Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮, ৩০ কার্তিক ১৪২৫, ০৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী

বৈধ-অবৈধ পেশা ও উপার্জন

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান | প্রকাশের সময় : ৯ নভেম্বর, ২০১৮, ১২:০৫ এএম

চার

সুদ ঃ অবৈধ পন্থায় অর্থোপার্জনের বহুল প্রচলিত একটি প্রধান মাধ্যম হলো সুদের আদান প্রদান, যা আধুনিক বিশ্বব্যবস্থায় অর্থনীতির শিরা উপশিরায় ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। সুদ অর্থনীতির সবচেয়ে পুরাতন ও জটিল একটি বিষয়। মিসর, রোম, গ্রীস ও ভারতবর্ষ প্রভৃতি দেশে প্রাচীনকালে সুদ সম্পর্কে আইন রচনার প্রয়োজন হয়। বেদ, তাওরাত ও ইঞ্জিলে সুদকে একটি সমস্যা হিসেবে আলোচনা করা হয়েছে। সক্রেটিস, প্লেটো ও এরিস্টেটলের মতো প্রাচীন গ্রীক দার্শনিক এবং হিন্দু ও ইয়াহুদী সংস্কারকগণ সুদী কারবারের নিন্দা করেছেন। আর এটি ইসলামের সবচেয়ে ঘৃণ্যতম অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া। সুদ অর্থনৈতিক শোষণ ও জুলুমের অন্যতম হাতিয়ার। এটি মানুষের মানসিকতাকে সংকীর্ণ করে দেয়, মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে, অর্থনৈতিক গতিকে শ্লথ করে দেয়, অর্থবণ্টনে বৈষম্য সৃষ্টি করে। যদিও বিভিন্ন প্রাচ্যবিদ বিভিন্ন ধরণের যুক্তি-তর্ক উপস্থাপনের মাধ্যমে ইসলামে নিষিদ্ধ ঘোষিত সুদকে বৈধ করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। সুদের আরবী প্রতিশব্দ হলো ‘রিবা’। যার আভিধানিক অর্থ কয়েকটি হতে পারে। যেমন: বৃদ্ধি “আয-যামাখশারী, আসাসুল বালাগাত, বৈরূত: মাতবাতুল আওলাদিল আওরিফান, ১৯৫২, পৃ. ১৫৩। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ বলেন : যে সুদ তোমরা দিয়েছ এই উদ্দেশ্যে যে, মানুষের ধন বৃদ্ধি পাবে, আল্লাহর কাছে তা বৃদ্ধি পায় না।”- আল কুরআন, ৩০ : ৩৯। অন্য এক আয়াতে আল্লাহ্ বলেন : আল-কুরআন, ২ : ২৭৬”, অতিরিক্ত “এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ বলেন : “ফলে তিনি কঠোর হস্তে পাকড়াও করলেন।”-আল কুরআন, ৬৯ : ১০। ইমাম আল-জাওহারী ও ফাররা র. আয়াতে বর্ণিত এর অর্থ করেছেন বা অতিরিক্ত বস্ত। যেমন যখন কেউ প্রাপ্যের চেয়ে বেশি পায় তখন বলে : “আমি অতিরিক্ত পেয়েছি।”- আর-রাযী, মুখতারুস সীহাহ, বৈরূত: দারুল কুতুবিল ইসলামিয়্যহ, ১৯৯৪, পৃ. ২১৬”, বিকাশ “ইবনে কাছীর,তাফসীরু কুরআনিল আজীম, বৈরূত: দারুল মারিফা, ১৯৮৭, খ. ৩, পৃ. ২১৬। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন : “তুমি ভূমিকে পতিত দেখতে পাও, অতঃপর আমি যখন তাতে বৃষ্টি বর্ষণ করি তখন তা সতেজ ও বিকশিত হয়।” আল-কুরআন, ২২ : ৫”, সংখ্যাধিক্য ও ক্ষমতা “ইমাম শাওকানী, ফাতহুল কাদীর, আল-কাহেরা: মাকতাবাহ ওয়া মাতবা’আতি মুস্তাফাতুল বাবী আল-হালাবী ওয়া আওলাদুহু, ১৯৬৪, খ. ৩, পৃ. ১৯১। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ বলেন: “...যাতে একদল অন্যদল অপেক্ষা অধিক ক্ষমতাবান হয়...।” আল-কুরআন, ১৬ : ৯২।” ভূপৃষ্ঠ থেকে উঁচুস্থান “মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব, ফিরুযাবাদী, আল-কামূসুল মুহীত, আল-কাহেরা : মাতবাআতে আমীরিয়্যাহ, ১৪০২, খ. ৪, পৃ. ৩২৬। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন : “আর আমি মারইয়াম তনয় ও তাঁর মাকে এক নিদর্শন বানিয়েছিলাম এবং তাদেরকে এক অবস্থানযোগ্য স্বচ্ছ পানি বিশিষ্ট টিলায় আশ্রয় দিয়েছিলাম।” আল-কুরআন, ১৩ : ১৭”, শিশুর বেড়ে ওঠা “ইবনে আছীর, আন-নিহায়াহ ফী গারীবিল হাদীস ওয়াল আছার, বৈরূত: মাকতাবাতুল ইসলামিয়্যাহ, ১৯৬৩, খ. ২, পৃ. ১৯২”, ফুলে ওঠা “ইবনে মানজূর, লিসানুল আরব, বৈরূত: দারু সাদির, তা.বি., খ. ১৪, পৃ. ৩০৪-৩০৫, ইমাম নব্বী, তাহজীবুল আসমা ওয়াল লুগাত, (বৈরূত: দারুর কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, তা.বি.), খ. ১, পৃ. ১১৭” ইত্যাদি। সুদের ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো : Interest. ÒBangla Academy English-Bengali Dictionary, Edetor, Zillur Rahman Siddiqui, Dhaka : Bangla Accademy, 2004, P.406.”
পরিভাষিক অর্থে- ঋণ গ্রহণ বাবদ ঋণের পরিমাণের হিসাবে যে অতিরিক্ত হিসাব নির্ণয় করা হয় তাকে সুদ বলে। আর এ অতিরিক্ত অর্থ ভোগকারীকে সুদখোর বলে। “বাংলা অভিধান, ঢাকা : বাংলা একাডেমী, ১৯৯২, পৃ. ১১৫৭।”
‘‘সুদ বা রিবা হচ্ছে সেই বাড়তি অর্থ যার বিনিময়ে ঋণদাতা ঋণ পরিশোধের সময়টা আরো কিছু দিনের জন্য বাড়িয়ে দেয়।’’ “আলী নায়িফ, আশ-শুহূদ আল-মুফাস্সাল ফী আহকামির রিবা, মিশর : দারুত তাকওয়া, তা.বি., খ. ১, পৃ ৪; আবূ জাফর আত-তাবারী, জামি’উল বয়ান ফী তা’বীলির কুরআন, খ. ৩, পৃ. ৫৯৫”
ইবনুল আরাবী র. বলেন: ‘‘রিবা তথা সুদ হচ্ছে সে বাড়তি দাম, যা কোন মালের বিনিময় নয়।’’ “আবূ বকর আর-রাযী, আহকামুল কুরআন, বৈরূত : দারুল ফিকর, তা.বি., খ. ৩, পৃ. ১৫৩”
আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী র. বলেন: ‘‘পারস্পরিক বিনিময়ের ক্ষেত্রে কোন প্রকার বিনিময় ছাড়া মালের প্রবৃদ্ধিই সুদ বা রিবা।’’ “ইমাম বদরুদ্দীন আঈনী, উমদাতুল কারী শারহি সহীহুল বুখারী, বৈরূত : দারুল ফিকর, ১৯৭৯, খ. ১২, পৃ. ১৯৯”
আল্লামা ইবনে হাজার আল-আসকালীন র. বলেন: ‘‘পণ্য বা অর্থের বিনিময়ে প্রদেয় অতিরিক্ত পন্য বা অর্থই রিবা বা সুদ।’’ “ইবনে হাজার আল-আসকালানী, ফাতহুল বারী, আল-কাহেরা : দারুল মা’আরিফ, ১৯৫২, খ. ৪, পৃ. ২৫”
সুদ যে কোন অবস্থাতেই হোক না কেন ইসলামের অর্থনৈতিক দর্শনে হারাম। তাছাড়া সুদ সর্বযুগে এবং সবসময় ঘৃণিত অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়ে আসছে, যা আমরা বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ ও সভ্যতার দিকে দৃষ্টি দিলে স্পষ্ট জানতে পারি।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।