Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১১ আশ্বিন ১৪২৫, ১৫ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

মাদকের অপচ্ছায়ায় আক্রান্ত যুবসমাজ

মাওলানা কবির হোসেন | প্রকাশের সময় : ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৮, ১২:০৩ এএম

মদ এমন একটি বস্তু যা বিবেককে আচ্ছন্ন করে ফেলে। আর বিবেক আচ্ছন্ন হলে মানুষের হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। এজন্য রাসূল (সাঃ) বলেছেন- “ মদ হচ্ছে সকল অশ্লীল কর্মের মূল ”। উল্লেখ্য যে, মদ কোন নির্ধারিত বস্তুর নাম না। যেসব বস্তু বেশী পরিমানে খেলে বিবেকের ক্ষতি হয় তার অল্প বস্তুত মদ। আল্লাহ তায়ালা বলেন - “ হে মুমিনগণ ! নিশ্চয় মদ জুয়া, প্রতিমা এবং ভাগ্য নির্ধারক কার্য সমূহ শয়তানের অপবিত্র কর্ম ”। অতত্রব, তোমরা এগুলি থেকে বেঁচে থাক। যাতে তোমরা কল্যাণ প্রাপ্ত হও। শয়তান তোমাদের মাঝে মদ ও জুয়ার মাধ্যমে শক্রতা ও বিদ্ধেষ মঞ্চারিত কর্তে চায় এবং আল্লাহর যিকির ও ছালাত থেকে তোমাদেরকে বিরত রাখতে চায়। তাহলে কি তোমরা বিরত থাকবে না ? (সূরা মায়িদাহ- ৯০ ও ৯১ নং আয়াত)। অত্র আয়াতে আল্লাহ তায়ালা কয়েকটি অশ্লীল কর্ম হারাম বলে ঘোষণা করেছেন। (১) নেশাজাত দ্রব্য যা পাপের মূল। (২) জুয়া যা মানুষকে সামাজিক ও আর্থিক ভাবে অপদস্থ করে। 

(৩) শর সমূহ বা ফালবাজি বা ভাগ্যবাজি। আল্লাহ তায়ালা অন্যত্র বলেন- “ তারা আপনাকে নেশাদার দ্রব্য ও জুয়া সর্ম্পকে জিজ্ঞেস করে, আপনি বলুন- তাতে বড় গুনাহ হয় ” (সূরা বাকারাহ- ২১৯নং আয়াত)। ওসমান (রাঃ) বলেন, রাসূল (সাঃ) বলেছেন- তোমরা নেশাদ্বার দ্রব্য থেকে বেঁচে থাক। কেননা নেশাদ্বার দ্রব্য হচ্ছে অশ্লীল কর্মের মূল। যে ব্যক্তি নেশাদার দ্রব্য থেকে বেঁচে থাকেনা তারা আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের নাফরমানী করে । আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নাফরমানী করার কারণে সে শাস্তীর হক্বদার হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন- যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সাঃ) এর নাফরমানী করে এবং সীমালঙ্গন করে, আল্লাহ তায়ালা তাকে এমন আগুনে প্রবেশ করাবেন যেখানে সে চিরকাল থাকবে। তার জন্য রয়েছে অপমানজনক শাস্তি। (সূরা নিসা- ২/১৬৭ পৃষ্ঠা মদ্যপান অধ্যায়) । জাবির (রাঃ) বলেন, রাসূল (সাঃ) বলেছেন- নিশ্চয়ই আল্লাহর ওয়াদা রয়েছে নেশাদার দ্রব্য পানকারীদের আল্লাহ “ ত্বিনাতে খাবাল ” পান করাবেন। জিজ্ঞেস করা হল, হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) ত্বিনাতে খাবাল কি জিনিস ? রাসূল (সাঃ) বললেন- জাহান্নামীদের শরীর হতে গলে পড়া রক্তপুজ মিশ্রিত অত্যন্ত গরম তরল পদার্থ ( মুসলিম- ২/১৬৭ পৃষ্ঠা)। আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন, রাসূল (সাঃ) বলেছেন- সর্বদা নেশাদার দ্রব্য পান করা মূর্তি পূজার ন্যায় অপরাধ। (ইবনে মাজাহ-৩৩৭৫) আবু দারদা (রাঃ) বলেন, রাসূল (সাঃ) বলেছেন- সর্বদা নেশাদার দ্রব্য পানকারী জান্নাতে যাবে না। (ইবনে মাজাহ- ৩৩৭৬) আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) বলেন, রাসূল (সাঃ) বলেছেন- পিতা মাতার অবাধ্য সন্তান-জুয়া ও লটারীতে অংশগ্রহন কারী, খোটা দানকারী এবং সর্বদা মদপানকারী জান্নাতে যাবে না। (মিশকাত- ৩৬৫৩) ইবনু ওমর (রাঃ) বলেন, রাসূল (সাঃ) বলেছেন- তিন শ্রেণীর লোকের প্রতি আল্লাহ তায়ালা জান্নাত হারাম করেছেন (১) সর্বদা মদপানকারী (২) পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান ও (৩) পরিবারে বেপর্দার সুযোগ দানকারী। (নাসাঈ মিশকাত-৩৬৫৫) আবু মুসা আশআরী (রাঃ) বলেন, রাসূল (সাঃ) বলেছেন- তিন শ্রেণীর লোক জান্নাতে যাবে না- (১) সর্বদা নেশাদার দ্রব্য পানকারী (২) আত্বীয়তার সর্ম্পক বিচ্ছিন্নকারী (৩) যাদুকে বিশ^াসকারী (মিশকাত - ৩৬৫৩) আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) বলেন, রাসূল (সাঃ) বলেছেন- যে ব্যক্তি নেশাদার দ্রব্য পান করবে আল্লাহ তায়ালা তার ৪০ দিন ছালাত কবুল করবেন না। যদি এ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে তা হলে জাহান্নামে যাবে। যদি তওবাহ করে তাহলে আল্লাহ তার তওবাহ কবুল করবেন না । যদি এ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে তা হলে জাহান্নামে যাবে। এভাবে তিনবার লোকটি ওয়াদা ভঙ্গ করে চতুর্থ বার মদপান করে তাহলে আল্লাহ তাকে ক্বিয়ামতের দিন “ রাদাগাতুল খাবাল ” পান করাবেন আর তা হল জাহান্নামীদের শরীর হতে গলে পড়া রক্তপুঁজ মিশ্রিত গরম তরল পদার্থ। (ইবনে মাজাহ - ২৭৩৮) আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূল (সাঃ) এমন দশ শ্রেণীর লোকের প্রতি অভিশাপ করেছেন যারা মদের সাথে সম্পর্ক রাখে- (১) যে লোক মদের নির্যাস বের করে। (২) প্রস্তুতকারক। (৩) মদপান কারী। (৪) যে পান করায় (৫) আমদানীকারক (৬) যার জন্য আমদানী করা হয়। (৭) বিক্রেতা (৮) ক্রেতা (৯) সরবরাহকারী (১০) এর লভ্যাংশ ভোগকারী (তিরমিযী, মিশকাত- ২৭৭৬) আবু মালিক আশআরী (রাঃ) বলেন- রাসূল (সাঃ) বলেছেন- আমার কিছু উম্মত মদ্যপান করবে এবং তার ভিন্ন ভিন্ন নাম রাখবে। তাদের নেতাদেরকে গায়িকা ও বাদ্যযন্ত্র দ্বারা সম্মান করা হবে। আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে ভ‚মিকম্পের মাধ্যমেই মাটিতে ধসিয়ে দিবেন। আর তাদেরকে বানর ও শুকুরে পরিনত করবেন। (বুখারী- ৪০২০)
হাদীসের মাধ্যমে স্পষ্ট হচ্ছে যে, মানুষ ভিন্ন ভিন্ন নাম রেখে মদ্য পান করবে আর তাদের নেতা ও দায়িত্বশীলদের সর্বক্ষনের সঙ্গী হবে বাদ্যযন্ত্র ও গায়িকা। এদের চরিত্র হবে নোংরা, এদের প্রিয় কাজ হবে অশ্লীলতা। তাদের স্বভাব ও কৃষ্টি কালচার হবে শুকর ও বানরের ন্যায়। মুয়াজ ইবনু জাবাল (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূল (সাঃ) বলেছেন- ইসলামের সূচনা বা রাজত্ব শুরু হয়েছে নবী ও দয়া দ্বারা। তারপর রাজত্ব আসবে খেলাফত ও রহমত দ্বারা। তারপর আসবে অত্যাচারী শাসকদের যুগ। তারপর আসবে কঠোরতা, উচ্ছৃংখলতা বিপর্যয় সৃষ্টিকারী যুগ, এসব অত্যাচারী শাসকেরা রেশমী কাপড় পরিধান করা, অবৈধভাবে নারীদের লজ্জাস্থান উপভোগ করা এবং মদপান করাকে হালাল মনে করবে। এরপরও তাদের প্রচুর রুযী দেওয়া হবে। দুনিয়াবী যে কোন কাজে তাদের সাহায্য করা হবে। অবশেষে এ পাপের মধ্যে লিপ্ত থেকে আল্লাহর সম্মুখে উপস্থিত হবে (বায়হাকী , মিশকাত বাংলা- ৫১৪৩) আনাস (রাঃ) বলেন, আমি রাসূল (সাঃ) কে বলতে শুনেছি ক্বিয়ামতের আলামত সমূহের মধ্যে রয়েছে (১) বিদ্যা উঠে যাবে (২) মূর্খতা বেড়ে যাবে (৩) ব্যাভিচার বেশী হবে (৪) মদ্যপান বৃদ্ধি পাবে (৫) পুরুষের সংখ্যা কমে যাবে (৬) নারীর সংখ্যা বেশি হয়ে যাবে এমন কি একজন পুরুষ ৫০ জন মহিলার পরিচালক হবে। (বুখারী ও মুসলিম-৫২০৩) আনাস (রাঃ) বলেন, নবী করিম (সাঃ) বলেছেন- যখন আমার উম্মত নেশাদার দ্রব্য পান করবে, গায়িকাদের েিনয় নাচ গানে মত্ত হবে এবং বাদ্যযন্ত্র নিয়ে ব্যস্ত হবে তখন অবশ্যই তিনটি ভয়াবহ বিপদ নেমে আসবে (১) বিভিন্ন এলাকায় ভ‚মি ধসে যাবে। (২) উপর থেকে অথবা কোন জাতির পক্ষ থেকে যুলুম অত্যাচার চাপিয়ে দেওয়া হবে। (৩) অনেকের পাপের দরুন আকার আকৃতি বিকৃত করা হবে। আর এ গজবের (আযাবের) মূল কারণঃ তিনটি (১) মদপান করা (২) নায়িকাদের নিয়ে নাচ গানে মত্ত হওয়া (৩) বাদ্য যন্ত্রের প্রতি আগ্রহী হওয়া। আল্লাহ আমাদের এ জীবন, সমাজ ও ঈমান বিধ্বংসী মরনাস্ত্র থেকে হেফাজত করুন। যুবসমাজ যেন নষ্ট-নর্দমার এই অভিশাপ থেকে বাঁচতে পারে আল্লাহ সেই তাওফিক দান করুন।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর