Inqilab Logo

ঢাকা, শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৬ আশ্বিন ১৪২৫, ১০ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

চট্টগ্রামে অবৈধ অস্ত্রের ছড়াছড়ি উদ্ধারে নেই বিশেষ অভিযান

রফিকুল ইসলাম সেলিম | প্রকাশের সময় : ৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৮, ১২:০২ এএম

বন্দরনগরীসহ বৃহত্তর চট্টগ্রামে অবৈধ অস্ত্রের ছড়াছড়ি হলেও উদ্ধারে নেই বিশেষ অভিযান। র‌্যাব-পুলিশের নিয়মিত অভিযানে যা ধরা পড়ছে তা নিয়েই সন্তষ্ট সবাই। সীমান্ত পথে অস্ত্র আসছে, আবার দেশেও তৈরী হচ্ছে। তবে এসব অস্ত্র পাচারকারী সিন্ডিকেটের সদস্যরা অধরা থেকে যাচ্ছে। ফলে বন্ধ হচ্ছে না অবৈধ অস্ত্র ব্যবসা।
সমৃদ্ধ হচ্ছে পাতাল জগতের বাসিন্দাদের অস্ত্র গোলাবারুদের ভান্ডার। এই অঞ্চলে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহারও বাড়ছে। ডাকাতি, দস্যুতা, ছিনতাই, মাদক ব্যবসা ও খুনের ঘটনায় আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার হচ্ছে। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রতিনিয়ত ব্রাশফায়ারে খুনের ঘটনায় এক ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। অবৈধ অস্ত্রের বিস্তারে জনমনে আতঙ্ক আর নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। সামনে জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে রাজপথে উত্তাপ বাড়বে। আর সেই সময় অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহারও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। যদিও এই অঞ্চলের র‌্যাব-পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, নিয়মিত অভিযানে অস্ত্র উদ্ধার এবং অস্ত্রধারীদের পাকড়াও করা হচ্ছে। প্রয়োজনে যে কোন সময় বিশেষ অভিযানও পরিচালনা করা হবে।
জানা যায়, চট্টগ্রাম অঞ্চলে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে। ছিনতাই, ডাকাতি, দস্যুতার মতো ঘটনাতেও অস্ত্র ব্যবহার হচ্ছে। মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে পাওয়া যাচ্ছে অস্ত্র গোলা বারুদ। উঠতি তরুণ আর কিশোর অপরাধীদের হাতেও উঠে আসছে দেশি-বিদেশি অস্ত্র। সম্প্রতি নগরীতে কয়েকটি খুন ও ছিনতাইয়ের ঘটনায় কিশোর অপরাধীদের হাতে অস্ত্র দেখা গেছে। চেক পাস্টে পুলিশকে গুলি করে পালানোর ঘটনায় একটি অস্ত্রও উদ্ধার করে পুলিশ। ওই ঘটনায় জড়িত ১০ জনই উঠতি যুবক ও কিশোর। নগরীর জামালখানে কলেজিয়েট স্কুলের ছাত্র খুনের ঘটনায়ও কিশোরদের অস্ত্র ব্যবহার করতে দেখা গেছে। ওই ঘটনাসহ কয়েকটি ঘটনায় দেখা গেছে সন্ত্রাসীরা নিজেদের আধিপত্য বিস্তারে ছোটদের হাতে অস্ত্র তুলে দিচ্ছে।
বিশেষ করে রাজনৈতিক দলের পাড়াভিত্তিক ক্যাডার মাস্তানরা নিজেদের প্রভাব বিস্তার ও দলভারি করতে স্কুল-কলেজে পড়–য়াদের হাতে অস্ত্র দিচ্ছে। গেল ঈদুল ফিতরের পরদিন নগরীর পল্টন রোডে এক যুবলীগ কর্মীকে হত্যা করা হয়। ওই খুনের ঘটনায়ও অস্ত্রধারীদের মহড়া দিতে দেখা যায়। পরে এক সন্ত্রাসীর কাছ থেকে অস্ত্রও উদ্ধার করে পুলিশ। সরকারি দলের ক্যাডার মাস্তানরা নগরীর বিভিন্ন এলাকায় এবং ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তারে প্রায়ই দেশি-বিদেশি অস্ত্রের মহড়া দিচ্ছে। তবে এসব অস্ত্র উদ্ধারে পুলিশকে তৎপর হতে দেখা যায় না। নগরীর সিআরবিতে টেন্ডারবাজি নিয়ে ছাত্রলীগ-যুবলীগের বন্দুকযুদ্ধে জোড়া খুনের ঘটনায় বেশ কয়েকটি অস্ত্র ব্যবহার হলেও তার একটিও উদ্ধার হয়নি।
নগরীর গোসাইল ডাঙ্গা ওয়ার্ডে সস্প্রতি উপ-নির্বাচনে প্রকাশ্যে ভারী অস্ত্রের মহড়া দেয় সরকারি দলের সমর্থিত এক কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকেরা। তাদের কাউকে পুলিশ গ্রেফতার করেনি। চট্টগ্রাম জেলা এবং তিন পার্বত্য জেলাতেও অস্ত্রের ভয়ঙ্কর বিস্তার ঘটছে। বিশেষ করে পার্বত্য জেলায় পাহাড়ি সন্ত্রাসী গ্রæপগুলো তাদের গোপন অস্ত্রভান্ডার সমৃদ্ধ করে তুলছে। পাহাড়ে প্রতিনিয়ত খুনের ঘটনায় ভারী অস্ত্রের ব্যবহার হচ্ছে। চট্টগ্রাম মহানগরীর আইসফ্যাক্টরি রোডে মাদক ব্যবসায়ীর আস্তানা থেকে একে-২২ রাইফেলের মতো ভারী অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনাও ঘটেছে।
কয়েক বছর আগে নগরীর সদরঘাটে ছিনতাইয়ের সময় দুটি একে-২২ রাইফেল ফেলে পালিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা। ছিনতাইকারীদের হাতে বানানো বোমায় এক ছিনতাইকারী ও একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা মারা যান ওই ঘটনায়। পরে তদন্ত জানা যায় ওই ছিনতাইকারীরা ছিল নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামায়াতুল মোজাহেদীন বাংলাদেশ- জেএমবির সদস্য। তারা দলের ফান্ড মজবুত করতে ছিনতাই করছিল। তবে তাদের কাছ থেকে পাওয়া একে-২২ রাইফেলের উৎস অজানা থেকে যায়। এর আগে চট্টগ্রাম মহানগরী ছাড়াও হাটহাজারী ও বাঁশখালীর জঙ্গলে জঙ্গি আস্তানায় একে-২২ রাইফেলসহ ভারী অস্ত্র উদ্ধার করে র‌্যাব পুলিশ। মহানগরী এবং জেলার বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক দলের ক্যাডার মাস্তানদের কাছ থেকে উদ্ধার করা দেশি-বিদেশী অস্ত্র।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের সাথে আলাপ করে জানা যায়, সীমান্ত পথে অস্ত্র আসছে। এসব অস্ত্র এই অঞ্চলের কালো অস্ত্রের ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের হাত ধরে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় চলে যাচ্ছে। তিন পার্বত্য জেলায় তৎপর বিভিন্ন পাহাড়ি সন্ত্রাসীরাও অস্ত্র ব্যবসার সাথে জড়িত। দেশেও অস্ত্র তৈরী হচ্ছে। কক্সবাজারের মহেষখালী ও চকোরিয়া এবং চট্টগ্রামের বাঁশখালীর গহীন জঙ্গলে গড়ে উঠা কারখানায় অস্ত্র তৈরী হয়। র‌্যাবের অভিযানে এমন বেশ কয়েকটি অস্ত্র তৈরীর কারখানা আবিষ্কার হয়। মাঝে মধ্যে কিছু কারখানা উদ্ধার আর কিছু অস্ত্র তৈরীর কারিগর ধরা পড়লেও মূলহোতারা আড়ালে রয়ে যায়। জামিনে ছাড়া পেয়ে আবার তারা সংঘবদ্ধ হয়ে নতুনভাবে অস্ত্র তৈরী শুরু করে।
জানা যায়, সম্প্রতি সন্ত্রাসীদের কাছে পয়েন্ট ২২ বোর, ৭.৬৫ এবং পয়েন্ট নাইন এমএম পিস্তল জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বহনে সুবিধা ও দাম কম হওয়ায় সন্ত্রাসীরা এই সিরিজের অস্ত্রগুলো বেশি ব্যবহার করছে। নগরী এবং জেলায় চাঞ্চল্যকর কয়েকটি হত্যাকাÐে একই সিরিজের অস্ত্রগুলো ব্যবহৃত হয়েছে। এসব ক্ষুদ্র আগ্নেয়াস্ত্র আসছে যশোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও সাতক্ষীরা সীমান্ত হয়ে। র‌্যাব-৭ চট্টগ্রামের অভিযানে গত দেড় বছরে ৪৭১ টি বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। এই সময়ে মোট ৫৬ টি ম্যাগাজিন এবং ৫ হাজার ৭৯১ রাউন্ড বিভিন্ন ধরনের গুলি এবং কার্তুজ উদ্ধার হয়।
একই সময়ে পুলিশ কত সংখ্যক অস্ত্র উদ্ধার করেছে তার সঠিক হিসাব নেই। তবে নগরীর ১৬টি থানায় দেড় বছরে অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারের ঘটনায় ৪০৯টি মামলা হয়েছে। একই সময়ে চট্টগ্রাম রেঞ্জেরে ১১ জেলায় মামলা হয় ৯৩২টি। যে সংখ্যক অস্ত্র র‌্যাব-পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে তার কয়েকগুণ নিরাপদে পার হয়ে গেছে।

 



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ