Inqilab Logo

ঢাকা, শুক্রবার ১৯ জুলাই ২০১৯, ০৪ শ্রাবণ ১৪২৬, ১৫ যিলক্বদ ১৪৪০ হিজরী।

আশুরা সর্বোচ্চ ত্যাগ ও সংগ্রামের প্রেরণা

গাজী মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম জাবির | প্রকাশের সময় : ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৮, ১২:০৪ এএম

এক

৬১ হিজরির ১০ মহররম ইরাকের কারবালার প্রান্তরে যে শোকাবহ ঘটনা ঘটেছিল সেটা কে আশুরা বলে। সেই আশুরা বা কারবালাকে আমরা যেন স্মরণ করি, আলোচনা করি এবং তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করি। মহান আল্লাহর প্রিয়তম বন্ধু হযরত মোহাম্মদ (দরুদ শরীফ) এর নাতী হযরত ইমাম হোসাইন (রাঃ) সহ তাঁর ঘনিষ্ঠ ৭২ জন সদস্য একই স্থানে শত্রুর হাতে প্রাণ দিয়েছিলেন অর্থ্যাৎ শাহাদাত বরণ করেছিলেন। এই ঘটনার জাগতিক বিশ্লেষণ যেমন আছে, তেমনি আধ্যাতি্মক বিশ্লেষণ ও আছে। তাগুতি শক্তির জোটবদ্ধ নানামুখী আক্রমণের মোকাবিলায় মুসলিম উম্মাহ আজ এক দুরুহ পরীক্ষার সম্মুখীন। শুধু আফগানিস্তান, ফিলিস্তিন,কাশ্মীর বা মিয়ানমার নয় পুরো মুসলিম উম্মাহই আজ কুফুরি শক্তির বেপরোয়া আক্রমণের লক্ষ্য স্থল ; জলে-স্থলে অন্তরীক্ষে আজ শুধু কাফের-মুশরিকদের সম্মিলিত পাশবিক উল্লাস,চতুর্দিকে শুধু মুসলিম উম্মাহর বক্ষ ভেদী দুশমনের শাণিত অস্ত্রের ঝনঝনানি। কী অদ্ভুত এই পৃথিবী, যেখানে সত্য,ন্যায় ও ইনসাফের কোন স্থান নেই, সকল শুভত্বকে পদদলিত করে দৌর্দন্ত প্রতাপে শুধু রাজত্ব করতে চায় পশু শক্তি। আর ইসলাম যেহেতু সত্যের কথা বলে,আলো এবং ইসলামের কথা বলে,তখন খোদাদ্রোহী মানবতাদ্রোহী অন্ধকার বিলাসি ইবলিসী শক্তির রর্ণদামাম। আজ শুধু ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে। মুসলিম মিল্লাতের বিরুদ্ধে দাজ্জালী-দুশমনদের বহুমুখী আক্রমণ ও বেপয়োয়া আগ্রাসনের এই বৈরী সময় ও প্রেক্ষাপটে আজ আবার ফিরে এলো আশুরা, ফিরে এলো রক্তস্নাত আত্মত্যাগের শাশ্বত বার্তা নিয়ে ১০ মহররম ১৪৪০ হিজরী। আশুরার ইতিহাস কারো অজানা নয়। কারবালার প্রান্তরে হযরত ইমাম হোসাইন (রাঃ) এর যে সংগ্রামী ভ‚মিকা ও আত্মত্যাগ সেই ঘটনা মুসলিম উম্মাহর বুকে সে এক শাশ্বত বেদনার নিরন্তর রক্তক্ষরণ। এ মুহুর্তে আমাদের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো আশুরার অন্তনির্হিত ভাবার্থকে আবিষ্কার করা এবং আশুরার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত যে বৈপ্লবিকতা তা অনুধাবন করা এবং আশুরা কী সেটা সর্ব্বোচ্চ গুরুত্ব এবং তীব্রতায় অনুভব করা। কারণ, আজ এমন কোন ভ‚মি নেই, যেখানে তাগুতি শক্তির ইসলাম বিরোধী আস্ফালন নেই, এমন কোন দিন নেই,যে দিন ইসলাম ধর্মের আমানত রক্ষার্থে মুসলিম জাতির রক্তের নজরানা পেশ হচ্ছে না। কারবালার প্রান্তরে হযরত ইমাম হোসাইন (রাঃ) সপরিবারে শাহাদাত বরণ করেন। দৃশ্যত এটা পরাভব; দৃশ্যত এটা প্রতিপক্ষের বিজয়। কিন্তু না, মুসলমান কোন তাৎক্ষনিক বিজয়ের প্রত্যাশি নয়; বিজয় ও পরাজয় নিরস্কুশ ভাবে আল্লাহ পাকের অভিপ্রায়। মুসলিম জাতির কাজ হলো সর্বাত্মক ভাবে জিহাদে শরীক হওয়া। অতএব জয়-পরাজয় নয়,মুখ্য বিষয় হলো আশুরার ঐদিন কারবালার রণক্ষেত্রে ইমামের অকুন্ঠ আত্মত্যাগের মধ্যদিয়ে প্রজ্বলিত এমন এক রক্তের দীপশিখা, যা জিহাদের তামান্না হয়ে মুসলিম উম্মার বুকে রোজ কেয়ামত পর্যন্ত সগৌরবে জেগে থাকবে। আসলে এটাই ছিল মহান আল্লহ পাকের অভিপ্রায়! কিন্তু একথা মনে রেখেও একটি প্রশ্ন পরিহার করা কঠিন সেটা হল,নিশ্চিত পরাজয় জেনেও ইমাম হেসাইন (রাঃ) এ রকম একটি অসমরণে কেন অবতীর্ণ হলেন? যে ভাবেই ব্যাখ্যা করুন, আমি নিশ্চিত ভাবে বিশ্বাস করি,এর মধ্যে এতটুকু হঠকারিতা ছিলনা। হযরত ইমাম এই স্থির সিদ্ধান্তে অটল ও অবিচল ছিলেন যে,জয়-পরাজয় একটি অতিশয় লঘু ও গৌণ ব্যাপার,কিন্তু একজন প্রকৃত মুসলমানের আমৃত্যু নিঃশর্ত কতর্ব্য হলো,আল্লাহর পথে শেষ মূহুর্ত পর্যন্ত জিহাদে শরীক থাকা। মহান আল্লাহর পথে, তার মনোনীত ধর্মের মর্যাদা রক্ষার্থে হযরত ইমাম হোসাইন (রাঃ) তাঁর জীবন দিয়ে প্রমাণ করলেন , ইসলাম তার অনুসারীদের কাছে দ্ব্যর্থহীন ভাবে দাবী করে রক্তের নজরানা, দাবী করে আল্লাহর পথে সর্বস্ব কোরবানী দেয়ার অকুন্ঠ তামান্না। আর এই পরীক্ষায় যারা উত্তীর্ণ, তারাই সফলকাম, তারাই আল্লাহ পাকের প্রিয়তম বান্দাদের অন্তভর্‚ক্ত হওয়ার যোগ্য। হযরত ইমাম হোসাইন (রাঃ) আপন জীবনকে বিলিয়ে দিয়ে এই দৃষ্টান্তই স্থাপন করলেন। তিনি অনাগত দিনের কোটি কোটি মুসলমানের কাছে এই বার্তা দিলেন যে, আল্লাহর ধর্ম ক্ষতিগ্রস্থ হবে, রাসুল (দরুদ) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ইসলামী রাষ্ট্রনীতির বিকৃতি ঘটবে তা হতে পারেনা। যার কারণে আশুরার দিনে হযরত ইমাম হোসাইন (রাঃ) আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে মুসলিম জাতিকে জানিয়ে দিলেন , সত্যের জন্য ও ন্যায়ের জন্য প্রয়োজন হলে জীবন কোরবানী দিতে। ইসলামের বক্তব্য হলো, একজন মুসলমানের সালাত ও কোরবানী তাঁর জীবন ও মৃত্যু সবই একমাত্র আল্লাহর জন্য (সুরা: আনআম -১৬২) অর্থ্যাৎ কোন মুসলমানের দ্বিতীয় কোনরূপ চিন্তার কোন অবকাশ নেই; ধর্মের প্রয়োজনে সবকিছু অকাতরে কোনবাণী করা তার জন্য ফরজ। মহান আল্লাহ পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেনঃ হাজীদের পানি খাওয়ানো এবং পবিত্র কাবা গৃহের রক্ষণাবেক্ষণ আর আল্লাহ ও আখেরােেতর প্রতি বিশ্বাস নিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদকে সমকক্ষ মনে করোনা। জীবন এবং সম্পদ তুচ্ছ জ্ঞানে যারা আল্লাহর জন্য হিযরত করে এবং জিহাদে অবতীর্ণ হয়, তারা আল্লাহর কাছে অতি মর্যাদার অধিকারী এবং তারাই সফল কাম। (সূরা তাওবা : আয়াত-১৯.২০)। মহান আল্লাহ আরো বলেন, ”তোমরা কি এই খেয়ালে আছো যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে অথচ এখনো পরীক্ষা করাই হলো না, কে তোমাদের মধ্যে মুজাহিদ আর কে জিহাদের ময়দানে অবিচল” (সূরাঃ আলে ইমরান- আয়াত-১৪২)। অতএব এই যখন ঘোষণা কোন মুসলমানের পক্ষে জিহাদের ময়দান থেকে প্রাণের মায়ায় পশ্চাৎপসরণ করা সম্ভব” সে জিহাদ বদরে হোক বা কারবালায় হোক, স্পেনে হোক বা সিন্ধুতে হোক,শেষ নিঃশ্বাস থাকা পর্যন্ত জিহাদ চালিয়ে যাওয়া মুসলমানদের জন্য ফরজ। আশুরার এই দিনে মুসলিম উম্মাহকে এই কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। শুধু স্মরণ নয়,সকল তাগুতি মোকাবিলায় জীবনকে অবিসংবাদিত সংগ্রামী তামান্নায় সর্বস্ব নিবেদনের জন্য আহবান জানায়।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: আশুরা

১২ অক্টোবর, ২০১৬
১২ অক্টোবর, ২০১৬
১২ অক্টোবর, ২০১৬

আরও
আরও পড়ুন