Inqilab Logo

ঢাকা, রবিবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৮, ০২ পৌষ ১৪২৫, ৮ রবিউস সানী ১৪৪০ হিজরী
শিরোনাম

সংলাপ সফল করতেই হবে

| প্রকাশের সময় : ৬ নভেম্বর, ২০১৮, ১২:০৩ এএম

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের সঙ্গে জাতীয় ঐক্যফ্রণ্টের দ্বিতীয় দফা সংলাপ অনুষ্ঠিত হবে আগামী ৭ নভেম্বর। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন, জাতীয় ঐক্যফ্রণ্টের তরফে আবারো সংলাপে বসার জন্য চিঠি দেয়ার প্রেক্ষিতে ৭ নভেম্বর বেলা ১১টায় ছোট আকারে সংলাপ হবে। গত পরশু জাতীয় ঐক্যফ্রণ্টের পক্ষ থেকে দ্বিতীয় দফা সংলাপে বসার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে চিঠি দেন জাতীয় ঐক্যফ্রণ্টের নেতা ড. কামাল হোসেন। ওই চিঠিতে ১ নভেম্বর গণভবনে সংলাপের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলা হয়, সংলাপে জাতীয় ঐক্যফ্রণ্টের সাত দফা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হলেও তা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। সেইদিন আপনি বলেছিলেন, আমাদের আলোচনা অব্যাহত থাকবে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে অসম্পূর্ণ আলোচনা সম্পূর্ণ করার লক্ষ্যে জরুরি ভিত্তিতে আমরা জাতীয় ঐক্যফ্রণ্টের পক্ষে আবারো সংলাপে বসতে আগ্রহী। এক্ষেত্রে দফাগুলোর সংবিধানিক ও আইনগত দিক বিশ্লেষনের জন্য উভয়পক্ষের বিশ্লেষণসহ সীমিত পরিসরে আলোচনা আবশ্যক। ১ নভেম্বরের সংলাপের পর ড. কামাল হোসেন বলেছিলেন, সংলাপে প্রধানমন্ত্রীর দীর্ঘ বক্তব্যের মধ্যে ‘আমরা বিশেষ কোনো সমাধান পাইনি।’ বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছিলেন, ‘আলোচনায় আমরা সন্তুষ্ট নই।’ পক্ষান্তরে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, জাতীয় ঐক্যফ্রণ্ট চাইলে সংলাপ আরো হতে পারে। বলা যায়, সংলাপ অব্যাহত রাখার সম্ভবনা নিয়েই প্রথম দফা সংলাপের সমাপ্তি ঘটে। বলা বাহুল্য, জাতীয় ঐক্যফ্রণ্টের সংলাপের প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে সংলাপের আয়োজন করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে মহানুভবতা ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছিলেন, দ্বিতীয় দফা সংলাপে সম্মত হয়েও সেই মহানুভবতা ও দূরদর্শিতারই প্রমাণ রেখেছেন। এও লক্ষ্যনীয়, জাতীয় ঐক্যফ্রণ্ট অত্যন্ত ধীর-স্থিরভাবে নিয়মতান্ত্রিক পথ অনুসরণ করছে এবং ক্ষমতাসীন মহলও একইভাবে ইতিবাচক আচরণ ও ভূমিকা প্রদর্শন করছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা একে সপ্রশংস দৃষ্টিতে দেখছেন।
দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা রাজনৈতিক সংকটের সুরাহা এবং একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতার বাইরে থাকা রাজনৈতিক মহলদ্বয়ের মধ্যে সমঝোতা ও ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার অপরিহার্যতা প্রশ্নাতীত। এজন্য সংলাপই উৎকৃষ্ট ও উত্তম উপায়। উভয়পক্ষ যে তা উপলদ্ধি করে, সেটাও স্পষ্ট। অব্যাহত সংলাপে সম্মত হওয়াই তারই প্রমাণ। দু’পক্ষেই এখন ‘ডু অর ডাই’ অবস্থানে রয়েছে। এটা অবশ্যই একটা কঠিন অবস্থা। এ থেকে বেরিয়ে আসার শান্তিপূর্ণ ও একমাত্র পথ হলো, সংলাপ বা আলোচনা। উভয়ের স্বার্থে ও কল্যাণে এর জাতীয় মঙ্গলে এবং বিকল্প নেই। সমঝোতা ও সমাধান আলোচনার টেবিল থেকেই আসতে হবে। কাজেই, আলোচনার টেবিল ছাড়া যাবেনা। যে কোনোমূল্যে সমাধান বের করে আনতে হবে। সংলাপ সমঝোতার বিপরীতে আছে সংঘাত ও সহিংসতা, যা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। যে কোনো সংকট ও বিরোধ নিষ্পত্তির দুটি পথ খোলা থাকে। একটি হলো, সংলাপ ও সমঝোতা, অন্যটি হলো, সংঘাত-সহিংসতা ও যুদ্ধ। প্রথমটি হলো শান্তিরপথ, যাতে উভয় পক্ষই নিরাপদ থাকে। দ্বিতীয়টি হলো ধ্বংসের পথ, যার ক্ষতি অপূরণীয়, অপরিসীম। ইতিহাসে এমন অসংখ্য নজির রয়েছে, যেখানে আলোচনা-সংলাপের মাধ্যমে বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকটের শান্তিপূর্ণ মিমাংসা হয়েছে, রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের অবসান ঘটেছে। ইতিহাস-পাঠকদের হুদায়রিয়ার সন্ধির কথা নিশ্চয় স্মরণ আছে। ওই সন্ধির মাধ্যমে মক্কার কোরেশদের সঙ্গে বিশ্বনবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা. একটি রক্তক্ষয়ী সংঘাত এড়াতে সক্ষম হন। সংলাপের মাধ্যমে সন্ধিতে উপনীত হওয়া সম্ভব হয়। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা তথা ১৯৪৭ সালের পাকিস্তান ও ভারতের স্বাধীনতা লাভ যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয়নি, আলোচনা-সংলাপের মাধ্যমেই হয়। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধ আলোচনা-সংলাপের মাধ্যমই অবসিত হয়। দক্ষিণ আফ্রিকায় শেতাঙ্গ শাসনের অবসান যুদ্ধের মাধ্যমে হয়নি, আলোচনা-সমাঝোতার মাধ্যমেই হয়। কোরিয়ার যুদ্ধ কিংবা ভিয়েতনাম যুদ্ধের অবসান হয় আলোচনা-সংলাপের ভিত্তিতে। এ ধরনের আরো বহু ঘটনার কথাই উল্লেখ করা যায়, যেখানে আলোচনা-সংলাপই শান্তিপূর্ণ মিমাংসা এনে দিয়েছে। আবার আলোচনা-সংলাপের ব্যর্থতায় কী ধরনের মানবিক বিপর্যয়, সভ্যতার বিনাশ ও অপরিসীম ক্ষয়ক্ষতি ঘটে ইতিহাসে তারও বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ আলোচনা-সংলাপের পথ পরিহার করার জন্যই সংঘটিত হয়। এখনো বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যে সব রাজনৈতিক সংকট ও য্দ্ধু বিদ্যমান, তার জন্য আলোচনা-সমঝোতার ব্যর্থতাই দায়ী। ইতিহাসের নজির সামনে রেখে আমাদেরও আলোচনা-সংলাপের পথকেই একমাত্র উপায় হিসাবে গ্রহণ করতে হবে।
গণতান্ত্রিকপরস্পরা ধরে রাখা ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতার পালাবদল নিশ্চিত করার জন্য একটি অবাধ, সুষ্ঠ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের কোনো বিকল্প হতে পারে না। এ ধরনের একটি নির্বাচনের দাবি গোটা দেশের জনগণের। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো এ দাবি জানিয়ে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মহলও এ দাবির প্রতি সহমত পোষণ করে। তারাও বিভিন্ন সময় তাকিদ দিয়ে আসছে। এখন ক্ষমতাসীন দল ও মহলও বলছে, তারাও অবাধ, সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চায়। তারা এটা চায় বিদ্যমান সংবিধানের আওতায়। কিন্তু সংবিধানে এখন যে ব্যবস্থা রয়েছে, তাতে ওই ধরনের একটি নির্বাচন হওয়া সম্ভবপর নয়। এমতাবস্থায় কিভাবে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা যায়, সেটাই মূখ্য বিবেচ্য বিষয়। অনেকেই মনে করেন, সংবিধান এমন কিছু নয়, যা সংশোধন করা যাবে না। কোনো আইনও এমন নয় যে, তার সংশোধন বা পরিবর্তন হতে পারে না। জাতীয় বৃহত্তর স্বার্থে সব কিছুরই সংশোধন-পরিবর্তন হতে পারে। জাতীয় ঐক্যফ্রণ্ট যে সাত দফা দাবি দিয়েছে, তার মতে, সংবিধানের মধ্যে থেকেই সেগুলোর অধিকাংশের বাস্তবায়ন সম্ভব। দ্বিতীয় দফা সংলাপে সেটাই প্রধানত আলোচ্য বিষয়। যে কোনো বিরোধ-সংকট মিমাংসার জন্য বিবদমান দু’ পক্ষের কিছু না কিছু ছাড় দেয়ার মানসিকতা থাকা উচিৎ এবং সমঝোতা ও ঐকমত্যের প্রয়োজনে তা দিতেই হয়। আমরা আশা করি, দ্বিতীয় দফা সংলাপে খোলা মনে দু’পক্ষই অংশ নেবে এবং সমঝোতায় উপনীত হওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাবে। যে কোনোমূল্যে সংলাপকে সফল করতেই হবে। এক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন মহলকে অধিকতর নমনীয় ও ছাড় দেয়ার মনোভাব দেখাতে হবে। ক্ষমতাসীন মহল যদি অনমনীয় থাকে এবং আগের মতো একতরফা নির্বাচন করতে চায় তবে গণতন্ত্র ও নির্বাচনের ভবিষ্যত অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে বলে পর্যবেক্ষকরা আশংকা করেন। তারা এও আশংকা করেন, দেশজুড়ে সংঘাত-সহিংসতা দেখা দিতে পারে এবং তাতে নাগরিক নিরাপত্তা অনিশ্চিত ও অর্থনীতির ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে। এই অনাকাঙ্খিত ও অবাঞ্ছিত পরিস্থিতি যাতে সৃষ্টি হতে না পারে, সেজন্য ক্ষমতাসীন মহলকেই অগ্রবর্তী ভূমিকা রাখতে হবে। অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে কোনো পক্ষ হেরে গেলে তার কিছু হবে না। কিন্তু শক্তি প্রয়োগের পথ অবলম্বন করে রাজনৈতিকভাবে হেরে গেলে তার আর কিছুই থাকবে না। সংকটের গ্রহণযোগ্য মিমাংসায় পৌঁছাতে সংলাপ অব্যাহত রাখতে হবে। যতদিন মিমাংসায় পৌঁছানো না যাচ্ছে, ততদিন সংলাপ চালিয়ে যেতে হবে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর