Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৮, ০১ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ০৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
শিরোনাম

দখল-দূষণে প্রমত্তা মরিচ্চাপ সরু নালা

সাতক্ষীরা থেকে আবদুল ওয়াজেদ কচি | প্রকাশের সময় : ১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮, ১২:০৫ এএম

এক সময়ের প্রমত্তা মরিচ্চাপ নদী এখন সরু নালায় পরিণত হয়েছে। স্থানভেদে ১৫০-২০০ মিটার চওড়া নদীটি এখন সরু নালা। নদীর দুই পাশ দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে কাঁচা-পাঁকা বাড়ি, ঘের, ইটভাটাসহ বিভিন্ন স্থাপনা। নদীটির বেশির ভাগই এখন দখলকারীদের কবলে। এতে নাব্য হারিয়ে নদীটি এখন মৃতপ্রায়। আর তার নেতিবাচক প্রভাব হিসেবে নদীর তীরবর্তী গ্রামগুলোতে পানিবদ্ধতাসহ পরিবেশগত নানা সঙ্কট তৈরি হয়েছে।
তবে, দখলকারীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। অনেকেই এক সময়কার প্রমত্তা মরিচ্চাপ নদীর নাম বদলে নালা বলতে শুরু করেছেন। এখনই এ ব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে ক’দিন পর তাও অবশিষ্ট থাকবে না বলে আশঙ্কা এলাকাবাসীর।
সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, প্রবাহহীন সামান্য পানি নিয়ে মরিচ্চাপ নদীর সাক্ষ্য দিচ্ছে নালাটি। দেবহাটা থেকে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার মধ্য দিয়ে আশাশুনি উপজেলা পর্যন্ত বিস্তৃত ৩৭ কিলোমিটার দীর্ঘ মরিচ্চাপের পুরোটাই চলে গেছে দখলকারীদের কবলে। বিলশিমুলবাড়িয়া, বালিথা, চরবালিথা, এল্লাচর, ফিংড়ি, ব্যাংদহ, টিকিট, কামালকাটি, নইহাটি গ্রামের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদীর দু’ধারে চলছে দখলের মহোৎসব। মূল নদীর দু’ধারে বেড়ির মধ্যে নির্মাণ করা হয়েছে অসংখ্য পাঁকা-কাঁচা বাড়ি, ধর্মীয় স্থাপনা, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, ইটেরভাটা, মুরগির খামার, ঘেরসহ বিভিন্ন স্থাপনা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীটি খননের নামে চলেছে নদীকে মেরে ফেলার উৎসব। খননের সময় নদীর মধ্যভাগ হতে মাটি তুলে নদীর মধ্যেই দু’পাশে বেড়ির উপর রাখা হয়েছে। এতে ৮-১০ মিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে নদীটি। নদী তীরবর্তী এলাকাবাসী জানান, এক সময় মরিচ্চাপ ছিলো খরস্রোতা। এতে নিয়মিত জোয়ার-ভাটা হতো। মরিচ্চাপ ছিল স্থানীয়দের জীবন-জীবিকার উৎস। এই নদী দিয়ে চলত বড় বড় লঞ্চ-স্টিমার, পালতোলা নৌকা। আর এই নদী দিয়ে সাতক্ষীরাসহ বিভিন্ন এলাকার মানুষ কলকাতায় যেত ব্যবসা-বাণিজ্য করতে। আশাশুনি, দেবহাটা এবং সদরের বিভিন্ন এলাকায় যাওয়ার অন্যতম প্রধান পথ ছিল এই নদী।
স্থানীয়রা জানায়, বছর সাতেক আগে পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধানে নদীটি খননের কাজ করা হয়। ওই সময় অপরিকল্পিকতভাবে নদীর ধার চেঁছে ছুলে সেই মাটি নদীর মধ্যেই ফেলে বেড়িবাঁধ উঁচু করা হয়। খননের সময় নদীর ভেতর থেকে মাটি তুলে নদীর দু’ধারের ১০ মিটার জায়গায় উঁচু করায় ১০ মিটারের বাইরে নদীর যে জায়গা ছিল তা খুব দ্রুত দখল হয়ে যায়। এখন নদীটি কোথাও কোথাও সরু নর্দমায় পরিণত হয়েছে। এ ছাড়া ষাটের দশকে নদীটির বাঁকে বাঁকে অপরিকল্পিতভাবে সুইস গেট করায় খালগুলোর পানি প্রবেশ ও পানি বের হতে না পারায় জোয়ারে আসা পলি নদীর বুকে জমে যাওয়ায় নাব্য হারায় নদীটি। ফলে এখন আর জোয়ার-ভাটা হয় না। তার উপর আবার নেট-পাটা ও অবৈধ বাধ দিয়ে মাছ চাষ করা হচ্ছে।
সাতক্ষীরা নদী বাঁচাও আন্দোলন কমিটির নেতা অধ্যক্ষ আশেক-ই-এলাহী জানান, মরিচ্চাপ নদীটি দখল হয়ে গেছে। এটা এখন মরা খাল। এটা রক্ষায় তেমন কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। নদী দখলমুক্ত করতে নদীর জায়গা মাপ করা দরকার। কিন্তু পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসন এটা কখনো করেনি। মরিচ্চাপ রক্ষা করতে দ্রুত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
এদিকে, সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, পানি উন্নয়ন বোর্ডের মধ্যে থাকা নদীটির ৩৭ কিলোমিটার অংশ খনন করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় নদীর স্থান বিশেষ ৩২ থেকে ৫৫ মিটার চওড়া করে খনন করা হবে। স্থান ভেদে বর্তমান গভীরতার সাথে আরো চার থেকে পাঁচ মিটার গভীর করা হবে। এই প্রকল্পে পানি উন্নয়ন বোর্ড-১ এর আওতায় থাকা ৩৪ দশমিক ৫ কিলোমিটারের জন্য ৯৫ কোট ২৬ লাখ টাকা এবং পানি উন্নয়ন বোর্ড-২ এর আওতায় থাকা ৬ দশমিক ৫ কিলোমিটারের জন্য ২৪ কোটি ৫৪ লাখ টাকা বাজেট ধরা হয়েছে।
এ ব্যাপারে সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ড-১ এর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী রাশিদুর রহমান জানান, নদীর পাড়ের জমি আমাদের না। এটা জেলা প্রশাসনের আওতায়। তাই এই জায়গা রক্ষা করার দায়িত্ব তাদের। তবে আমরা নদীটি খননের জন্য এটা প্রকল্প তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। পাশ হলে খুব দ্রুত খননের কাজ শুরু হবে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।