Inqilab Logo

ঢাকা, সোমবার, ২২ অক্টোবর ২০১৮, ৭ কার্তিক ১৪২৫, ১১ সফর ১৪৪০ হিজরী

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন : পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন

| প্রকাশের সময় : ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮, ১২:০৭ এএম

প্রয়োজনীয় সংশোধন, জনমত যাচাইয়ের সুপারিশ এবং সংশ্লিষ্ট প্রায় সব পক্ষের মতামত ও দাবী উপেক্ষা করে অবশেষে প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। এই আইনের বহুল আলোচিত-সমালোচিত ৩২ ধারা বহাল রেখেই আইনটি কণ্ঠভোটে পাস হয়। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খসড়া প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই দেশের সাংবাদিক সমাজ, সংবাদপত্র ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার মালিকপক্ষ, বিভিন্ন রাজনৈতিকদল ও নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে এই আইনের ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরার পাশাপাশি প্রত্যখ্যান করা হয়েছিল। এমনকি সংসদে সরকারের অনুগত বিরোধিদলও জনমত যাচাইসহ প্রয়োজনীয় পরিবর্তন, সংশোধন ও সংযোজনের সুপারিশ করেছিল। গত বুধবার বিলটি সংসদে পাশ হওয়ার আগে বিরোধিদলের বেশ কয়েকজন সদস্য জোরালোভাবে এই আইনের বিরোধিতা করে বক্তব্য রাখেন। ইতিপূর্বে সম্পাদক পরিষদের তরফ থেকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে খসড়া প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল। দেশের সাংবাদিক সমাজ নিজেদের মধ্যকার বিভেদ-বিভাজন সত্তে¡ও এই আইনের বিরুদ্ধে রাজপথে প্রতিবাদ বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছে। সংসদে বিরোধিদলের সদস্যরা সম্পাদক পরিষদ, ডিইউজে, বিএফইউজেসহ দেশের সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের মতামতের সাথে সহমত রেখেই এই আইনকে মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিপন্থী বলে বেশ কিছু পরিবর্তনসহ জনমত যাচাইয়ের দাবী তোলেন। কার্যত কোন পক্ষের দাবীই মানা হয়নি। রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির লক্ষ্যে সংসদে ক্ষমতাসীনদের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে আইনটি পাস করা হয়েছে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের নামে একটি নির্বতনমূলক আইন পাসের প্রচেষ্টা শুরু থেকেই দেশের গণমাধ্যমকর্মী ও সচেতন নাগরিক সমাজের বিরোধিতার সম্মুখীন হয়। এই আইনে নাগরিকের মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলা হয়। গত বুধবার আইনটি সংসদে পাশ হওয়ার পর নাগরিক সমাজ এবং সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের মুখে তাদের সেই প্রতিবাদী কণ্ঠেরই পুনরুচ্চারণ শোনা গেল। ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন ও জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি, রিয়াজউদ্দিন আহমদের মতে, আইনটি স্বাধীন সাংবাদিকতার পথে বড় বাঁধা হয়ে দাঁড়াবে। স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর মারাত্মক প্রভাব এবং গণতন্ত্রকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। টিআইবির পরিচালক ইফতেখারুজ্জামানের মতে, এই আইন সব নাগরিকের বাক স্বাধীনতা নিশ্চিতের সাংবিধানিক অঙ্গীকার ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী। এই আইন পাসের মধ্য দিয়ে একটি সংবিধান পরিপন্থী কাজ করা হল। একে কালো আইন আখ্যায়িত করে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ অব্যাহত রাখা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। জনমত ও নাগরিক সমাজের যৌক্তিক আপত্তি উপেক্ষা করে আইনটি পাস করার ঘটনাকে সংসদীয় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সাথে সাংঘর্ষিক বলে মনে করেন বিশিষ্ট নাগরিক সুলতানা কামাল। দেশের প্রায় সব বিশিষ্ট সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের বক্তব্য থেকে এই আইন সম্পর্কে প্রায় অভিন্ন মতামত ও বিরোধিতা শোনা যাচ্ছে। আইনটি যে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, নাগরিকের বাক স্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতার সাংবিধানিক অধিকার ব্যহত করবে সবার কণ্ঠেই সে উদ্বেগের কথা ফুটে উঠেছে।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সম্পর্কে যখন বহুবিধ প্রশ্ন ও আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, তখন তড়িঘড়ি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সংসদে পাস করার মধ্য দিয়ে একটি নতুন বির্তকের জন্ম দেয়া হল। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পাসের প্রতিক্রিয়ায় বিএনপি’র সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, মানুষের মুখ বন্ধ করতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পাস করা হয়েছে। আইনের খসড়া সংসদে অনুমোদনের জন্য উত্থাপিত হওয়ার আগেই বাসদের সভাপতি খলিকুজ্জামান বলেছিলেন, দেশকে পুলিশি রাষ্ট্রে পরিনত করাই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের উদ্দেশ্য। আইনের খসড়ায় ৮,২১,২৫,২৮,২৯,৩১,৩২ ও ৪৩ নং ধারাগুলো আপত্তিজনক ধারা হিসেবে সংশোধনের জোর দাবী অগ্রাহ্য করায় এ নিয়ে সামাজিক-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বিরুপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে। এই আইন পাস হওয়ার মধ্য দিয়ে আইসিটি আইনের বিতর্কিত ৫৭ ধারা বাতিলের প্রতিশ্রæতি দেয়া হলেও ৩২ ধারায় ঔপনিবেশিক আমলের অফিসিয়াল সিক্রেসি অ্যাক্ট এবং রাজনৈতিক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করে পুলিশকে বিশেষ ক্ষমতা দেয়ার মধ্য দিয়ে একে একটি নিবর্তনমূলক আইনে পরিনত করা হয়েছে। আইন পাসের প্রতিক্রিয়ায় ডাক টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তফা জব্বার নিজেকে গর্বিত বলে গণ্য করে আইন পাসের দিনটিকে একটি ঐতিহাসিক দিন বলে দাবী করেন। অন্যদিকে, সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক, ডেইলী স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, স্বাধীন সাংবাদিকতা,মতপ্রকাশ ও গণতন্ত্রের জন্য একটি দু:খজনক দিন। আমরা মনে করি, কোন সভ্য ও গণতান্ত্রিক সমাজে এ ধরনের আইন কাম্য হতে পারেনা। রাষ্ট্রপতির চুড়ান্ত অনুমোদনের আগে, জনমত ও জনপ্রত্যাশাকে মূল্য দিয়ে আইনটির গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক অধিকার পরিপন্থী ধারাসমুহ বাতিল করা হোক। মনে রাখতে হবে, এদেশের গণতন্ত্রকামী ও স্বাধীনচেতা জনগণ কোন নির্বতনমূলক কালাকানুন অতীতে মেনে নেয়নি, ভবিষ্যতেও মেনে নেবে না।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর