Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮, ৩০ কার্তিক ১৪২৫, ০৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী

এনপিএসর ট্রানজিট পয়েন্ট শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর

সাখাওয়াত হোসেন | প্রকাশের সময় : ১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৮, ১২:০২ এএম

## বিমান বন্দরে মাত্র ৮দিনের ব্যবধানে গতকাল ১৬০ কেজি মাদক জব্দ
## তিনটি চক্রকে শনাক্ত করতে মাঠে নেমেছে গোয়েন্দা সংস্থার একাধিক টিম
## এটি সেবনকারীর মৃত্যু ঘটাতে পারে, বাড়িয়ে দেয় আত্মহত্যার প্রবণতাও

নতুন মাদক এনপিএসর ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। প্রভাবশালী একাধিক চক্র তিন বছর ধরে নতুন মাদক নিউ সাইকোঅ্যাকটিভ সাবস্টেন্সেস (এনপিএস) আমদানি করছে। সম্প্রতি সময়ে দু’টি চালান ধরা পড়লেও এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি বড় চালান বাংলাদেশ হয়ে চলে গেছে ইউরোপ, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়া। আন্তর্জাতিক মাদককারবারিরা বাংলাদেশকে ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করলেও এ চক্রের সাথে জড়িত তিনটি চক্রকে শনাক্ত করতে মাঠে নেমেছে মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর ও গোয়েন্দা সংস্থার একাধিক টিম। ট্রানজিট পয়েন্টের পাশাপাশি দেশে এ মাদক ব্যবহারের কিছু তথ্যও পেয়েছেন তদন্তের সাথে জড়িতরা। অন্যদিকে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মাত্র আট দিনের ব্যবধানের নতুন ধরনের মাদক ‘খাট’ বা এনপিএস আটকের ঘটনা ঘটেছে। ঢাকা কাস্টম হাউস ও জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার যৌথ অভিযানে প্রায় ১৬০ কেজি ‘খাট’ আটক করা হয়। গতকাল বেলা দুইটার দিকে বিমানবন্দরের কার্গো ইউনিটের ফরেন পোস্ট অফিস থেকে খাটের চালানটি জব্দ করা হলেও এর সঙ্গে জড়িত কাউকে আটক করা যায়নি। ৮দিন আগে ৩১ আগস্ট দুপুরে শাহজালাল বিমানবন্দরের কার্গো এলাকা-সংলগ্ন রানওয়ের পাশে ৪৬৭ কেজি খাটের চালান জব্দ করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। এর সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে নাজিমউদ্দিন (৪৫) নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়। ওই দিন সন্ধ্যার দিকে নাজিমউদ্দিনের শান্তিনগরের কার্যালয়ে ‘নওশিন এন্টারপ্রাইজ’ থেকে আরও ৩৯৪ কেজি খাট জব্দ করা হয়। ৮৬১ কেজি খাটের চালান বাংলাদেশে পাঠিয়েছিল ইথিওপিয়ার আদ্দিস আবাবার জিয়াদ মুহাম্মদ ইউসুফ নামের এক ব্যক্তি। গতকাল জব্দ হওয়া খাটের চালানটির রপ্তানিকারক জিয়াদ মুহাম্মদ। তবে আমদানিকারক হিসেবে এশা এন্টারপ্রাইজ, হাউস নম্বর-২৮, রোড-০২, বøক-ডি, বাদলদী, তুরাগ, ঢাকা-১২৩০ ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে।
মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর ও গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, প্রাণঘাতী ইয়াবার চেয়েও ভয়ঙ্কর এনপিএস মাদক। সারাবিশ্বে এটি ইয়াবাকেও ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্বে মাদক সেবনপ্রবণ ৮০টি দেশ এবং অঞ্চলে জরিপ করে ৭০টিতেই এনপিএসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
সূত্র জানায়, জাতিসংঘ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ইউনাইটেড নেশনস অফিস অন ড্রাগস অ্যান্ড ক্রাইম (ইউএনওডিসি) এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে ২০১৫ সালে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, এনপিএস সেবনকারী একটা সময় আত্মহননের পথ বেছে নেয়। ২০১২ সালে এনপিএস নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ইউএনওডিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এনপিএসে আসক্ত ব্যক্তি মানসিক বৈকল্যে ভুগতে থাকেন, সামাজিকভাবে নিজেকে নিঃসঙ্গ মনে করেন এবং কর্মস্পৃহা হারিয়ে ফেলেন। একসময় তার কাছে বেঁচে থাকা অপ্রয়োজনীয় মনে হয় এবং তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। বিশ্বের অনেক দেশই স্থায়ীভাবে এনপিএস নিয়ন্ত্রণ করছে অথবা অস্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করেছে। ইউএনওডিসির ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বিশ্ব একটি ভীতিকর নতুন মাদক সমস্যা প্রত্যক্ষ করছে। এনপিএস তৈরির উপাদানগুলো বৈধ। এসব উপাদান গবেষণাগারে, বাথ সল্ট হিসেবে বিক্রি করা যায়। এনপিএসের ব্যবহার ব্যাপক মাত্রা পেলে যুবসমাজ ধ্বংসের চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হবে। জনস্বাস্থ্য পুরোপুরি হুমকির মুখে পড়বে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক (গোয়েন্দা) মো. নজরুল ইসলাম সিকদার বলেন, আমদানির সময় গ্রিন-টি বা খাত নামে লোগো লাগানো হয়। খাত হলো ক্যাথিনোন গ্রæপের উদ্ভিদজাতীয় পদার্থ, যা এনপিএস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এটি চিবিয়ে অথবা চায়ের মতো খাওয়া হয়। এটি স্টিমুলেন্ট ড্রাগ বা ইয়াবার উপাদান। বড় যে চালানটি ধরা হয়েছে সেই চালানটি আমেরিকা, ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়ায় পাচারের পরিকল্পনা ছিল চক্রটির।
তিনি বলেন, আমরা আরও গভীরে যাচ্ছি। গ্রেফতারকৃত ব্যক্তি আগেও এ ধরনের চালান এনেছেন কিনা এবং তিনি কী ধরনের ব্যবসা করতেন, সে বিষয়ে তদন্ত চলছে। এ চক্রের সাথে আরো লোকজন জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। সব কিছু মাথায় রেখেই তদন্ত হচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, এনপিএস তৈরির প্রক্রিয়া যত জটিল, তার চেয়েও বেশি জটিল হবে দেশে এটি একবার তৈরি হলে তা প্রতিরোধ করা। দেশে প্রাথমিকভাবে এটির ব্যবহার হয়েছে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। কারা দেশে এ ধরনের মাদক ব্যবহার ও সরবরাহ করছে এ বিষয়ে তদন্ত চলছে। আমাদের দেশে প্রথম যখন এনপিএস’র অস্তিত্ব পাওয়া গেলো তখন একদিনেই মিললো ৮৬১ কেজি। এটি কাকতালীয় নয়। এ থেকে এটা স্পষ্ট যে, এনপিএস আরও আগে থেকে আসছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
এক প্রশ্নের জবাবে ওই কর্মকর্তা বলেন, ২০১৬ সাল থেকে একাধিক মাদক চোরাকারবারী চক্র এ মাদক বাংলাদেশে নিয়ে আসছে। আন্তর্জাতিক মাদককারবারিদের সহযোগিতায় বাংলাদেশকে ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করলেও এ চক্রের সদস্যরা এটি দেশে ব্যবহার করার বিষয়টি প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। এদের শনাক্ত করে দ্রæত আইনের আওতায় আনা সম্ভব হলে এনপিএস মাদক প্রতিরোধ করা সম্ভব বলে ওই কর্মকর্তা মন্তব্য করেন।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ