Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২০, ২৩ আষাঢ় ১৪২৭, ১৫ যিলক্বদ ১৪৪১ হিজরী

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় প্রশংসনীয় উদ্যোগ

প্রকাশের সময় : ২৩ এপ্রিল, ২০১৬, ১২:০০ এএম

দেশে জ্বালানি সংকট দিন দিন তীব্র হয়ে উঠছে। গ্যাস চালিত যানবাহন থেকে শুরু করে গৃহস্থালির কাজে ব্যবহৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সংকটের কথা সকলেরই জানা। এ পরিপ্রেক্ষিতে বিকল্প হিসেবে লিকুইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজি ব্যবহারের তাকিদ জোরেশোরে উচ্চারিত হচ্ছে। সরকারও বিষয়টি নিয়ে অগ্রসর চিন্তা-ভাবনার পরিচয় দিয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে প্রাকৃতিক গ্যাস সংকট আরো অধিক তীব্র হয়ে উঠার আগেই সিলিন্ডারে গ্যাস সরবরাহ করার পরিকল্পনা করেছে। এজন্য বেসরকারি খাতে এলপিজি গ্যাস স্টেশন স্থাপনের অনুমতিও দিয়েছে। দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকোকে ইতোমধ্যে ৫০০টি এলপিজি গ্যাস স্টেশন স্থাপনের অনুমতি দেয়া হয়েছে। অনুমতি পাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটি আগামী জুলাই মাসে তার প্রথম এলপিজি গ্যাস স্টেশন চালু করবে। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ৩৫টি প্রতিষ্ঠানকে এই স্টেশন চালু করার লাইসেন্স প্রদান করেছে। এর মধ্যে ১০টি তাদের কাজ শুরু করেছে। বেক্সিমকোসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সিলিন্ডারে গ্যাস সরবরাহের জন্য এলপিজি গ্যাস স্টেশন স্থাপনের বিষয়টি অত্যান্ত ইতিবাচক একটি পদক্ষেপ। এ ব্যাপারে বেক্সিমকোর ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান বলেছেন, দেশে প্রাকৃতিক গ্যাস প্রাপ্তির সুযোগ দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রতিবছর ৬ থেকে ৭ ভাগ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে প্রাকৃতিক গ্যাস ও জ্বালানি সরবরাহ ক্রমেই নিম্নমুখী হচ্ছে, যা এ অগ্রগামিতা পিছিয়ে দিচ্ছে। এ অবস্থায় এলপিজি ব্যবহারের বিকল্প নেই। দেশের জ্বালানি সংকট নিরসনে এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা সময়ের দাবি। বলার অপেক্ষা রাখে না, বিশ্ববাজারে এলপিজি’র দাম ২০১১ সাল থেকে নিম্নমুখী। টন প্রতি ১৪০০ ডলার থেকে ৩৫০ ডলারে নেমেছে। আগামী চার-পাঁচ বছরে এই দাম স্থিতিশীল থাকবে। এমনকি জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পেলেও এলপিজি’র দাম বৃদ্ধি পাবে না। এখন যদি এলপিজি’র ব্যাপক প্রচলন শুরু করা যায়, তবে দেশের জ্বালানি সংকট যেমন দূর হবে, তেমনি প্রাকৃতিক গ্যাসের উপর থেকেও চাপ কমবে।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় উন্নত বিশ্বে এলপিজি’র ব্যবহার অনেক আগে থেকেই চলে আসছে। পার্শ্ববর্তী ভারতসহ শতাধিক দেশে এখন এই গ্যাস ব্যবহার করা হচ্ছে। আমাদের দেশে এলপিজি’র ধারণা নতুন হলেও স্বল্প পরিসরে এর ব্যবহার বেশ কয়েক বছর আগে থেকে শুরু হয়েছে। এর চাহিদাও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এক হিসাবে দেখা যায়, রান্না ও শিল্প-কারখানায় এর ব্যাপক চাহিদার বিপরীতে ২০১৫ সালে মাত্র ১.৬ লাখ টন সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে। এর মধ্যে ১.৪২ লাখ টন আমদানি করা এবং ১৮ হাজার টন সরকারের বিভিন্ন কারখানা সরবরাহ করেছে। লক্ষ্য করা গেছে, শহর ও গ্রাম-গঞ্জে, বিশেষ করে যেসব এলাকায় গ্যাস সংযোগ নেই, সেসব এলাকায় এলপিজি ব্যবহার শুরু হয়েছে। এতে দেশের বর্তমান প্রাকৃতিক গ্যাস মজুদের ওপর থেকে কিছুটা চাপ কমার পাশাপাশি জ্বালানি কাজে ব্যবহৃত পরিবেশবান্ধব গাছপালা কাটাও হ্রাস পাচ্ছে। এ বাস্তবতায়, সিলিন্ডারে এলপিজি ব্যবহার ব্যাপক হারে বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। তবে প্রয়োজনের তুলনায় এলপিজি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা খুবই নগণ্য। হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এই সিলিন্ডার গ্যাস সরবরাহ করছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বসুন্ধরা, যমুনা, টোটালগ্যাজ উল্লেখযোগ্য। সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, এসব সিলিন্ডার গ্যাসের মূল্য নির্ধারণে সরকারের নির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা না থাকায় একেক প্রতিষ্ঠান একেক রকম মূল্যে বিক্রয় করছে। কেউ একই পরিমাণের গ্যাস সিলিন্ডারের মূল্য বেশি রাখছে, কেউ কম রাখছে। একই সাথে গ্যাস সিলিন্ডারের মান নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি নিখুঁত না হওয়ায় অনেক সময় বাসাবাড়িতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে হতাহতের ঘটনাও ঘটছে। এর দায়দায়িত্ব যেমন প্রতিষ্ঠানগুলো নিচ্ছে না, তেমনি সরকারের তরফ থেকে প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেয়া হচ্ছে না। এ কথা অনস্বীকার্য, আমাদের প্রাকৃতিক গ্যাস ও খনিজ সম্পদের ঘাটতি রয়েছে। মজুদ ফুরিয়ে আসছে। যদিও একটা সময় বলা হয়েছে, বাংলাদেশ গ্যাসের উপর ভাসছে এবং মাটির নিচে প্রচুর তেল ও অন্যান্য খনিজ সম্পদ রয়েছে, পরবর্তীতে দেখা গেছে এসবই অন্তঃসারশূন্য কথাবার্তা। গ্যাসের বর্তমান তীব্র সংকট থেকে তা বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না। এখন তো নতুন কোনো গ্যাস সংযোগই দেয়া হচ্ছে না। কেউ কেউ বলছেন, আগামী ২০-৩০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক গ্যাসের ভান্ডার ফুরিয়ে যাবে। এ প্রেক্ষিতে, বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলা অপরিহার্য। এলপিজি হতে পারে এর উত্তম বিকল্প। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে এখনই জোরেশোরে এ উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। বিশ্ববাজারে যেহেতু এলপিজি’র টন প্রতি মূল্য অনেক কম, তাই এখনই এলপিজি’র ব্যবহার বৃদ্ধির উপযুক্ত সময়। এতে দেশের প্রাকৃতিক গ্যাসের সাশ্রয় হবে এবং ভবিষ্যতে জ্বালানি সংকট মোকাবিলা সহজ হবে। বলাবাহুল্য, পাইপ লাইনের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহের কারণে বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতি এবং অপচয়ের একটি সংস্কৃতি আমাদের দেশে সুদীর্ঘকাল ধরে চলে আসছে। এলপিজি দেশব্যাপী চালু করলে অনিয়ম-দুর্নীতির সুযোগ কমে যাবে এবং মানুষও গ্যাস ব্যবহারে হিসাবী ও মিতব্যয়ী হবে।
এ কথা মানতেই হবে, এলপিজি গ্যাস স্টেশন স্থাপন এবং এর ব্যবহারের উপর গুরুত্ব দিয়ে সরকার অত্যন্ত দূরদৃষ্টি সম্পন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। সংকট শুরুর সময় থেকেই সংকট নিরসনের এ ধরনের অগ্রগামী চিন্তা প্রশংসনীয়। আরও প্রশংসনীয় বেক্সিমকোর মতো একটি সুপ্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানের উপর আস্থা রেখে এ দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। আমরা জানি, বেক্সিমকো ওষুধ শিল্পে পাইওনিয়ার। বিদেশে ওষুধ রপ্তানি করে রপ্তানি খাতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে চলেছে। এছাড়া গার্মেন্টস শিল্পেও তার ব্যাপক সুনাম ও সুখ্যাতি রয়েছে। কাজেই এলপিজি’র প্রসারের ক্ষেত্রেও যে প্রতিষ্ঠানটি সক্ষম হবে, তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠানটি অন্যান্য এলপিজি প্রতিষ্ঠানের সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে এলপিজি বাস্তবায়ন এবং এর সেবা দ্রুতই সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে যাবে বলে আমাদের দৃঢ়বিশ্বাস। আমরা মনে করি, এ ক্ষেত্রে সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংক যথাযথ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবে। পাশাপাশি অতিসত্বর এলপিজি’র সরবরাহ ও বিপণনের একটি নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে, যাতে গ্রাহকরা ন্যায্যমূল্যে এবং নিরাপদে এলপিজি পেতে পারে।

 

 

 

 

 

 

 

 

 



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় প্রশংসনীয় উদ্যোগ
আরও পড়ুন