Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১০ আশ্বিন ১৪২৫, ১৪ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

আছেন ওমানে, করেছেন গোপন বৈঠক মুরাদনগরে

চান্দিনা (কুমিল্লা) উপজেলা সংবাদদাতা | প্রকাশের সময় : ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮, ১২:০২ এএম

হঠাৎ করে কুমিল্লার বিভিন্ন স্থানে বিএনপির নেতাকর্মীদের ধরপাকড় শুরু হয়েছে। গত পাঁচ দিনে কুমিল্লায় বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের প্রায় দেড় শতাধিক নেতাকর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। এ ছাড়া বিভিন্ন জায়গায় পুরোনো মামলা সচল করার পাশাপাশি নতুন করে নাশকতা পরিকল্পনার অভিযোগ এনে অজ্ঞাতনামা আসামি করে মামলা দেওয়া হচ্ছে বলে বিএনপির নেতাকর্মীরা অভিযোগ করেন।
কুমিল্লার বিএনপির নেতারা বলছেন, ১লা সেপ্টেম্বর দলের ৪০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানী ঢাকায় বড় জনসভা করার পর থেকে ধরপাকড় বেড়ে গেছে। তারা জানান, ঈদুল আজহার পর থেকেই কুমিল্লার বিভিন্ন স্থানে টুকটাক ধরপাকড় চলছিল। কিন্তু গত কয়েক দিনে ধরপাকড়ের সংখ্যা বেড়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড.খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ঢাকায় আমরা একটা ভালো জনসভা করলাম। সারা দেশেও প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচি ঘিরে কর্মী-সমর্থকেরা সক্রিয় হয়েছে। সরকার এটাকে ভয় পায়। সেই ভয় থেকে গ্রেফতার শুরু করেছে। এর উদ্দেশ্য বিএনপিকে বাইরে রেখে আরেকটি নীলনকশার নির্বাচন করা। কিন্তু সেটা জনগণ হতে দেবে না।
এদিকে কুমিল্লার ব্রাক্ষণপাড়া উপজেলার মাধবপুর ইউনিয়নের উত্তর চান্দলা শহীদ মেম্বারের সারের দোকানে গোপন বৈঠকের সময় ব্রাক্ষণপাড়া থানা পুলিশ বিএনপি ও জামায়াতের ৭ জন নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করে কুমিল্লা জেল হাজতে প্রেরণ করেছে। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে গ্রেফতারকৃত ৭ জনসহ অজ্ঞাত আরো ২৭ জনকে আসামী করে ব্রাক্ষণপাড়া থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলাটি দায়ের করেছে। মামলার বিবরণে জানা যায়, গত রবিবার সন্ধ্যায় উত্তর চান্দলা শহীদ মিয়ার সারের দোকানের ভিতরে ও বাহিরে ৩৫/৪০ জন বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মী সরকার বিরোধী গোপন বৈঠক করার সময় থানার এস আই রাজু আহাম্মদ সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে ঘটনাস্থলে হাজির হয়ে শশীদল ইউনিয়নের বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবু সুফিয়ান মিন্টু, ব্রাক্ষণপাড়া সদর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মো. শাহজালাল, যুবদল নেতা ফকরুল আলম ভূইয়া জুয়েল, ছোট ধুশিয়া গ্রামের আবু সাইদ গোপালনগর গ্রামের আবুল কালাম আজাদ সিদলাই ৮ নং ওয়ার্ডের আবুল কালামকে গ্রেফতার করা হয়। এসময় ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ ৪ টি ককটেল, ১০ টি লাঠি, বস্তা ভর্তি পাথর, বস্তাসহ বিভিন্ন মালামাল উদ্ধার করেন।
এদিকে কুমিল্লার হোমনা উপজেলায় নাশকতার আশঙ্কায় পৌর বিএনপি›র সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. শাহ আলমসহ ৪ জনকে আটক করেছে থানা পুলিশ। গত শনিবার রাতে বিএনপি›র স্থায়ী কমিটির সদস্য প্রয়াত এম কে আনোয়ারের বাস ভবন থেকে তাদের আটক করা হয়। গত রবিবার তাদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা দায়ের পর তাদেরকে কুমিল্লা জেল-হাজতে প্রেরণ করেছে। গ্রেফতারকৃতরা হলো, হোমনা পৌর বিএনপি›র সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. শাহ আলম, শ্রীমদ্দি গ্রামের বিএনপি কর্মী মো. কামরুজ্জামান, আব্দুল মতিন ও আব্দুর রহিম। থানা পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত শনিবার রাতে হোমনাস্থ বিএনপি’র দলীয় কার্যালয়ে নাশকতার গোপন বৈঠক চলাকালে হোমনা থানা পুলিশ গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করে বিএনপি›র ৬ জন নেতাকর্মীকে আটক করে। পরে সিনিয়র দুজন নেতার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ না থাকায় তাদেরকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে বিএনপি›র নেতাকর্মীদের দাবি তারা বিএনপি›র স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য সাবেক কৃষিমন্ত্রী এম কে আনোয়ারের প্রথম মৃত্যু বার্ষিকী পালন উপলক্ষে প্রস্তুতিসভা শেষে বাড়ি যাওয়ার পথে তাদের গ্রেফতার করা হয়।
তবে পুলিশ জানায়, সারা দেশব্যাপী নাশকতার আশঙ্কায় অভিযানের অংশ হিসেবে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে নাশকতা ও বিস্ফোরক আইনে মামলা রুজু করা হয়েছে। মামলায় আরো অজ্ঞাত নামা আসামি করা হয়েছে।
কুমিল্লার মুরাদনগরে বিএনপি নেতাকর্মীদের জন্য এখন নতুন আতঙ্কের নাম ‘গোপন বৈঠক’। বাস্তবে এ ধরনের বৈঠক না হলেও থানায় ঠিকই মামলা হচ্ছে গোপন বৈঠকের কথা বলে। আবার বিদেশে রয়েছেন এমন ব্যক্তিও এই মামলায় আসামি হচ্ছেন বলে অভিযোগ বিএনপির নেতাকর্মীর। কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলায় এমনি একটি কথিত বৈঠকে বসে নাশকতা, রাষ্ট্রের ক্ষতিসাধন করার পরিকল্পনা করার অপরাধে আসামি হয়েছেন ওমান প্রবাসী আহাদ খলিফা। যিনি গত ৬ মাসেরও বেশি সময় ধরে ওমানে চাকরি করছেন। আবার বয়সের ভারে ন্যুজ হয়ে পড়েছেন, চোখে ঝাপসা দেখেন এমন বয়োবৃদ্ধ লোকও কথিত গোপন বৈঠকের মামলার আসামি হয়েছেন। গত শুক্রবার রাত সাড়ে ১২টায় (পুলিশের এজহারে উল্লিখিত সময়) মুরাদনগর উপজেলা সদরের মাদরাসা দীঘিরপাড়ের বাড়ি থেকে উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আলমগীর হোসেনকে গ্রেফতার করে মুরাদনগর থানা পুলিশ। ওই রাতে উপজেলা বিএনপি কার্যালয়ের পিয়ন আলমকেও মধ্যপাড়া এলাকার বাড়ি থেকে আটক করা হয়। আবার আ ন ম ইলিয়াস নামের এক জামায়াত নেতাকেও আটক করা হয়। পুলিশ এজহারে বলেছে, এই তিনজকে আলমগীরের বাড়ি থেকে গোপন বৈঠক চলাকালে আটক করা হয়েছে। তাদের সাথে আরো ৩০-৪০ জন ছিল। যারা পালিয়ে গেছে। মুরাদনগর থানা পুলিশ শুক্রবার রাতের গ্রেফতার অভিযানকে কারাবন্দী খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে নাশকতা, যানবাহন ভাঙচুরসহ অপরাধ সংঘটিত করার জন্য গোপন বৈঠক করে পরিকল্পনা করছিল অভিযোগ এনে ৩৩ জনকে এজহারনামীয় এবং ১৫-২০ জনকে অজ্ঞাত উল্লেখ করে মামলা করেছেন। আটককৃতদের পরিবারের সদস্যরা বলেছেন, ঘুম থেকে পুলিশ তাদের তুলে নিয়ে গেছে। কিন্তু মুরাদনগর থানার এসআই আবদুল গোফরানের দায়ের করা ওই মামলার ২২ নম্বর আসামি আহাদ খলিফা এ বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি চাকরি করতে ওমান যান। শুক্রবার রাতে তিনি ওমান থেকে কিভাবে এসে ওই কথিত গোপন বৈঠকে যোগ দিয়ে আবার পুলিশের ধাওয়ায় পালিয়ে গেছেন তা নিয়ে তুমুল আলোচনা চলছে মুরাদনগরসহ গোটা কুমিল্লায়। আবার ওমানে এ খবর জানাজানি হওয়ায় ওমানে চাকরিরত বাংলাদেশিদের মধ্যে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠেছে।
কেবল মুরাদনগরের মধ্যপাড়ার মৃত কেনু মিয়ার ছেলে আহাদ খলিফাই নন, ওই মামলায় উপজেলার বড়ইয়াকুড়ি গ্রামের ৮০ বছর বয়সী সাবেক চেয়ারম্যান তৌহিদুল ইসলাম মীরকেও আসামি করা হয়েছে। অথচ বয়োবৃদ্ধ এ লোকটি ঠিকমতো চলাফেরা করতে পারেন না। চোখে ঝাপসা দেখেন। আবার অনেকে চাকরি ও ব্যবসার কারণে কুমিল্লার বাইরে ঢাকাসহ অন্যান্য জেলায় অবস্থান করলেও গত শুক্রবার রাতের কথিত গোপন বৈঠকে তাদের উপস্থিতি দেখিয়ে মামলার আসামি করা হয়েছে। মুরাদনগর উপজেলা বিএনপির সিনিয়র নেতারা জানান, পুলিশ বানোয়াট কাহিনী দিয়ে সাজানো মামলা করেছে। গত শুক্রবার রাত ২টায় পুলিশ ছাত্রদল নেতা আলমগীর ও বিএনপি অফিসের পিয়ন আলমকে পৃথকভাবে আটক করে। পরে পিয়ন আলমকে দিয়ে বিএনপি অফিস খুলে প্রায় ২০-২৫টি চেয়ার পুলিশ থানায় আনে। অফিস থেকে চেয়ার নিয়ে যাওয়ার পেছনেও পুলিশের অসৎ উদ্দেশ্য ছিল বলে বিএনপির নেতাকর্মীরা জানান। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থেকে ১৪ জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
পুলিশের গণ গ্রেফতারের বিষয়ে দেবিদ্বার উপজেলার সাবেক বিএনপির সংসদ সদস্য মঞ্জুুরুল আহসান মুন্সী- বলেন, নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে। এখন দরকার ছিল নির্বাচনের পরিবেশটা তৈরি করা, পরিবেশটা সুন্দর করা অথচ কুমিল্লার বিভিন্ন উপজেলায় গড়ে প্রতিদিন ১০ থেকে ২০ জন বিএনপি ও ছাত্রদল নেতাকে গ্রেফতার করা হচ্ছে।
এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক পুলিশ সদস্য দৈনিক ইনকিলাবকে জানান, বিএনপি ও জামায়াতের নেতা-কর্মীরা গোপনে সংগঠিত হচ্ছেন বলে পুলিশের কাছে খবর রয়েছে। এসব খবরের পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষ নজর রাখতে পুলিশ সদস্যদের প্রতি নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ কারণে কুমিল্লায় কোনো কোনো এলাকায় ধরপাকড় করা হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে পদস্থ পুলিশ কর্মকর্তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। পুলিশের দাবি, কোনো ধরপাকড় হচ্ছে না। তবে মাদকবিরোধী অভিযানে আসামিদের গ্রেফতার করা হচ্ছে।



 

Show all comments
  • সুলতান ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮, ২:৩০ এএম says : 0
    আরও কত কি যে দেখতে হবে!
    Total Reply(0) Reply
  • Nazir Ahmed ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮, ১১:৩৭ এএম says : 0
    আজব পুলিশ
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ