন অজুহাতে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করেনি। র‌্যাবের পক্ষ থেকে ১৫ হাজার ইয়াব উদ্ধারের ঘটনায় ওই পুলিশ কর্মকর্তাকে আসামি করা হয়। মাদক বিরোধী অভিযান শুরুর পর পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা পুলিশের ভেতরে যারা মাদক ব্যবসায় জড়িত তাদের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। এ হুঁশিয়ারির মধ্যেও পুলিশের ওই দুই এসআই মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। জানা যায়, তাদের মতো আরও অনেকে এখনো মাদকের কারবারে জড়িত রয়েছেন।
পুলিশি অভিযানের মুখে মাদক ব্যবসায় জড়িতরা গা ঢাকা দিলেও তারা ব্যবসা বন্ধ করেনি। কৌশল এবং এলাকা পাল্টে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করেই আসক্তারা কিনে নিচ্ছে মাদকদ্রব্য। গ্রেফতার মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, বেশিরভাগ ব্যবসা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে হচ্ছে। মোবাইলে যোগাযোগের পর নির্দিষ্ট স্থানে মাদকের চালান পৌঁছে যাচ্ছে। মাঝে মধ্যে দু’একটি চালান পুলিশের হাতে ধরা পড়লেও বাকি চালান গন্তব্যে চলে যাচ্ছে। শুধুমাত্র সুর্নিদিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতেই মাদকের চালান আটক করা হচ্ছে।
মাদক বিরোধী চলমান অভিযানে সুফল মিলছে জানিয়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মাসুদ-উল হক দৈনিক ইনকিলাবকে বলেন, অভিযানের ফলে মাদক সিন্ডিকেট কিছুটা হলেও দুর্বল হয়েছে। মাদক ব্যবসায়ীরা আড়ালে চলে গেছে। তবে এখনো মাদকের ছোট বড় চালান উদ্ধার হচ্ছে। এতে বোঝা যায়, মাদক ব্যবসা বন্ধ হয়নি। নগরীতে যেসব এলাকায় মাদকের হাট বসতো সেসব এলাকায় পুলিশ নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রাখায় মাদকের কারবারিরা সেখানে ঘেষতে পারছে না। তবে তিনি মনে করেন, শুধুমাত্র পুলিশি অভিযানে মাদকের আগ্রাসন রোধ করা সম্ভব নয়। এর বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ দরকার।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ