Inqilab Logo

ঢাকা, শনিবার , ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ০৯ রবিউস সানি ১৪৪১ হিজরী

উপকূলীয় অঞ্চলে শিল্প স্থাপনে অগ্রাধিকার দিতে হবে

| প্রকাশের সময় : ১৯ অক্টোবর, ২০১৮, ১২:০৩ এএম

ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে বিদ্যমান যানজট এবং জনদুর্ভোগ লাঘবে উপকূলীয় অঞ্চলে শিল্পায়ণের প্রস্তাব করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক(এডিবি)’র ডেপুটি কান্ট্রি ডিরেক্টর চাই লি। পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট(পিআরআই) আয়োজিত ‘বাংলাদেশ’স ইকোনমিক জিওগ্রাফি: সাম প্যাটার্ন এন্ড পলিসি’, শিরোনামের এক আলোচনা সভায় এডিবি’র এই কর্মকর্তা এ ক্ষেত্রে চীনের উদাহরণ তুলে ধরেন। ঢাকাসহ দেশের প্রায় সবগুলো বিভাগীয় শহর, এমনকি অধিকাংশ জেলা শহরের মানুষ এখন যাজটসহ নানাবিধ নাগরিক সংকটের সম্মুখীন। বিশেষত ঢাকার যানজট নিরসনে গত দুই দশকে নানাবিধ উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও অবস্থার তেমন কোনো লক্ষ্যনীয় পরিবর্তন হয়নি। উপরন্তু পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অপরিকল্পিত বসতি , ভাসমান ও ছিন্নমূল মানুষের সংখ্যা। গ্রামীন জনপদে প্রয়োজনীয় কর্মসংস্থান না থাকা এবং নদীভাঙ্গনে বিপন্ন মানুষ ভীড় করছে ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে। প্রিয় গ্রাম ও জনপদ পেছনে ফেলে শহরমুখী এই জনস্রোতের মূল আকর্ষণ হচ্ছে শহরে এসে যেনতেন প্রকারে একটি কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা। শহরের অভ্যন্তরে গড়ে ওঠা শিল্প কারখানাগুলোর কারণে শহরের জনসংখ্যা বৃদ্ধি অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। এর ফলে শহরগুলো উপযুক্ত পরিবেশ ও বাসযোগ্যতার সংকটে পড়েছে। ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিংয়ে বসবাসের জন্য বিশ্বের অন্যতম অযোগ্য শহরের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে ঢাকা। ঢাকার যানজট নিরসনে সরকারের নানাবিধ উদ্যোগের পাশাপাশি কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থার পক্ষ থেকেও বেশ কিছু পরামর্শ বা প্রস্তাব পেশ করা হয়েছে। রাজধানী ঢাকার পুর্নগঠনের বদলে শহরের মূল অবকাঠামো ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পূর্বদিকে সম্প্রসারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে যুগোপযোগী ও ভবিষ্যতমুখী পরিকল্পনায় ঢাকার উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের কোনো প্রস্তাবই বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। 

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ ব্লু ইকোনমির উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করলেও ঢাকা ও চট্টগ্রামের মত শহরে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও জনদুর্ভোগের পেক্ষাপটে বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ উপক‚লীয় অঞ্চলের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর পাশাপাশি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে শিল্পকারখানা উপক‚লে বিকেন্দ্রীকরণের কোনো সুনির্দ্দিষ্ট পরিকল্পনার কথা শোনা যায়নি। চীনের শিল্পায়ণ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে তার শিল্পকারখানা ও ইপিজেডগুলো গড়ে তোলা হয়েছিল সেখানকার উপক‚লীয় শহরগুলোতে। এর ফলে উৎপাদিত পণ্য রফতানীর জন্য জাহাজিকরণ অনেক সহজ ও সাশ্রয়ী হয়। সেই সাথে কাঁচামাল ও আভ্যন্তরীণ বাজারে পণ্য সরবরাহের জন্য উপক‚লীয় অঞ্চলের সাথে সারাদেশের স্থল, নৌ ও রেল যোগাযোগ নেটওয়ার্কের উন্নয়ন এ ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার ভিত্তিক উদ্যোগ হিসেবে গ্রহণ করা হয়। শিল্পায়ণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সমুদ্রোপকুলীয় অঞ্চলের অনুরূপ সম্ভাবনার পাশাপাশি সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদকে রেমিটেন্স আয়ের খাত হিসেবে কাজে লাগানোরও ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। শুধু চীন নয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়াসহ শিল্পোন্নত দেশগুলো তাদের উৎপাদিত পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক আন্তর্জাতিক বাজারে সক্ষমতা ধরে রাখতে শিল্পায়ণের জন্য উপক‚লীয় অঞ্চলগুলোকেই বেছে নিয়েছে। অধিক জনসংখ্যার কারণে আমাদের নগরীগুলোতে যানজট, আবাসন, বর্জ্যব্যবস্থাপনা, পরিবেশগত সংকট ও ক্রমবর্ধমান নাগরিক দুর্ভোগের বাস্তবতায় উপক‚লীয় অঞ্চলে শিল্পকারখানা স্থানান্তর আমাদের জন্য একটি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত বিকল্প পন্থা হিসেবে গণ্য হতে পারে।
নানামুখী বাস্তবতায় দেশের অর্থনীতি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। দেশকে মধ্য আয়ের পথে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনার কথা সরকার প্রচার করলেও বিদ্যমান অবস্থায় আন্তজার্তিক প্রতিযোগীতা সক্ষমতায় পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ। গতকাল প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ২০১৮ সালের ‘গ্লোবাল কম্পিটিটিভনেস ইনডেক্সে’ বাংলাদেশ গত বছরের চেয়ে একধাপ পিছিয়ে পড়ার তথ্য জানা যায়। বিশ্বের ১৪০ দেশের মধ্যে গত বছর বাংলাদেশের অবস্থান ১০২ থেকে এ বছর ২০৩ এ নেমে এসেছে। অর্থনৈতিক সক্ষমতায় অবনমনের বাস্তবতা জিইয়ে রেখে মধ্যম আয়ের দেশ বা টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। শুধুমাত্র কাগজে কলমে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হিসাব জাতীয় উন্নয়নের মূল নির্দেশক হতে পারেনা। দেশের প্রধান শহরগুলোকে বাসযোগ্য রাখতে এবং যানজটসহ জনদুর্ভোগ কমিয়ে আনতে যখন উন্নয়ন সহযোগিরা উপক‚লীয় অঞ্চলের অবকাঠামোসহ যোগাযোগ নেটওয়ার্ক উন্নয়নের কথা বলছেন তখনো আমরা একটি বিপরীতমূখী অবস্থাই প্রত্যক্ষ করছি। গতকাল ইনকিলাবে প্রকাশিত এক রিপোর্টে উপক‚লীয় তিন বিভাগের মধ্যে সড়ক যোগাযোগ নেটওয়ার্কে বিরূপ অবস্থার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। চট্ট্রগ্রামের সাথে বরিশাল, খুলনা, ভোলা, লক্ষীপুর মোংলা, বেনাপোল ও ভোমরা স্থল বন্দরের সড়ক যোগোযোগ থাকলেও ফেরী চলাচল ঝঞ্ঝাটপূর্ণ হওয়ায় বাণিজ্যিক পরিবহণ বেশ ঝক্কি ও সময়সাপেক্ষ। প্রয়োজনীয় সংখ্যক আধুনিক ফেরী সার্ভিস চালুর মধ্য দিয়ে এসব রুটের সড়ক যাতায়াত নির্বিঘ্ন করা গেলে ঢাকা-চট্টগ্রামের মূল মহাসড়কের উপর চাপ কমার পাশাপাশি পণ্য পরিবহনে সময় ও খরচ সাশ্রয় হবে। সেই সাথে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার, মোংলাসহ উপক‚লীয় জেলাগুলোর সাথে সারাদেশের সড়ক, রেল ও নৌযোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। সামদ্রিক সম্পদের সম্ভাবনা এবং জনবহুল শহরের চাপ কমাতে উপক‚লীয় অঞ্চলে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও রফতানীমুখী শিল্প স্থানান্তরের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ