Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২০, ৩১ আষাঢ় ১৪২৭, ২৩ যিলক্বদ ১৪৪১ হিজরী

রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি’র ৩ বছর - শারীরিক সমস্যা নিয়ে কর্মহীন হয়ে আছেন আহতরা

প্রকাশের সময় : ২৪ এপ্রিল, ২০১৬, ১২:০০ এএম

অর্থনৈতিক রিপোর্টার : রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় আহত শ্রমিকদের স্বাস্থ্যগত সমস্যার উন্নতি হয়েছে। তবে এখনো বড় অংশ স্বাস্থ্য সংক্রান্ত ঝুঁকিতে রয়েছেন। আহত শ্রমিকদের প্রায় ৮০ শতাংশ শারীরিক সমস্যায় রয়েছেন, ১৫ শতাংশ শ্রমিকের শরীরে ব্যথা রয়েছে এবং তাদের পক্ষে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়া কষ্টসাধ্য। ৪৮ শতাংশের পুরোপুরি কর্মসংস্থান হয়নি। পুনঃনিয়োগে হয়েছে মাত্র ২১ শতাংশের।
গতকাল শনিবার রানা প্লাজা দুর্ঘটনার ৩ বছরপূর্তি উপলক্ষে রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে ‘অন রি-ইমার্জিং ফ্রম দ্য রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি : অ্যান অ্যাকাউন্ট অন দ্য থার্ড অ্যানিভার্সারি’ শীর্ষক সংলাপ অনুষ্ঠানে এক প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়। এই সংলাপের আয়োজন করে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) যৌথ উদ্যোগে। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক ড. গোলাম মোয়াজ্জেম।
সিপিডির ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য’র সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন সিপিডির চেয়ারম্যান প্রফেসর রেহমান সোবহান, শ্রম মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ইসরাফিল আলম, শ্রম ও কর্মসংস্থান সচিব মিকাইল সিপার, সিপিডির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান, ব্যারিস্টার সারাহ হোসেনসহ ইউএস, নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স, স্পেন, সুইডেন ও নরওয়ের রাষ্ট্রদূত, হেড অব ইউএন ওম্যান, ডেনমার্ক, আইএলও, অ্যাকর্ড, অ্যালায়েন্স প্রতিনিধি ও শ্রমিক নেতারা।
মূল প্রবন্ধে ড. গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, দেশের গার্মেন্টস খাতের ইতিহাসের সব থেকে বড় দুর্ঘটনা রানা প্লাজা ট্রাজেডির পর একে একে ৩টি বছর পেরিয়ে গেলেও নিখোঁজ শ্রমিক, আহত শ্রমিকদের চিকিৎসা, পুনঃকর্মসংস্থান, আর্থিক সহায়তা বা ক্ষতিপূরণ এবং আইনি প্রক্রিয়া এ ৫টি বিষয় এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।
সিপিডির চেয়ারম্যান রেহমান সোবহান বলেন, বিল্ডিং কোড না মেনে যারা কাঠামো তৈরি করছেন, তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনকে কঠোর হতে হবে। উৎপাদন ব্যবস্থাসহ কারখানার চারপাশের পরিবেশের নজরদারি ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি উৎপাদন ব্যবস্থায় শ্রমিকদের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। সম্ভব হলে শ্রমিকদের মালিকানায় অংশীদারিত্ব করতে হবে। ব্যবস্থায় গুরুত্ব দিয়ে পণ্যের মূল্য সমন্বয় করতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশের পোশাক কারখানা থেকে ৫ ডলারের কেনা একটি পণ্য ২৫ ডলারে বিক্রি হচ্ছে। এর মাঝের ২০ ডলার কোথায় যাচ্ছে তার সমাধান করতে হবে। তা না হলে রানা প্লাজার মতো দুর্ঘটনা বন্ধ হবে না।
সিপিডির সম্মানিত ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, রানা প্লাজার ঘটনাকে মনে রেখে আগামীতে একটি সুন্দর শিল্প পরিবেশ গড়ে তুলতে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। আর রানা প্লাজার সব ধরনের শ্রমিকদের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয়কে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়ার প্রয়োজন রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, নিখোঁজ শ্রমিক, আহত শ্রমিকদের চিকিৎসা, পুনকর্মসংস্থান, আর্থিক সহায়তা এবং প্রাতিষ্ঠানিকিকরণের প্রতি আমাদের জোর দিতে হবে।
সস্তা শ্রম নয় শ্রমিকদের নৈপুণ্যেই বাংলাদেশের পোশাকশিল্প টিকে আছে এমন মন্তব্য করে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্সিয়া বার্নিকাট বলেন, শ্রমিকদের নৈপুণ্যের কারণে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা পেয়েছে বাংলাদেশি পোশাক। আর এর উপর ভিত্তি করেই তৈরি পোশাক খাত বিস্তার লাভ করেছে। যে কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের সঙ্গে আছে এবং ভবিষ্যতেও বাংলাদেশের পোশাকখাতের সঙ্গে থাকবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
কারখানা পরিদর্শনে আসা ক্রেতাদের দুটি সংগঠন অ্যাকোর্ড এবং অ্যালায়েন্স বাংলাদেশে কতদিন তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করবে এমন তর্কের নিজ দেশের অবস্থান তুলে ধরে তিনি বলেন, অ্যাকোর্ড, অ্যালায়েন্সের অবদান প্রথম দিকে বোঝা না গেলেও এখন এটার ফল পাওয়া যাচ্ছে। কারণ তারা গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ করেছে।
নেদারল্যাল্ডের রাষ্ট্রদূত লিওনি মার্গারেথ বলেন, পৃথিবীর সব থেকে আদর্শিক ও ভালো কারখানাগুলোর বেশ কয়েকটি বাংলাদেশে অবস্থিত। তবে বিশ্বব্যাপী এটির খুব একটা প্রচারণা নেই। রানা প্লাজার দুর্ঘটনার পর সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে।
সংলাপে ইন্ডাস্ট্রিয়াল বাংলাদেশ কাউন্সিলের মহাসচিব বাবুল আক্তার বলেন, বাংলাদেশের আইনে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণের পরিমাণ খুবই কম। তারপরও বিভিন্ন উৎস থেকে শ্রমিকরা সাহায্য পেয়েছেন, তা কিন্তু ক্ষতিপূরণ না। যার বা যাদের কাছ থেকে আইনগতভাবে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার কথা, তাদের কাছ থেকে শ্রমিকরা ক্ষতিপূরণ পাননি। সরকার তাদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করে শ্রমিকদের দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, তারা (নিহত শ্রমিক) বেঁচে গেছেন। আর যারা আহত হয়েছেন, তাদের প্রতিদিনই যন্ত্রণার মধ্যে থাকতে হয়। আহতদের চিকিৎসা নেওয়ার জন্য প্রতিদিনই ছোটাছুটি করতে হয়। এর ফলে অন্য পেশায়ও যাওয়ার সুযোগ হয় না। সরকারের উচিত, যারা আহত হয়েছেন তাদের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা।
সংলাপে অংশ নেয়া শ্রমিক নেতারা বরাবরের মতো পোশাকখাতে ট্রেড ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে বলেন, দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের এ যাবতকালে যতটা অর্থ সহযোগিতা দেয়া হয়েছে তার পুরোটাই কোনো না কোনো ক্রেতা গোষ্ঠী বা সংস্থার অনুদান বা সাহায্য। প্রকৃত অর্থে যাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা এখন পর্যন্ত তাদের কাছ থেকে কোন ক্ষতিপূরণ পাওয়া যায়নি।
কার কাছ থেকে কীভাবে ক্ষতিপূরণ আদায় করা হবে তার একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা চান শ্রমিক নেতারা। একইসঙ্গে রানা প্লাজাসহ গার্মেন্টসখাতে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনায় আহতদের সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত সুচিকিৎসা ও যারা সুস্থ হয়ে উঠেছে তাদের কর্মসংস্থানের দাবি জানান তারা।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি’র ৩ বছর - শারীরিক সমস্যা নিয়ে কর্মহীন হয়ে আছেন আহতরা
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ