Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার, ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৫ পৌষ ১৪২৫, ১১ রবিউস সানী ১৪৪০ হিজরী

কারবালা ও আশুরার শিক্ষা

অধ্যাপক হাসান আব্দুল কাইয়ূম | প্রকাশের সময় : ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮, ১২:০৭ এএম

ইরাকের ফোরাত নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত কারবালা মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ জনপদ। এই জনপদ প্রসিদ্ধিলাভ করেছে জান্নাতে যুবকদের নেতা, প্রিয় নবী (সা:)-এর প্রিয় নাতি, আসাদুল্লাহিল গালিব, হজরত আলী করমুল্লাহ ওয়াজহাহু এবং জান্নাতে নীরীদের নেত্রী হজরত ফাতেমাতুজ জেহারা (রা:)-এর দ্বিতীয় পুত্র হজরত ইমাম হুসাইন (রা:)-এর সপরিবারে শাহাদতের মর্মান্তিক ঘটনাকে স্মরণের জন্য। উপমহাদেশের স্বাধীনতার নকীব মওলানা মুহাম্মদ আলী জত্তহর লিখেছেন : কতলে হুসাইন আসলমে মার্গ ইয়াজিদ হ্যায়/ইসলাম জিন্দা হোতা হ্যায় হর কারাবালাকি বাদ ইমাম হুসাইনের কতল হওয়া আসলে ইয়াজিদের মৃত্যু এনেছে/ইসলাম জিন্দা হয় প্রতিটি কারবালার পরে। হযরত ইমাম হোসাইন (রা:) সত্য ন্যায় ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ণিজে প্রাণ দিয়ে প্রমাণ করেছিলেন কোনো কোরবানিই বৃথা যায় না। কারবালার যুদ্ধ ঘটেছিল ৬৮০ খ্রি: ১০ মুহররম অর্থাৎ আশুরার দিনে। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এই ঘটনাকে স্মরণ করে লিখেছিলেন, ফিরে এলো আজ সেই মুহররম মাহিনা/ত্যাগ চাই, মুরসিয়া ক্রন্দন চাহিনা। কারবালার যুদ্ধ আশুরাকে মহিয়ান করে দিয়েছে।

সৃষ্টির আদিকাল থেকে যুগে যুগে বিভিন্ন নবী-রাসূলের নানা ঘটনাকে ধারণ করে আছে। আল্লাহ তাআলা হজরত মুহাম্মদ (সা:)-এর নূর মোবারক সৃষ্টির মাধ্যমে যেদিন সৃষ্টি জগতের সূচনা করেন সেদিন ছিল আশুরা। পৃথিবীতে যেদিন প্রথম বৃষ্টি বর্ষিত হয়েছিল সেদিন ছিল আশুরা। মানব জাতির আদি পিতা হজরত আদম (আ:)-এর দেহে প্রাণ সঞ্চারিত করেছিলেন সেদিন ছিল আশুরা, হজরত আদম (আ:)-এর তত্তবা যেদিন আল্লাহ কবুল করেছিলেন সেদিন ছিল আশুরা। হজরত নূহ (আ:) মহা প্লাবনের সময় ৪০ দিন ভাসমান থাকা অবস্থায় কিস্তি থেকে যুদী পাহাড়ের চ‚ড়ায় সদলবলে যেদিন অবতরণ করেছিলেন সেদিন ছিল আশুরা, যেদিন হজরত ইবরাহীম (আ:) নমরুদের অগ্নিকুÐ থেকে আল্লাহর রহমতে মুক্ত হয়েছিলেন সেদিন ছিল আশুরা। আল্লাহ তায়ালা আগুনকে নির্দেশ দিয়েছিলেন : হে আগুন, তুমি ইবরাহীমের জন্য শান্তিপ্রদ শীতল হয়ে যাও। হজরত মূসা (আ:) যেদিন বনী ইসরাইলের কয়েক হাজার মানুষকে ফেরাউনের কারগার থেকে মুক্ত করে লৌহিত সাগর পাড়ি দিয়েছিলেন সেদিন ছিল আশুরা, হজরত আইয়ূব (আ:) ১৮ বছর কঠিন রোগে ভোগার পর সেদিন আল্লাহর রহমতে রোগমুক্ত হয়েছিলেন সেদিন ছিল আশুরা। হজরত ইউনুস (আ:) চল্লিশ দিন মাছের পেটে থাকার পর আল্লাহর রহমতে যেদিন দজলা নদীর তীরে অবতরণ করেছিলেন সেদিন ছিল আশুরা। এমনিতরো অসংখ্য ঘটনার সরব সাক্ষী আশুরা।
প্রিয় নবী (সা:) ৬২২ খ্রিষ্টাব্দের রবিউল আউয়াল মাসে আল্লাহর নির্দেশে মক্কা মোকাররমা থেকে হিজরত করে মদীনা মনোয়ারায় এসে জানতে পারলেন, মদীনার ইয়াদিরা আশুরাতে সিয়াম পালন করে। তিনি তাদের ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা আশুরাতে সিয়াম পালন করো কেন? তারা জানালেন তাদের নবী হজরত মুসা (আ:) ফেরাউনের কবল থেকে হাজার হাজার বনি ইসরাইলকে উদ্ধার করে যেদিন লৌহিত সাগর পাড়ি দিয়েছিলেন সেদিন ছিল আশুরা, হজরত মুসা (আ:) কৃতজ্ঞতার নিদর্শন স্বরূপ এবং মুক্তির দিবস হিসাবে আশুরাকে সিয়াম পালন করতেন তারই অনুসরণে আমরাও আশুরায় সিয়াম পালন করি। প্রিয় নবী (সা:) তাদের এই কথা শুনে বললেন, মুসা (আ:)-এর ওপর তোমাদের যতটুকু অধিকার রয়েছে আমার তার চেয়ে বেশি অধিকার রয়েছে। এর প্রায় সাত মাস পর ১০ই মহররমে তিনি আশুরার সিয়াম পালন করলেন তার অনুসরণে সাহাবায়ে কেরামও এই সিয়াম পালন করলেন। এর কয়েক মাস পর আল্লাহ তায়ালা রমাদান মাসকে সিয়ামের জন্য নির্ধারণ করে দিয়ে সিয়াম বিধান নাজিল করেন। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন : রমাদান মাস, যাতে নাজিল হয়েছে মানুষের হেদায়েতের জন্য। সৎপথে সুস্পষ্ট নিদর্শন এবং সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্যকারী আল-কোরআন। অতত্রব তোমরা যারা এই মাস পাবে তারা এই মাসে সিয়াম পালন করবে। রমাদান মাসে সিয়াম বিধান নাজিল হওয়ার ফলে তা পালন করা ফরজ হয়ে গেল আর আশুরার সিয়াম নফল সিয়াম হিসাবে পরিণত হলো। নফল সিয়ামের মধ্যে সবচেয়ে সর্যাদাপূর্ণ নফল সিয়াম হচ্ছে আশুরার সিয়াম।
কারবালায় ইমাম হোসাইন (রা:) সপরিবারে শাহাদাতের ঘটনা যেদিন ঘটেছিল সেদিন ছিল ১০ই মহররম বা আশুরা। কারবালা সেদিন ছিল ধু ধু মরু প্রান্তর বর্তমানে সেখানে গড়ে উঠেছে এক অত্যাধুনিক নগরী। প্রতিদিন হাজার হাজার জিয়ারতকারীর সমাবেশ ঘটে কারবালায়। তারা হজরত ইমাম হোসাইন (রা:) মাজার শরীফ জিয়ারত করে শহীদী চেতনা উজ্জীবিত হয়।
হজরত হোসাইন (রা:) কারবালার যুদ্ধের সূচনাতে এক জ্বালাময়ী ভাষণ দিয়েছিলেন। দীর্ঘ ভাষণে তিনি বলেছিলেন, আমার নানা হজরত মুহাম্মদ (সা:) বলেছিলেন হোসাইন, আমার থেকে এবং আমি হোসাইন থেকে কিন্তু ইয়াযিদ বাহিনী তার সেই ভাষণের তোয়াক্কা না করে তাঁকে কতল করতে কুণ্ঠাবোধ করেনি। ইয়াজিদের প্রেতাত্মা আজও রয়েছে। তারা মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে চলেছে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন : তোমরা আল্লাহর রজ্জু সম্মিলিতভাবে মজবুত করে আঁকড়ে ধর এবং পরস্পর বিভেদ সৃষ্টি করো না। আল্লাহর এই নির্দেশকে যারা অমান্য করে তারা আল্লাহর শত্রু এবং মানবতার শত্রু। আশুরার শিক্ষা হচ্ছে ঐক্য ও সংহতি। যুগশ্রেষ্ঠ সুফী হজরত মওলানা শাহসুফী তোয়াজউদ্দীন আহমদ বলেছেন, সবর ও শোকরের মহা শিক্ষা আমরা আশুরাতে পাই, এ দিবস আত্মআবিষ্কার করার তাকিদ দেয়। আশুরাকে কেন্দ্র করে অনেক শিরক ও বিদাআত তৎপরতা রয়েছে, যা প্রতিহত করা আমাদের কর্তব্য।
লেখক : পীর সাহেব দ্বারিয়াপুর শরীফ, গবেষক, সাবেক পরিচালক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ।

 



 

Show all comments
  • জীবন ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮, ৩:৪৬ এএম says : 0
    সংক্ষিপ্ত এই লেখাটি খুব ভালো লাগলো
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।