Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৪ পৌষ ১৪২৫, ১০ রবিউস সানী ১৪৪০ হিজরী
শিরোনাম

ইন্দোনেশিয়ায় বিধ্বস্ত বিমানটি ছিল সর্বাধুনিক প্রযুক্তির

আগেরদিন বিপদ সঙ্কেত দিয়েছিল আরেকটি বোয়িং

ইনকিলাব ডেস্ক | প্রকাশের সময় : ৩ নভেম্বর, ২০১৮, ১২:০২ এএম

সর্বাধুনিক প্রযুক্তির নতুন বোয়িং, অভিজ্ঞ পাইলট, আবহাওয়া অনুকূলে, তবুও কেন বিধ্বস্ত হলো ইন্দোনেশিয়ার উড়োজাহাজটি? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে মাঠে নেমেছেন তদন্তকারীরা। তাদের নজর এখন বিমানটির দিকে। কিছুতেই এটিকে সাধারণ দুর্ঘটনা বলে মেনে নিতে পারছেন না বিশেষজ্ঞরা। তাদের ধারণা, নতুন হলেও উড়োজাহাজটিতে ছিল কোন যান্ত্রিক ত্রু টি যা কোম্পানির প্রকৌশলীদের চোখ এড়িয়ে গেছে।
ইন্দোনেশিয়ায় সোমবার ১৮৯ আরোহী নিয়ে সুকর্ণ হাতা বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়ন করার পর সমুদ্রে বিধ্বস্ত হয় লায়ন এয়ারের জেট বিমান। আগেরদিন রবিবারও লায়ন এয়ারের একই মডেলের আরেকটি বিমান সেখান থেকে উড্ডয়ন করার পর বিপদ সংকেত দিয়ে ফিরে আসতে চেয়েছিল। খবর দা গার্ডিয়ান। এই তথ্য জানিয়ে বালি-নুসরা টেনগ্রা এলাকার বিমান নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের প্রধান হারসন বলেন, সংকেত দেয়ার পর পাইলট নিয়ন্ত্রণ কক্ষকে আবার জানান, বিমানটি ঠিকভাবে উড়ছে। তাই তিনি ফিরে আর ফিরে আসছেন না। তিনি বলেন, “পাইলট নিজে আন্তঃবিশ্বাসী ছিলেন ডেনপাসার থেকে জাকার্তায় বিমানটি উড়িয়ে নিয়ে যেতে পারবেন।”
লায়ন এয়ারের বিমানটি উড্ডয়নের পর বালির ওই বিমানবন্দরে অবতরণ করতে আসছিল অন্য একটি বিমান। কিন্তু তাদেরকে অপেক্ষায় থেকে আকাশে চক্কর কাটতে বলা হয়। ওই বিমানের পাইলটও লায়ন এয়ার ও নিয়ন্ত্রণ কক্ষের মধ্যে রেডিও বার্তা শুনতে পেয়েছিলেন। মিডিয়ার সাথে কথা বলার অনুমতি না থাকায় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই বিমানের পাইলট বলেন, “লায়ন এয়ার থেকে ফিরে আসার জন্য দেয়া প্যান-প্যান সংকেতের কারণে আমাদেরকে অপেক্ষায় থাকতে বলা হয়।” উল্লেখ্য, পাইলটরা জরুরি অবস্থা বোঝানোর জন্য ‘প্যান-প্যান’ সংকেত ব্যবহার করেন। সর্বোচ্চ বিপদ সংকেত ‘মেডে’ থেকে এটি এক ধাপ নিচের বিপদ সংকেত। তিনি বলেন, “উড্ডয়নের পাঁচ মিনিট পরেই লায়নের বিমানটি ফিরে আসতে চেয়েছিল কিন্তু তারপরেই পাইলট জানান সমস্যার সমাধান হয়েছে এবং তিনি জাকার্তার দিকে চলে যাচ্ছেন।”
ডেনপাসার থেকে জাকার্তাগামী ওই বিমানটি পরে স্থানীয় সময় রাত ১০:৫৫ মিনিটে গন্তব্যে অবতরণ করে। পরেরদিন সেখান থেকে উড্ডয়ন করা সুমাত্রাগামী বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স বিমানটি ১৮৯ জন আরোহী নিয়ে সমুদ্রে বিধ্বস্ত হয়। বিধ্বস্ত হওয়ার আগে এটিও ফিরে আসার জন্য নিয়ন্ত্রণ কক্ষে সংকেত দিয়েছিলো।
এদিকে, সোমবার বিধ্বস্ত হওয়া লায়ন এয়ারের জেট বিমানটি ছিল বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স ৮ মডেলের, যা উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটির নতুন ও সর্বাধুনিক প্রযুক্তির বিমান।
ইন্দোনেশিয়ায় উড়োজাহাজটির নিবন্ধন নম্বর ছিল পিকে-এলকিউপি। ন্যাশনাল ট্রান্সপোর্ট সেফটি কমিটি (এনটিএসসি) এর প্রধান সূর্যান্তো জুজোনো বলেন, বিমানটি আগস্ট মাসে লায়ন এয়ারে সরবরাহ করা হয়েছিল।
বায়ু ট্র্যাফিকের উপর নজরদারি করা ওয়েবসাইট প্লেনস্পটারডটনেট জানিয়েছে, বিধ্বস্ত উড়োজাহাজটি লায়ন এয়ার ফ্লিটে থাকা বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স ৮ মডেলের ১১টির মধ্যে একটি। ৭৩৭ ম্যাক্স ৮ মডেলের বোয়িংটি ১৯৬৭ সালে চালু হওয়া জেটের সর্বশেষ সংস্করণগুলির মধ্যে একটি। ১০ হাজারের বেশি ৭৩৭ মডেলের বোয়িং এরই মধ্যে তৈরি করা হয়েছে এবং এটি বিশ্বের মধ্যে সর্বকালের সর্বোচ্চ বিক্রিত উড়োজাহাজ।
উন্নত প্রযুক্তির এই উড়োজাহাজটির গ্রহণযোগ্যতা ও চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলেছে। বিপদে নানা ধরণের বিকল্প ব্যবস্থা থাকায় এই উড়োজাহাজের দুর্ঘটনার ঝুঁকিও অত্যন্ত কম। সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ত্রু টিমুক্ত একটি নতুন উড়োজাহাজ কেন কোন সংকেত ছাড়াই বিধ্বস্ত হলো- সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো খুঁজে বের করতে পারেনি সংশ্লিষ্টরা। ইন্দোনেশিয়ায় এই ধরণের একটি নতুন বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স ৮ উড়োজাহাজ বিধ্বস্তের ঘটনাটিকে তাই ‘অত্যন্ত অস্বাভাবিক’ বলে মন্তব্য করেছেন সিএনএন’র বিমান বিশ্লেষক পিটার গোয়েলজ।
উড়োজাহাজটির পাইলট ও কো-পাইলটও ছিলেন অত্যন্ত অভিজ্ঞ। তাদের যথাক্রমে ৬ হাজার ঘণ্টা ও ৫ হাজার ঘণ্টা বিমান চালানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে। আওহাওয়াও প্রতিকূল ছিল না। এসব কারণে তদন্তকারীরা বিমানটির দিকেই নজর দিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ট্রান্সপোর্টেশন সেফটি বোর্ডের প্রাক্তন চেয়ারম্যান গোয়েলজ। তারা দেখতে চাইছেন, বিমানটিতে নির্মাণজনিত কোন ত্রু টি ছিল কিনা। ৭৩৭ বোয়িংয়ের ম্যাক্স সংস্করণগুলি তাদের লিপ জেট ইঞ্জিনের জন্য অন্য বিমানের চেয়ে দক্ষ ও পরিবেশগতভাবে বন্ধুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ, বিরূপ প্রাকৃতিক পরিবেশেও এই উড়োজাহাজ যাত্রীদের নিরাপদ ও আরামদায়ক ভ্রমণের নিশ্চয়তা দেয়। বোয়িং বলছে, ৭৩৭ ম্যাক্স জেট তাদের পূর্বসুরীদের থেকে ১০-১২ ভাগ বেশি দক্ষ। লিপ ইঞ্জিন তৈরি করে সিএফএম ইন্টারন্যাশনাল যা যুক্তরাষ্ট্রের জিই এভিয়েশন ও ফ্রান্সের সাফরান এয়ারক্রাফট ইঞ্জিনস এর যৌথ উদ্যোগ। ২০১৭ সালে এই ইঞ্জিনের উৎপাদন মানে ত্রু টে খুঁজে পেয়েছিল নির্মাতারা।
সিএফএম’র একজন মুখপাত্র জেমি জিউয়েল বলেন, কোম্পানির পরিদর্শনের সময় জেটের টারবাইনের উৎপাদন ডিস্কগুলোতে কিছুটা ব্যতিক্রম দেখা গিয়েছিল। তবে ওই অংশটির সঙ্গে সম্পর্কিত কোন সমস্যা ৭৩৭ ম্যাক্স বোয়িংয়ের ২০০০ ঘণ্টারও বেশি পরীক্ষা ফ্লাইটগুলির একটিতেও দেখা যায়নি বলে জোর দিয়ে বলেন জিউয়েল।
লায়ন এয়ার বোয়িং ৭৩৭ এর অন্যতম ক্রেতা। এছাড়া ভ্রমণকারীদের একটা বড় অংশ এই বোয়িংয়ের জন্যই লায়ন এয়ারকে বেছে নেয়। বিশ্বের বড় বড় বিমান সংস্থা গ্রাহক টানতে বোয়িং ৭৩৭ কে বেঁছে নিচ্ছে। ২০১১ সালে কোম্পানিগুলো ২৩০টি একক ও টুইন-ইঞ্জিন জেট ক্রয়ের ঘোষণা দিয়েছে যার মূল্য ২১.৭ বিলিয়ন ডলার। তখন বোয়িং থেকে বলা হয়েছিল, এটি বোয়িং ইতিহাসে বিমানের সংখ্যা ও ডলার মূল্যে সবচেয়ে বড় একক অর্ডার। সূত্র: সিএনএন।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ