Inqilab Logo

ঢাকা, সোমবার, ১৫ অক্টোবর ২০১৮, ৩০ আশ্বিন ১৪২৫, ০৪ সফর ১৪৪০ হিজরী

দুদকে দিশেহারা

ব্যবসায়ী, ব্যাংকার, রাজনীতিবিদ, সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা সর্বত্রই আতঙ্ক

হাসান সোহেল | প্রকাশের সময় : ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮, ১২:৪১ এএম

স্বাধীনতার পর দেশকে গড়তে দায়িত্ব নেন একজন ব্যবসায়ী। দীর্ঘদিন সুনামের সাথে ব্যবসা করা স্বনামধন্য ওই ব্যবসায়ীকে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তলব করেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই ব্যবসায়ী জানান, গত প্রায় ৩০ বছর ধরে ব্যবসা করছি। দেশের হাজার হাজার লোকের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছি। কখনও কোন অনিয়ম করিনি, সুনামের সাথে ব্যবসা করেছি। কিন্তু সম্প্রতি দুদক অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে তলব করেছে। যা আমার জন্য আসলেই মর্যাদাহানীকর। 

দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ার। পাশাপাশি সুনামের সাথে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। ছিলেন বিএনপি সরকারের মন্ত্রী। কিন্তু হঠাৎ করেই তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনলো দুদক- পাঁচ তারকা হোটেল ব্যবসা, কোটি কোটি টাকা অস্বাভাবিক লেনদেনসহ বিভিন্ন দেশে অর্থ পাচারের। বলছিলাম বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর কথা।
এভাবে ব্যবসায়ী, ব্যাংকার, রাজনীতিবিদ, সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সর্বস্তরের মানুষের আতঙ্কের নাম এখন দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। বড় বড় ব্যাংক লুটেরা ও টাকা পাচারসহ নানা কেলেঙ্কারির হোতাদের আড়াল করে যারা দীর্ঘদিন সুনামের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি ও রাজনীতি করছেন তাদেরকে হয়রানি করছে প্রতিষ্ঠানটি। এমনকি দুদকের হয়রানি এড়াতে সরকারের মেগা প্রকল্পসহ বড় বড় প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালকরা (পিডি) সতর্ক থাকতে গিয়ে টাকা ব্যয় করছেন না। আর এতে দেশের বিনিয়োগে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। এদিকে কোন দুর্নীতির সাথে সরকারি স্বার্থ না থাকলে দুদক ওই প্রতিষ্ঠানকে বা ব্যক্তিকে তদন্ত বা নোটিশ পাঠাতে পারে না। তাই দুদক হাতিয়ার হিসেবে দুদক আইনের ২৬-এর ১ ও ২ এর উপধারা (ক ও খ) ব্যবহার করে হয়রানি করছেন। এই আইনে কমিশন কোন তথ্যের ভিত্তিতে ও বিবেচনায় কোন বৈধ সম্পত্তির পাশাপাশি অবৈধ সম্পত্তির দখলে আছেন বা মালিকানা আছে তাহলে কমিশন লিখিত আদেশের মাধ্যমে ওই ব্যক্তিকে দুদক নির্ধারিত পদ্ধতিতে দায়-দায়িত্বের বিবরণ দাখিলসহ উক্ত আদেশে নির্ধারিত অন্য যে কোন তথ্য দাখিলের নির্দেশ দিতে পারেন। যদিও এই আইন ব্যবহার করে মনগড়াভাবে সমাজের সম্মানিত ও সুনামের সাথে ব্যবসা করছে বা রাজনীতি করছে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনছেন বা নোটিশ দিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে পারটেক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান এমএ হাশেম এবং হোটেল লা মেরিডিয়ানের মালিক আমিন আহম্মেদ ভূঁইয়াকে তলব করেছে দুদক। হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এ কে আজাদকে তলব করে দুদক। এর আগে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিএনপি নেতা এম মোরশেদ খান ও তার স্ত্রী নাছরিন খানকে দুদক তলব করে। গত বছর মে মাসে নড়াইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্প পরিচালক মো. আনিসুর রহমানকে দুদক তলব করে। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে দেশের স্বনামধন্য ব্যাংকার, সুনামের সাথে সৎ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত একাধিক সরকারি কর্মকর্তাকে তলব করেছে দুদক। যা আইনের অপব্যবহার বলেছেন বিশ্লেষকরা। অপরদিকে ভারতে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা অর্থ পাচার হলেও তাতে কোন নজড় নেই দুদকের। অভিযোগে আনা হচ্ছে মালয়েশিয়া ও কানাডায় অর্থ পাচার নিয়ে।
একই সঙ্গে দুদকের কাজ না হলেও প্রতিষ্ঠানটি ফাঁদ অভিযান, ভেজাল বিরোধী অভিযানসহ বিভিন্ন কর্মকান্ড পরিচালনা করছে। বিভিন্ন সময়ে রিহ্যাবসহ একাধিক ব্যবসায়ী সংগঠন দুদকের বিরুদ্ধে হয়রানির অভিযোগ এনেছেন। এছাড়া এর আগে দুদকের অভিযানের বিরুদ্ধে একাধিকবার প্রকাশ্যে বক্তব্য দিতে দেখা গেছে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনকে। ‘সুবিধা না পেলে দুদক কর্মকর্তারা হয়রানি করেন’- প্রকাশ্যে এমন অভিযোগও তোলেন তিনি। ৫০ হাজার কোটি টাকার আবাসন খাতে ধ্বসের জন্যও দুদককে অভিযুক্ত করেছেন তিনি। আর এভাবে চললে এবার কি পুরো বেসরকারি খাতই ধ্বসে পড়বে প্রশ্ন অনেকের।
বিনিয়োগে এখন বড় বাধা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা নয়- দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ব্যাংক লুটেরাদের আড়াল করে নিচের সারির কয়েক’শ ব্যাংক কর্মকর্তাকে আটক করেছে সংস্থাটি। এতে ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে আর্থিক খাতে। আতঙ্কে ঋণ বিতরণ এক প্রকার বন্ধই করে দিয়েছে ব্যাংকগুলো। অপরদিকে ক্ষমতাশালীরা ক্ষমতার অপব্যহার করে বিদেশে অর্থপাচার করছে। আর এতে স্থিমিত হয়ে গেছে দেশের বিনিয়োগ কার্যক্রম। অর্থ চলে যাচ্ছে বিদেশে। হয়রানির ভয়ে বড় উদ্যোক্তারা ঋণ নিচ্ছেন বিদেশি উৎস থেকে। এই পরিস্থিতি চললে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের আশাবাদ ‘চলতি বছর ২০১৯ জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৮ শতাংশ আর্থিক লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে ৮ দশমিক ২৫ শতাংশের ঘরে পৌঁছানো অসম্ভব- মত বিশেষজ্ঞদের। তাহলে কার স্বার্থে কাজ করছে দুদক?।
এদিকে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক গবেষণা প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে- রাজনৈতিক হয়রানির হাতিয়ার হিসেবে দুদককে ব্যবহার করা হয়। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমে মানুষের আস্থা খুবই কম। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতিবিদদের ক্ষেত্রে দুদক নমনীয় বলে জনগণ মনে করে। উদাহরণ স্বরূপ বলা হয়- ২০১৫ সালে দুদক ৩৬ ব্যক্তির দুর্নীতি তদন্ত করে। এরমধ্যে ১৬ জন ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন ইনকিলাবকে বলেন, সরকার চলছে দুর্নীতি-লুটপাটের উপর। তাই যে যা পাড়ছে করছে। তিনি বলেন, অদ্ভুত দেশে অদ্ভুত আইন। এটা এক ধরণের তামাশার আইন। মন চাইলো তাকে তলব করলেন, সম্পদের বিবরণী চাইলেন। একজন সম্মানিত ব্যক্তিকে দুদকে গিয়ে সম্পদের হিসাব দিতে বললেন। অথচ আইনে আছে কোন ব্যক্তিকে এভিডেন্স দিতে বলতে পারবে না। সাবেক এই উপদেষ্টা বলেন, আইনে আছে, হ্যাঁ সন্দেহ ও অভিযোগ থাকতে পারে। তাকে গিয়ে বলতে পারেন। দুদক থেকে এসে ওই ব্যক্তির কাছে বলো আপনার এই সম্পদ আছে, গাড়ী-বাড়ি আছে। কিন্তু বলা হয়, ‘আপনি এসে প্রমান করেন আপনি সৎ। চোর না। এটা হলো।’ তিনি বলেন, গণতন্ত্র- শাসনতন্ত্র- আইনের শাসন কোনটাই নেই। সবকিছু লুটপাট করে খাচ্ছে। এক্ষেত্রে হাতিয়ার হিসেবে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে ব্যবহার করছে। ব্যারিস্টার মইনুল বলেন, বাংলাদেশ এ রকম একটি লুট-পাটের সমিতি হবে, কোন যুক্তি-তর্ক কথা বলা যাবে না। এটা ভাবতে পারিনা।
শুধু ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনই নয় বা ব্যাংকাররাই নয়; দুদকের সমালোচনা করছেন অর্থনীতিবিদরাও। বিভিন্ন সময়ে বড় বড় চিহ্নিত দুর্নীতিবাজদের আগে গ্রেপ্তার করতে বলেছেন অর্থনীতিবিদ ও সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ।
“দুদকের উচিত একটু সময় নিয়ে হলেও প্রভাবশালী ও বড় দুর্নীতিবাজদের গ্রেফতারে যাওয়া। না হলে এই অভিযান প্রশ্নবিদ্ধ হবে।”
“দুদকের অভিযান চললেও ব্যাংকগুলোর বড় বড় খেলাপি ও কেলেঙ্কারির নায়কদের কিছুই হচ্ছে না”- বলেছেন সরকারি গবেষণা সংস্থা বিআইডিএস’র সাবেক গবেষণা পরিচালক ও অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. জায়েদ বখত।
“বড় বড় আর্থিক দুর্নীতির সঙ্গে যুক্তরা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে” উল্লেখ করে টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, এটি দুর্নীতির মূলোৎপাটনে মোটেই সহায়ক নয়।
সার্বিক বিষয়ে দুদক সচিব আবু মো. মোস্তফা কামাল খানের সাথে সেল ফোনে কল ও এসএমএস দিলেও তিনি কোন সাড়া দেননি। দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ সংস্থাটির কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় বলেছিলেন, দুদক হবে দুর্নীতিবাজদের জন্য আতঙ্কের নাম। আর যারা দুর্নীতি করেন না তাদের জন্য দুদক হবে বটবৃক্ষ বা আশ্রয়স্থল। যদিও বাস্তবে তা ভিন্ন বলছেন বিশ্লেষকরা। বিশ্লেষকরা বলছেন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান একে অপরের পরিপূরক। বিনিয়োগ বাড়লে কর্মসংস্থান বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু দুদকের অপ্রত্যাশিত হয়রাণি এড়াতে এবং সংশ্লিষ্টরা সতর্ক থাকতে গিয়ে সরকারি কিংবা বেসরকারি কোনো খাতেই বিনিয়োগ বাড়ছে না। আর সরকার দলীয় প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে একটি গ্রুপ নামে-বেনামে বিদেশে অর্থপাচার করছে।
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিলিজেন্ট ইউনিয়নের (বিএফআইইউ) প্রধান এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান বলেছেন, অর্থ পাচারের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। তিনি বলেন, আমাদের অনুসন্ধানে ৪ হাজার কোটি টাকার ওপরে অর্থ পাচার সংক্রান্ত অনিয়ম পাওয়া গেছে।
ঢাকার ওয়ারির ব্যবসায়ী তৌহিদুল আলমের গার্মেন্ট কারখানা ও ফ্যাশন হাউজের ব্যবসা। রাজধানীতে তার ১২টি বৃহদাকার শোরুম। অডিট রিপোর্ট অনুযায়ী, তার কোম্পানির আকার ১শ’ কোটি টাকার ওপরে। তিনি ঢাকায় আরও ১৭টি শোরুম খুলবেন যাতে তার দরকার ৮২ কোটি টাকা। ৩০ কোটি টাকার সম্পত্তির মর্টগেজ দিয়ে ব্যাংক থেকে ১০ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার জন্য দু’মাস ধরে বিভিন্ন ব্যাংকে ঘুরছেন। তারপরও কোনো ব্যাংক তাকে ঋণ দেয়নি।
তিনি কী ১০ কোটি টাকা ঋণ পাওয়ার যোগ্য নন- এমন প্রশ্ন করা হয় সোনালী ব্যাংকের একটি কর্পোরেট শাখার ঋণ কর্মকর্তাকে, যিনিও ফিরিয়ে দিয়েছিলেন ওই ব্যবসায়ীকে। বললেন, সকল আইন অনুযায়ী তিনি এর চেয়ে বেশি ঋণ পাওয়ার যোগ্য।
: তাহলে দিচ্ছেন না কেন?
: তার ব্যবসা ভালো। তবে তার ব্যাংক লেনদেন কিছু কম আছে।
: এটা কি তার ঋণ পেতে কোনো আইনি বাধা?
: না। তবে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) যেভাবে আমাদের হয়রানি করছে তাতে আমরা ঋণ না দিতে পারলেই বাঁচি। এজন্য কোনো ব্যবসায়ীর ত্রুটি না থাকলেও ত্রুটি বের করে তাকে ফিরিয়ে দেই। ভালোই তো আছি। ঋণ না দিলেও বেতন ঠিকমতো পাচ্ছি। খামোখা ঋণ দিয়ে নিজে হয়রানির শিকার হওয়ার দরকার কি?
“সকল প্রক্রিয়া ঠিকভাবে সম্পন্ন করে ঋণ দিলেও দুদক সেখানে ‘ত্রুটি’ খুঁজে পায়। আর একটি ঋণ ফাইলে অনেক কর্মকর্তার স্বাক্ষর থাকে। কেউ ভুলক্রমেও কোনো ত্রুটি করলে ওই ফাইলে স্বাক্ষরকারী সবার ‘ইতিহাস’ নিয়ে টান দেয় দুদক। সবাইকে নোটিশ করে- এটা নিয়ে আমরা আতঙ্কে আছি।”
রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকার একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক জাহাঙ্গীর (ছদ্মনাম)। ওই ব্যাংকটিতে এটা সবাই জানে, সে কোনো ঋণ দেয় না। এজন্য তাকে কয়েকবার বদলিও হতে হয়েছে। কারণ জানতে চাইলে ইনকিলাবকে বলেন, “ঋণ না দিলে বদলিই তো করবে, চাকরিতো খেতে পারবে না। বাংলাদেশের যেখানে বদলি করুক সেখানে যাবো। তবু ঋণ দেবো না। কারণ আমার পারিবারিক সম্মান ঋণ দিতে গিয়ে নষ্ট করবো না।”
এই বিষয়টি ওই ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সামনে উত্থাপন করা হলে ইনকিলাবকে বলেন, “এটা ঠিক, দুদকের কিছু বাড়াবাড়ির কারণে ব্যাংকারদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। ব্যাংকের বিনিয়োগ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলে দেশের অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়বে। এখন সময় এসেছে, দুদক এবং ব্যাংকাররা মিলে পারস্পরিক সমঝোতার পরিবেশ সৃষ্টি করার। সবার কাজের পরিধি চিহ্নিত করার।”
শুধু তৌহিদুল নয়, একইভাবে এক বছর ঘুরেও ঋণ পাননি হাতিরপুলের টাইলস ব্যবসায়ী কুদরত এলাহী। গাইবান্ধার গোবীন্দগঞ্জে ১শ’ বিঘা জমির ওপর একটি কোল্ড স্টোরেজ প্রোজেক্ট করার জন্য জনতা, সোনালী ও অগ্রণী ব্যাংকের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন তিনি। জনতা ব্যাংক থেকে মৌখিক সায় পাওয়ার পর প্রায় ১০ কোটি টাকা বিনিয়োগও করেন এই প্রকল্পে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যাংক ঋণ দেয়নি তাকে। এতে তার প্রায় ৭ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে- ইনকিলাবের কাছে এমন দাবি করেন কুদরত এলাহী।
“ব্যাংকে এখন সব ঋণ দেয়া বন্ধ। আমার জানা মতে কোনো ম্যানেজার এখন ঋণ দিচ্ছেন না। ঋণ গ্রাহকরাও এখন শাখায় কম আসছে। সাধারণ ব্যবসায়ীরাও ব্যাংকে আসতে চাচ্ছেন না।” ইনকিলাবের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন রূপালী ব্যাংকের একটি কর্পোরেট শাখার ব্যবস্থাপক। “রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়া সত্তে¡ও দেশে বিনিয়োগ বাড়ছে না দুদকের বাড়াবাড়ির কারণে। পৃথিবীর কেউ শতভাগ শর্ত পূরণ করে ঋণ দিতেও পারবে না; নিতেও পারবে না। আমাদের দেখতে হয়, ঋণ গ্রহীতার ব্যবসা আছে কিনা; তার ঋণ ফেরত দেয়ার সামর্থ আছে কিনা; আর ঋণের জামানত ঠিক আছে কিনা। এখন শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করেও ঋণ দেয়ার পর দুদক যদি হয়রানি করে তবে দেশে বিনিয়োগ বাড়বে না।”
তিনি বলেন, একজন ম্যানেজারের ঋণ দেয়ার ক্ষমতা থাকে ২০ থেকে ৫০ লাখ টাকা। বড় ঋণ দেয় বোর্ড ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। এখন তারা কোনো ত্রুটি করলে ধরা হচ্ছে আমাদের।
ব্যাংকিং ভালো বোঝে এমন লোকদের সমন্বয়ে আর্থিক খাতের জন্য দুদকে আলাদা সেল করার দাবি জানান ওই ব্যবস্থাপক। “আনাড়ি লোকজন তদন্তে এসেই মূলত ঝামেলা পাকায়,” বলেন তিনি।
সূত্র মতে, দেশে হঠাৎ করে ব্যাংকগুলো বড় ধরনের তারল্য সংকটে পড়েছে। খুব অল্প সময়ের মধ্যে তারল্য সংকট ঘণীভূত হওয়ায় খোদ কেন্দ্রীয় ব্যাংক উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। এ দিকে দেশে আমদানির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় আমদানি ব্যয়ও বেড়েছে। গত ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে আমদানিতে ৫ হাজার ১৫৩ কোটি ডলারের সমপরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে। যা আগের অর্থ বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৬ দশমিক ৩৯ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানির জন্য ৫১৫ কোটি ডলারের এলসি খোলা হয়েছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় যা প্রায় ২২ শতাংশ বেশি। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি বাড়লে বিনিয়োগ সে তুলনায় বাড়া উচিত। কিন্তু পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাময়িক হিসাবে দেখা গেছে, গত অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ সামান্য বেড়ে ২৩ দশমিক ২৫ শতাংশ দাঁড়িয়েছে। যা আগের অর্থ বছর শেষে ছিল ২৩ দশমিক ১০ শতাংশ। দেশে বেসরকারি বিনিয়োগের পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত কয়েক বছর ধরেই বিনিয়োগ জিডিপির ২১ শতাংশ থেকে ২৩ শতাংশের বৃত্তে আটকে রয়েছে। তবে এর মধ্যে ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ২৩ শতাংশ ছিল। যা ২০১৬-১৭ অর্থবছরেও একই পর্যায়ে ছিল। আর এর আগের ৩ বছরে বিনিয়োগ পরিস্থিতি জিডিপির ২১ শতাংশের মধ্যেই আবদ্ধ ছিল। অথচ সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে বিনিয়োগ জিডিপির ৩৪ শতাংশ হওয়া বাঞ্ছনীয় ছিল। কিন্তু এর পরিমাণ ২৮ শতাংশের গড় অতিক্রম করতে পারেনি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বিনিয়োগ বাড়লেই কেবল আমদানি বাড়ে। কিন্তু বর্তমান চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। এর মূল কারণ হিসেবে আমদানির আড়ালে দেশের বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদরা। অর্থনীতিবিদদের মতে, নির্বাচনের আগেভাগে দেশে বিনিয়োগের বদলে অর্থ বিদেশে গচ্ছিত রাখাকেই অনেকেই নিরাপদ মনে করেন। ফলে আমদানির জন্য এলসি খোলা হলেও অনেক সময়ই সে যন্ত্রপাতি দেশে আসে না। এ জন্য বিষয়টি খতিয়ে দেখা জরুরি। কেন অস্বাভাবিক হারে বাড়ছেই আমদানি ব্যয়? অথচ উল্লিখিত সময়ে বিনিয়োগ বাড়েনি। অবশ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের তরফেও বিষয়টি নিয়ে যথেষ্ট উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। ##



 

Show all comments
  • Samrat Miah ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮, ১২:০৩ পিএম says : 0
    এছাড়াও দুদকের এক কর্মকর্তার দুর্নীতির তথ্য,উপাত্ত এবং শক্ত প্রমান আছে আমার কাছে।
    Total Reply(0) Reply
  • তামান্না ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮, ৩:৫৬ এএম says : 0
    নিরাপরাধ কাউকে যেন হয়রানি করা না হয়
    Total Reply(0) Reply
  • Abdur RahmanMallick ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮, ১২:২৩ এএম says : 0
    বেশ ভালো রিপোর্ট । একদিকে ব্যাংকগুলো দেউলিয়া হচ্ছে অন্যদিকে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা হয়রানির শিকার হচ্ছে। দুদকের একচোখ কানা । তাই সাংবাদিকের এস এমএস চোখে দেখে না। ক্রিমিনালদের তারা দেখতে পায় না। তাদের কর্মশালা আয়োজন করে বোঝানো দরকার একটা প্রতিষ্ঠানকে সফল করা কত কঠিন। দুদক কানা না হলো রিপোর্টটি আমলে নিত।
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ