Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৪ আশ্বিন ১৪২৫, ৮ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

বৃহত্তর ঐক্যের স্বার্থে ত্যাগ স্বীকার করতে হবে

মতবিনিময় সভায় মির্জা ফখরুল

স্টাফ রিপোর্টার | প্রকাশের সময় : ৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮, ১২:৩৯ এএম

গণতন্ত্রকে মুক্ত করতে হলে জাতীয় ঐক্যের বিকল্প নেই মন্তব্য করে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বৃহত্তর ঐক্যের স্বার্থে কিছু না কিছু ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। তিনি বলেন, আমাদের সব সময় মনে রাখতে হবে গ্রেটার ইউনিটি, বৃহত্তর যে ঐক্য সেই ঐক্য কখনোই হবে না, যদি না আমরা কিছু না কিছু ত্যাগ স্বীকার করি। ওই সব ছাড় দিয়ে আমাদেরকে আজকে একটা না একটা জায়গায় আসতে হবে। আমরা সেই চেষ্টাই করছি। গোটা দেশ এটাই চায়। অন্যান্য যারা আছেন তারাও বুঝেন এটা ছাড়া কোনো মুক্তি নেই। আমরা বিশ্বাস করি, অতি দ্রুত জাতীয় ঐক্য ইনশাল্লাহ প্রতিষ্ঠিত হবে এবং সমগ্র জাতি এই স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে জাতিকে মুক্ত করবার জন্যে, গণতন্ত্রকে মুক্ত করবার জন্যে এবং দেশনেত্রীকে মুক্ত করবার জন্যে তারা আন্দোলন করবে। গতকাল (শনিবার) দুপুরে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে মুক্তিযোদ্ধা দল আয়োজিত বর্তমান প্রেক্ষাপটে রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাদের করণীয় শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
মির্জা ফখরুল বলেন, গত ৩ ফেব্রুয়ারি বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সভায় দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন, আমি হয়ত কারাগারে চলে যাবো। কিন্তু আপনারা সমস্ত রাজনৈতিক দল ও সংগঠনগুলোকে নিয়ে একটা ঐক্য গড়ে তুলুন। সেই ঐক্যের মধ্য দিয়ে এই দানবকে পরাজিত করুন। সেই লক্ষ্যে আমরা তার নির্দেশ অনুযায়ী শান্তিময় বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে আমরা অন্যান্য সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে একটা জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার চেষ্টা করছি। প্রক্রিয়া চলছে। আমরা বিশ্বাস করি এটাতে আমরা সফল হবো। আমাদের সামনে এখন পথ একটাই জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। যার মাধ্যমে আমরা দানব সরকারকে পরাজিত করবো।
খালেদা জিয়ার অসুস্থতার বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব বলেন, কিছুদিন আগে আমি যখন কারাগারে দেশনেত্রীর সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম তখনই দেখেছি উনি ভীষণ অসুস্থ। এরপরে তার পরিবারের সদস্যরা বৃহস্পতিবার দেখা করে এসে একই কথা জানিয়েছেন। গত শুক্রবার আমাদের আইনজীবীরা গিয়েছিলেন, সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি জয়নুল আবেদিন জানিয়েছেন, বেগম খালেদা জিয়ার ওজন কমে গেছে, সোজা হতে পারেন না, বাম পা অবশ হয়ে গেছে। অথচ এর আগে ডাক্তাররা বলেছিলেন তাকে বিশেষায়িত হাসপাতালে নেয়ার জন্য, সরকার তা করেনি। উল্টো প্রধানমন্ত্রী যা বলছেন তা অত্যন্ত অমানবিক।
কারাগারে আদালত নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, প্রচলিত আইন অনিযায়ি কেউ অসুস্থ হলে তার বিচার কাজ হয় না। আদালতে কারাগার স্থানান্তর সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক ও মানবতাবিরোধী। ছোট একটি গুহার মতো ঘরে ক্যামেরা ট্রায়াল হচ্ছে। যেখানে আইনজীবীদের বসার মত জায়গা নেই। কেন তার সাথে এমনটা করা হচ্ছে? বেগম জিয়ার অপরাধ তিনি গণতন্ত্রের জন্য, স্বাধীন, সার্বভৌমত্বের জন্য লড়াই, সংগ্রাম করছেন। আর তার (শেখ হাসিনা) দলের লোকেরা বলেন তিনি গণতন্ত্রের মানস কন্যা। যিনি গণতন্ত্রকে গলা টিপে হত্যা করেছেন, তাকে বলা হচ্ছে গণতন্ত্রের মানস কন্যা।
মির্জা ফখরুল বলেন, প্রধানমন্ত্রী নাকী বলেছেন জিয়াউর রহমান এই ধরনের বিচার করেছিলেন। না জিয়াউর রহমান সাহেবের সেই ধরনের বিচার করেনি। বিচারটা হয়েছিলো মার্শাল ‘ল অধীনে। বিচারপতি আবু সাহাদাত মো. সায়েম ওই সময়ে প্রেসিডেন্ট ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ছিলেন। সুতরাং মানুষকে বিভ্রান্ত করে ভুল বুঝানো চলবে না।
আওয়ামী লীগ সরকার জনগণ থেকে অনেক দ‚রে চলে গেছে মন্তব্য করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, এ সরকার আর টিকতে পারবে না। আওয়ামীলীগ পরাজিত হতে শুরু করেছে। এদের পতন আসন্ন। এজন্য তারা পালাবার পথ খুঁজছে। তারা রাজনৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়ে গেছে। পাগলের মত আচরণ করছে। তিনি বলেন, দেশ এখন সবচেয়ে সঙ্কটময় ম‚হুর্ত পার করছে। স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র থাকবে কিনা তা নির্ভর করছে আগামী কিছুদিনের ওপর। ভয়াবহ এই দানবের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করতে হবে। কেউ এসে করে দেবে এমন ভাবলে হবে না, আমাদেরকেই করতে হবে, দাঁড়াতে হবে।
ফখরুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, বিভিন্ন জায়গায়, থানা-ওয়ার্ড, গ্রামে-ইউনিয়নে সারাদেশে যে মামলা হচ্ছে সেগুলোর একই রকম কথা। মনে হয় যেন ফরমেট তৈরি করে দিয়েছে, সেই ফরমেটে এফআইআরগুলো তৈরি করা হয়েছে। তারা নিজেরাই কিছু ককটেল-টকটেল ফুটাচ্ছেন, ফুটিয়ে সব কিছুর অবশিষ্টাংশ সেটাকে নিচ্ছেন, রাস্তা থেকে কয়েকটা পাথর কুঁড়িয়ে নিচ্ছেন, কয়েকটা লাঠি আনছেন। বলছেন আলামত পাওয়া গেছে। আসলে সেখানে কোনো ঘটনাই ঘটেনি। এই যে একটা ভয়াবহ মিথ্যাচারের মধ্য দিয়ে গোটা জাতিকে জিম্মি করা হচ্ছে শুধুমাত্র তার ও তার দলের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার জন্য। এভাবে মিথ্যা মামলা দিয়ে গোটা দেশে একটা নরকের মতো অবস্থা তৈরি করে ফেলা হয়েছে। দেশে এখন ভয়াবহ মিথ্যাচার চলছে। সরকার গোটা জাতিকে জিম্মি করে তাদের ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা করছে। তারা একটা কথিত নির্বাচন করতে চায়। কিন্তু দেশের মানুষ এধরণের কোন নির্বাচন মেনে নেবে না।
মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতি ইশতিয়াক আজিজ উলফাতের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক সাদেক আহমেদ খানের পরিচালনায় মতবিনিময় সভার উদ্বোধন করেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। বক্তব্য রাখেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অবঃ) হাফিজ উদ্দীন আহমেদ, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আব্দুস সালাম, মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক সম্পাদক জয়নুল আবেদীন প্রমুখ।
কাজী জাফরের অভাব আমরা অনুভব করি:
জাতীয় রাজনীতিতে জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) চেয়ারম্যান মরহুম কাজী জাফর আহমেদের অনুপস্থিতি প্রতিমূহুর্তে অনুভব করার কথা জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, দেশের এই কঠিন মূহুর্তে, সঙ্কটকালে যদি আমি কাজী জাফর আহমেদকে সাথে পেতাম তাহলে আমরা অনেক শক্তিশালী হতাম। গতকাল বিকেলে জাতীয় প্র্রেসক্লাবে ২০ দলীয় জোটের মরহুম নেতা কাজী জাফর আহমেদের তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
মির্জা ফখরুল বলেন, জীবনে শেষ সময়ে কাজী জাফর আহমেদ আমাকে বলেছিলেন, কখনো গণতন্ত্র, দেশের জনগণের বিপক্ষে যেওনা। জনগণকে সাথে নিয়ে সত্যের পথে, ন্যায়ের জন্য লড়াই করবে। বেগম খালেদা জিয়ার সাথে সব সময় থাকবে। তিনিই দেশে এখন একমাত্র ব্যক্তি ও নেতা যিনি দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করতে পারে। তার শত্রæরা তার সম্পর্কে কত রকম কথা বলেছেন। কিন্তু শেষ দিন পর্যন্ত কাজী জাফর আহমেদ মানুষের জন্য, জনগণের জন্য কথা বলেছেন, চিন্তা করেছেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে তিনি একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র। তার নেতৃত্বে গড়ে দেশে বড় বড় আন্দোলন গড়ে ওঠেছিল। নেতৃত্বের সমস্ত গুণাবলী ছিল তার মধ্যে। বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি সকলকে আকৃষ্ট করতেন, বিশেষ করে ছাত্র ও শ্রমজীবী মানুষকে। শ্রমিক আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা ছিলেন কাজী জাফর আহমেদ। টঙ্গীতে একটি শ্রমিক আন্দোলন জড়িয়ে পরার কারণে সেখানে তিনি এখনো স্মরণীয় হয়ে আছেন। কাজী জাফর তার কাজের মাধ্যমে প্রতিবাদ ও সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। রাজনৈতিক কারণে তিনি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান করতেন। তিনি যেখানেই অবস্থান করতেন না কেন জনগণের থেকে বিচ্ছিন্ন হননি। জনগণের সাথেই সব সময় ছিলেন।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, কাজী জাফর জীবিত থাকা অবস্থায় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে একই সময়ে দুই দিকে লড়াই করতে হয়েছে। একদিকে লড়াই করেছেন ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে, আর অন্যদিকে তার নিজের দলের হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে তার দলকে গণতন্ত্রের পক্ষে নিয়ে এসেছেন। সে সময় তার সিদ্ধান্ত অত্যন্ত সাহসী সিদ্ধান্ত ছিল। কারণ তখন সরকার সব দালালদের টেনে নেয়া শুরু করেছিল। তাদেরকে অর্থ, বিত্ত, মন্ত্রীত্বের লোভ দেখিয়ে দলে টানছিল। কিন্তু কাজী জাফর আহমদ সাহেব কোন লোভের কাছে বলি দেননি।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে কাজী জাফর কিংবদন্তি মন্তব্য করে বিএনপির এই নেতা বলেন, লক্ষ্যে পৌছানোর জন্য অনেকগুলো কৌশল অবলম্বন করতেন। সেই কৌশলগুলো ছিল সত্যিকার অর্থে রাজনৈতিক চিন্তা ধারার মাধ্যমে নেয়া। ৪ দলীয় যে জোট গঠন হয়েছিল এর মূল উদ্যোক্তা ছিলেন কাজী জাফর আহমেদ। যখনই দেশের কোন প্রয়োজন, সঙ্কট দেখা দিয়েছে তিনি সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন। তিনি আপাদমস্তক একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন। রাজনীতি ছাড়া অন্য চিন্তা করতেন না।
জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) আয়োজিত এই আলোচনা সভায় দলটির মহাসচিব মোস্তফা জামাল হায়দারের সভাপতিত্বে ও যুগ্ম মহাসচিব এএসএম শামীমের পরিচালনায় দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য এসএমএম আলম, আহসান হাবিব লিংকন, নওয়াব আলী আব্বাস, মাওলানা রুহুল আমীন, সেলিম মাস্টার, মরহুম নেতা কাজী জাফর আহমদের মেয়ে কাজী জয়া প্রমূখ বক্তব্য রাখেন। ২০ দলীয় জোট নেতাদের মধ্যে এলডিপির রেদোয়ান আহমেদ, প্রফেসর মোহাম্মদ আবদুল্লাহ, এনপিপির ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, এনডিপির খন্দকার গোলাম মূর্তজা, জাগপার তাসমিয়া প্রধান,খন্দকার লুৎফর রহমান, ন্যাপের গোলাম মোস্তফা ভুঁইয়া, ডিএলের সাইফুদ্দিন মনি, বিএনপির ইসমাইল হোসেন বেঙ্গল আলোচনায় অংশ নেন।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ