Inqilab Logo

ঢাকা, রোববার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮, ০৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ০৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
শিরোনাম

‘রিলিফ নয়, চাই নদীশাসন’

থেমে নেই ভাঙন

ইনকিলাব ডেস্ক | প্রকাশের সময় : ১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৮, ১২:০২ এএম

‘ঘর ভাইঙা নিয়া এক আত্মীয়র বাড়ি রাখতাছি। সেহানে রাইখা দমডা ফালাই, হেরপর দেহুম কোনে যাওয়ন যায়। এহানেতো ভাঙনের ডরে দম বন্দ হয়া আসতাছে।’ ভাঙনকবলিত এলাকা থেকে ঘর ভেঙে অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার সময় চোখের পানি মুছতে মুছতে এভাবে নিজের কষ্টের কথা জানান ফরিদা বেগম (৪৫) নামের এক গৃহিণী। অন্যদিকে ট্রলার বোঝাই করে অন্যত্র আশ্রয়ের জন্য যাওয়া নারী-পুরুষ-শিশুসহ প্রত্যেকের চোখে জল। তাদের বিদায় দিতে আসা গ্রামবাসীর চোখেও জল। বিদায় নেয়া পরিবারের সদস্য লালন সরদার (৪৮) কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘পাগলা নদী আমাগো একসাথে থাকতে দিলো না।’
সর্বনাশা পদ্মার করাল গ্রাসে প্রতিদিন বিলীন হয়ে যাচ্ছে বহুতল ভবন, ব্রিজ, কালভার্ট, রাস্তাঘাট, মসজিদ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও মানুষের শেষ সম্বল বাপ-দাদার ভিটেবাড়ি। তীব্র ভাঙনের কাছে নড়িয়ার নদী তীরবর্তী মানুষ এখন দিশেহারা ও পাগল প্রায়। সব হারিয়ে নিঃস্ব এসব মানুষের কান্নার স্রোত যেন একাকার হয়ে যাচ্ছে সর্বনাশা পদ্মার ধারার সঙ্গে।
সর্বশেষ গতকাল সকাল সাড়ে ৬টার দিকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উত্তর পাশের সীমানা প্রাচীর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ফাটল ধরেছে মূল ভবনে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সবক’টিই এখন ভাঙনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ক্যাম্পাসে থাকা গ্যারেজ, মসজিদের একটি অংশ, সীমানা প্রাচীর ও প্রবেশের ফটক বিলীন হয়ে গেছে। আতঙ্কে হাসপাতালের রোগীরা অন্যত্র চলে গেছে। চিকিৎসক ও কর্মচারীদের পরিবারের সদস্যদের হাসপাতাল ক্যাম্পাস থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। দৌলতদিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ৬ নম্বর ফেরিঘাটটিও ভাঙনের মুখোমুখি। অন্য ৫ নম্বর ঘাটটিও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। তবে সেখানে বালুর বস্তা ফেলে ঘাট রক্ষার চেষ্টা চালাচ্ছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। রাজবাড়ী গোদার বাজার ধুনচী এলাকার ২০০ মিটার পদ্মা নদীর তীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ধসের পর আবারও প্রায় ১০০ মিটার ধসে গেছে। গতকাল রোববার সকাল ৯টার দিকে রাজবাড়ী সদর উপজেলার মিজানপুর ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের ধুনচী পূর্বপাড়া এলাকা সংলগ্ন এলাকায় তীর প্রতিরক্ষা বাঁধে এ ধস দেখা দেয়। এর আগে গত শনিবারের শরীয়তপুরে ভাঙনে পূর্ব নড়িয়া ও উত্তর কেদারপুর গ্রামের দেড় শ পরিবার গৃহহীন হয়েছে। ভাঙনে উত্তর কেদারপুর গ্রামের রাম ঠাকুর সেবা মন্দির বিলীন হয়ে গেছে। এ নিয়ে গত তিন মাসে পদ্মার ভাঙনে নড়িয়ায় ৪ হাজার ৬৫০ পরিবার গৃহহীন হলো।
ভাঙন কবলিত এলাকায় মানুষ ব্যস্ত সময় পার করছেন বাড়ি-ঘর, দোকান-পাট সরিয়ে নিতে। ঝুঁকিপূর্ণ বসতবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং দোকানপাট নিরাপদ স্থানে সড়িয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকলেও কয়েক দিনের বিরামহীন নদী ভাঙনে ফলে দ্রুত গতিতে বসতবাড়ি সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি নদী ভাঙনবাসীর। অনেকেই খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পদ্মার পাড়ে দাঁড়িয়ে আহাজারি করা ছাড়া আর কোনো পথ নেই। তারা বাপ-দাদার ভিটে-মাটি ও সহায়-সম্বল হারিয়ে মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজছে। সরকারের পক্ষ থেকে পানি উন্নয়ন বোর্ড আপদকালীন বরাদ্দ দিয়ে কোটি টাকার জিওব্যাগ ফেলেও নদী ভাঙন রোধ করতে পারছে না। প্রতিদিন নতুন নতুন এলাকা ভাঙছে। এলাকাবাসির অভিযোগ তাদের দেখার কেউ নেই। এ পর্যন্ত সরকারের ত্রাণ তহবিল থেকে যে সাহায্য দেয়া হয়েছে তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। এলাকাবাসীর একটাই দাবি, নড়িয়াকে রক্ষা করতে জরুরি ভিত্তিতে বেড়িবাঁধের কাজ শুরু করা হোক। তারা বলেন, ‘আমরা রিলিফ চাই না, চাই নদীশাসন’।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তিন মাসে মাসে পদ্মা নদীর অব্যাহত ভাঙনের ফলে নড়িয়া উপজেলার কমপক্ষে ৪ হাজার পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়েছে। ২ শ বছরের পুরাতন মূলফৎগঞ্জ বাজারের বিরাট অংশ হারিয়ে গেছে নদীতে। এ ছাড়াও বহু বাড়ি-ঘর ও বড় বড় স্থাপনা, রাস্তা, ব্রিজ, কালভার্ট নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এখনো মারাত্মক ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে ৮শ’ দোকান-পাট ও ঐতিহাসিক মুলফৎগঞ্জ আলিয়া মাদরাাসাসহ শত শত পাকা-আধাপাকা বাড়ি-ঘর ও সরকারি প্রতিষ্ঠান। অবশেষে অতি প্রাচীন নড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিও গ্রাস করে নিয়ে যাচ্ছে সর্বনাশা পদ্মা নদী।
হাসপাতালের সামনের রাস্তাটুকু ও হারিয়ে গেছে নদীগর্ভে। হাসপাতালটির সন্নিকটে নদী। ইতোমধ্যে হাসপাতাল মসজিদের একাংশ গ্রাস করে নিয়েছে নদী। হাসপাতালের নুতন কমপ্লেক্স ভবনটিতে ফাঁটল ধরেছে। পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে দুটি ভবন। হাসপাতালের মালামাল সরিয়ে নেয়া হয়েছে। হাসাপতালের কার্যক্রম আবাসিক ভবনে চালু রাখা হয়েছে। যেকোনো মুহূর্তে বিলীন হয়ে যাবে প্রাচীনকালের এ হাসপাতালটির পুরো ভবনগুলো। সাধুরবাজার লঞ্চঘাট এলাকা ধসে প্রাণহানি ঘটেছে ১০ জনের।
নড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্র জানায়, ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়ার কারণে গত ৩ আগস্ট ওই ভবন থেকে ক্যাম্পাসের পেছনের দিকের একটি আবাসিক ভবনে সীমিত পরিসরে ১০ শয্যার কার্যক্রম চালু রাখা হয়। ভাঙনের কারণে পদ্মা নদী হাসপাতালের সীমানায় চলে আসায় হাসপাতালের ক্যাম্পাসে থাকা কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তাদের পরিবারের সদস্যদের নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। আতঙ্কে রোগীরা হাসপাতাল ছেড়ে চলে গেছে। হাসপাতাল ক্যাম্পাসের একটি আবাসিক ভবনে এখন জরুরি বিভাগ ও বহির্বিভাগ চালু রাখা হয়েছে। হাসপাতালে প্রবেশের সড়কটি বিলীন হয়ে যাওয়ায় ক্যাম্পাসের পেছন দিকের সীমানা প্রাচীর ভেঙে সরু রাস্তা বের করা হয়েছে। হাসপাতালের সামনের ২৫টি ওষুধের দোকান বিলীন হয়ে গেছে। এ কারণে হাসপাতালে কোনো রোগী আসছে না।
নড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মুনীর আহমেদ বলেন, হাসপাতালের স্থাপনা পদ্মায় বিলীন হওয়া শুরু হয়েছে। হাসপাতালের মূল ভবনে ফাটল ধরেছে। যেকোনো সময় ওটা নদীতে ধসে পড়তে পারে। ভাঙনের আতঙ্কে রোগীরা হাসপাতাল ছেড়ে চলে গেছে। এখন সীমিত পরিসরে জরুরি ও বহির্বিভাগের কার্যক্রম চালু রাখা হয়েছে।
নড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকতা সানজিদা ইয়াসমিন বলেন, পদ্মা নদীর ভাঙনে আমাদের উপজেলায় প্রায় ৪ হাজার পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়েছে। সাধুর বাজার ও ওয়াপদা বাজারের দুই শতাধিক ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান ও মুলফৎগঞ্জ বাজারের দুই শতাধিক দোকান-পাট নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ইতোমধ্যে ভাঙনকবলিতদের মাঝে জিআর চাল, ঢেউটিন ও শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে।
এদিকে, নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ উপজেলার দেবগ্রাম ও দৌলতদিয়া ইউনিয়ন। এভাবে চলতে থাকলে রাজবাড়ীর মানচিত্র থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে ইউনিয়ন দুটি। এছাড়া রাজবাড়ী গোদার বাজার ধুনচী এলাকার ২০০ মিটার পদ্মা নদীর তীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ধসের পর আবারও প্রায় ১০০ মিটার ধসে গেছে। গতকাল রোববার সকাল ৯টার দিকে রাজবাড়ী সদর উপজেলার মিজানপুর ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের ধুনচী পূর্বপাড়া এলাকা সংলগ্ন এলাকায় তীর প্রতিরক্ষা বাঁধে এ ধস দেখা দেয়।
স্থানীয় সূত্র জানায়, বাঁধ হবার পর ৪ থেকে ৫ বছর কোনো ভাঙন ছিল না। কিন্তু শুকনো মৌসুমে নদীতে ড্রেজিং করার পর এবার ভাঙতে শুরু করেছে। গত দুই সপ্তাহে গোদার বাজার ধুনচী পূর্বপাড়া এলাকার তীর প্রতিরক্ষা বাঁধে পর পর তিনবার ভাঙন দেখা দিলো।
এলাকাবাসী জানান, গোয়ালন্দতে গত তিন-চার দিনের অব্যাহত নদীভাঙনে এই দুই ইউনিয়নের হাজার হাজার বিঘা ফসলি জমি বিলীন ও শত শত পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়েছে। এসব পরিবার সরকারি বাঁধে বা রেলসড়কের পাশে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। দৌলতদিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ৬ নম্বর ফেরিঘাটটি ভাঙনের মুখোমুখি। অন্য ৫ নম্বর ঘাটটিও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। তবে সেখানে বালুর বস্তা ফেলে ঘাট রক্ষার চেষ্টা চালাচ্ছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্থার (বিআইডব্লিউটিসি) দৌলতদিয়া ঘাট ব্যবস্থাপক শফিকুল ইসলাম জানান, ফেরিঘাট এলাকায় নদীভাঙন শুরু হওয়ায় ৬ নম্বর ঘাটটি হুমকিতে রয়েছে। নদীভাঙনের শিকার দেবগ্রাম ও দৌলতদিয়া ইউনিয়নের গৃহহীন হয়ে পড়া হাজার হাজার মানুষ ইতিমধ্যে এলাকা ছেড়েছে। এখনই ভাঙ্গন রোধে ব্যবস্থা না নিলে গোয়ালন্দের মানচিত্র থেকে এই দুই ইউনিয়ন হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী। গত ১৫ বছরে এ উপজেলার ৪৯টি গ্রাম পদ্মা নদীতে বিলীন হয়েছে। উপজেলার ১১৪টি গ্রামের মধ্যে এখন পদ্মাবেষ্টিত হয়ে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে বাকি ৬৫টি গ্রামের বাসিন্দারা। দুই মাস ধরে উপজেলার পদ্মা-তীরবর্তী এলাকা ভাঙছে। দৌলতদিয়ার বেপারীপাড়া, যদুমাতবর পাড়া, দৌলতদিয়ার ৬ নং ঘাট, সিরাজখার পাড়া ও দেবগ্রাম ইউনিয়নের চর বরাট, অন্তার মোড়, দেলুনদী, তেনাপচা, দেবগ্রামসহ গ্রামে ভাঙনের তীব্রতা বেশি।
এদিকে রাজবাড়ীর কালুখালীর রতনদিয়া ইউনিয়নের সাদারচর, হরিণবাড়ীয়া, প্লাবিত রাজবাড়ী সেনানিবাস ও জেলা শহরের গোদারবাজার ঘাট এলাকা পদ্মার ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে। গত মঙ্গলবার রাতে রাজবাড়ী শহর রক্ষা বাঁধের নদীর পার সংরক্ষণ গোদারবাজার ঘাটের অবকাশকেন্দ্র‘বন্ধন’-সংলগ্ন ২০০ মিটার নদী তীর রক্ষা বাঁধ ধসে গেছে। বর্তমানে সেখানে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধের চেষ্টা চলছে। এছাড়া কালুখালীর রতনদিয়া এলাকার বেশ কয়েকটি গ্রাম নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। রাজবাড়ী সেনা ক্যাম্প নামক পিলার থেকে সোয়া কিলোমিটার এসবিবি ইটের রাস্তার কিছু অংশ ও সাদার বাজার সম্পূর্ণ ধসে গেছে। এ ছাড়া লস্করদিয়া নারায়ণপুর গ্রামের কয়েক শ বাড়িঘর পদ্মায় বিলীন হয়ে গেছে। রাজবাড়ী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী প্রকাশ সরকার বলেন, বর্তমানে রাজবাড়ী জেলার পদ্মাপাড়ের বেড়িবাঁধের বাইরের বিভিন্ন এলাকায় ৮৭৫ মিটারজুড়ে ভাঙন রয়েছে। ।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর