Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮, ৩০ কার্তিক ১৪২৫, ০৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী

বৈধ-অবৈধ পেশা ও উপার্জন

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান | প্রকাশের সময় : ১৯ অক্টোবর, ২০১৮, ১২:০৩ এএম

এক

প্রত্যেক ব্যক্তির জীবিকার জন্য প্রয়োজন কর্মের। প্রতিটি মানুষই তার যোগ্যতানুযায়ী কাজ করে। সকল মানুষেরই জন্মগতভাবে কমবেশি কর্মদক্ষতা ও প্রতিভা আছে। আল্লাহ্ প্রদত্ত এ যোগ্যতা ও কর্মক্ষমতাকে অকর্মণ্য, নিষ্ক্রিয় ও অকেজো করে রাখার অধিকার কারো নেই। নবী-রাসূলগণকেও জীবিকা নির্বাহ করার জন্য কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে। মানুষের একান্ত প্রয়োজনীয় বস্তুসমূহ অর্থ ছাড়া অর্জন করা যায় না। অর্থসম্পদ উপার্জনে ইসলাম সকল মানুষকে উৎসাহিত করে। উপার্জনকারী ব্যক্তি আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয়। জীবন এবং সম্পদ একটি অপরটির পরিপূরক। সম্পদ ছাড়া যেমন জীবনধারণ সম্ভব নয়, তেমনি প্রাণহীন ব্যক্তির জন্য অর্থেরও কোন মূল্য নেই। অর্থসম্পদ মানুষের কল্যাণের জন্য কিন্তু এ সম্পদই আবার কখনোও কখানোও অকল্যাণের কারণ হয়ে থাকে। বিত্ত-বৈভব যেমন মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হয়ে থাকে অনুরূপভাবে তা আবার মানুষের ক্ষতিকর কাজেও ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ইসলাম ছাড়া সম্পদ অর্জনের ক্ষেত্রে যে সকল রীতিনীতি অনুসৃত হচ্ছে, তার সবগুলোই সম্পদ সঠিক ব্যবহার ও সুষম বণ্টনের মাধ্যমে সকল মানুষের সার্বক কল্যাণে ভূমিকা রাখতে পেরেছে এমনটি জোর দিয়ে বলা যায় না। অত্র প্রবন্ধে বৈধ-অবৈধ পেশা ও পণ্য থেকে উপার্জন প্রসঙ্গ বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
সম্পদ-এর পরিচয় ঃ জাস্টিনিয়ান তাঁর ইনস্টিটিউটস্ এ রেসকে (Res) দ্বিতীয় শ্রেণীর আইন হিসেবে অভিহিত করেছেন। রেস শব্দটির প্রতিশব্দ হলো বস্তু। এর দু’টি অর্থ রয়েছে। সাধারণ অর্থে যে সকল বস্তু দৃষ্টিগোচর হয় সেগুলোই রেস; যেমন: টেবিল, চেয়ার, বাড়ি, একখন্ড জমি ইত্যাদি। ‘‘ R.W.; The Elements of Roman Law, London: Sweet & Maxwell Limited, ১৯৫৬, চ. ১৩৪; ড. এবিএম মফিজুল ইসলাম পাটোয়ারী, রোমান আইনের মূলনীতি, ঢাকা: মল্লিকা পাবলিশিং হাউস, ২০০৫, পৃ. ১২৭-১২৯।
Muirhead James, Historical Introduction to the Private Law of Rome, (London: Adam & Charles Black, 1899), P. 245; Leage, R.W., Prichard, A.M., Leage’s Roman Private Law, (London: Macmillan & Co. Ltd., 1961), P. 256; Nicholas, Berry, An Introduction to Roman Law, (London: Oxford University Press, 1962), P. 421.
তবে আইনবিদদের মতে রাস্তায় চলার অধিকার ও দেনা ইত্যাদিও বস্তুর মধ্যে গণ্য। এ প্রসঙ্গে রোমান আইনে ‘‘রোমান আইন: প্রাচীন রোমে যেসব নিয়ম কানুন বা আইন প্রচলিত ছিল তাই রোমান আইন। এটি কোনো প্রণীত আইন নয় বা এটি একক কোনো আইনও নয়। রোমানদের সামাজিক জীবন নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রচলিত প্রথাসমূহ এবং সভ্য জাতি হিসেবে তারা যেসব নিয়ম-নীতির মাধ্যমে পরিচালিত হতো এবং তাদের ধর্মীয়, রাষ্ট্রীয়, সামাজিক এবং বৈষয়িক কর্মকান্ড পরিচালনার জন্য রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে তারা যেসব নিয়ম কানুনের প্রবর্তন করেছিল প্রকৃতপক্ষে তাকেই রোমান আইন বলা হয়ে থাকে।-নির্মলেন্দু ধর, রোমান আইন, ঢাকা: রেমিসি পাবলিশার্স, ২০০৬, পৃ.১।’’ ড.ড. ইঁপশষধহফ এ দিকেই লক্ষ করে বলেছেন: আইন দ্বারা সংরক্ষিত যে কোনো বস্তু, যার অর্থনৈতিক মূল্য ছিল, তাকেই রেস বলা হতো। ‘‘ড. এবিএম মফিজুল ইসলাম পাটোয়ারী, রোমান আইনের মূলনীতি, প্রাগুক্ত, পৃ. ১২৭-১২৯।’’
সম্পদ শব্দের অর্থ (Meanings of the term ‘Property’) সকল আইনগত অধিকার, মালিকী অধিকার, সর্বজন স্বীকৃত মালিকী অধিকার ইত্যাদি। ‘‘আজিজুর রহমান চৌধুরী, ব্যবহার-তত্ত¡ (আইন বিজ্ঞান), ঢাকা: বাংলাদেশ ‘ল’ বুক সেন্টার, ২০০৪, পৃ. ২২৭; Leage, R.W., Prichard, A.M., Leage’s Roman Private Law, London: Macmillan & Co. Ltd., 1961, P. 125; Nicholas, Berry, An Introduction to Roman Law, London: Oxford University Press, 1962, P. 214.’’
সম্পদ উপার্জনের বিভিন্ন পন্থা ঃ সাধারণভাবে উপার্জনের অনেক প্রকার থাকতে পারে, তবে মৌলিক দিক থেকে মানুষের উপার্জনকে দু’ভাগে ভাগ করা যায়। ক. বৈধ পন্থায় উপার্জন এবং খ. অবৈধ পন্থায় উপার্জন। নিম্নে এসম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা উপস্থাপন করা হলো-
বৈধ পস্থায় উপার্জন: বৈধ পন্থায় উপার্জনের জন্য আমাদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা উচিত। আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের অন্যতম শর্ত হলো, বান্দার হালাল উপার্জন। কেননা রিযিক যদি হালাল পন্থায় উপার্জিত না হয় তাহলে তার কোনো দুআ কিংবা ইবাদত কোনটাই কবুল হয় না। আল্লাহ্ আমাদেরকে হালাল রিযিক দিয়ে জীবনধারণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন: ‘‘আমি তোমাদের জন্য যে রিযিক দিয়েছি তা থেকে পবিত্র বস্তু তোমরা ভক্ষণ কর।’’ ‘‘আল-কুরআন, ২:৫৭’’ আর বৈধ পেশায় নিয়োজিত থেকে সম্পদ উপার্জনের জন্য পবিত্রতম ও হালাল বস্তুর খোঁজ করার নির্দেশও আল্লাহ দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন: ‘‘হে মুমিনগণ! জুমুআর দিন যখন সালাতের জন্য আহবান করা হয় হয় তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণে ধাবিত হও এবং ক্রয়-বিক্রয় ত্যাগ কর, এটাই তোমাদের জন্য শ্রেয় যদি তোমরা উপলব্ধি কর। সালাত শেষ হলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে এবং আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান করবে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করবে যাতে তোমরা সফলকাম হও। যখন তারা দেখল ব্যবসায় ও কৌতুক, তখন তারা তোমাকে দাঁড়ান অবস্থায় রেখে তার দিকে ছুটে গেল। বল, আল্লাহর নিকট যা আছে তা ক্রীড়া-কৌতুক ও ব্যবসায় অপেক্ষা উৎকৃষ্ট। আল্লাহ্ সর্বশ্রেষ্ঠ রিযিকদাতা।’’ ‘‘আল-কুরআন, ৬২: ৯-১১।’’
এ প্রসঙ্গে রসূলুল্লাহ স. বলেছেন: ‘‘পৃথিবী মিষ্ট ও শ্যামল। এখানে যে ব্যক্তি হালাল সম্পদ উপার্জন করবে এবং ন্যায়সংগত পথে তা ব্যয় করবে, আল্লাহ তাকে উত্তম প্রতিদান দেবেন এবং তাকে জান্নাত দান করবেন। আর যে ব্যক্তি হারাম পন্থায় সম্পদ উপার্জন করবে এবং অন্যায় পথে ব্যয় করবে, আল্লাহ তাকে অপমানজনক স্থানে নির্বাসিত করবেন। আর যারা হারাম সম্পদ হস্তগতকারী, কিয়ামতের দিন তারা আগুনে জ্বলবে।’’ ‘‘খাওলাহ বিনতে কায়িস রা. হতে বর্ণিত।-ইবনে হিব্বান, আস-সহীহ, দারুল ফিক্র, তা.বি., খ. ১০, পৃ. ৩৭০, হাদীস নং-৪৫১২’’ এভাবে আরো অনেক হাদীস বর্ণিত হয়েছে এবং হালাল পন্থায় উপার্জনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। নিম্নে বৈধ পন্থায় উপার্জনের কতিপয় মাধ্যম উপস্থাপন করা হলো-
চাকরি ঃ সম্পদ উপার্জনের জন্য মেধা ও শ্রম বিনিয়োগ করে তা আহরণ করতে হয়। আল্লাহ্ বনী ইসরাঈলের জন্য যেমন মান্না “ ‘মান্না’ এক ধরনের সুস্বাদু খাবার, যা শিশিরের মত গাছের পাতায় ও ঘাসের উপর জমে থাকত। আল্লাহ্ বিশেষভাবে তা বনী ইসরাঈলের জন্য প্রেরণ করেছিলেন।” ও সালওয়া “ ‘সালওয়া’ পাখির গোশ্ত জাতীয় এক প্রকার খাদ্য, যা আল্লাহ্ বনী ইসরাঈলের জন্য বিশেষভাবে প্রেরণ করেছিলেন।” নাযিল করতেন তেমনটি এ যুগে আর হবার সম্ভবনা নেই। “বনী ইসরাঈলদের উপর আল্লাহ্ এমন এক খাবার নাযিল করতেন যাকে কুরআনের ভাষায় মান্না ও সালওয়া বলা হতো এবং তারা তা লাভ করতো বিনা পরিশ্রমে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ বলেন : ‘আর আমি তোমাদের উপর মেঘের ছায়া দিলাম এবং তোমাদের প্রতি নাযিল করলাম ‘মান্না’ ও ‘সালওয়া’। তোমরা সে পবিত্র বস্তু থেকে আহার কর, যা আমি তোমাদেরকে দিয়েছি। আর তারা আমার প্রতি জুলুম করেনি, বরং তারা নিজদেরকেই জুলুম করতো।”- আল কুরআন, ২ : ৫৭” মুসলিম উম্মাহকে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে সম্পদ উপার্জনের শিক্ষা রসূলুল্লাহ্ স. দিয়েছেন। এজন্য মানুষকে পরিশ্রমের জন্য নিত্য নতুন উপায় বের করতে হয়েছে এবং হচ্ছে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর