Inqilab Logo

ঢাকা, শনিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৮, ০৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ০৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী

ব-দ্বীপ পরিকল্পনা

| প্রকাশের সময় : ৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৮, ১২:০৫ এএম

নদীর দেশ বাংলাদেশের জন্য জলাবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলাসহ পানিসম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে অবশেষে শতবছর মেয়াদী ব-দ্বীপ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। ২০১৮ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে এই প্রকল্পের প্রথম ধাপ বাস্তবায়নের জন্য সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা। প্রথম ধাপের ৮০টি প্রকল্পের মধ্যে ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন খাতে ৬৫টি এবং দক্ষতা উন্নয়ন, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং গবেষণামূলক প্রকল্প থাকবে ১৫টি। গত মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের বৈঠকে এই পরিকল্পনা অনুমোদিত হয়। ইউরোপের নদীমাতৃক দেশ নেদারল্যান্ডসকে রোল মডেল হিসেবে গ্রহণ করে এবং নেদারল্যান্ড সরকারের সহায়তা নিয়েই এই পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। নেদারল্যান্ডস ছাড়া বিশ্বব্যাংকসহ বেশকিছু আন্তর্জাতিক সংস্থা এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহায়তা দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে বলে জানা যায়। জলবায়ু পরিবর্তনের বিশ্বচ্যালেঞ্জে বাংলাদেশের অবস্থান খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত। কৃষিপ্রধান অর্থনীতি ও অধিক জনসংখ্যায় ভারাক্রান্ত বাংলাদেশ এখন যে সব অর্থনৈতিক, সামাজিক ও প্রাকৃতিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে, ভবিষ্যতে তার চাপ ও সংকট আরো তীব্রতর হতে থাকবে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। এহেন বাস্তবতায় শতবর্ষী ডেল্টা প্ল্যান-২১০০ বাস্তবায়নের উদ্যোগ মানুষের মধ্যে নতুন প্রত্যাশার সঞ্চার করবে। এই প্রকল্প যথাযথ প্রক্রিয়ায় বাস্তবায়িত হলে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার রূপরেখা একটি অদম্য গতি লাভ করবে।
উজান থেকে নেমে আসা নদীবাহিত পলিমাটি দিয়ে হাজার বছরে গাঙ্গেয় বাংলাদেশের ভূ-প্রকৃতি গড়ে উঠেছে। তবে যৌথ নদীর উপর উজানে ভারতের বাঁধ নির্মাণ, পানি প্রত্যাহার ও নিয়ন্ত্রণের কারণে গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ চরম দুর্যোগের সম্মুখীন হয়েছে। খরা, আকষ্মিক বন্যা, নদীভাঙ্গনের মত দুর্যোগের সাথে নদী ও পানি ব্যবস্থাপনার একটি নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান। বিশেষতঃ পদ্মার উজানে গঙ্গায় ভারতের ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের শুরুতেই তৎকালীন পাকিস্তান সরকার গঙ্গা ব্যারাজ নির্মাণের পরিকল্পনা নিলেও তা কখনো বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। সাম্প্রতিক সময়ে তিস্তা অববাহিকায় পানি সংকট এবং পরিবেশগত বিপর্যয় রুখতে গঙ্গা ব্যরাজ প্রকল্প নতুন করে আলোচনায় আসলেও এর পরিকল্পনায় কথিত ত্রু টি এবং ভারতের আপত্তির কারণে বাস্তবায়নের উদ্যোগ সফল হয়নি। তবে আলোচ্য ডেল্টা প্লানে প্রথম ধাপের ৮০টি প্রকল্পের মধ্যে গঙ্গা ব্যারাজ প্রকল্পকে অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রকল্প হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের রূপরেখায়পরিকল্পনার প্রথম ধাপে গঙ্গা ব্যারাজ নির্মাণ প্রকল্পের জন্য সর্বোচ্চ ৫.১৫ বিলিয়ন ডলার বা ৪৫ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে। ফারাক্কা ও গজলডোবা বাঁধের বিরূপ প্রতিক্রিয়া নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। ডেল্টা পরিকল্পনার প্রথম ধাপের অগ্রাধিকার প্রাপ্ত প্রকল্প হিসেবে স্বীকৃত হওয়ার মধ্য দিয়ে এই প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা আবারো প্রমাণিত হল। পাশাপাশি দেশের নদনদীগুলোতে নাব্য সংকট, দূষণ, দখল, কৃষি, শিল্প এবং নগরগুলোতে পরিবেশগত বিপর্যয় রুখতে ব-দ্বীপ পরিকল্পনা হতে পারে একটি স্থায়ী সমাধানের পথ ও দিকদর্শন।
বাংলাদেশের সামগ্রিক বাস্তবতায় ব-দ্বীপ প্রকল্প একটি অপরিহার্য প্রকল্প। দীর্ঘদিন ধরেই দেশের পানি বিশেষজ্ঞরা এমন একটি প্রকল্প গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলে আসছেন। অনেক দেরিতে হলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঐকান্তিক ইচ্ছায় শতবর্ষব্যাপী বাস্তবায়ণযোগ্য এই মহাপরিকল্পনা গৃহীত হল। জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ, সমুদ্রপৃষ্ঠস্ফীতির কারণে আগামীতে কৃষিজমি হ্রাস পাওয়া, কোটি মানুষের জলবায়ু উদ্বাস্তু হওয়া এবং জনসংখ্যাবৃদ্ধির মধ্য দিয়ে খাদ্য নিরাপত্তার সংকট মোকাবেলায় এ ধরনের মহাপরিকল্পনার বিকল্প নেই। ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ভিত্তিতে ডেল্টা প্রকল্পকে উপকূলীয় অঞ্চল, নদনদীগুলোর মোহনা ও চ্যানেল, অভ্যন্তরীন নদীভাঙ্গন রোধ, খরাপ্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চল, হাওর ও আকষ্মিক বন্যা প্রবণ অঞ্চল এবং নগর অঞ্চল ইত্যাদি ৬টি হটস্পটে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম ধাপের প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে এই পরিকল্পনা দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ১.৫ শতাংশ বাড়বে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। তবে এই পরিকল্পনার আরো সুদূর প্রসারী সামাজিক-অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও সুফল রয়েছে। এমন একটি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির কাছে অবিস্মরীয় হয়ে থাকবেন। এমন একটি প্রকল্পে ভূমিকা পালনের জন্য পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামালও ধন্যবাদার্হ। তবে পরিকল্পনা গ্রহণ তা বাস্তবায়নের প্রথম শর্ত হলেও বাস্তবায়নের অর্থনৈতিক ও আঞ্চলিক-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা অনেক বড় বিষয়। যেখানে গঙ্গা ব্যারাজের মত প্রকল্প ৬০ বছরেও বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি, সেখানে ব-দ্বীপ প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিঃসন্দেহে অনেক বেশি দূরূহ ও চ্যালেঞ্জিং। অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে দেশ যেভাবে এগিয়ে চলেছে তা বজায় রাখতে হলে দেশের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। শত বছরের ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়নের জন্য দেশের সব রাজনৈতিক শক্তির ঐক্য ও জাতীয় সংহতি বজায় রাখতে হবে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর