Inqilab Logo

ঢাকা, সোমবার, ২৫ মার্চ ২০১৯, ১১ চৈত্র ১৪২৫, ১৭ রজব ১৪৪০ হিজরী।

খাদ্যোৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও মানুষ তার কাক্সিক্ষত সুফল পাচ্ছে না

সরদার সিরাজ | প্রকাশের সময় : ৪ নভেম্বর, ২০১৮, ১২:০৪ এএম

দেশ খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে, এ কথা সরকারি লোকজন প্রায়ই গর্ব করে বলেন। কথাটি খুব অসত্য নয়। বিশেষ করে যখন প্রকৃতি ফেভার করে, তখন। দেশের জন্য এটা একটা গর্বেরই বিষয়। প্রশ্ন উঠতে পারে, ‘মাছে-ভাতে বাঙ্গালী’ প্রবাদের মর্যদা লাভ করেছে। তাই ১৬ কোটির অধিক মানুষের জন্য মাছ-ভাত আমদানি করতে হলে উন্নতির প্রায় সবই ব্যয় হতো। কিন্তু তা হচ্ছে না। বরং কিছু রফতানি হচ্ছে। খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা দেশের একটি বড় অর্জন। আর এই অর্জনের মূল দাবিদার কৃষক আর হাইব্রিড। প্রশ্ন উঠতে পারে, খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার সুফল কি পাচ্ছে জনগণ? জবাবে বলতে হয়, না, পাচ্ছে না। কারণ, মূল্য ও ভেজাল অত্যধিক । ফলে লাভের ধন পিপড়ায় খেয়ে ফেলছে। ফাও’র তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশ এখন বিশ্বে চাল ও মাছ উৎপাদনে চতুর্থ, সবজিতে তৃতীয় ও আলু উৎপাদনে সপ্তম। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ধান, গম, আলুসহ প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যশস্য উৎপাদনে বইছে প্রবৃদ্ধির জোয়ার। বর্তমানে খাদ্যশস্য উৎপাদন ৪ কোটি মেট্রিক টনেরও বেশি। বছরে আলু উৎপাদন হচ্ছে ১.২ কোটি মেট্রিক টন। শুধু উৎপাদনেই নয়, আলু এখন দেশের অন্যতম অর্থকরি ফসলও। গত বছর আলু রফতানি হয়েছে ৩.৩০ কোটি ডলারের। মৎস্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, মাছ উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। মাছ রফতানি দিনে দিনে বাড়ছে। ফাও পূর্বাভাস দিয়েছে, ২০২২ সালে বিশ্বে যে চারটি দেশ মাছ চাষে বিপুল সাফল্য অর্জন করবে, তার মধ্যে প্রথম দেশটি হচ্ছে বাংলাদেশ। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী, স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে ধানের উৎপাদন ৩ গুণের বেশি, গম ২ গুণ, সবজি ৫ গুণ ও ভুট্টার উৎপাদন বেড়েছে ১০ গুণ। খাদ্য উৎপাদনে সরকারের মনোযোগ, কৃষি গবেষণা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, উচ্চফলনশীল জাতের বীজ উদ্ভাবনের ওপর গুরুত্বারোপ, সহজ কিস্তিতে ঋণ-ব্যবস্থার কারণে কৃষিতে কাক্সিক্ষত সাফল্য এসেছে। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে দেশে ৪১.৩৪ লাখ টন মাছ উৎপাদন হয়েছে, যার ৫৬.৮২% চাষের. ১৬.১৫% সমুদ্র থেকে, আর ২৭.৮% খাল-বিল, নদী-নালা, হাওর-বাওড়ের মাধ্যমে এসেছে। আর পৃথিবীর ৬০% ইলিশের উৎপাদন হয় বাংলাদেশে। সরকারি হিসাব মতে, দুই কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মৎস্য খাতের উপর নির্ভরশীল। ফাও’র হিসাবে বাংলাদেশের মানুষের প্রাণিজ আমিষের ৫৭ শতাংশ শুধু মাছ থেকেই মেটানো হয়। খাদ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যৌথ জাতীয় খাদ্য গ্রহণ নির্দেশিকা অনুযায়ী, একজন মানুষের দিনে অন্তত ৬০ গ্রাম মাছ খাওয়া প্রয়োজন। আর একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন ১২০ গ্রাম মাংসের প্রয়োজন। দেশে বর্তমানে দৈনিক মাথাপিছু মাংসের প্রাপ্যতা ১২১.৭৪ গ্রাম। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী বলেছেন, মাছ ও মাংস উৎপাদনে দেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে। অপরদিকে, আর এক তথ্যে জানা গেছে বর্তমানে ডিম উৎপাদনেও দেশ স্বয়ংভর হয়েছে। দুধের উৎপাদনেও অনেক বেড়েছ। অর্থাৎ দেশ চাল, মাছ, মাংস, ডিম, সবজি, চা উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে। তবে প্রায় সব ধরণের মসল্লা, চিনি, দুধ ইত্যাদির উৎপাদন চাহিদার চেয়ে অনেক কম। এসব আমদানি করতে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। কৃষির এই উন্নতি ঘটেছে ধারাবাহিকভাবে। ফলে এতে কোন সরকারের একক কৃতিত্ব নেই।
দেশে খাদ্য উৎপাদন বাড়লেও তার সুফল পাচ্ছে না মানুষ। ভেজাল আর অধিক মূল্যের কারণে সব নস্যাৎ হয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন খাদ্য-পণ্যের নমুনা সংগ্রহের পর তা নিয়মিত পরীক্ষা করে আসছে জনস্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট। ২০১৭ সালে ৬,০৪৭টি নমুনা সংগ্রহ করে প্রতিষ্ঠানটি। এর মধ্যে ৫,১৪৬টি নমুনা নিজস্ব ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ১,৩৩৫টি নমুনাতেই ভেজাল পাওয়া গেছে। কিছু পণ্যের আবার শতভাগই ভেজাল। পানির অপর নাম জীবন । কিন্তু তার ৮০ ভাগই দূষিত। বিশ্ব ব্যাংকের রিপোর্ট মতে, বাংলাদেশে পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহ করা পানির ৮০ শতাংশেই এবং বিভিন্ন উপায়ে সরবরাহ করা খাবার পানির ৪১ শতাংশেই ডায়রিয়ার জীবাণু রয়েছে। এছাড়া, সারা দেশের ১৩% পানিতে আর্সেনিক রয়েছে। এ পানি পান করে ডায়রিয়া, জন্ডিস, কলেরাসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। এছাড়া একাধিক পরিবার একই টয়লেট ব্যবহার করছে, এমন মানুষের সংখ্যা ৫.০৮ কোটির বেশি। পানি ও স্যানিটেশনে দুর্বলতার কারণে অপুষ্টি ও পেটের বিভিন্ন রোগ ও উপসর্গের প্রকোপ বাড়ছে। এর ফলে নষ্ট হচ্ছে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। দরিদ্র ও শিশুরা এর শিকার হচ্ছে তুলনামূলকভাবে বেশি’। জারের পানিও নিরাপদ নয়। বিএআরসি’র এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, পথে ঘাটে, রাস্তার পাশের দোকানে এসব জারের পানিতে রয়েছে মল-মূত্রের জীবাণু যা ছড়াচ্ছে আমাশয়, টাইফয়েড, কলেরা, ইউরিন ইনফেকশন ও জন্ডিসসহ অনেক জীবনঘাতী রোগ। সর্বস্বীকৃত প্রতিষ্ঠান এক্রিডেটেড ল্যাবরেটরি এসজিএস বাংলাদেশ লিমিটেড কর্তৃক নমুনা পানিসমূহের পরিমাণগত ও গুণগতমান বিশ্লেষণ করে এ তথ্য দিয়েছে। ঢাকার ২৪টি স্থানসহ দেশের সব বিভাগের বিভিন্ন জেলা থেকে ২৫০টি নমুনা সংগ্রহ করে এই গবেষণা পরিচালনা করে বিএআরসি। বিজ্ঞানীরা বলেছেন, কলিফর্ম মূলত বিভিন্ন রোগ সৃষ্টিকারী প্যাথোজেন, যেমন- ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও প্রোটাজেয়ার সৃষ্টিতে উৎসাহ যোগায় বা সৃষ্টি করে। ইতিপূর্বে এক দৈনিকে প্রকাশ, বাজারজাত করা সয়াবিন, সরিষা ও ঘির ৯৬টি নমুনার মধ্যে মাত্র তিনটি পাওয়া গেছে মানসম্পন্ন। মানসম্পন্ন তিনটিই সয়াবিন তেল। সরিষা অথবা ঘির কোনও নমুনা মানসম্মত পাওয়া যায়নি। সয়াবিন তেলের মধ্যে মানোত্তীর্ণ মাত্র দুইটি কোম্পানি (ব্র্যান্ড) এবং একটি খোলা তেলের নমুনা রয়েছে। ন্যাশনাল ফুড সেফটি ল্যাবরেটরিতে দৈব-চয়ন পদ্ধতিতে বাজার থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার প্রাপ্ত ফল প্রকাশ করা হয়। ল্যাবরেটরিতে ৯ কোম্পানির বোতল-জাত এবং খোলা ১৮টি নমুনার সয়াবিন তেল পরীক্ষা করা হয়। সয়াবিন তেলে ভিটামিন ‘এ’ মিশানোর নিয়ম থাকলেও তিনটি ছাড়া অন্যগুলোতে সঠিক উপায়ে মিশানো ছিল না অথবা কোনটিতে আদৌ ভিটামিন ‘এ’ পাওয়া যায়নি। আবার কোনটিতে বেশি পরিমাণ ভিটামিন এ পাওয়া গেছে। এসব তেলে প্রয়োজনীয় আয়োডিনও পাওয়া যায়নি।ঘির কোনটাতেই প্রয়োজনীয় উপাদান পাওয়া যায়নি। ফুড সেফটি ল্যাবরেটরি বাজার থেকে ১৮টি খোলা ঘি এবং ২০টি বিভিন্ন কোম্পানির (ব্র্যান্ড) ঘি পরীক্ষা করে কোনটিকেই মানসম্মত পায়নি খোলা সয়াবিনের ১৮টির মধ্যে একটি ছাড়া ১৭টিই মানহীন পাওয়া গেছে। সরিষার তেলে পাওয়া গেছে পরিমাণের বেশি আর্দ্রতা। এছাড়া, ফুড সেফটি ল্যাবরেটরিতে বিভিন্ন জাতের ১৫০ নমুনার সবজি পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ৪৫টির মধ্যে কীটনাশকের উপস্থিতি পাওয়া যায়। আবার ঢাকা শহরের ৪৬টি স্কুলের সামনে থেকে ৪৬টি ঝালমুড়ি, ৩০ ফুচকা, ১৬টি ভেলপুরি এবং ৪২টি আচারের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এসব নমুনায় টাইফয়েড, ডায়রিয়ার জীবাণু পাওয়া গেছে। পূর্বের এক তথ্যমতে, পাস্তুরিত দুধের ৭৫ শতাংশই নিরাপদ নয়’। আইসিডিডিআরবি’র পরীক্ষা-নিরীক্ষায় দেখা গেছে, বাজারে পাওয়া যায় এমন পাস্তুরিত তরল দুধের ৭৫ শতাংশই বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়ার ক্ষতিকর মাত্রার কারণে অনিরাপদ। দেশের ৪৩৮টি কাঁচা দুধের নমুনা এবং বাণিজ্যিকভাবে প্রক্রিয়াজাত দুধের ৯৫টি নমুনা সংগ্রহ করে তা বিশ্লেষণ করে প্রতিষ্ঠানটি। গবেষণার ফল যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকাশিত ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব ফুড মাইক্রোবায়োলজিতে প্রকাশ করা হয়। শিশুদের পুষ্টির প্রাথমিক উৎস এ দুধ নিয়ে গবেষণা ফলকে আইসিডিডিআরবি অপ্রীতিকর বলে বর্ণনা করে। এই অবস্থায় এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্টের দেওয়া নির্দেশনা অনুযায়ী খাদ্য মন্ত্রণালয় ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে গত ২১ জুন। এই কমিটি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পাস্তুরিত দুধ উৎপাদন, বাজারজাতের উদ্দেশ্যে পরিবহন এবং খুচরা দোকান থেকে তিনটি ধাপের দুধ নিয়ে অণু-জৈবিক মান পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন তৈরি করে। কমিটি সূত্রে জানা গেছে, বেশির ভাগ কারখানাতেই দুধ উৎপাদন পর্যন্ত মান ঠিক থাকছে। কারখানা থেকে যখনই দুধ খুচরা বিক্রেতাদের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে সেখানে ব্যাকটেরিয়ার ক্ষতিকর মাত্রার সংক্রমণ পাওয়া গেছে। সর্বশেষ খুচরা বিক্রেতা পর্যায়ে এ সংক্রমণ পাওয়া গেছে উচ্চমাত্রায়। উল্লেখ করা যেতে পারে, মাছ,ফলমূল ও শাকসবজিতে ফরমালিনের কারণে মানুষের মধ্যে চরম আতংক রয়েছে । এমনকি জীবন রক্ষাকারী ওষুধ পর্যন্ত ভেজাল আর মেয়াদ উত্তীর্ণের দোষে দুষ্ট!
খাদ্যে ব্যাপক ভেজালের কারণে দেশের মানুষের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের ‘দ্য সেফ ফুড ইমপারেটিভ’ শীর্ষক প্রতিবেদন মতে, অনিরাপদ খাদ্যের কারণে উত্পাদনশীলতা ক্ষতির দিক থেকে ২৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দশম। অনিরাপদ খাদ্য পুষ্টি নিরাপত্তাকে বাধাগ্রস্ত করে। সেই সাথে মানব উন্নয়ন এবং বৃহত্ অর্থে খাদ্য-অর্থনীতিকে বাধাগ্রস্ত করে। অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণের ফলে বাংলাদেশের মানুষের যে উৎপাদনশীলতা নষ্ট হচ্ছে তার আর্থিক পরিমাণ বছরে ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি । বাংলাদেশে এখনো ২.২০ কোটি লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। তাদের অর্ধেকই ক্ষুধার্ত থাকে। আর দুই-তৃতীয়াংশ শিশু অপুষ্টির কারণে খর্বাকৃতির হয়ে জন্মায়। এই অবস্থায় এ দেশের বেশিরভাগ মানুষের ধারণা, দেশের মানুষ অনাহারে যা মারা যায় ও ব্যাধিগ্রস্ত হয়, তার চেয়ে অনেক বেশি মারা যায় ও বিভিন্ন ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে ভেজাল খাবার ফলে। পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য উৎপাদনেও দেশ অনেক পিছিয়ে আছে। খাদ্য মানসম্মত না হলে মানুষ নানা ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, ২০১০-২০১৬ সাল পর্যন্ত বিশ্বে ৬০ কোটি মানুষ খাদ্যজনিত কারণে অসুস্থ হয়েছে। তাদের মধ্যে ৪.২০ লাখ মানুষের অকাল মৃত্যু হয়েছে । বিশ্বব্যাংক উল্লেখ করেছে, জীবনযাপন পদ্ধতি পরিবর্তন করে স্বল্প খরচের মাধ্যমেই এই ধরনের ক্ষতি অনেক কমিয়ে আনা সম্ভব। দেশের মানুষের উৎপাদনশীলতার পূর্ণ ব্যবহার করতে হলে খাদ্য নিরাপত্তায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
দেশে খাদ্যের মূল্যও অধিক । তাই মানুষের উপার্জনের বেশিরভাগ ব্যয় হয় খাদ্য ক্রয়ে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি প্রকাশিত ‘ট্রু কষ্ট অব আ প্লেট অব ফুড’ বা ‘এক থালা খাবারের প্রকৃত দাম’ শীর্ষক প্রতিবেদন-২০১৮ মতে, খাদ্যমূল্যের তুলনায় উন্নয়নশীল ৫২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান নবম। এক থালা সাধারণ মানের পুষ্টিকর খাবার কিনতে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরের একজন বাসিন্দার ১.২০ ডলার খরচ হয়। আর বাংলাদেশে ব্যয় হয় ৬.৫৬ ডলার, আয় সামর্থ্যের বিবেচনায় নিউইয়র্কবাসীর চেয়ে প্রায় সাড়ে ৫ গুণ বেশি দামে খাবার খেতে হয় একজন বাংলাদেশিকে। খাদ্যের অত্যধিক মূল্যের কারণে দেশের বিরাট সংখ্যক মানুষ পুষ্টি-হীনতার শিকার। ফাও’র খাদ্য ও পুষ্টি পরিস্থিতি বিষয়ে ‘ফুড সিকিউরিটি নিউট্রিশনাল সার্ভিল্যান্স প্রোগ্রাম এর গবেষণা প্রতিবেদন-২০১৭ মতে, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার মধ্যে আড়াই কোটিরও বেশি মানুষ অপুষ্টিতে ভুগছে। নারীর পুষ্টিহীনতার চিত্র আরও ভয়াবহ। পুষ্টিহীন মানুষের মধ্যে ৬০ শতাংশ নারী। শিশু মৃত্যুর প্রধান কারণও অপুষ্টি বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, আমাদের দেশে খাদ্য উৎপাদন বাড়লেও পুষ্টি পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। ফলে আগামী ২০২৫ সালের মধ্যে খর্বতা ২৭ শতাংশ কমিয়ে আনার যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা অর্জন নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
দেশে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও তার সুফল তেমন পাওয়া যাচ্ছে না। ভেজাল আর মূল্য বৃদ্ধিই এর মূল কারণ। তাই যে কোন মূল্যেই হোক এসব বন্ধ করতে হবে। ভেজাল বিরোধী অভিযান মাঝে-মধ্যেই অনুষ্ঠিত হয়। তাতে দোষীদের শাস্তিও হয়। কিন্তু শাস্তির পরিমাণ কম হওয়ায় সংশ্লিষ্টরা পুনরায় একই অপরাধে লিপ্ত হয়। তাই ভেজাল, পচা, বাসি ও দূষিত পরিবেশে খাদ্য বিক্রয়কারীর বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান করা আবশ্যক, যার প্রধান হতে পারে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির প্রতিষ্ঠান একেবারে বন্ধ ও কমপক্ষে ৩ বছরের সশ্রম কারাদন্ড। অপরদিকে, খাদ্যের মূল্য বৃদ্ধি রোধ করা জরুরি। কারণ, এই অধিক মূল্য উৎপাদনকারীরা পায় না। কতিপয় অতি মুনাফালোভী ব্যবসায়ী এই মূল্য বৃদ্ধি ঘটায়। এবং পণ্য যত হাত বদল হয় তত মূল্য বাড়ে। বাজারে ব্যাপকভাবে খোলা খাবার বিক্রি করা হয়, যার সবই অনিরাপদ। আবার প্যাকেটজাত পণ্যের মেয়াদ উত্তীর্ণ হলেও তা বিক্রি করা হয়। এসব অনিয়ম, বন্ধ করার জন্য নিয়মিত বাজার তদারকি করা দরকার এবং দোষী ব্যক্তিদের কঠোর শাস্তি আবশ্যক। আর মানুষেরও উচিৎ, অনিরাপদ খাদ্য সম্পূর্ণরূপে পরিহার করা। দেশের কৃষিখাত আধুনিক না হওয়ার কারণেও খাদ্যের মূল্য অন্য দেশের তুলনায় অধিক। যেমন: চালসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি করে আনার পরও তা আমাদের দেশে উৎপাদিত পণ্যের চেয়ে তার মূল্য কম হয়। কারণ, বেশিরভাগ দেশের কৃষিখাত আধুনিক। তাদের একদিকে, উৎপাদনের হার বেশি, অন্যদিকে উৎপাদন ব্যয় অনেক কম। ফলে তাদের পণ্যের মূল্য কম। তাই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য আমাদের কৃষিখাতকে সম্পূর্ণরূপে আধুনিক করা দরকার।এছাড়া বাজারে ও খাদ্য পরিবহনে ব্যাপক চাঁদাবাজির কারণেও মূল্য বৃদ্ধি পায়। তাই এটাও প্রতিরোধ করা জরুরি।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন