Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২২ নভেম্বর ২০১৮, ০৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ১৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী

ঢাকা বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে কেন

মো. তোফাজ্জল বিন আমীন | প্রকাশের সময় : ৯ নভেম্বর, ২০১৮, ১২:০৫ এএম

দেশের প্রায় ১০ শতাংশ মানুষের বাস ঢাকায়। একটা সময় ঢাকা শহর ফাঁকা থাকলেও এখন তিল ধারণের ঠাঁই নেই। নদীবেষ্টিত রাজধানী নগরী ভেনিস হওয়ার কথা থাকলেও সে নগরী এখন বাসোযোগ্য নগরী হিসেবে স্বীকৃত। যুক্তরাজ্যের ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের প্রকাশিত তালিকায় দেখা গেছে, বিশ্বের ১৪০টি দেশের ওপর করা জরিপে সবচেয়ে অযোগ্য শহরের তালিকায় ঢাকা শহরের অবস্থান ১৩৯তম। বাসযোগ্য শহরের তালিকায় সবার ওপরে ভিয়েনা। ওয়ার্ল্ড পুপুলেশন রিভিউয়ের ভাষ্যমতে, ভিয়েনা শহরের প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৪ হাজার মানুষ বাস করে। আর ঢাকায় প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৪৫ হাজার মানুষ বাস করে। বাসোযোগ্য হওয়ার এটা একটি বড় কারণ। ঢাকাকে বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা যদি আন্তরিকভাবে করা হতো তাহলে বিশ্বে বসবাসের অযোগ্য শহর হিসেবে ঢাকার স্থান দ্বিতীয় হতো না। যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার পরই ঢাকার স্থান। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে রাজধানীবাসীর নাগরিক সুবিধা বৃদ্ধির জন্য ঢাকা সিটি করপোরেশনকে দুভাগ করেছিল। কিন্তু নাগরিক সুবিধা ন্যূনতম বৃদ্ধি পায়নি। বরং দিন দিন ঢাকা বসবাসের অযোগ্য হচ্ছে। অথচ ক্ষমতাসীন দলের নেতানেত্রীরা বক্তব্যে, বিবৃতিতে ও টিভি টকশোতে উন্নয়নের ফিরিস্তি দিচ্ছেন। উন্নয়ন হয়নি এটা বলছি না। তবে উন্নয়নের চেয়ে লুটপাট হাজারগুণ বেশি হচ্ছে। উন্নয়নের ভেলকিবাজির গল্প রূপকথার গল্পকে হার মানালেও একই রাস্তা বারবার খোঁড়াখুঁড়ি বন্ধ করা যায়নি। যানজট, ধুলাবালি, ধোঁয়া, শব্দদূষণ, বায়ুদূষণ ও মশার যন্ত্রণায় নগরবাসীর জীবন দুবির্ষহ হয়ে উঠলেও পরিত্রাণের উপায় নেই। ঢাকায় পথচারীদের চলাচলের জন্য যতটুকু সুযোগ-সুবিধা থাকার কথা সেটুকুও নেই। যতটুকু আছে, সেখানেও ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা অবৈধভাবে হাট-বাজার, দোকানপাট গড়ে নিজেদের পকেট ভারি করছে।

একটি স্বাধীন ও সভ্য দেশের রাজধানী যখন বাসযোগ্যতা হারিয়ে ফেলে তখন সহজে অনুমেয় হয় যে, দেশটিতে আইন আছে বটে কিন্তু আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ নেই। যে সমাজ ও রাষ্ট্রে শুধুমাত্র ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি চর্চা হয় সেখানে জনগণের মৌলিক অধিকার ভুলন্ঠিত হয়। ঢাকার ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্য যতটা না জনগণ দায়ী তার চেয়ে হাজারগুণ বেশি দায়ী ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি। রাজনৈতিক নেতা নেত্রীরা প্রায়ই বলে থাকেন জনগণের ভাগ্যের উন্নয়নের জন্য রাজনীতি করেন। অথচ স্বাধীনতার ৪৬ বছরের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে যারাই ক্ষমতার মসনদে বসেছে তারাই জনগণের মৌলিক অধিকার ভুলন্ঠিত করেছে। তা না হলে ঢাকা বাসযোগ্যতা হারাবে কেন? উন্নয়ন ভালো কিন্তু অপরিকল্পিত ও লোক দেখানো উন্নয়ন কারও জন্য কল্যাণজনক নয়।
আমরা সবাই উন্নত সমাজ ও রাষ্ট্রের স্বপ্নে বিভোর থাকি। অথচ সমাজ ও রাষ্ট্রের নানা অসংগতির বিরুদ্ধে টু-শব্দ উচ্চারণ করার সাহসটুকু রাখি না। সবাই নিজেকে নিয়ে ভাবি। অন্যের ওপর যখন অবিচার বা জুলুম চলে তখন তা দেখেও না দেখার ভান করি। কিন্তু যখন নিজের ওপর জুলুম চলে তখন আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করি। ঢাকার সমস্যার কথা লিখলে সমাপ্তি টানা যাবে না। ঢাকার প্রধান সমস্যা হচ্ছে, পরিবেশ দূষণ, বায়ু দূষণ, শব্দ দূষণ, জলাবদ্ধতা, যানজট ও গণশৌচাগারের অভাব। যানজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মূল্যবান সময় জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। যানজটের কারণে বছরে ৮১ লাখ ৫০ হাজার কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। ব্যবসা বাণিজ্যের সময় নষ্ট হচ্ছে ৪০ শতাংশ যা টাকার অংকে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। যানজটের কারণে বছরে ক্ষতি হচ্ছে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বাংলাদেশে ২০১৫ সালে ৮০ হাজার মানুষ পরিবেশ দূষণজনিত অসুখ-বিসুখে মৃত্যু হয়েছে । সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে যত আলোচনা হয় পরিবেশদূষণ নিয়ে ততটা হয় না। অথচ পরিবেশদূষণের কারণে ঢাকার আর্থিক ক্ষতি ১৪৪ কোটি ডলার, যা দেশের মোট জিডিপির ৭ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশের মোট মৃত্যুর ২৮ শতাংশের জন্য পরিবেশ দূষণ দায়ী। এ হার দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। বিবিসির এক রিপোর্টে দেখা গেছে, ঢাকার বায়ুদূষণের কারণে ৯ থেকে ১৪ বছরের শিশুদের ফুসফুসের কার্যকারিতা কমে যাচ্ছে। বাড়ছে হাঁপানি ও নিউমোনিয়া। পরিবেশ অধিদফতরের ভাষ্যমতে, ঢাকার বায়ুদূষণ সহনীয় মাত্রার চেয়ে পাঁচগুণ বেশি।
বিপদ-আপদ, দুর্ঘটনা, ভূমিকম্প, সুনামি ইত্যাদির ওপর কারও হাত নেই একথা ঠিক। কিন্তু একটু সচেতন হলে মনুষ্যসৃষ্ট দুযোর্গ মোকাবেলা করা কঠিন নয়! ঢাকাকে বাঁচাতে হলে ঢাকা শহর থেকে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি, যত্রতত্র বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, স্কুল, ক্লিনিক, রিক্সসা, অবৈধ গাড়ি, অপরিকল্পিত দালানকোঠা, ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা হাসপাতাল ঢাকার বাইরে নিয়ে যেতে হবে। ঢাকার শব্দদূষণ, বায়ুদূষণ, যানজট, জলাবদ্ধতা, মশা ও মশাবাহিত রোগ, গণপরিবহনের অপ্রতুলতা, ধোঁয়া, ধুলোয় কার্যত অচল হয়ে পড়ছে রাজধানী ঢাকা। এই দুর্ভোগ এক দিন, সপ্তাহ বা মাসের নয়। এ অবস্থা চলছে বছরের পর বছর। ক্ষমতাসীনরা উন্নয়নের বেলুন আকাশে উড়ালেও রাজধানী ঢাকার বসবাসযোগ্যতার খুব একটা উন্নয়ন হয়নি। ঢাকা এখনো পৃথিবীর নিকৃষ্টতম শহরগুলোর একটি। ঢাকার সমস্যাগুলো কোনো অলৌকিক ঘটনা কিংবা রাতারাতি সমাধান করা সম্ভব না। তারপরও সরকার অপরিকল্পিত নগরায়নের শিকার নগরবাসীকে দুর্ভোগের হাত থেকে রক্ষা করবে, এমনটিই দেশবাসীর প্রত্যাশা।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।