Inqilab Logo

ঢাকা, শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ০২ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ০৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী

সড়কশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় স্কাউটসহ স্বেচ্ছাকর্মীদের মহতী উদ্যোগ

| প্রকাশের সময় : ১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৮, ১২:০২ এএম

শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীদের সপ্তাহ খানেকের নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে, আশাবাদী হতে অনুপ্রাণিত করেছে। তারা ওই ক’দিন সড়কশৃংখলা প্রতিষ্ঠা ও ট্রাফিকব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনায় যে ভূমিকা রেখেছে, তা অভূতপূর্ব ও নজিরবিহীন। তারা রাজধানীর রাজপথে ট্রাফিকের দায়িত্ব নিয়ে লাইসেন্সবিহীন, ফিটনেসবিহীন গাড়ি ধরেছে, অনেক আমলা, মন্ত্রী ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির লজ্জায় ফেলিয়েছে, তারা ট্রাফিক আইন মানতে বিভিন্ন যানবাহন ও পথচারিদের বাধ্য করেছে। এতে কিছুটা হলেও সড়কে শৃংখলা লক্ষ্য করা গেছে, যানজট কমতে দেখা গেছে। সড়কে বেপরোয়া বিশৃংখলা ও দু:সহ যানজট নিরসন অসম্ভব, এই ধারণা তারা বদলে দিয়েছে। শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীদের এই ‘পথ দেখানোকে’ গোটা দেশের মানুষ সমর্থন জানিয়েছে, তাদের অভিনন্দন ও ধন্যবাদ জানিয়েছে। তাদের এই আন্দোলন সরকার ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে যেমন নাড়া ফেলেছে তেমনি জনগণ পর্যায়েও সচেতনতা বৃদ্ধি করেছে। এর ফল হিসাবে আইনশৃংখলা বাহিনীর পক্ষ থেকে ট্রাফিক সপ্তাহ পালনসহ সড়কশৃংখলা প্রতিষ্ঠায় বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, সড়ক নিরাপত্তা আইন সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। দু:খজনক হলেও বলতে হচ্ছে, শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীদের এই অরাজনৈতিক ও মহতী আন্দোলনকে শেষ দিকে রাজনৈতিক রং দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। হামলা-মামলা- গ্রেফতার ইত্যাদিও হয়েছে। তারপরও বলতে হবে, তাদের আন্দোলন বিফলে যায়নি। পরবর্তীতে গৃহীত বিভিন্ন ইতিবাচক উদ্যোগ ও পদক্ষেপ তার প্রমাণ বহন করে। এই আন্দোলনেরই অনুপ্রেরণায় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ও সড়কশৃংখলা প্রতিষ্ঠার ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে যোগ দিয়েছে স্কাউট, রোভার স্কাউট, গার্লস গাইড ও বিএনসিসির সদস্যরা। তারা গত কয়েকদিন ধরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ও পয়েন্টে কাজ করছে। তারা মূলত জেব্রাক্রসিং ও ফুটওভারব্রিজ ব্যবহারে পথচারীদের নির্দেশনা ও সহযোগিতা দিচ্ছে। তাদের এই স্বেচ্ছকর্মের কারণে রাস্তা পারাপারে শৃংখলার পাশাপাশি যানজট কিছুটা হলেও কমে এসেছে। স্কাউট, রোডার স্কাউট, গার্লস গাইড ও বিএনসিসির সদস্যরা বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী। তারা স্বেচ্ছায় এ জনহিতকর কর্মে ব্রতী হয়েছে। তাদের অকুণ্ঠিতচিত্তে আমরা সাধুবাদ জানাই।
নিরাপদ সড়ক চাই, এখন একটা প্রধান জাতীয় দাবি। সড়কে প্রতিদিনই দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটছে। গত ঈদের সময় মাত্র ১৩ দিনে দু’শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে সড়ক দুর্ঘটনায়। আহতের সংখ্যা এর কয়েকগুণ বেশি। এরপরও এমন কোনো দিন নেই, যেদিন সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষ হতাহত না হচ্ছে। সড়কে মৃত্যুর মিছিল কোনোভাবেই থামানো সম্ভব হচ্ছে না। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে যানজট ও অশেষ ভোগান্তি। সড়ক-মহাসড়কগুলোতে যানজট প্রতিদিনের সাধারণ বাস্তবতা। এতে যাত্রীদের অপরিমেয় দুর্ভোগের শিকার হতে হচ্ছে। মালামাল পরিবহন ব্যহত ও বিলম্বিত হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের বিপুল অংকের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। পণ্যমূল্যে যুক্ত হচ্ছে এই ক্ষতির অংক। আর তার অনিবার্য খেসারত দিতে হচ্ছে ক্রেতা-ভোক্তাদের। যানজটে বার্ষিক ক্ষতির পরিমাণ কত, বিভিন্ন সংস্থার গবেষণা ও সমীক্ষায় তার বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। আমরা এখানে তার পুনরাবৃত্তি করতে চাই না। অর্থনীতিকদের মতে, এই ক্ষতি যদি নিরোধ করা সম্ভব হতো, তাহলে জিডিপিতে এক থেকে দেড় শতাংশ প্রবৃদ্ধি ঘটতো। ঢাকা বাংলাদেশের রাজধানী ও প্রধান শহর। এই শহরটি যানজটের নির্বিচার শিকার। প্রতিদিন যানজটে এখানে কোটি টাকার ক্ষতি ও বিপুল কর্মঘণ্টা বিনষ্ট হয়। এছাড়া দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ও যখন-তখন ঘটতে দেখা যায়। এ ব্যাপারে সকলেই একমত যে, দুর্ঘটনা, সড়কবিশৃংখলা ও যানজটের জন্য শুধু চালক ও ফিটনেসবিহীন গাড়িই দায়ী নয়, যাত্রী-পথচারীরাও দায়ী। চালক ও গাড়ি ঠিক হলেই যে দুর্ঘটনা ও যানজট কমবে সে নিশ্চয়তা দেয়া যায় না। যদি যাত্রী ও পথচারীরা সতর্ক-সচেতন হয় ও ট্রাফিক আইন চলে তবেই সেটা সম্ভব হতে পারে। নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ। স্বীকার করতে হবে, চলাচল ও সড়ক ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমাদের নাগরিক সচেতনতা অত্যন্ত কম। জেব্রাক্রসিং, আন্ডারপাস, ওভারব্রিজ ইত্যাদি ব্যবহারে অনেকের মধ্যেই অবহেলা ও অনীহা প্রত্যক্ষ করা যায়। অথচ এগুলো ব্যবহার করলে তাদের নিরাপত্তা ঝুঁকি যেমন থাকে না তেমনি দুর্ঘটনা ও যানজট কম হতে পারে। স্কাউট, রোভার স্কাউট, গার্লস গাইড ও বিএনসিসির সদস্যরা রাজধানীতে এই সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ট্রাফিক আইন মানতে অভ্যস্ত করার কাজটাই মূলত করছে।
এসব সংগঠন বা প্রতিষ্ঠান আমাদের দেশে বহুদিন ধরেই আছে। লাখ লাখ শিক্ষার্থী এদের সদস্য। এরা সুশৃংখল এবং বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। এরা একটি সংগঠিত বিশাল ফোর্স। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দেশের অনেক বিখ্যাত ব্যক্তি আগে সংযুক্ত ছিলেন, এখনো আছেন। এদের এই সংঘশক্তিকে সঠিকভাবে, উপযুক্ত ও প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ব্যবহারের কোনো উদ্যোগ অতীতে তেমন একটা নেয়া হয়নি। এই অব্যবহৃত শক্তিকে কাজে লাগানো গেলে অনেক বড় বড় কাজ করা সম্ভবপর হয়ে উঠতে পারে। সড়কশৃংখলা ও ট্রাফিক আইন বাস্তবায়নে স্কাউট, রোভার স্কাউট, গার্লস গাইড ও বিএনসিসির সদস্যরা যেভাবে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে দায়িত্ব পালন করছে সেটা একটা বিরল নজির এবং এ নজিরের অনুসৃতি প্রসারিত করা যেতে পারে। আগে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা লেখাপড়া ও খেলাধুলা ও সংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি সাক্ষরতা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও জনসেবামূলক অনেক কাজ করতো। এখন আর এসব কাজ তাদের করতে দেখা যায় না। জনসেবা ও জনকল্যাণমূলক কাজে তাদের নিয়োজিত করা সম্ভব হলে দেশ ও জাতি প্রভূত উপকৃত হতে পারে। স্কাউট, রোভার স্কাউট, গার্লস গাইড ও বিএনসিসির সদস্যরা যে উদ্যোগ নিয়েছে তার সঙ্গে মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করা যেতে পারে। আমাদের শিশু-কিশোর ও তরুণদের মধ্যে সুপ্ত ও অপব্যবহৃত অবস্থায় যে শক্তি রয়েছে তা কাজে লাগানোর পরিকল্পিত উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। এ জন্য তাদের উদ্বুদ্ধ করার সঙ্গে সঙ্গে উপযুক্ত ইনশিয়েটিভ নিতে হবে। আর স্বপ্রণোদিত হয়ে স্বেচ্ছাকর্ম যেহেতু দীর্ঘদিন ধরে করা সম্ভব নয়, সেক্ষেত্রে তাদের ইনসেনটিভও কিছু না কিছু দিতে হবে। সরকার ও সংশ্লিষ্টরা এদিকে যথাযথ নজর নিক্ষেপ করবে, এটাই কাম্য।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।