Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮, ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ৫ রবিউস সানী ১৪৪০ হিজরী

দশ মহররম : মুসলিম মিল্লাতের দায়িত্ব ও কর্তব্য

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান | প্রকাশের সময় : ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৮, ১২:০২ এএম

আমাদের দেশে তিন ভাষায় সন বা বর্ষ গণনা করা হয়। আরবী, বাংলা ও ইংরেজী। দেশ হিসেবে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ এবং স্বাধীন ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার নিজস্ব স্বকীয়তা ও মর্যাদা থাকলেও সন গণনার ক্ষেত্রে বাংলার অবস্থান দ্বিতীয়। মুসলিম জাতি হিসেবে আরবী ভাষার একটা স্বতন্ত্র মর্যাদা থাকলেও আমাদের কাছে তা নেই। ফলে আরবী সন গণনার স্তর গিয়ে দাঁড়িয়েছে তৃতীয়তে। কেবল প্রাধান্য পাচ্ছে ইংরেজী গণনা। প্রায় দু’শ বছরের ইংরেজ শাসন আমাদের মন-মগজকে যেভাবে ধুলাই করেছে বংশ পরিক্রমায় তা আমরা লালন করছি ঐশী বিধানের মতো। আমাদের যা নিজস্ব সম্পদ তার গুরুত্ব আমাদের কাছে নেই বললেই চলে। যেমন বাংলা ভাষার জন্য ৮ই ফাল্গুন রক্ত ঝরেছে। শহীদ হয়েছে অনেকে। অথচ আমরা মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করি ২১শ ফেব্রুয়ারী। ৮ই ফাল্গুণ ইংরেজদের ধুলাই আগুনে জ্বলে পুড়ে ভস্ম হয়ে গেছে। একইভাবে আরবী চলে গেছে আরব দেশে। সে যাই হোক, বাংলা ও ইংরেজি সন আমরা গণনা করি বটে। আজ পর্যন্ত কেউ এ সনদ্বয়কে চর্ম চক্ষে দেখছে বলে শুনিনি। ৩০/৩১ দিন শেষ হলেই তোতা পাখির ন্যায় বলি জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি, বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ ইত্যাদি। আসলে এসবের কোন দৃশ্যমান অস্তিত্ব যেমন নেই তেমনি মানবজীবনে এর গুরুত্বও নেই। পক্ষান্তরে আরবী মাসসমূহ যেমন মানুষের চোখের সামনে দৃশ্যমান অনুরূপ এর গুরুত্বও অপরিসীম। এ বিশাল ও বৈচিত্র্যময় পৃথিবী যার ইঙ্গিতে সৃষ্টি হয়েছে সে মহামহিম আল্লাহ নিজেই এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘‘তোমরা যাতে করে বছরের সংখ্যা, সময় গণনা করতে পার তার জন্য আমি চন্দ্র ও সূর্য্যকে আলোকবর্তিকাময় ও উহার কক্ষপথ সুনিয়ন্ত্রিত করেছি।‘‘ (আল-কোরআন)। [আরবী মাসসমূহ মূলত এ জন্যই দৃশ্যমান। যেহেতু আরবী মাসসমূহ সময় এবং কাল গণনার্তে স্বয়ং আল্লাহ তা’আলা চন্দ্র ও সূর্য সৃষ্টি করেছেন। এ কারণেই দৃশ্যমান এ মাসগুলোর গুরুত্ব লক্ষণীয়। সময়ের আবর্তে নতুন চন্দ্র উদয়ের মধ্যদিয়ে চক্রাকারে এক একটি মাস নানান গুরুত্বে ও তাৎপর্য্যের বার্তা নিয়ে মানবমন্ডলীর সমীপে উপস্থিত হয়। এসব মাসের মধ্যে এমন কতক মাস রয়েছে যা অধিক মর্যাদার দাবীদার ও বরকতময়। এ বরকতময় ও তাৎপর্যপূর্ণ মাসসমূহের মধ্যে একটি হলো আরবী সনের প্রথম মাস ‘‘মাহে মহররম’’ বা হারাম মাস অথবা পবিত্র মাস। মহররমকে হারাম মাস বলা হয় এ কারণেই যে, এ মাসে যুদ্ধ-বিগ্রহ, রক্তপাত, ঝগড়া-বিবাদ ইত্যাদি করা হারাম বা শরীয়া দৃষ্টিতে অবৈধ। পবিত্র মাস বলা হয় এ কারণেই যে, সকল প্রকার যুদ্ধ-বিগ্রহ, বিবাদ-বিশৃংখলা, ঝগড়া-বিবাদ ইত্যাদি থেকে বিরত থাকা দরকার বলেই এ মাসকে পবিত্র মাস হিসেবে মর্যাদা প্রদান করা হয়। যেহেতু সন গণনার সূচনা মাস সেহেতু এ মাসে কোন ধরনের খারাপ কাজ করা উচিত নয়। অন্যান্য মাসেও তা থেকে বিরত থাকার শিক্ষা সূচনা মাসেই দেয়া হয়। পৃথিবীর সূচনা হতে এ পর্যন্ত যত বড় বড় বৈচিত্র্যপূর্ণ ও অকল্পনীয় ঘটনা সংঘটিত হয়েছে তার সিংহ ভাগই এ মাসের ১০ তারিখ সংঘটিত হয়েছে। এ দিনে সংঘটিত কয়েকটি ঐতিহাসিক ঘটনা নিম্নরূপ : ১। আল্লাহ তা’আলা পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এ দিনে। অর্থাৎ পৃথিবীর জন্ম দিন হলো ১০ মহররম। ২। আদি পিতা হযরত আদম (আঃ)কে সৃষ্টি করা হয় এ দিন। ৩। এ দিনেই হযরত আদম (আঃ) কে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়। ৪। বিচ্যুতির কারণে হযরত আদম (আঃ)-এর পৃথিবীতে প্রেরণের পর এ দিনই তাঁর তাওবা কবুল করা হয়। ৫। জাতির পিতা হযরত ইব্রাহিম (আঃ)-এর জন্ম দিন। ৬। নমরুদের বিশাল অগ্নিকুন্ড হতে জাতির পিতা হযরত ইব্রাহিম (আঃ) মুক্তিলাভ করেন। ৭। তুর পাহাড়ে আল্লাহর সাথে হযরত মুসা (আঃ)-এর কথোপকথন ও আসমানী কিতাব ‘‘তাওরাত’’ লাভ। ৮। জালেম ফেরাউনের দলবলসহ নীল দরিয়ায় সলিল সমাধি। ৯। হযরত ইদ্রীছ (আঃ) এর পুনঃ জান্নাতে ফেরা। ১০। বিবি মরিয়ম (আঃ)-এর গর্ভ হতে হযরত ঈসা (আঃ) এর পৃথিবীতে আগমন। ১১। হযরত নুহ (আঃ) ও তাঁর সঙ্গী-সাথীদের মহাপ্লাবন হতে মুক্ত লাভ। ১২। হযরত ঈসা (আঃ)-এর আকাশ গমন। ১৩। হযরত সোলাইমান (আঃ)-এর পুনঃরাজত্ব লাভ। ১৪। হযরত আইয়োব (আঃ)-এর রোগ মুক্তি ও পুনঃধন সম্পদ লাভ। ১৫। হযরত দাউদ (আঃ)-এর হাতে জালিম বাদশা জালুত নিহত হয়। ১৬। হযরত দাউদ (আঃ)-এর গুনাহ্ মাফ হয়। ১৭। হযরত্ ইয়াকুব (আঃ) তার প্রিয় পুত্র হযরত ইউসুফ (আঃ) কে ফিরে পান। ১৮। মাছের পেট হতে হযরত ইউনুস (আঃ)-এর মুক্তি লাভ। ১৯। আসমান হতে বৃষ্টি বর্ষণের সূচনা হয় এ দিনে। ২০। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর প্রিয় দৌহিত্র হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর শাহাদাত বরণ। ২১। এ দিনের কোন এক জুমাবারে ইস্রাফিলের সিংগার ফুঁৎকারে কেয়ামত সংগঠিত হবে। [উপরোক্ত বহুল আলোচিত ঘটনাসমূহের মতো আরো ঘটনা ঘটেছে মহররমের দশ তারিখ। এসব কারণেই এ মাস অতীব গুরুত্বের দাবী রাখে। সকল সংঘঠিত ঘটনাসমূহের মাঝে সব চেয়ে ব্যথাদায়ক ও বহুল আলোচিত ঘটনা হলো হযরত মুহাম্মদে আরবী (সঃ) এর প্রিয় দৌহিত্র শহীদ জননী ফাতেমাতুজ জোহরা (রাঃ) এর হৃদয়ের স্পন্দন, শেরে খোদা হযরত আলী মর্তুজা (রাঃ) এর নয়নের মনি বিশ্ব মুসলিম মিল্লাতের বিপ্লবী ও সংগ্রামী চেতনার প্রতীক সাইয়াদুস শুহাদা হযরত ইমাম হোছাইন (রাঃ) এর মর্মান্তিক শাহাদাত বরণ। দজলা ও ফোরাতের তীরে কারবালা প্রান্তরে হিজরী ৬১ সনে কাতেবে ওহি হযরত আমীরে মোয়াবিয়ার অযোগ্য সন্তান জালিম এজিদের পাষন্ড সৈন্য-সামন্তরা খোদায়ী খিলাফতকে পদ তলে দিয়ে আহলে বাইয়্যাতের যোগ্য খিলাফতকে অস্বীকার করে রাজতন্ত্রের দম্ভ প্রদর্শন করে সাইয়্যাদিনা ইমাম হোছাইন সহ ৭২জনকে শাহাদাত বরণ করিয়ে দুনিয়ার ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়ের সূচনা করে। কিন্তু কেন এবং কিভাবে এ ঘটনা সংগঠিত হয় তার কম বেশি দুনিয়াবাসীর অজানা নয়। আমরা সি দিকে যাব না। শুধু এটুকু বলার প্রয়াস পাব যা জরুরী মনে হয়। [কুফায় গভর্নর হযরত আমীরে মোয়াবিয়ার ইন্তেকালের পর তার পুত্র এজিদ পিতার উত্তরাধিকার হিসেবে নিজকে খলিফা বলে ঘোষণা দেয়। আহলে বাইয়্যাতদের কে সে তার আনুগত্য স্বীকার করার নির্দেশ দেয়। অথচ শরীয়াহ মোতাবেক এজিদ কোন প্রকার ইসলামী খিলাফতের জন্য উপযুক্ত ছিল না। তাই আহলে বাইয়্যাতগণ তার আনুগত্য স্বীকার করার মতো কোন ধরনের যৌক্তিকতা নেই বিধায় তাঁরা এজিদের নির্দেশকে প্রত্যাখ্যান করে। শুধু এ কারণেই হিজরী ৬১ সনের ১০ মহররম কারবালা প্রান্তরের ব্যথাদায়ক ঘটনা সংঘটিত হয়, আহলে বাইয়্যাতের পবিত্র রক্তে রঞ্জিত হয় কারবালা প্রান্তর। এজিদি শক্তি অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায়, সুকৌশলে ৭২ জন আহলে বাইয়্যাতের রক্ত ঝরায় নির্মমভাবে। দুনিয়ার বুকে সৃষ্টি করে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। হযরত ইমাম হোছাইন (রাঃ) এর শাহাদাতের মর্মান্তিক ঘটনা অতি গুরুত্ব সহকারে বিবেচিত হয়ে আসছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। আলোচনা পর্যালোচনা চলছেই। তা চলতে থাকবে প্রলয় দিবস অবধি। ঘটনার চুলচেড়া বিশ্লেষণ হচ্ছে। কিন্তু ঘটনার মূল কারণ কি সে ব্যাপারে সাধারণ মানুষ খুব বেশি ওয়াকিফহাল নয়। ফলে মুসলিম বিশ্ব এ ঘটনার তাৎপর্যকে কেন্দ্র করে যে শিক্ষা পাওয়ার কথা এবং শিক্ষার বিষয়কে মূল্যায়ন করার কথা তা করা হচ্ছেনা। অথচ এ দিনকে কেন্দ্র করে আমরা অনেক কিছু করে থাকি। যা করি তা শরীয়াহ্ সম্মত কিনা তার বাছ বিচার করা হয় না। বাস্তব সম্মত বিষয় হলো ১০ মহররম কারবালার প্রান্তরে সংঘটিত ঐতিহাসিক ও হৃদয় বিদারক ঘটনার সামাজিক, রাজনৈতিক ও শরীয়াহ ভিত্তিক গুরুত্ব আছে। দেখার বিষয় হলো আমরা এর গুরুত্ব কতটুকু মূল্যায়ন করি এবং কি ভাবে মূল্যায়ন করি? আমরা যা করি তার মধ্য হতে অধিক আর করার কিছু আছে কিনা এবং যা করি তার মধ্য হতে বর্জনীয় কিছু আছে কিনা? তা জানা ও বুঝা সকলের জন্য অতিব জরুরী। এটা জানার পূর্বে আমরা দেখব যে, বিশ্বনবী (সঃ) এর আগমনের পূর্বে ও পরে মহররম পালন হতো কিনা? হলে কিভাবে হতো? [বিশ্বনবী (সঃ) এর আগমন পূর্ব মহররম পালন:] বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সঃ)-এর আগমন পূর্ব যত নবী পৃথিবীর ভূ-পৃষ্ঠে আগমন করেছেন তারা এবং তাদের উম্মতগণ মহররম পালন করেছেন। তাঁরা ১০ মহররম রোজা পালনের মাধ্যমে মহররম পালন করতেন। কোন কোন নবীর উম্মতের উপর মহররমের রোজা ফরজ ছিল। এ মাসকে তারা পবিত্র মাস হিসেবে জানতো- বিধায় এ মাসে কোন ধরনের যুদ্ধ-বিগ্রহ, ঝগড়-বিবাদ ইত্যাদিতে জড়িয়ে পড়তো না। পবিত্র মাসে ঐ প্রকার ঝগড়া-বিবাদ, যুদ্ধ-বিগ্রহ নিষিদ্ধ ছিল। হযরত মুসা (আঃ) এর উম্মত তথা বনি ইস্রাইলের লোকেরা দশ-ই-মহররমকে মুক্তি দিবস হিসেবে পালন করতো। কারণ অত্যাচারী জালিম বাদশা ফেরাউনের দলবলসহ নীল দরিয়ায় সলিল সমাধি ঘটেছিল এ দিনে। তার মৃত্যুর পর তার জুলুম থেকে বনি ইস্রাইল নিষ্কৃতি লাভ করে- বিধায় এ দিনকে তারা মুক্তি দিবস হিসেবে পালন করতো। [মহানবী (সঃ) এর মহররম পালন:] বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) স্বয়ং পবিত্র আশুরার রোজা রেখেছেন। হাদীস শরীফের বর্ণনা মতে, হযরত (সঃ) অহি প্রাপ্তির পূর্বে ১০ই মহররম রোজা রাখতেন। হিজরতের পর মদীনায় গিয়েও তিনি রোজা রেখেছেন। পবিত্র রমজান মাসের রোজা ফরজ হবার পর আশুরার রোজা সুন্নাতে রূপায়িত হয়। কেউ ইচ্ছা করলে আশুরার রোজা রাখতেও পারে আবার নাও রাখতে পারে। তবে হযরত (সঃ) মহররমের ৯ ও ১০ তারিখ দু’টি রোজা রাখতেন। এভাবে দু’টি রোজা রাখা সুন্নাত। এ দু’টি রোজা ৯ ও ১০ তারিখ হোক অথবা ১০ ও ১১ তারিখ হোক। এটা মুসলিম মিল্লাতের কর্তব্য। এ বিষয়ে সবাইকে উৎসাহিত করা সকলের একান্ত দায়িত্ব। [হযরত ইমাম হোছাইনের শাহাদাত বরণ কেন?] কারবালার ঐতিহাসিক মর্মান্তিক ঘটনায় হযরত ইমাম হোছাইন (রঃ) নিজে শাহাদাত বরণ করলেন। তার সাথে কোলের মাসুম বাচ্চাসহ আহলে বাইয়্যাতের ৭২জন সদস্য শাহাদাতের নজরানা পেশ করলেন। একজন ব্যক্তির জীবন দেয়া এবং সাথে কোলের বাচ্চাসহ ৭২জন কুরবানী হওয়া এটা ছোট কোন ঘটনা নয়। কোন ধরনের দুর্ঘটনাও নয়। তাই স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগে যে, এজিদের সাথে হযরত ইমাম হোছাইনের বিরোধ কোথায় ছিল? ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায যে, হযরত ইমাম হোছাইন (রঃ) এর সাথে এজিদের কোন ধরনের ব্যক্তিগত শত্রুতা, দ্বনদ্ব-সংঘাত ছিল না। সামাজিক কোন সমস্যাও ছিল না। সিংহাসন লাভের মতো কুৎসিত কোন মনোবাসনা ইমামের ছিল না। যিনি বিশ্বনবীর কোলে-কাঁধে চড়েছেন, হযরত আলী ও হযরত ফাতেমা (রঃ)-এর কোলে চড়ে বড় হয়েছেন- আসহাবে রাসূল (স:) এর মাঝে বড় হয়েছেন, এমন একজন মহান ব্যক্তির মাঝে সিংহাসন লাভের মতো কুৎসিত বাসনা থাকবে তা চিন্তা করা যায় না। তিনি ছিলেন উন্নত মানের তাকওয়া সম্পন্ন লোক। সবদিক দিয়ে ছিলেন তিনি সম্মানিত ও সর্বজন শ্রদ্ধেয়। যারা শাসক ছিলেন তাদের কাছেও তিনি সম্মানিত ছিলেন। হযরত ইমাম হোছাইনের ব্যক্তিত্ব দুনিয়ার সাধারণ পদ-পদবীর চেয়ে অনেক গুণে বড় এবং সম্মানিত ছিল। অতএব সিংহাসন লাভের মতো কোন ধরনের কুৎসিত বাসনা ইমামের ছিল না। কোন ধরনের পদ-পদবীর প্রয়োজনও ইমামের ছিল না। তারপরও কেন তিনি কারবালা প্রান্তরে যুদ্ধে লিপ্ত হলেন? এ বিষয়ে আলোচনা করতে গেলে দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখতে হবে। এখানে সে সুযোগ নেই বিধায় মৌলিক কারণগুলো সংক্ষেপে আলোচনা করছি। আল্লাহর দেয়া সংবিধান অনুযায়ী বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সঃ)-এর নেতৃত্বে মদীনায় যে ইসলামী খিলাফাত প্রতিষ্ঠিত হয় সে ইসলামী রাষ্ট্রের কয়েকটি মৌলিক শাসনতান্ত্রিক ধারা ছিল। ইসলামী রাষ্ট্রের সে শাসনতান্ত্রিক মৌলিক ধারাসমূহ ছিল আল্লাহর প্রদত্ত এবং রাসুল (সঃ) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ধারা। যা সকল যুগের সকল মানুষের জন্য ছিল কল্যাণকর। এ ধারা গুলো নিম্নরূপ: ১নং ধারা:- ‘‘একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে জনসাধারণের স্বাধীন মতামতের ভিত্তিতে। এ রাষ্ট্রে কোন একজন ব্যক্তির একক কর্তৃত্ব থাকবে না। এককভাবে কেউ একচ্ছত্র প্রাধান্য পাবে না।’’ নবুওয়াত লাভের পর মক্কার জনগণ স্বাধীনভাবে ইসলামী দাওয়াতকে প্রত্যাখ্যান করেছে বিধায় যেখানে ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম হয়নি। মদীনায় হিজরতের পর মদীনার সকল জনগণ ইসলামী রাষ্ট্র গড়ার বিষয়ে স্বাধীন মতামত পেশ করলে সেখানেই প্রথম ইসলামী রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন ঘটে। রাসূল (সঃ) এর ইন্তেকাল পর্যন্ত তিনি স্বয়ং ইসলামী রাষ্ট্রের নেতৃত্ব দেন। তিনি স্বয়ং অহি দ্বারা পরিচালিত বিধায় এ রাষ্ট্রের নেতৃত্ব দেন। বিশ্বনবীর ইন্তেকালের পর খোলাফায়ে রাশেদীনগণ পরামর্শের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা করেন। এখানে কারো একক কর্তৃত্ব ছিল না। ২নং ধারা: ‘‘দেশ বা রাষ্ট্র পরিচালিত হবে পরামর্শের ভিত্তিতে। আর পরামর্শ করতে হবে এমন লোকদের সাথে যাদের রয়েছে চারটি মৌলিক গুণ। মৌলিক গুণ হলো ১) যার রয়েছে ইসলামের গভীর জ্ঞান ২) তাকওয়া বা আল্লাহ ভীতি ৩) যার রয়েছে নির্ভুল সিদ্ধান্ত নেয়ার মতো বুদ্ধি জ্ঞান। ৪) যার প্রতি রয়েছে জনগণের গভীর আস্থা। মদীনায় যে ইসলামী রাষ্ট্র গঠিত হয়েছিল তার প্রথম কর্ণধার ছিলেন স্বয়ং আল্লাহর রাসূল। রাসূল (সঃ) এর ওফাতের পর প্রধান চার খলিফা রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে ঐ সময়ের সবচেয়ে বেশি জ্ঞানী, তাক্ওয়া সম্পন্ন, বুদ্ধি সম্পন্ন এবং জনগণের নিকট প্রিয়জন যারা ছিল তাদেরকে নিয়ে মজলিশে শূরা গঠন করে তাদের সাথে পরামর্শ করে রাষ্ট্র পরিচালনা করতেন। কোন খলিফা ইসলাম বহির্ভূত কোন সিদ্ধান্ত কিংবা নিজের মর্জিমতো কোন সিদ্ধান্ত কারো উপর বা রাষ্ট্রের জনগণের উপর চাপিয়ে দিতেন না। ৩নং ধারা: ‘‘রাষ্ট্রের ভাল-মন্দ ইত্যাদি বিষয়ে মতামত পেশ করার পূর্ণ স্বাধীনতা জনগণের থাকবে। জনগণের মত প্রকাশের স্বাধীনতার উপর কারো কোন প্রকার হস্তক্ষেপ করা যাবে না। বিশেষ করে সৎ কাজের আদেশ দেয়া, অসৎ কাজে বাধা দেয়ার স্বাধীনতা সকল জনগণ সংরক্ষণ করবে।’’ সৎ কাজের আদেশ দেয়া, অসৎ কাজে বাধার সৃষ্টি করা এটা আল্লাহর হুকুম। আল্লাহর নির্দেশ। এ নির্দেশ রাষ্ট্র প্রধান থেকে শুরু করে সাধারণ কর্মচারী পর্যন্ত সকলের মৌলিক কাজ। মূলত: ইসলামের বড় ও আসল মিশন এটা। আল্লাহর এ হুকুম সকলে সমভাবে সংরক্ষণ করবে। মদীনার নব গঠিত ইসলামী রাষ্ট্রের জনগণ মতামত পেশ করার স্বাধীনতা পূর্ণরূপে ভোগ করেছেন। ৪নং ধারা: ‘‘যিনি ইসলামী রাষ্ট্রের প্রধান হবেন তাকে আল্লাহ এবং জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে।‘‘ এখানেই একজন ব্যক্তির আসল রূপ ফুটে উঠে। যিনি সরকার প্রধান হবেন তিনি কোন ধরনের জবাব দিহিতার ঊর্ধ্বে থাকবেন না। দুনিয়ার জীবনে রাষ্ট্রের ভাল-মন্দ সব বিষয়ে জনগণের নিকট স্বচ্ছ জবাবদিহি করতে হবে। আর আদালতে আখেরাতে মহান আল্লাহর নিকট জবাবদিহি করার মনমানসিকতা থাকতে হবে। রাষ্ট্রের শাসনতন্ত্রের এ ধারার বলে কোন রাষ্ট্রনায়কের স্বেচ্ছাচারী হবার সুযোগ নেই। প্রকাশ্যে বা অপ্রকাশ্যে কোন ধরনের বৈষয়িক বা জাগতিক, নৈতিক বা অনৈতিক কোন ধরনের অপরাধ করার সুযোগ থাকে না। (চলবে)



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর