Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৪ আশ্বিন ১৪২৬, ১৯ মুহাররম ১৪৪১ হিজরী।

বেপেরোয়া ‘পাঠাও’

আবদুল্লাহ আল মামুন | প্রকাশের সময় : ৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮, ১২:৩৬ এএম

প্রতিনিয়ত প্রাণহানি-অঙ্গহানি
নারীদের শ্লীলতাহানির অভিযোগ
ট্রাফিক আইনের তোয়াক্কা নেই
অভিযোগ করলে মেলে না প্রতিকার

মতিঝিলে চালক-আরোহী নিহত


গণপরিবহন ও সিএনজিচালিত অটোরিকসার ভোগান্তি লাঘবে সহজে এক স্থান থেকে অন্যস্থানে যাত্রী বহনে ‘পাঠাও’ (অ্যাপসভিত্তিক মোটরসাইকেলে যাত্রী পরিবহন সেবা) চালু হয়েছিল। কিন্তু সেবাটি চালুর পর থেকেই নানা কারণে সমালোচিত হয়ে আসছে এটি। বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, নারীদের শ্লীলতাহানি, ট্রাফিক আইনের তোয়াক্কা না করা এমনকি বাইকারদের খারাপ আচরণসহ নানা অভিযোগ রয়েছে এই সেবাটির বিরুদ্ধে। এ সব অভিযোগ নিয়ে সেবা প্রদানকারী সংস্থাটির কল সেন্টারে ফোন করলেও কোনো লাভ হয় না বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের । এ দিকে, পাঠাও সেবা চালুর পর থেকে এ পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় চালক, আরোহী ও পথচারীসহ প্রাণ হারিয়েছেন অনেকে। প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও বাইকারদের দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায়। সর্বশেষ গত রোববার রাতে রাজধানীর মতিঝিলে একটি লরি ট্রাকের ধাক্কায় একইসঙ্গে পাঠাও চালক ও আরোহীসহ দু’জন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া চলতি বছর জুলাইয়ে চট্টগ্রামে এক নারী চিকিসককে শ্লীলতাহানি ও ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগে এক পাঠাও চালককে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, অ্যাপসটি চালুর শুরু থেকেই প্রতিষ্ঠানটির ত্রু টিপূর্ণ ম্যাপ ও জিপিএস সিস্টেমে ভোগান্তি ছিল। এ ছাড়া বাইকারদের খারাপ ব্যবহার, নারীদের সঙ্গে খারাপ আচরণ ও শ্লীলতাহানি, অ্যাপে না গিয়ে ব্যক্তিগতভাবে যাবার অফার, যাত্রা শুরুর আগেই অ্যাপ রাইড চালু করা। তবে সব থেকে গুরুতর অভিযোগ হলো অনিয়ন্ত্রিত ও বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো। ভুক্তভোগীরা জানান, অধিক আয়ের লোভে কম সময়ে বেশি যাত্রী পাওয়ার আশায় আইন-কানুন ও দুর্ঘটনার পরোয়া না করে গাড়ি চালায় পাঠাও চালকরা।
পাঠাও সেবাটি নিয়মিত ব্যবহার করেন এমন অনেক আরোহী দৈনিক ইনকিলাবকে অভিযোগ করেছেন, কোন রকম যোগ্যতার পরীক্ষা ছাড়াই পাঠাও অ্যাপসে রেজিস্ট্রেশন করার সুযোগ দেওয়া হয়। এ সব রেজিস্ট্রেশনকারীদের অনেকেই কয়েকদিন আগে ঢাকা এসেছেন। নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও জায়গাগুলো চেনেন না। কেউ কেউ কোন রাস্তাঘাটই চেনেন না। এ ছাড়া অনেক বাইকার আছেন যারা সবেমাত্র মোটরসাইকেল চালানো শিখেছেন কিন্তু এখনো দক্ষতা ও পরিপক্কতা আসেনি। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এসব চালকদের ভিন্ন কোন আয়ের উৎস না থাকায় তারা ফুলটাইম পেশা হিসেবে পাঠাওকে বেছে নিয়েছে। এ ছাড়া যারা পার্টটাইম হিসেবে পাঠাও চালাচ্ছেন তাদের মধ্যে পেশাদারিত্বের অভাব রয়েছে। এসব পার্ট টাইম চালকরা কোন ধরণের আইনকানুন ও অ্যাপসের তোয়াক্কা না করে চুক্তিতে যাত্রী বহন করেন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, অদক্ষ ও যাচ্ছেতাই  লোককে পাঠাও চালানোর রেজিস্ট্রেশন দেওয়ায় প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে। প্রতি মাসেই নগরীর কোথাও না কোথাও প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। এতে পাঠাও চালকের পাশাপাশি আরোহীরাও মারা যাচ্ছেন। এ ছাড়া প্রতিনিয়ত আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন চালক-আরোহীদের সংখ্যাও অনেক।
কয়েকজন পুরাতন সেবাগ্রহনকারী অভিযোগে আরও জানান, পাঠাও থেকে যে ডিসকাউন্ট অফার চালু করেছে সেটি নিয়েও রয়েছে গাপলা। যারা সার্ভিসটি বেশি ব্যবহার করে ডিসকাউন্টগুলো তাদের না দিয়ে নতুন ব্যবহারকারীদের প্রদান করে আকৃষ্ট করা হয়। এটি স্পষ্ট প্রতারণা। এ ছাড়া এসব অফার ভোগ করার জন্য কিছু কোড পাঠানো হয়। এ সব প্রো কোডগুলোও অনেক সময় ব্যবহার হয় না বলেও অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
গত কয়েকদিন সরেজমিনে পাঠাও সেবাটি নিয়ে বিস্তর অভিযোগ শোনা গেছে। নিউমার্কেটে রুমানা নামে এক নারী জানান, নারী আরোহী পেলে অনেক চালক বেশি আগ্রহ দেখায়। এসব বাইকাররা পরবর্তীতে ফোন করে নারীদের সাথে কথা বলতে চাওয়াসহ নানা অজুহাতে বিরক্ত করে।
মতিঝিল শাপলাচত্ত্বরে আলী আহসান নামে এক আরোহী ইনকিলাবকে জানান, অফিস টাইম তথা সকালের দিকে অনেক বাইকাররা অ্যাপসে যেতে চায় না। ওই সময় তারা চুক্তিতে যাত্রী বহন করে। কোন উপায় না পেয়ে বাধ্য হয়ে বেশি টাকা দিয়ে চুক্তিতে যেতে হয়।
কারওয়ানবাজারে মনজিল মোরশেদ নামে এক যাত্রী জানান, অ্যাপসটি চালুর সময় এক রকম ভাড়া দেখালেও গন্তব্যে যাওয়ার পর বেশি ভাড়া দেখায়। এ নিয়ে তাৎক্ষণিক অভিযোগ জানালেও কোন প্রতিকার পাননি বলে তিনি জানান।
মিরপুর ১০ নম্বরে খলিলুল্লাহ নামে এক শিক্ষক জানান, পাঠাও চালকদের পেছনে বসলে সব সময় মৃত্যু আতঙ্ক কাজ করে। তারা অনেক বেপরোয়া গতিতে বাইক চালায় যাতে যে কোন সময়ে জীবনহানি ও অঙ্গহানির মতো দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
এদিকে, পাঠাও সেবাগ্রহনকালে দুর্ঘটনায় এ পর্যন্ত অনেক চালক ও আরোহী প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে গত রোববার মতিঝিলে একটি লরির চাপায় পাঠাও চালক রিপন শিকদার (৩০) ও আরোহী জানে আলম (৩১)। চালক রিপন সিকদার খিলগাঁও হাজীপাড়ার বাসিন্দা। জানা গেছে, নিহত জানে আলম গাজী ঢাকার জয়কালি মন্দিরের পাশে ডিসিসি রোডে থাকতেন। বাসায় ফেরার পথে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
মতিঝিল থানার ওসি ওমর ফারুক বলেন, মতিঝিলের ২৪ তলা ভবনের পাশে একটি লরি ট্রাক মোটরসাইকেলটিকে চাপা দিয়ে পালিয়ে যায়। এ ছাড়া গত ২০ আগস্ট মোহাম্মদপুরে ট্রাকের ধাক্কায় সোহেল পারভেজ (৩২) নামে এক পাঠাও চালক নিহত হয়েছেন। গত ৪ জুলাই বিমানবন্দর গোলচত্বর এলাকায় বিআরটিসির দোতলা বাসের ধাক্কায় নাজমুল হাসান (৩২) নামের এক পাঠাও আরোহী নিহত হন। এ ঘটনায় পাঠাও চালক গুরুতর আহত হন। গত ১৯ জুন ভোরে রাজধানীর মিন্টুরোডে ফারুক হোসেন রিংকু (৩৩) নামে এক পাঠাও চালক নিহত হন। তিনি মুদি ব্যবসার পাশাপাশি পাঠাও চালাতেন বলে পুলিশ ও স্বজনরা জানিয়েছিল। চালক একটি রিকসাকে ধাক্কা দিলে রিকশা ও মোটরসাইকেলটি ভেঙে ধুমরে মুচরে যায়। গত ৫ মার্চ তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকা কাজী মারুফ আহম্মেদ (২৪) নামে এ পাঠও চালক নিহত হন। এ ছাড়া ২০১৭ সালের ২ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের হালিশহরে ট্রাকের ধাক্কায় আমিনুল ইসলাম রফিক নামে এক পাঠাও চালক নিহত হন।
সড়ক দুর্ঘনাসহ নানা অনিয়মের বাইরেও পাঠাও চালকদের বিরুদ্ধে নারীদের শ্লীলতাহানি ও ধর্ষণের চেষ্টার অভিযোগ রয়েছে। গত ২৯ জুলাই চট্টগ্রামে এক শিক্ষাণবীশ নারী চিকিৎসককে শ্লীলতাহানি ও ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগ ওঠে এক পাঠাও চালকের বিরুদ্ধে। ঘটনার পর মিজানুর রহমান (৩৩) নামে ওই চালককে গ্রেফতার করে চট্টগ্রামের পাহাড়তলী থানা পুলিশ। বন্দর থানার নিউমুরিং এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করা হয়। ওই সময় চট্টগ্রাম নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (পশ্চিম) নাজমুল হাসান জানিয়েছিলেন, একইমাসের ২৪ জুলাই ফ্রি পোর্ট এলাকা থেকে ভাটিয়ারি যাওয়ার পথে পাহাড়তলীর জেলেপাড়া এলাকায় গাড়ি থামিয়ে তাকে ওই নারী চিকিৎসককে শ্লীলতাহানি ও ধর্ষণের চেষ্টা করে মিজান। পরে তিনি চিৎকার ও নিজেকে মুক্ত করার চেষ্টা করলে মিজান ওই নারীর ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ও ভ্যানিটি ব্যাগ নিয়ে পালিয়ে যায়।
এদিকে অভিযোগের বিষয়ে জানতে পাঠাওয়ের ওয়েবসাইটে দেওয়া নাম্বারে কল করা হলেও কারো সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
##



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ