Inqilab Logo

ঢাকা, শুক্রবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৮, ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ৬ রবিউস সানী ১৪৪০ হিজরী

ফররুখ আহমদের ছড়া : শিশু-ভাবনা

ড. আ শ রা ফ পি ন্টু | প্রকাশের সময় : ২ নভেম্বর, ২০১৮, ১২:০৮ এএম

ছড়া বা শিশু-কিশোর সাহিত্য রচনায় বাংলাসাহিত্যে কবি ফররুখ আহমদের (১০ জুন ১৯১৮-১৯ অক্টোবর ১৯৭৪) অবদান অবিস্মরণীয়। তবে কবি হিসেবে তিনি যত পরিচিত ছড়াকার বা শিশুসাহিত্যিক হিসেবে তত পরিচিত নন। অথচ কলেবরের দিক থেকে কিংবা উৎকর্ষ বিচারেও শিশু-সাহিত্যিক হিসেবে রবীন্দ্রনাথ, সুকুমার রায় ও নজরুল ইসলামের পাশাপাশি ফররুখ আহমদের অবদানও কম নয়। ফররুখ আহমদের শিশু-কিশোর ছড়া-কবিতার ভাষা, ছন্দ, ভাব, বিষয় ও শিশু-মনস্তত্তে¡র বিচারে তাকে বাংলা সাহিত্যের একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিশু-সাহিত্যিক হিসেবে অভিহিত করা যায়। তাঁর রচিত বিভিন্ন শিশু-কিশোর ছড়ার দিকে আলোকপাত করলেই বিষয়টি স্পষ্ট হবে।

ফররুখ আহমদের উল্লেখযোগ্য ছড়াগ্রন্থগুলো হলো-পাখির বাসা (১৯৬৫), হরফের ছড়া (১৯৬৮), নতুন লেখা (১৯৬৯), ছড়ার আসর-১ (১৯৭০)। কবির মৃত্যুর পর প্রকাশিত তিনটি গ্রন্থ হলো- চিড়িয়াখানা (১৯৮০), ফুলের জলসা (১৯৮৫), কিস্সা কাহিনী (১৯৮৫)। কবির মৃত্যুর পর যেসব শিশু-কিশোর গ্রন্থ পান্ডুলিপি আকারে পাওয়া গেছে, তা হলো : ছড়ার আসর (২), ছড়ার আসর (৩), সাঁঝ সকালের কিস্সা, আলোকলতা, খুশীর ছড়া, মজার ছড়া, পাখীর ছড়া, রং মশাল, জোড় হরফের ছড়া, পড়ার শুধু, পোকামাকড়, ফুলের ছড়া, দাদুর কিস্সা, সাঁঝ সকালের কিস্সা। কবির শিশু-কিশোর গ্রন্থের মোট সংখ্যা ২১টি। তার মধ্যে ৪টি তাঁর জীবিত অবস্থায় এবং ৩টি মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়। বাকি ১৪টি গ্রন্থ অপ্রকাশিত রয়েছে। এ ছাড়া কবি ‘‘নয়া জামাত’’ নামে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ ভাগ গ্রন্থ রচনা করেছিলেন শিশুস্কুলপাঠ্য হিসাবে। এসব গ্রন্থ ঐ সময় স্কুলপাঠ্য হিসেবে বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ফলে একাধিক বার এর মুদ্রণ হয়।
উৎকর্ষ বা গুণগত মানের দিক থেকে ফররুখ আহমদের শিশুতোষ ছড়া-কবিতা অসাধারণ। শিশু-মনস্তত্ত¡ বিচারে এবং শিশুদের উপযোগী ভাব-ভাষা ও ছন্দ ব্যবহারে তিনি অসাধারণ নৈপুণ্য প্রদর্শন করেছেন। তাঁর প্রথম রচিত শিশু-কিশোর গ্রন্থের নাম ‘‘পাখীর বাসা’’। এটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে পাঠকদের নিকট বিপুলভাবে সমাদৃত হয় এবং এজন্য কবি ১৯৬৬ সনে ইউনেস্কো পুরস্কার লাভ করেন। এরপর এটি আদমজী পুরস্কার’ লাভ করে। এ গ্রন্থে মোট ৪১টি কিশোর কবিতা বা ছড়া সংকলিত হয়েছে। এর মধ্যে পাখীর বাসা, ঘুঘুর বাসা, বকের বাসা, প্যাঁচার বাসা, মজার ব্যাপার, মজার কোরাস, মেলায় যাওয়ার ফ্যাঁকড়া, নরম গরম আলাপ, বাদুরের কীর্তি, দাদুর কিস্সা, বিশেষ অনুরোধে, পাখপাখালী, টুনটুনী, কাঠঠোকরা, কুটুম পাখী, টিয়ে পাখী, ফিঙে পাখী, ঝড়ের গান, বৃষ্টির গান, বর্ষা শেষের গান, শরতের গান, বৃষ্টির গান, ফাল্গুনের গান, চৈত্রের গান, শাহজাদী, শাহজাদা, সিতারা, শাহীন, রংমহল, সাম্পান, জঙ্গীপীর, তিতুমীর, মহান নেতা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
‘‘পাখীর বাসা’’- বিভিন্ন পাখি নিয়েই সবচেয়ে বেশি ছড়া রচিত হয়েছে। তিনি নামছড়াটি ভূমিকা স্বরূপ শুরু করেছেন এভাবে-
আয় গো তোরা ঝিমিয়ে পড়া দিনটাতে,
পাখীর বাসা খুঁজতে যাবো একসাথে
(পাখীর বাসা : পাখীর বাসা)
গ্রামীণ জীবনযাত্রায় শিশুরা যে অবাধ বিচরণ সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। শিশুরা ঝিমিয়েপড়া দুপুরে নির্ঘুম থেকে নানা দুষ্টুমি করে বেড়ায় আর তারা পাখির বাসা খুঁজতে লক্ষ্য করে-
কাঠবিড়ালী পশমী কোটে
বিষম রোদে হাঁপিয়ে ওঠে,
কাকের করুণ কান্না ঠোঁটে
মিলায় দূরে দূরে
(চৈত্রের গান : ঐ)
শিশুরা শুধু দুষ্টুমি আর পাখির বাসা খুঁজতেই ব্যস্ত নয় তারা আনন্দ-ফুর্তি বা কেনা-কাটার জন্য গ্রাম্য মেলায় যায়। সেখান গিয়ে দেখে-
বাপ রে সে কী ধুম ধাড়াক্কা
দিচ্ছে ধাক্কা, খাচ্ছে ধাক্কা,
গুঁতোর চোটে হয় প্রাণান্ত
হাঁপিয়ে ওঠে ক্যাবলা কাণ্ড!
লাগলো যখন বিষম তেষ্টা
ক্যাবলা করে ডাবের চেষ্টা।
তাকিয়ে দেখে পকেট সাফ,
ভিড়ের ভিতর দেয় সে লাফ।
(মেলায় যাওয়ার ফ্যাঁকরা : ঐ)
মেলায় বেড়ানো এই সাময়িক অসুবিধা হলেও সেখানে তারা পায় চোখ ধাঁধানো বিভিন্ন জিনিস, উৎফুল্ল হয়ে ওঠে অফুরন্ত আনন্দে।
‘‘হরফের ছড়া’’ বাংলা একাডেমির থেকে গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৬৮ সালের মার্চ মাসে। দীর্ঘকাল পর ১৯৯৯ সালে কথাশিল্পী শাহেদ আলীর ভূমিকা সংবলিত গ্রন্থটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়। এরপর ২০০৬ সালে বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটি এটি পুনঃমুদ্রণ করে। ‘‘হরফের ছড়া’’ একটি পরিকল্পিত ও সুলিখিত ছড়াগ্রন্থ। শিশুদের প্রথম পাঠ হিসাবে এটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ও উপযোগী গ্রন্থ। হরফের ছড়া গ্রন্থে কবি ফররুখ আহমদ শিশুদেরকে বাংলা বর্ণমালার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। ভাষা শিখতে হলে প্রথমে বর্ণ বা অক্ষর জ্ঞান থাকতে হয়। বর্ণ দিয়ে শব্দ, শব্দ দিয়ে বাক্য তৈরি করে মানুষ মনের ভাব প্রকাশ করে। তাই বর্ণ-পরিচয় অতি গুরুত্বপূর্ণ। এখানে প্রত্যেকটি বাংলা বর্ণ বা হরফ নিয়ে এক একটি ছড়া রচিত হয়েছে। এগুলো এতোই সুন্দর ও আকর্ষণীয় যে, শিশুরা এসব ছড়া পড়ে সহজেই বাংলা বর্ণমালা বাংলা শব্দগঠন শিখতে পারবে। যেমন ‘অ’ বর্ণ নিয়ে ছড়া-
অ- য়ে অতসী-তিসির মাঠ
অশথ গাছের সামনে হাট।
অলিগলি শহর চাই
অলিগলি শহর পাই।
‘ক’ বর্ণ নিয়ে একটি ছড়া-
ক-য়ের কাছে কলমিলতা
কলমিলতা কয়না কথা
কোকিল ফিঙে দূর থেকে
কলমি ফুলের রঙ দেখে। (অসমাপ্ত)

 



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর