Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮, ০৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী

নাইন-ইলেভেন ট্র্যাজেডি : ইতিহাসের এক অস্পষ্ট অধ্যায়

ওলীউর রহমান | প্রকাশের সময় : ১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮, ১২:০৫ এএম

নাইন-ইলেভেন ট্রাজেডি ইতিহাসের এক অস্পস্ট ও কালো অধ্যায়। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টম্বর আমেরিকার ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার টুইনটাওয়ার এক নজিরবিহীন সন্ত্রাসী হামলায় ধ্বংস হয়েছিল এবং মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের সদর দপ্তর ‘পেন্টাগন’ও আক্রান্ত হয়েছিল। ঐদিন আমেরিকা এয়ারলাইন্স এবং ইউনাইটেড এয়ারলাইন্সের চারটি বিমান ছিনতাই করে দু’টি বিমান দিয়ে আঘাত করা হয় টুইন-টাওয়ারে এবং অন্য একটি বিমান দিয়ে আঘাত করা হয় পেন্টাগনে। আর চতুর্থ বিমানটি গিয়ে বিধ্বস্ত হয় একটি গ্রামাঞ্চলে। মাত্র এক ঘণ্টা সময়ের মধ্যে চারটি বিমান ছিনতাই করে আমেরিকার মতো উন্নত প্রযুক্তিসমৃদ্ধ নিশ্চিদ্র নিরাপত্তা পরিবেষ্টিত একটি দেশে এমন ভয়াবহ হামলার কারণে বিশ্ববাসী থমকে দাঁড়িয়েছিল।
১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলায় চারটি বিমানের ২৬৮ জন যাত্রীসহ কয়েক হাজার মানুষ সেদিন প্রাণ হারিয়েছিল। আমেরিকার ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছিল আনুমানিক ১০ হাজার ৫ শত কোটি ডলার, যা সিঙ্গাপুরের মতো উন্নত দেশের পুরো এক বছরের আর্থিক ব্যয়ের সমান। টুইনটাওয়ার ছিল মার্কিনীদের অহংকার এবং আমেরিকার ‘হৃদপিন্ড’। দু’টি মহাসমুদ্র পরিবেষ্টিত কন্টিনেন্টাল আমেরিকার অভ্যন্তরে এই নজিরবিহীন সন্ত্রাসী হামলার জন্যে খোদ আমেরিকাসহ সারা বিশ্বে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্নের ঝড় উঠেছিল।
১১ সেপ্টেম্বরের ঘটনায় বিশ্ববাসী মর্মাহত হয়েছিল। আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ এ হামলাকে ‘আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ আখ্যায়িত করে সৌদী ভিন্নমতাবলম্বী উসামা বিন লাদেন এবং তার আল-কায়েদা নেটওয়ার্ককে এর জন্য দায়ী করেন। বিশ্বের অন্যতম সেরা সম্পদশালী পিতার সন্তান সৌদি ধনকুবের বিন লাদেন ১৯৮০ সালে সোভিয়েত দখলদারদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে আফগানিস্তানে প্রবেশ করেন। ১৯৯০ সালে কুয়েতে ইরাকের হামলার অজুহাতে সৌদি আরবে মার্কিন সেনা মোতায়েনের ঘটনায় বিন লাদেন সৌদি সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন এবং রাতারাতি সৌদি সরকার ও আমেরিকার শত্রু হয়ে পড়েন। বিশ্বের কোন মুসলমানই সৌদি আরবের পূণ্যভূমিতে আমেরিকান সৈন্যদের উপস্থিতি মেনে নিতে পারেনি। বিন লাদেনও তা মেনে নিতে পারেননি। আমেরিকার সাথে বিন লাদেনের শত্রু তা এখান থেকেই। একপর্যায়ে তিনি আমেরিকার কড়া সমালোচনা শুরু করেন। আমেরিকাও বিভিন্ন সন্ত্রাসী ঘটনার জন্য তাকে দায়ী করতে থাকে। ২০০১ সালে উসামা বিন লাদেন আফগানিস্তানে অবস্থান করছিলেন। প্রেসিডেন্ট বুশ আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের উপর চাপসৃষ্টি করেন উসামা বিন লাদেনকে তার হাতে তুলে দেওয়ার জন্য। কিন্তু তৎকালীন আফগানিস্তানের ইসলামী ইমারতের প্রেসিডেন্ট মোল্লা মুহাম্মদ ওমর সাফ জানিয়ে দেন যে, কোন প্রমাণ ছাড়া উসামা বিন লাদেনকে তারা আমেরিকার হাতে হস্তান্তর করবেন না। এতে বুশ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন এবং ২০০১ সালের ২৭ অক্টোবর থেকে আফগানিস্তানে ইঙ্গ-মার্কিন নেতৃত্বাধীন বহুজাতিক বাহিনীর বোমা বর্ষণ শুরু হয়। টানা দুই মাসের বোমা বর্ষণে গুড়িয়ে দেয়া হয় খরা-দুর্ভিক্ষপীড়িত ও যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানকে। হত্যা করা হয় হাজার হাজার নারী ও শিশু এবং নিরপরাধ মানুষকে। উৎখাত করা হয় তালেবান সরকারকে। ট্যাঙ্ক, মিসাইল এবং কার্পেটিং বোমার আঘাতে আঘাতে পাইকারী হারে মুসলমানদের হত্যা করা হয়, আর বন্দিদের সাথে করা হয় অমানবিক আচরণ। অবশেষে হামীদ কারজায়ীর নেতৃত্বে একটি পুতুল সরকার গঠন করে সেখানে ইঙ্গ-মার্কিন দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠিত করা হয়।
টুইনটাওয়ার ধ্বংসের ঘটনায় খোদ আমেরিকাতেই জোরালোভাবে কিছু প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল। যেমন- ১. বিশ্বের সর্বাধিক উন্নত প্রযুক্তিসমৃদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তাবেষ্টনী ছিন্ন করে চারটি বিমান কীভাবে ছিনতাই করা হলো? ২. ছিনতাই করা বিমানগুলো কন্ট্রোলরোম থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর গতিপথ পরিবর্তন করে অনেক সময় নিয়ে টুইনটাওয়ার এবং পেন্টাগনে হামলা করেছে, এরমধ্যে আমেরিকার বিমান বাহিনীকে কেন সক্রিয় করা হলো না? ৩. টুইনটাওয়ারে যে বিমান দু’টি আক্রমণ করেছিল সে দুটি বিমানের তলায় যে কালো পদার্থ ভিডিও ফুটেজে দেখা গিয়েছিল সে পদার্থগুলো কী ছিল? ৪. টুইনটাওয়ারের ধ্বংসাবশেষকে পরবর্তীতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য সংরক্ষণ করা হলো না কেন? ৫. পেন্টাগনে যে বিমানটি আঘাত করেছিল সে বিমানের পরিমাপ এবং আঘাতের চিহ্নের মধ্যে মিল নেই কেন? বিমানটির ধ্বংসাবশেষইবা গেল কোথায়? এছাড়া আমেরিকার কতিপয় রাজনৈতিক নেতার কথাবার্তা ও অতীত ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল যে, নাইন ইলেভেন ট্রাজেডির সাথে এদের কোন যোগসাজস ছিল কি না। এসব প্রশ্ন ও রহস্যের কোন কুল-কিনারা না করে বুশ-বেøয়ারও তাদের সহচররা যুদ্ধোন্মাদনায় মেতে উঠেন। এভাবে ইতিহাসের একটি ঘৃণ্যতম সন্ত্রাসী ঘটনার মূল রহস্যকে চাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
অন্য কোনভাবেও বিন লাদেনকে ধরার ব্যবস্থা করা যেত, কিন্তু সেখানে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পথই বেছে নেয়া হয়। মজলুমের কান্না নাকি জালেমের জুলুমে সাহস যোগায়। সেই সাহসের মহড়া প্রদর্শন করা হয় আফগানিস্তানে। টুইন টাওয়ার-বিন লাদেন ইস্যুকে কেন্দ্র করে আফগানিস্তানকে ধ্বংস করে দেয়ার পর এই ব্যাপক বিধ্বংসী মারণাস্ত্রের নল ঘুরে যায় সভ্যতার লীলাভূমি ইরাকের দিকে। প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের কাছে ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র রয়েছে, এই মিথ্যা অভিযোগে ২০০৩ সালের ২০ মার্চ থেকে ইরাকে শুরু হয় ইঙ্গ-মার্কিনীদের বিমান হামলা। বোমার আঘাতে আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত করা হয় সভ্যতার লীলাভূমি ইরাক। অবশেষে সেখানে কোন বেআইনী অস্ত্র পাওয়া যায়নি। তবে বহু প্রাণহানী ঘটিয়ে সাদ্দাম সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে ব্যাপক লুটতরাজ চালিয়ে সেখানেও মার্কিন দখলদারিত্ব নিশ্চিত করা হয়। ইরাক ও আফগানিস্তানের অন্যায় ও অসমযুদ্ধে ইঙ্গ-মার্কিনীরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ১০ লাখেরও বেশি মানুষকে হত্যা করে। অবশেষে ২০০৩ সালের ১৩ ডিসেম্বর সাদ্দাম হোসেনকে তার জন্মস্থানেই গ্রেফতার করে দখলদার বাহিনী। অতঃপর শুরু হয় দখলদারদের হাতের পুতুল ইয়াদ আলাবী, আহমদ চালাবীদের তৈরি আদালতে প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে হত্যা করার প্রহসনের বিচার প্রক্রিয়া। যারা সভ্যতার লীলাভূমি ইরাককে ইতিপূর্বে বধ্যভূমিতে রূপান্তরিত করেছে সেই হায়েনাদের তত্ত্বাবধানে সাদ্দাম হোসেনের কোন ধরনের বিচার করা হবে তা আগেই বিশ্ববাসী বুঝতে পেরেছিল। ইরাকী আদালতের একটি পুরোনো মৃত্যুদন্ডের রায়কে গণহত্যা আখ্যায়িত করে এই গণহত্যার অপরাধে ২০০৬ সালের ডিসেম্বর মাসে ঈদুল-আজহার দিনে সাদ্দাম হোসেনকে ফাঁসিতে ঝুলনো হয়।
ইরাকজুড়ে তন্ন তন্ন করে খোঁজার পরও যেভাবে ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্রের নামগন্ধ পাওয়া যায়নি আফগানিস্তানকেও অনুরূপ দুমড়ে মুচড়ে দিয়েও বিন লাদেনকে পাওয়া যায়নি। যুদ্ধের পর আমেরিকার বুদ্ধিজীবীরাই বলেছিল যে, গোপন নথিতে ভুল তত্ত্ব সরবরাহ করা হয়েছিল। গোয়েন্দা রিপোর্ট ভুল ছিল। এসব কথা বলে তারা ইরাক যুদ্ধে নিহত লাখ লাখ মানুষের রক্তকে শুধু তাচ্ছিল্য ও উপহাস করেনি বরং ইতিহাসের এক ঘৃণ্যতম বর্বরতাকে বৈধতা দেয়ার প্রয়াস পেয়েছিলেন। অন্যদিকে আফগানিস্তানের নারকীয়তা সমাপ্ত করে পূর্ণ দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর বলা হয় যে, বিন লাদেন আফগানিস্তানে নেই।
নাইন-ইলেভেন ট্রাজেডির পর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নামে শুরু হয় জঙ্গি তৎপরতা। কথিত এসব তৎপরতার কারণে সারা বিশ্বের মুসলমানরা মারাত্মক বেকায়দায় পড়ে, সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখা হয় মুসলমানদের। ইসলামী প্রতিষ্ঠানসমূহের উপর বাড়ানো হয় নজরদারি। অপপ্রচার ও বিদ্বেষ ছড়ানো হয় মিডিয়ায়। হামলা-মামলার শিকার হয় বহু মুসলমান। জঙ্গি সন্দেহে বহু মুসলমানকে গ্রেরফতার করে তাদের উপর চালানো হয় অকথ্য নির্যাতন। সইতে না পেরে অনেকেই মৃত্যুবরণ করে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, বিশ্বের একমাত্র নিউরো সাইন্টিস্ট ড. আফিয়া সিদ্দিকার কথা। তাকে আল-কায়দা নেটওর্কের সাথে সম্পৃক্ততার কথিত অভিযোগে কিডন্যাপ করা হয় ২০০৩ সালে পাকিস্তান থেকে। ৫ বছর গুম করে রাখার পর ২০০৮ সালে হাজির করা হয় আমেরিকার একটি আদালতে। আমেরিকার আদালত তাকে ৮৬ বছরের সাজা দেয়। আদালতে তিনি তার উপর অকথ্য নির্যাতন এবং বছরের পর বছর ধরে গণধর্ষণের বর্ণনা দেন। বিশ্বের সেরা এই বিজ্ঞানীর বড় অপরাধ ছিল তিনি ছিলেন পবিত্র কোরআনের হাফেজা এবং আলেমা। বিজ্ঞানের সুত্রগুলোকে তিনি কোরআনের দৃষ্টিকোণ থেকে বর্ণনা করতেন। মুসলিম বিশ্বের কেউ আফিয়া সিদ্দিকার সহযোগিতায় এগিয়ে আসেনি। অবশেষে তিনিও লাম্পট্যবাদীদের নির্যাতন সইতে না পেরে মৃত্যুর পথ অবলম্বন করেন। এরূপ আরো বহু ঘটনা ঘটেছে।
লেখক: প্রাবন্ধিক



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।