Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার, ১৭ অক্টোবর ২০১৮, ২ কার্তিক ১৪২৫, ০৬ সফর ১৪৪০ হিজরী

আত্মসমর্পণের হিড়িক

চট্টগ্রামের বিভিন্ন আদালতে এক মাসেই হাজির দেড় শতাধিক

রফিকুল ইসলাম সেলিম | প্রকাশের সময় : ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৮, ১২:০১ এএম

চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের মাঝারি ও তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের আদালতে আত্মসমর্পণের হিড়িক পড়েছে। চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলাসহ হরেক মামলায় তারা গণহারে বিভিন্ন আদালতে হাজির হচ্ছেন। কেউ জামিন পাচ্ছেন, আবার কেউ কারাগারে যাচ্ছেন। কেউ উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে আইন মেনে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করছেন। গেল এক মাসে চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলার আদালতগুলোতে অন্তত দেড় শতাধিক আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মী হাজির হয়েছেন বলে আদালত সূত্রে জানা গেছে। সামনের দিনগুলোতে এ প্রবণতা আরও বাড়বে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
খুনের মামলাসহ একাধিক মামলার হুলিয়া মাথায় নিয়ে এতোদিন অনেকেই দাপটের সাথে বিভিন্ন এলাকায় তৎপর ছিলেন। তারাও এখন আদালতের কাঠগড়ায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টানা দুই মেয়াদে সরকারের শেষ সময়ে এসে এখন ক্ষমতাসীন দলের তৃণমূল নেতাদের আইনের কাছে আত্মসমর্পণ তাৎপর্যপূর্ণ। ‘সামনে এমন সুযোগ আর নাও থাকতে পারে’ এমন শঙ্কা ও ভীতি থেকেই তারা অদূর ভবিষ্যতে গ্রেফতার অথবা হয়রানি এড়ানোর জন্য আদালতে ছুটছেন বলেও মন্তব্য করছেন অভিজ্ঞ আইনবিদগণ।
চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক সুদীপ্ত বিশ্বাস হত্যা মামলার মূলহোতা যুবলীগ নেতা আইনুল কাদের নিপু ও তার অন্যতম সহযোগী জাহিদুল গত ১৭ সেপ্টেম্বর সোমবার আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। আদালত তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এতদিন তারা প্রকাশ্যে নগরীতে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন। অংশ নিয়েছেন দলের রাজনৈতিক কর্মসূচিতেও। আলোচিত এই খুনের মামলায় আগে আরও কয়েকজন আত্মসমর্পণ করেন। নগরীর হালিশহরে যুবলীগ নেতা মহিউদ্দিন মহিদকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করেও ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা আওয়ামী লীগ নেতা হাজি ইকবাল আদালতে এসে আত্মসমর্পণ করেন ১০ সেপ্টেম্বর। পরদিন তার ভাইও একই মামলায় আদালতে হাজির হন। তারও আগে নগরীর বাকলিয়ায় যুবলীগ নেতা ফরিদুল ইসলামকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার ঘটনায় আওয়ামী লীগ নেতা এমএ মুছাসহ আট নেতা আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। তাদেরও কারাগারে পাঠানো হয়। অথচ এতদিন তারা এলাকায় ছিলেন প্রকাশ্যে এবং সদর্পে।
চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলা ছাড়াও মহানগর ও চট্টগ্রাম জেলায় দলীয় কোন্দলের জেরে হত্যা, হত্যাপ্রচেষ্টা, অস্ত্রবাজি, মারামারিসহ বিভিন্ন মামলায় আওয়ামী লীগ এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন সমূহের তৃণমূলের নেতারা আদালতে হাজির হচ্ছেন বলে আদালত সূত্রে জানা গেছে।
আদালতে আওয়ামী লীগ নেতাদের আত্মসমর্পণের এই হিড়িক প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মহানগর আওয়ামী লীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট শেখ ইফতেখার সাইমুল চৌধুরী গতকাল (বুধবার) দৈনিক ইনকিলাবকে বলেন, সামনে জাতীয় নির্বাচন, এ অবস্থায় কোন ধরনের গ্রেফতার ও হয়রানি এড়াতে নেতাকর্মীরা আগে থেকেই আদালতে হাজির হয়ে জামিন নিচ্ছেন। এর ফলে সামনের দিনগুলোতে নির্বাচনী তৎপরতায় অংশ নেয়ার ক্ষেত্রে কোন ঝামেলা থাকবে না। মামলার পর আদালতে আত্মসমর্পণ করা আইনের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানো হয়। সরকারি দল হিসেবে আওয়ামী লীগ নেতাদের উচিত সবার আগেই আদালতে যাওয়া।
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রামের সাবেক পিপি ও জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি কফিল উদ্দিন চৌধুরী দৈনিক ইনকিলাবকে বলেন, নিজদল ক্ষমতায় থাকায় এতদিন তারা হুলিয়া মাথায় নিয়েও নিরাপদ ছিলেন। এমন সুযোগ সামনে আর নাও থাকতে পারে-এমন আশঙ্কায় তারা গ্রেফতার বা হয়রানি এড়াতে আগেভাগেই আইনের আশ্রয় নিচ্ছেন। প্রশাসনে তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য। সামনে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন হলে এমন প্রভাব নাও থাকতে পারে। হত্যা মামলায় আত্মসমর্পণ করে অনেকে কারাগারে গেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ক্ষমতার পটপরিবর্তন হলে পরিস্থিতি হবে ভয়াবহ। সরকারি দলের কতিপয় নেতা এমন ধরনের যে আশঙ্কা ব্যক্ত করছেন তাতে তৃণমূলের পর্যায়ে থাকা নেতাকর্মীদের মাঝে এক ধরনের চাপা ভীতি বা আতঙ্কের সৃষ্টি হচ্ছে। ওই আতঙ্কের কারণে হয়তো অনেকে এখন জেলখানাতে থাকাটাই নিরাপদ ভাবছেন।
চট্টগ্রাম মহানগর আদালতের পিপি অ্যাডভোকেট ফখরুদ্দীন চৌধুরী মনে করেন, সামনে নির্বাচন, মামলার আসামি হয়ে হুলিয়া নিয়ে পলাতক থাকলে হয়তো তারা প্রকাশ্যে নির্বাচনী তৎপরতায় সামিল হতে পারবেন না। এই কারণেই আগেভাগে আদালতে আত্মসমর্পণ করে তারা জামিন নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, নির্বাচনকে সামনে রেখে দলের নেতাকর্মীদের নামে ঝুলে থাকা হুলিয়া এবং মামলার নিষ্পত্তির বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। বিশেষ করে যেসব নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে খুন এবং অস্ত্রের মামলা রয়েছে তাদের জামিন করানোর উদ্যোগ নিয়েছেন বিভিন্ন সংসদীয় আসনের সম্ভাব্য মনোনয়ন প্রত্যাশীরা। নির্বাচনকালীন সরকার আসলে পুলিশের ভূমিকা কি হয় তা নিয়ে নানা সংশয় রয়েছে আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে।
টানা ১০ বছর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়। এ সময়ে বড় নেতাদের বিরুদ্ধে তেমন কোনো মামলা-মোকদ্দমা হয়নি। বিগত সরকারের সময়ে দায়েরকৃত অনেক মামলা রাজনৈতিক মামলা হিসেবে প্রত্যাহার করা হয়েছে। বিগত ১০ বছর নিজেদের মধ্যে হানাহানি আর কলহ-কোন্দলে মহানগরী থেকে শুরু করে জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা হয়েছে। মহানগরী ও জেলায় কোন্দলের জেরে অন্তত অর্ধ শতাধিক নেতাকর্মী খুন হয়। এসব খুনের মামলায় আসামি বেশিরভাগই আওয়ামী লীগ ও তাদের সহযোগী সংগঠনের থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাকর্মী।
আবার সরকারি দলের নেতাকর্মীদের নামে যেসব মামলা রয়েছে সেগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। আদালতে বিচারাধীন মামলার পাশাপাশি তদন্তাধীন মামলার তদন্ত শেষ করে আনা হচ্ছে। নগরীতে আলোচিত স্কুল ছাত্রী তাসফিয়া হত্যা মামলায় যে ছয়জনকে আসামি করা হয় তারা সবাই ছাত্রলীগের সাথে সংশ্লিষ্ট। মাত্র সাড়ে চার মাসের মাথায় মামলাটি তদন্ত শেষ করে ফাইনাল রিপোর্ট দেয়া হয়েছে। যদিও তাসফিয়ার পরিবার বলছে, ফাইনাল রিপোর্ট দিয়ে আসামিদের অব্যাহতি দেয়ার প্রতিবেদন তারা মানেন না। খুব শিগগির আদালতে নারাজি দেয়া হবে।
নগরীর কদমতলীতে পরিবহন ব্যবসায়ী ও যুবদল কর্মী হারুনুর রশিদ চৌধুরী হত্যা মামলায়ও ১৮ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয়া হয়। হারুনকে গুলি করে হত্যার পর এ ঘটনায় সরকারি দলের নেতাকর্মীদের দায়ী করা হলেও পুলিশি তদন্তে খুনের জন্য পরিবহন ব্যবসার বিরোধকে দায়ী করা হয়। আসামি করা হয় পরিবহন খাতের সংশ্লিষ্টদের। ইতোমধ্যে চট্টগ্রামের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও নগর ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক নাসিম আহমেদ সোহেল হত্যা মামলা, নগরীর হালিশহরে যুবলীগ নেতা মহিউদ্দিন হত্যা মামলা, সিআরবির জোড়া খুন মামলাসহ বেশ কয়েকটি চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার চার্জশিট দেয়া হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (প্রসিকিউশন) নির্মলেন্দু বিকাশ চক্রবর্তী দৈনিক ইনকিলাবকে বলেন, সাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়া সাপেক্ষে মামলার তদন্ত শেষ করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে কাউকে অতিরিক্ত সুযোগ দেয়ার কোন অবকাশ নেই। সরকারি দলের নেতাকর্মীদের বিভিন্ন মামলায় আদালতে আত্মসমর্পণ ও হাজির হওয়ার বিষয়টি ইতিবাচক উল্লেখ করে তিনি বলেন, এতে প্রমাণ হয় আইন সবার জন্য সমান। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে না।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ