Inqilab Logo

রোববার, ২৯ মে ২০২২, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯, ২৭ শাওয়াল ১৪৪৩ হিজরী
শিরোনাম

রাষ্ট্রীয় সম্পদের যথাযথ ব্যবহার

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান | প্রকাশের সময় : ৫ অক্টোবর, ২০১৮, ১২:০৪ এএম

চার

এখানে আমানত দ্বারা উদ্দেশ্য হলো শাসনসংক্রান্ত দায়িত্ব তথা পদমর্যাদা।
এক হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, মজলিস আমানতদারীর সাথে হওয়া উচিত। উদ্দেশ্য হলো, মজলিসে যে কথা আলোচনা হয় সেটা মজলিসের আমানত। ঠিক এভাবেই সরকারি বিষয়ে যে কোন গোপন কথা, তথ্য বা আইন রয়েছে সেগুলো সব রাষ্ট্রীয় পদের আমানক। আর যে আমানতের খেয়ানত করে তাকে হাদিসে মুনাফিক বলা হয়েছে।এ কারণে খেয়ানতকারী ব্যক্তি দায়িত্বের যোগ্য হতে পারে না।
রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ও সম্পদ হলো, আমানত। এই আমানত সোর্পদ করার মূলনীতি ইসলামী শরীয়া স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছে। ইসলামী শিক্ষামতে পদ সোর্পদ করার মানদন্ড হলো যোগ্যতা। যার মাঝে যোগ্যতা রয়েছে সে ব্যক্তিই ঐ কাজের জন্যে উপযুক্ত। এজন্যে বিভিন্ন বিভাগে কর্মী নিয়োগ করার সময় অঞ্চলভিত্তিক, সংখ্যালঘু হিসেবে, নারী অথবা মৃত চাকুরীজীবির সন্তানদের জন্যে যে কোটাপ্রথা রয়েছে, তা সুন্নাহর আলোকে তখনই বৈধ হবে, যখন এই গুরুদায়িত্ব আঞ্জাম দেয়ার জন্যে উপযুক্ত যোগ্যতা তাদের মাঝে থাকবে। যোগ্যতাশূন্য অবস্থায় কোটাপ্রথার ব্যবহার জায়েয নেই। হাদিস শরীফে রয়েছে: যখন কাজের দায়িত্ব অনুপযুক্ত ব্যক্তিকে সোর্পদ করা হয় তখন কেয়ামতের অপেক্ষা করো।
তাকওয়া অর্থ খোদাভীতি ও পরহেযগারী। তাকওয়ার অপরিহার্য দাবি হলো, দায়িত্বকবোধ। অর্থাৎ প্রত্যেক কর্তা ও দায়িত্বশীল ব্যক্তির নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পরিপূর্ণ আঞ্জাম দেয়ার অনুভুতি থাকা। যখন পদের অধিকারীদের মধ্যে তাকওয়া পয়দা হবে, তখন তারা দুনিয়া ও পার্থিব সমুদয় বস্তু থেকে বিমুখ হয়ে কর্তব্য আঞ্জাম দেয়ার মাঝে পরিপূর্ণ সময় ব্যয় করতে ব্যস্ত থাকবে। সরকারি চাকুরিজীবি, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের জন্যে যতকঠিন থেকে কঠিনতর আইন করা হোক না কেন, তাকওয়া অর্জন না করা পর্যন্ত তাদের মধ্যে সুচারুরুপে দায়িত্বপালন করার মানসিকতা তৈরি হবে না। কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে,সবচেয়ে উত্তম পাথেয় হলো, তাকওয়া। আর হে জ্ঞানীগণ! তোমরা আমাকে ভয় কর।উমর বিন আবদুল আযীয রহ. অধিকাংশ সময় কাঁদতেন। তার স্ত্রী জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, যখন আমি নিজের বিষয়ে চিন্তা করি, এই উম্মতের ছোট-বড়, সাদা- কালো সকলের বিষয়ে আমি দায়িত্বশীল। দরিদ্র, অসহায়, বন্দী ও হারিয়ে যাওয়া মুসাফিরসহ রাষ্ট্রের অন্য সকলের দায়িত্ব আমার কাঁধে। এটা তো নিশ্চিত যে, আল্লাহ তাদের সকলের বিষয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করবেন। যদি আমি আল্লাহ ও তার রাসূল (সাঃ) কে উত্তর না দিতে পারি...? এ চিন্তা আমার মধ্যে ভীতির সঞ্চার করে; ফলে আমি কান্না শুরু করি।
পরিভাষায় ঘুষ বলা হয়: প্রত্যেক এমন বস্তু যা একজন অপরজনকে প্রদান করে, একে সে তার জন্যে হালাল নয় এমন কোন কিছু অর্জনের মাধ্যমে হিসেবে ব্যবহার করে। ইসলামী শরীয়াতে ঘুষ গ্রহণ সম্পূর্ণ হারাম। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন: আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হোক ঘুষ প্রদানকারী ও গ্রহণকারীর উপর। পক্ষান্তরে হাদিয়া বা উপঢৌকন বলা হয় : উপঢৌকন হলো ঐ সম্পদ, যা সম্মান করার ভিত্তিতে অন্যকে দেয়া হয় বা অন্যের কাছে পাঠানো হয়। শরীয়াতে উপঢৌকন দেয়া নেয়া বৈধ। এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) থেকে বহু হাদিস বর্ণিত হয়েছে। যেমন আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন: তোমরা পরস্পরে একে অপরকে হাদিয়া দাও, কেননা তা অন্তরের বিদ্বেষকে দূর করে। কোন প্রতিবেশী যেন তার প্রতিবেশীর দেয়া হাদিয়াকে তুচ্ছ জ্ঞান না করে, যদিও (হাদিয়া) বকরির খুরের অংশ হোনা কেন। অতএব সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী সমাজের সকলের হাদিয়া গ্রহণ করার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদেরকে অনেকে হাদিয়া প্রদানের মাধ্যমে স্বার্থ সিদ্ধি করতে চায়। ফলে হাদিয়া বা উপঢৌকন গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদেরকে সর্তক থাকতে হয়। বর্তমান সময়ে পদস্থ কর্মকর্তা ও অফিসারদেরকে তাদের পদের কারণে উপঢৌকনের নামে যে ঘুষ দেয়া হয় সে বিষয়ে নিম্নের হাদিসটি লক্ষণীয়। আবু হুমাইদ সায়ীদী (রাঃ) বলেন: রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বনু আসাদের ইবনুল উতবিয়্যা নামের এক ব্যক্তিকে সাদাকা উসূল করার কাজে নিযুক্ত করলেন। সে ফিরে এসে বললো, এই সম্পদ আপনাদের (বায়তুল মালের), আর এই সম্পদ আমাকে হাদিয়া দেয়া হয়েছে। তখন রাসূূূূলুল্লাহ (সাঃ) মিম্বরে আরোহণ করে আল্লাহর হামদ ও সানা বর্ণনা করলেন। অুঃপর বললেন, যাকাত উসূলে নিযুক্ত ব্যক্তির কী হলো, আমরা তাকে পাঠাই, এরপর সে এসে বলে, এটা আপনাদের আর এাঁ আমার! সে নিজ মা- বাবার ঘরে বসে থাকুক, এরপর দেখুন, তাকে হাদিয়া দেয়া হয় কি না। ঐ সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ, যে ব্যক্তি এমন কোন সম্পদ নেবে, সে তা কেয়ামতের দিন বহন করে আনবে। যদি উট হয় তবে তা চিৎকার করবে অথবা যদি গাভী হয় তবে তা হাম্বা হাম্বা করবে, অথবা যদি বরকি হয় তবে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করবে।
স্বজনপ্রীতি বর্তমান সময়ের দুর্নীতির অন্যতম কারণ। সরকারি পদাধিকারী ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের রক্ষক নিজের আত্মীয়স্বজনকে প্রাধান্য দেয়ার সমাজ ও রাষ্ট্রেনানাবিধ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। ইসলাম বিচারসহ সর্বক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি থেকে দূরে থেকে ন্যায়কে গ্রহণ করার নির্দেশ দিয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন : হে ইমানদারগণ। তোমরা ন্যায় বিচারে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত থাকবে আল্লাহর সাক্ষীস্বরূপ; যদিও তা তোমাদের নিজেদের অথবা পিতা-মাতা এবং আত্মীয় স্বজনদের বিরূদ্ধের হয়, এ আয়াত থেকে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় হক ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে প্রয়োজনে স্বজনের বিরূদ্ধে নেয়া হয় অবশ্যক। ইসলামী রাষ্ট্রে কর্মরত সকল অফিসার কর্মকর্তা এবং ছোট বড় দায়ীত্বশীলদের যোগ্য হওয়ার সাথে সাথে তাদের মধ্যে আপসোসে হৃদ্যতা ও স্নেহের আচরণ থাকা জরুরি। উচ্চপদস্থদের কর্তব্য হলো, অধীনস্থ কর্মকর্তাদের সাথে সদাচরণ করা। যদি অফিসারগণ অধীনস্থদের সাথে সদাচরণ করে তাহলে অধীনস্থরাও নিজ নিজ কর্তব্য ও দায়িত্ব ভালোভাবে আঞ্জাম দেবে। সুন্নাহর আলোকে উচ্চপদস্থ অফিসার ও রাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের সীমাতিরিক্ত আড়ম্বরতা ও জাঁকজমক প্রদর্শনের কোন সুযোগ নেই একারণে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: হে আল্লাহ! যে ব্যক্তি আমার উম্মতের কোন দায়িত্ব লাভ করে এরপর তাদের সাথে কঠোরতা করে, আপনি তার প্রতিও কঠোরতা করুন, আর যে ব্যক্তি আমার উম্মতের কোন দায়িত্ব লাভের পর তাদের প্রতি সদয় হয় আপনিও তার প্রতি সদয় হোন। ইসলাম সরকারি পদ ও সম্পদের যথাযথ ও দায়িত্বপূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্যে নীতিমালা প্রণয়ন করেছে।
রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ও সম্পদের দায়িত্বশীলদের জন্য আবশ্যক হলো- সর্বাবস্থায় তারা রাষ্ট্রের উপকার ও স্বার্থের প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখবেন। সর্বক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি ও ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে থেকে দায়িত্ব পালন করবেন, এমনকি যে বিষয়গুলো আংশিক বা পরিপূর্ণভাবে রাষ্ট্রের উপকার সাধন করে সেসব ক্ষেত্রেও। এ প্রসঙ্গে আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদিসটি প্রণিধানযোগ্য। তিনি বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: শ্রেষ্ঠতম উপার্জন হলো শ্রমিকের নিজ হাতের উপার্জন, যখন সে কল্যাণকামী হয়। এ হাদিস অনুসারে, নিজ হাতে উপার্জনকারীর উপার্জনকে শ্রেষ্ঠ সাব্যস্ত করা হয়েছে কল্যাণকামী হওয়ার শর্তে। সরকারি কর্মকর্তার জন্য রাষ্ট্রের প্রতি কল্যাণকামী হওয়ার অর্থ হলেঅ, সে সর্ববিষয়ে উপকারের দিককে প্রাধান্য দেবে। প্রত্যেক দায়িত্ব বা পদে কর্মরত ব্যক্তির সাথে প্রথমে রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের ও কর্মকর্তার মাঝে একটি চুক্তি সম্পন্ন হয়। এটিকে কর্মের চুক্তিপত্র বলা হয়ে থাকে । যে শর্তগুলোর ভিত্তিতে এই দায়িত্ব পালনের প্রতিশ্রুতি সম্পন্ন হয় সে শর্তগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খরুপে আদায় করা সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীর কর্তব্য। এই চুক্তিপত্র রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তার মাঝে একপ্রকার প্রতিশ্রুতি। আর প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে কুরআন শরীফে এসেছে- আর তোমরা প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করো।নিঃসন্দেহে প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হবে।
আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) যখন খলীফা নিযুক্ত হলেন, তখন তিনি নিজ দায়িত্বের প্রতিশ্রুতিনামা জনসম্মুখে এ ভাষায় প্রকাশ করেছেন এবং এর মাধ্যমেই তিনি নিজ দায়িত্বের সীমানা নির্ধারণ করে নিয়েছেন, তিনি বলেন: যদি আমি সঠিক কাজ করি তাহলে তোমরা আমাকে সহযোগিতা করবে, আর ভুল কাজ করলে তোমরা আমাকে সংশোধন করবে। সত্য বলা আমানত ও মিথ্যা বলা প্রতারণা। তোমাদের দৃষ্টিতে দুর্বল ব্যক্তি আমার কাছে সবল, যতক্ষণ না আমি তার প্রাপ্য দিতে পারি। তোমাদের মধ্যকার শক্তিশালী ব্যক্তি আমার দরবারে অতি দুর্বল, যতক্ষণ না আমি তার কাছ থেকে মজলুমের হক আদায় করতে পারি। একজন সরকারি কর্মকর্তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য, তিনি সরকারি সম্পদকে আমানত গণ্য করবেন এবং ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের মধ্যে পার্থক্য করবেণ। এ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে খেয়াল করা উচিত যে, দায়িত্ব বা পদচ্যুত হওয়ার সাথে সাথে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও উপকরণও তার কর্তৃত্বশূন্য হয়ে যাবে। এ জন্যে এই সম্পদকে সে সংরক্ষণকারী ও বন্টনকারী হিসেবে নিজের কাছে রাখবে। রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও উপকরণে অন্যায়ভাবে হস্তক্ষেপ করা বা ব্যবহার করা কখনো বৈধ হবে না।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন