Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮, ০৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী

উডওয়ার্ডের বিস্ফোরক বই নিয়ে তোলপাড়, ক্ষুব্ধ ট্রাম্প

ইনকিলাব ডেস্ক | প্রকাশের সময় : ৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৮, ১২:০৩ এএম

মার্কিন সাংবাদিক বব উডওয়ার্ডের লেখা বইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসায় তোলপাড় শুরু হয়েছে দেশটির রাজনৈতিক মহলে। বইটি নিয়ে প্রথমে বিব্রত ও পরে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখান ট্রাম্প। খবর ওয়াশিংটন পোষ্ট ও বিবিসি।
দু’বারের পুলিৎজার পুরস্কার জয়ী ও ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি উন্মোচনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনকে ক্ষমতা থেকে নামিয়ে দিতে সহায়ক ভূমিকা পালনকারী ওয়াশিংটন পোস্টের বিখ্যাত এই সাংবাদিকের লেখা ‘ফিয়ার, ট্রাম্প ইন দ্য হোয়াইট হাউস’ প্রকাশিত হওয়ার আগেই আলোড়ন তুলেছে। এতে তিনি ট্রাম্পকে ‘মানবিক বিপর্যয়ের’ দিকে যেতে থাকা একজন প্রেসিডেন্ট হিসেবে মন্তব্য করেছেন। এই বই আরও একবার প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের যোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। একজন ভাষ্যকার মন্তব্য করেছেন, তাঁর এই নতুন বইয়ের এক-পঞ্চমাংশও যদি সত্যি হয়, তাহলে আরও একবার প্রমাণিত হবে, প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্প শুধু অযোগ্যই নন, হোয়াইট হাউসে তাঁর অবস্থান আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক।
বইটি নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গতকাল এক টুইট বার্তায় মন্তব্য করেন যে, কংগ্রেসের উচিত প্রকাশনা সংক্রান্ত আইন পরিবর্তন করা যাতে তিনি সুবিধাজনক ভাবে বব উডওয়ার্ডের বিরুদ্ধে ‘প্রতিশোধ’ নিতে পারেন। তিনি বলেন, “এটা কি লজ্জার বিষয় নয় যে, কেউ সম্পূর্ণভাবে তৈরি করা গল্প নিয়ে নিবন্ধ বা বই লিখতে পারে যেখানে একজন ব্যক্তিকে তার সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্রে দেখানো হয়, অথচ এজন্য তার কোন শাস্তি বা জরিমানা হয় না।” তিনি আরো বলেন, “জানি না কেন ওয়াশিংটনের রাজনীতিবিদরা প্রকাশনা সংক্রান্ত আইন পরিবর্তন করেন না?”
এই পর্যন্ত যে আধা ডজনের মতো বই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সংক্ষিপ্ত শাসনকাল বিষয়ে প্রকাশিত হয়েছে, ট্রাম্প ও তাঁর সমর্থকেরা এগুলো ‘ভিত্তিহীন’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। কিন্তু ‘ভয়’ বইয়ের লেখক এমন একজন সাংবাদিক ও লেখক, যিনি তাঁর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের জন্য দুই-দুবার পুলিৎজার পুরস্কার পেয়েছেন। সহযোগী লেখক কার্ল বার্নস্টাইনের সঙ্গে ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি বিষয়ে তাঁর ক্রমাগত প্রতিবেদনের কারণে অভিশংসনের মুখোমুখি হয়ে পদত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট নিক্সন।
বইটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ হওয়ার এক সপ্তাহ আগে গত মঙ্গলবার বার্তা সংস্থা এপির হাতে আসে একটি কপি। এরপরেই শুরু হয় তোলপাড়। এ বইয়ের উদ্ধৃতি ও কাহিনীগুলোকে এক টুইটার বার্তায় ট্রাম্প প্রতারণা ও জনগণের সঙ্গে মস্করা বলে অভিহিত করেছেন। এর সঙ্গে আরো যোগ করেছেন তিনি। বলেছেন, ‘প্রতিরক্ষামন্ত্রী জিম মাত্তিক ও চিফ অব স্টাফ জন কেলি প্রেসিডেন্টকে নিয়ে ওই বইয়ে সমালোচনার বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেছেন। এ ছাড়া আবেগতাড়িত সিদ্ধান্ত নেয়ার বিষয়ে তার ডেস্ক থেকে সিনিয়র সহযোগীরা স্পর্শকাতর ডকুমেন্ট নিয়ে নিয়েছেন এমনটাও তিনি প্রত্যাখ্যান করেন।’ দিনের শেষের দিকে আবারও টুইটারে ফেরেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি এটর্নি জেনারেল জেফ সেশনসকে ‘মানসিক বিকারগ্রস্ত’ এবং ‘দক্ষিণাঞ্চলের এক নির্বোধ’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন বলে বইটিতে যে কথা রয়েছে তাও তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। ট্রাম্প বলেন, তিনি জেফ সহ অন্য কারো বিরুদ্ধে কখনো ওইসব শব্দ ব্যবহার করেন নি। কারণ, দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ মহান হয়। উল্লেখ্য, রাশিয়া তদন্ত থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়ার পর জেফ সেশনস বহুবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সমালোচনার শিকারে পরিণত হয়েছেন।
এ বইয়ে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালের এপ্রিলে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করেন। এ নিয়ে রিপোর্ট করেন বব উডওয়ার্ড। ওই সময়ে জিম মাত্তিসকে ডেকে নেন ট্রাম্প। তাকে বলেন, তিনি চান সিরিয়ার নেতাকে (আসাদ) ক্ষমতা থেকে উৎখাত এবং বলেন,‘তাকে হত্যা করুন। আমাদের সেখানে অভিযান চালাতে হবে’। ট্রাম্পকে আশ্বস্ত করেন মাত্তিস। পরে একজন সিনিয়র সহযোগী বলেছেন, ‘তারা আসলে এমন কোনো পদক্ষেপই নেন নি। এর পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টারা সিরিয়ায় বিমান হামলাকে বেছে নেন, যা ট্রাম্প নির্দেশ দিয়েছিলেন।’ যুক্তরাষ্ট্রের দূত নিকি হ্যালি মঙ্গলবার বলেছেন, ‘প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে কখনোই হত্যার পরিকল্পনা করেন নি ট্রাম্প।’ নিকি হ্যালি জাতিসংঘ সদর দফতরে সাংবাদিকদের বলেন, ‘সিরিয়ায় রাসায়নিক অস্ত্র হামলা নিয়ে কথোপকথন সম্পর্কে তিনি জানেন। নিকি বলেন, আসাদকে হত্যা করার বিষয়ে একবারও প্রেসিডেন্টকে কথা বলতে শুনি নি আমি।’
বইয়ে চিফ অব স্টাফ জন কেলিকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, তিনি ট্রাম্পের মানসিক বিকার নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত। এক পর্যায়ে তিনি ট্রাম্পকে ইডিয়ট বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। তবে এ অভিযোগ মঙ্গলবার অস্বীকার করেছেন কেলি। এ বইয়ে আরো বলা হয়েছে, রাশিয়া তদন্ত নিয়ে ট্রাম্পের সাবেক আইনজীবী জন দোউদ। এই তদন্ত থেকে ট্রাম্প নিজেকে এড়াতে পারবেন কিনা তা নিয়ে তিনি সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। বিশেষ করে তিনি রাশিয়া তদন্ত নিয়ে স্পেশাল কাউন্সেল রবার্ট মুলারের সাক্ষাতকারকে বুঝিয়েছিলেন। জন দোউদ জানুয়ারিতে পদত্যাগ করেন। তিনি ট্রাম্পকে বলেছিলেন, সাক্ষ্য দেবেন না। এটা হয়তো একটি অরেঞ্জ জাম্পসুট। তবে মঙ্গলবার এ কথা অস্বীকার করেছেন তিনি। ওই বইয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী জিম মাত্তিসকে উদ্ধৃত করা হয়েছে। তিনি একবার ট্রাম্পকে ব্যাখ্যা করছিলেন উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি মনিটরিং নিয়ে কোরিয়া উপদ্বীপ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা মোতায়েনের বিষয়ে। মাত্তিস এক পর্যায়ে বলেন, আমরা তো তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ প্রতিরোধের জন্য এটা করছি। বইটিতে বলা হয়েছে, ওই সাক্ষাত নিয়ে জিম মাত্তিস তার ঘনিষ্ঠজনেদের বলেছেন যে, তার কথা শুনে বোঝার ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট ৫ম অথবা ৬ষ্ঠ গ্রেডের একজন শিক্ষার্থীর মতো আচরণ করছিলেন। তবে জিম মাত্তিস এমন কথা কখনো উচ্চারণ করেন নি বলে এক বিবৃতিতে বলেছেন। পেন্টাগনের মুখপাত্র কর্নেল রব ম্যানিং বলেছেন, ‘বব উডওয়ার্ড কখনোই জিম মাত্তিসের সাক্ষাতকার নেন নি।’
৪৪৮ পাতার বইটি লিখতে গিয়ে উডওয়ার্ড ১০০ জনের বেশি বর্তমান ও সাবেক ট্রাম্প কর্মকর্তার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন, যার অধিকাংশ টেপে ধারণ করা হয়। এই বইয়ের অন্যান্য বিতর্কিত তথ্যের মধ্যে রয়েছে:
তাঁর সাবেক চিফ অব স্টাফ রাইন্স প্রিবাস সম্বন্ধে ট্রাম্পের মন্তব্য, ‘এই লোকটা একটা ধেড়ে ইঁদুর, সারাক্ষণ সে এখান থেকে সেখানে ছুটে বেড়াচ্ছে।’
ট্রাম্প অনেক সময় সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ম্যাকমাস্টারের ব্যবহার নকল করে দেখাতে ভালোবাসতেন। তাঁর ভাষায়, এই লোকটা সস্তা স্যুট পরেন, আর কথাবার্তায় একজন মদ বিক্রেতার মতো।
ট্রাম্পের একটি প্রিয় অভ্যাস হলো আইনমন্ত্রী জেফ সেশন্সকে অনবরত অপমান করা। তাঁকে ট্রাম্প বিশ্বাসঘাতক এবং স্বল্প বুদ্ধিসম্পন্ন বলে অভিহিত করেছিলেন।
ট্রাম্প একবার বাণিজ্যমন্ত্রী উলবার রসকে বলেছিলেন, ‘আপনি এখন বুড়ো হয়ে গেছেন, বাণিজ্য চুক্তি বিষয়ে আলোচনায় আপনার অংশ নেওয়ার আর কোনো প্রয়োজন নেই।’
ট্রাম্প দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। যাতে এমন কিছু তিনি না করতে পারেন, সে জন্য হোয়াইট হাউসের স্টাফ সেক্রেটারি রব পোর্টার ও অর্থনৈতিক উপদেষ্টা গ্যারি কোহন তাঁর অফিসের টেবিল থেকে একটি নথি সরিয়ে রাখেন। কোহন উডওয়ার্ডকে জানান, ‘জাতীয় নিরাপত্তা বিবেচনা করেই তিনি কাজটা করেছিলেন।’ বলাই বাহুল্য, সে চিঠি চুরি গেছে, ট্রাম্প তা ধরতেই পারেননি। নাফটা চুক্তি প্রত্যাহারের যে নির্দেশ ট্রাম্প দিয়েছিলেন, সেটিও হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা টেবিল থেকে সরিয়ে ফেলেন।
গত বছর শার্লটসভিলে এক বর্ণবাদী মিছিলের পর ট্রাম্প যেভাবে তাদের পক্ষ সমর্থন করে বক্তব্য রাখেন, তার প্রতিবাদে হোয়াইট হাউসের অনেক কর্মকর্তা পদত্যাগে প্রস্তুত ছিলেন। উডওয়ার্ড জানিয়েছেন, তাঁর সহকর্মীদের অনুরোধে ট্রাম্প একটি লিখিত বক্তব্যে বর্ণবাদীদের নিন্দা করেন, তবে পরে হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তাদের জানান বর্ণবাদের এমন নিন্দা করা মস্ত ভুল ছিল। ‘এমন ভুল আর আমি কখনো করব না,’ ট্রাম্প বলেন।
তবে, হোয়াইট হাউস থেকে উডয়ার্ডের এই বইকে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বর্তমান প্রশাসনের সাবেক কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত রোষের ফসল বলে তা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। উডওয়ার্ড অবশ্য বলেছেন বইয়ের প্রতিটি কথা সত্যি। তাঁর কাছে বিভিন্ন নথি ছাড়াও সাক্ষাৎকারের রেকর্ড রয়েছে। তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর কথোপকথনের একটি রেকর্ডিংও প্রকাশ করেছেন। সেখানে ট্রাম্প তাঁকে দীর্ঘদিন থেকে চেনেন বলে জানিয়েছেন। ‘আপনি বরাবরই আমার ব্যাপারে ভারসাম্যপূর্ণ ছিলেন,’ ট্রাম্প সেখানে উডওয়ার্ডকে বলেন।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর